ইউজার লগইন

থ্রী- টু -ওয়ান -জিরো একশন !!!!!

থ্রী- টু -ওয়ান -জিরো একশন !!!!!

ছোটবেলায় নাটক সিনেমা দেখার সময় কাহিনী বোঝার থেকে বেশী ভাবতাম, কিভাবে নাটক সিনেমা তৈরি করে। আর নায়ক মারা যাওয়ার পর কিভাবে আবার জীবিত হয়! আর ভিলেনের শত শক্তি থাকা সত্তেও কেনই বা সে নায়ক কে হারাতে পারে না???
মাথার ভিতর এইসব প্রশ্ন গিজ গিজ করতে করতেই এক সময় টিভি স্ক্রীন এ লেখা আসত দ্যা এন্ড!
২০০২ সালে পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে অচেনা এক ব্যস্তমুখী শহর ঢাকায় এসেছিলাম পড়াশুনার জন্য, পথে আসার সময় যমুনা সেতু (তখন পৃথিবীর ১১ তম দীর্ঘ সেতু) দেখার আনন্দ ওহ সে এক অদ্ভুত অনুভুতি তা না হয় আর একদিন বলব।

আজ শুটিং নিয়েই বলি।ঢাকায় আসার পর থেকে শুটিং দেখার খুব ইচ্ছা। এফ ডি সি কি জিনিস তা তখনও বুঝি না। আমার বন্ধু রাতুলের বড় ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম এফ ডি সি তে শুটিং হয়। ওঁই খানে গেলে সব নায়ক নায়িকা কেও দেখা যাবে। আমি তো শুনেই খুব এক্সাইটেড হয়ে গেলাম। তারপর রাতুলকে খুব করে ধরলাম যেন ও ওর ভাইকে যেভাবেই পারে যেন রাজি করায়।

যথারীতি দিনক্ষণ ঠিক করে রাতুল আর ওর বড় ভাই সহ আমরা তিনজন রাওনা হলাম এফ ডি সির পথে। বলাকা বাসে করে আমরা টঙ্গী থেকে তেজগাঁও আসলাম। তারপর পায়ে হেটে এফ ডি সির গেট এ চলে এলাম। উৎসুক জনতার ভিড় দেখে আমারাও অগ্রসর হলাম গেটের দিকে। তারপর বুঝে উঠার আগেই দৌড়। ঠিক সিনেমার মত জাঁদরেল গোঁফ ওয়ালা দারোয়ান লাঠি নিয়ে সবাইকে তারা করছে। কি আর করা, শুটিং তো দেখাই হল না উল্টা দারোয়ানের তাঁরি খেয়ে বিষণ্ণ মনে বাড়ি ফিরলাম। ভাবলাম আর শুটিং এ দেখব না।

এর কিছুদিন পর খবর পেলাম আমাদের এলাকা থেকে মাইল ত্রিশেক দূরে পুবাইল এলাকায় সিনেমার শুটিং হচ্ছে। ছবির নাম হাজার বছর ধরে। আর তখন আমাদের ক্লাস নাইনের পাঠ্য বইয়ে হাজার বছর ধরে উপন্যাসটি ছিল। সুতরাং আগ্রহটা একটু বেশিই হল। এই সুযোগ কোনমতেই মিস করা যাবে না।
স্কুল ফাঁকি দিয়ে রাতুল, সুমন, তুহিন, রানা অংকুরসহ আমরা সবাই রওনা হলাম পুবাইলের উদ্দেশ্যে। টঙ্গী থেকে রিকশা যোগে মরকুন তারপর পায়ে হাটা ছাড়া আর উপায় ছিল না, কারন রাস্তার এত দুর্দশা ছিল যে তা বলে বুঝানো যাবে না।
রাস্তার দু ধারে সারি সারি তাল গাছ আর মাটির তৈরি বাড়ি আমি এর আগে কোথাও দেখিনি। ঠিক যেন উপন্যসের বর্ণিত সেই সাপের মত আঁকাবাঁকা মেঠো পথ আর দু ধারে গাছের সারি বেষ্টিত কল্পিত সেই গ্রাম। ঘণ্টা দুয়েক হাটার পর আমরা পৌচ্ছালাম পুবাইলের সেই শুটিং বাড়িতে।

এফ ডি সির মত এখানে নেই সেই দারোয়ান আর লোকজন ও ছিল হাতে গোনা। তখন আমি ঊনাকে (নায়িকা সুচন্দা) চিনি না। সবাই বলাবলি করছিল উনিই এই সিনেমার পরিচালক।
বেলা তখন দশটা , ঘর থেকে বের হয়ে নায়ক রিয়াজ (সিনেমায় মন্তু চরিত্র) সবাইকে সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করল। তার এই রকম বিনয় আচরনে আমি তো অবাক। সিনেমার নায়ক রিয়াজ আর বাস্তবের রিয়াজের চেহারা মিলাতে লাগলাম, বন্ধুকে বললাম দোস্ত ছবির রিয়াজ আর বাস্তবে্র রিয়াজ তো একই রকম দেখতে। অটোগ্রাফ নিলাম যা এখনো সযন্তে রেখেছি।

