ইউজার লগইন

আরিশ ময়ূখ রিশাদ'এর ব্লগ

যন্ত্র (শেষ পর্ব)

প্রথম পর্ব

এগুলা কি হচ্ছে? সব তোর দোষ। রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে অর্কের বলা কথাটুকু বিভাজনের রেখা টেনে দিয়েছিল। রায়হান স্বভাবসুলভভাবে ক্ষেপে গিয়ে অর্কের কলার চেপে ধরেছিল। বাকি দুজন ওদের ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত ছিল। ওরা সিগারেট তৃষ্ণা ভুলে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে ছিলো কিংবা ঝগড়ারত ছিলো আলোবন্দী হয়ে। ঠিক তখন-ই যুবকেরা সচেতন হয়, কারণ অস্থির চিত্রগুলো যা তারা ফোকাস করতে পারছিল না, তাদের কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।

রায়হানকে দেখা যাচ্ছে, কলেজ গেটের সামনে ধূমপানরত অবস্থায়। অর্ককে দেখা যাচ্ছে চা পানরত অবস্থায়।
কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। অর্ক রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে।
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে আমারো। তারপর তারা কিছুক্ষণ কথা বলে। অর্কের ভেতর চলতে থাকা এই দৃশ্যগুলোর দিকে আঠা দিয়ে আটকানো দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল বাকি তিনজন।

যন্ত্র

( সাধারণত পর্বভিত্তিক লেখা খুব একটা দেই না, যারা পড়বে তাদের বিরক্তির কথা ভেবে। এইবার দিলাম। বিরক্তির জন্য আগামভাবে ক্ষমাপ্রার্থী)

#
একটি ঘর, খুব বেশি বড় নয়। এখন সভাকক্ষের মতো করে সাজানো হয়েছে। পাঁচটি সারিতে,পাঁচটি করে চেয়ার। সামনে বড়সড় টেবিল। পেছনে ঝুলছে ক্যালেন্ডার। সেখানে তারিখ ঝুলছে গতমাসের। জানালা আছে কিন্তু এখন বন্ধ। বিশাল পর্দা নামানো। ঘরে চলছে এসি। তাদের কেউ এসির ঠান্ডা বাতাসে অনভ্যস্ততার দরুণ কাঁপছে। তাদের হাত-পা শুকিয়ে আসছে। তবু, তারা অপেক্ষা করছে।
দুজন বিশালদেহ নিরাপত্তা কর্মী ঘোরাফেরা করছে। তাদের মাথায় কালো টুপি। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না।
বড় টেবিলের ওপাশটা খালি। কেউ এসে বসবেন সেখানে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে।

তরুণীর ডানা বিষয়ক জটিলতা

#
আমার একটা ডানা ছিল। ডানাটি ছেঁড়া ছিল। একদিন উড়তে গিয়ে ঠাস করে পড়ে গিয়ে খেয়াল হলো, ডানাটি ছিড়ে গেছে, ভেঙে গেছে, কেউ এসে ভেঙে দিয়েছে।
আমি খুব শপিং করতাম। এটা-ওটা কিনতাম, শুধু শুধু দরদাম করতাম। কখনো কিছু না কিনে চলে আসতাম। মার্কেটে ডানা পাওয়া যেত না। আমার ডানাটি ভেঙে গিয়েছিল।
প্রায় একা একা হাঁটতাম, একা একা হাঁটি। তাকিয়ে মানুষ দেখি। ফুটপাতে ক্লান্ত পথচারীর পাঁজরভাঙ্গা নিঃশ্বাস দেখি, স্কুল ছাত্রদের চোখভরা আনন্দ দেখি, বেণী দোলানো তরুণীর হেঁটে যাওয়া দেখি। আমার দেখতে ভালো লাগে। কেবল, আমার মতো এক ডানা-ওয়ালা কাউকে দেখি না। আমি একটা ডানা খুঁজছি কিছুদিন ধরে। আমার ডানাটি কেউ এসে ভেঙে গিয়েছিল।
#
ধানমন্ডি থানায় ধুলো পড়া গাড়ির সাঁড়ি। পেরিয়ে এগিয়ে যাই। ঘর্মাক্ত পুলিশের চোখ খেলা করে- আমার মাথা থেকে নিচে। ওড়না পেঁচানো আমি, লোকটি কী দেখতে পাচ্ছে আমার ডানা নেই?
আমার ডানা হারিয়ে গেছে।