হাজার বছর ধরে বইটি সঙ্গে করে নিয়েছিলাম আমরা। অভিনেতারা সবাই রেডি হল, পরিচালক বার বার বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তারপর ক্যমেরা ম্যান রেডি শুটিং ইউনিটের লোকজন ব্যস্ত , অভিনেতা আর বিশেষ করে অভিনেত্রীদের চেহারা ঠিক আছে কিনা তা তদারকি করার জন্য কর্তব্যরত বয় সদা ব্যস্ত।

পরিচালক সবাইকে বললেন রেডি, থ্রী -টু -ওয়ান জিরো একশন। আর অমনি শুরু হল অভিনয়ের পালা। পাশে থেকে কেউ একজন ডায়লগ বলে দিচ্ছে আর একজন লম্বা লাঠিতে করে মাইকপিচ ঠিক মাথার উপর ধরে আছে। যথারীতি অভিনয় চলছে হঠাৎ পরিচালক বলে উঠলেন কাট--কাট , কিছুই হয়নি।

২০ সেকেন্ড এর সেই ছোট দৃশ্যটি ধারন করতে গিয়ে প্রায় বিশবার শট নেওয়ার পর পরিচালক কিঞ্চিৎ খুশি হয়ে ও কে বললেন। সাথে সাথে উৎসুক জনতা হাতে তালি দিয়ে অভিনন্দন দিতে লাগল।
আমি বইয়ের পাতার সাথে ডায়লগ গুলা মিলিয়ে হুবাহু মিল খুজে পেলাম।
তারপর আরও দুইদিন শুটিং দেখতে পুবাইল চলে গেলাম। অভিনয় যে কত কষ্টের শুটিং না দেখলে তা বুঝতেই পারতাম না। সিনেমার নায়িকা টুনির মত বলতেই হয় তা আর অয় না মিয়া তা আর অয় না। সত্যিই অভিনয় সবাইকে দিয়ে অয় (হয়) না। এটাও এক ধরনের শিল্প।
সুবীর নন্দীর গাওয়া ছবির একটা গান বারবার গাইতে ইচ্ছা করছে যদিও আমি গাইতে পারি না। শখ থাকা তো আর দোষের কিছু না তাই না?

শিল্পীঃ সুবীর নন্দী,
সুরকারঃ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল,
গীতিকারঃ জহির রায়হান
আশা ছিল মনে মনে, প্রেম করিমু তোমার সনে
তোমায় নিয়া ঘর বান্ধিমু গহীন বালুর চরে গো ……
গহীন বালুর চরে।।
সেই ঘরেতে তোমার-আমার মধুর মিলন হইতো
তোমার শাড়ীর আঁচলেতে পরাণ বান্ধা রইতো
রঙিন কাঁথায় থাকতাম শুইয়া, তোমায় বুকে লইয়া
চাঁদের আলোয় রাইত পোহাইতাম কথা কইয়া কইয়া
সেই সুখের স্বপন চোখে ভাসে, পরাণ উদাস করে গো ……
গহীন বালুর চরে।।
তোমার প্রেমের একটু পরশ গায়ে যদি লাগতো
ব্যথায় পোড়া বুকেতে এক সুখের সাগর জাগতো
তোমার কথা ভাইবা মরি নৌকা বাইতে বাইতে
কানাকড়ি চাই না, আহা তোমারে চাই পাইতে
সেই বালুচরে কাটতো জীবন মরণেরও পরে গো ……
গহীন বালুর চরে।।

শুটিং দেখার আনন্দ শেষ , এবার টিভির পর্দায় দেখার অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।
তারপর দিনক্ষণ সঠিক মনে নেই, তবে কোন এক ঈদ এর অনুষ্ঠানে টেলিভিশনের পর্দায় সিনেমাটি যখন দেখতে বসেছিলাম তখন সৃতিতে শুধুই সেই শুটিং।
এরপর অনেক শুটিং দেখেছি, কিন্তু স্কুল ফাঁকি দিয়ে সেইদিনের শুটিং দেখার মত মজা আর কোথাও পাইনি।

ছবিটি দক্ষ নির্মাণ শৈলী দিয়ে নির্মাণ করে সুচন্দা জিতে নেন মেরিল-প্রথম আলো পূরস্কার ও জাতীয় চলচ্চিত্র পূরস্কার এর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পূরস্কার। ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পূরস্কার সহ মেরিল প্রথম আলো পূরস্কার-এর একটি বিশেষ পুরস্কারসহ মোট চারটি বিভাগে ও পরে ঘোষিত জাতীয় চলচ্চিত্র পূরস্কার ২০০৫ এর মোট ছয়টি বিভাগে পূরস্কার লাভ করে।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জাহিদ জুয়েল's picture

নিজের সম্পর্কে

কেন যে ইঞ্জিনিয়ার হলাম, এইসব রসহীন জীবন খুব তিতা হয়ে গেছে,

ছোটবেলা থেকে সাহিত্যের প্রতি কিসের যে মায়া তা নিজেও জানি না। একটা সময় মনে হয়ত সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করি, কিন্তু তা আর হয়নি। রবি ঠাকুরের ছোট গল্প কিংবা কবিতা করেছে মুগ্ধ সেই ছোটবেলায়, জীবনের অনেকটা পথ অতিক্রম করে এসে আজও দেখছি ঐ একটা জিনিস আজও ভালবাসি হ্রদয়ের গহীন থেকে। তাইতো অসময়ে ছূটে এসেছি প্রিয় এই ব্লগে।