আকাশ, আগ্নেয়গিরি আর আমি

আকাশ

## প্রত্যেক মানুষের নাকি নিজের একটা আকাশ থাকে। সেই আকাশে প্রাকৃতিক আকাশের মতো নিজের কিছু তারা , কষ্ট নামের মেঘ , কান্না নামের বৃষ্টি থাকে। রোদ নামের ঘাম থাকে, চাঁদ নামের আলো থাকে, জোছনারুপী ভালোবাসা থাকে। কখনো কখনো শূন্যতার মতো অনন্ত নক্ষত্রবীথি থাকে, সুখগুলো হারানোর কৃষ্ণ গহবর থাকে। এতকিছু কোনোকিছুই থাকে না, যদি আকাশটা না থাকে। তবে অনেকেই আছে যারা এই আকাশের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত না হয়েও অনুভূতির চোরাবালিতে আটকে পড়ে হাঁসফাঁস করতে করতে জীবন কাটিয়ে দেয়। আমি সেই দলভূক্ত নই।
মেঘগুলোকে আমার সুখের মতোই মনে হয়। তারা সুখের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছোটাছুটি করে, অস্থির হয়ে। অস্থির মেঘ আমি ভালোবাসি!

বৃষ্টিজলে ধুঁয়ে যাওয়া অক্ষর

১))
প্রায় দশ বছর পর বাবাকে দেখলাম। শেষবার যখন দেখি, আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম দোতলা বাড়ির বারান্দায় নিশ্চুপ দেয়ালের মতো। দেয়ালের কান আছে এমন কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়, আমিও সেদিন সেই শোনা কথার আদর্শ ধরে রাখার জন্য কিছু কথা শুনে ফেলেছিলাম। নিচে দাঁড়িয়ে বাবা বলছিল, নামবি না খোকা?
আমি তখন দেয়ালের মতো অনঢ়। বাবা যখন দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল, তখন কিছুটা সচল হয়ে উৎসুক চোখ নিয়ে বাইরে এদিক-সেদিক তাকিয়েছিলাম।
এই দশ বছরে বাবা কত বদলে গেছে। বয়স যেন বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। মাস্ক মুখে, সারা হাত-পায়ে কিসব জানি লাগানো। বাবাকে মনে হচ্ছে বৃদ্ধ কেউ। আমি পাশে গিয়ে তাকালাম কিন্তু বাবা দেখল না। পাশে মনিটরে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন ওঠানামা করছে।
তোমার বাবা, এখন কোমায়। এজন্য আসতে বলেছিলাম।
পেছনে তাকিয়ে দেখি বয়স্ক মতো এক লোক। মলিন একটা শার্ট পড়নে। চোখে-মুখে রাজ্যের আধাঁর।

সম্পর্ক কিংবা অসম্পর্কের গল্প

১))
আমাদের প্রিয় বন্ধু সাগর একসময় ডায়েরী লিখত।
আমরা জানতে চাইতাম, তুই এত চুপচাপ কেন? বন্ধু আমাদের হেসে বলত,কই? পাতার সাথে তো কথা বলি। পাতা- যাকে আমরা দীর্ঘদিন ভেবে এসেছি রূপসী কোনো তরুণী, যার কথা ভেবে আমরা বন্ধুরা কত সময় পার করেছি উদাস থেকে উদাস হয়ে। এক অদেখা তরুণী যে আমাদের প্রিয় বন্ধুর সব কথা জানে, আমরা তার কাছের হয়েও কিছু জানি না সেই তরুণী দিন থেকে দিন আমাদের চোখের বালি হতে থাকল।
আমরা যখন আবিষ্কার করলাম, পাতা মানে কোনো নারী না, গাছের পাতা না বরং পাতা দিয়ে বানানো ডায়েরী,আমাদের মন কিঞ্চিত খারাপ হলো। সাগরকে নিয়ে নতুন করে আলোচনার কিছু না পেয়ে আমাদের ভেতর বিরক্তি কাজ করতে শুরু করে আর ডায়েরীটি পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে।

জেলবন্দী মানুষ কিংবা দেয়ালবন্দী আমি

১))
প্রায় চৌদ্দ বছর পর জেল থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে নিঃশ্বাস নিতে গিয়ে খেয়াল করলাম, উজ্জ্বল আলোতে চোখ জ্বালা করছে। হাঁফ ছাড়ার কথা ভুলে গিয়ে, আমি চোখের দুর্দশা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। অথচ প্রথমেই আমার ছেলের কথা মনে হওয়া উচিত ছিল কিংবা আমার বৃদ্ধ মা কিভাবে সংসারের ঘানি টানছে সেই বিষয়ে উদগ্রীব হয়ে বাসায় ছুটে যাওয়া উচিত ছিল। ছেলের কথা মনে হলো, অনেক পড়ে। এর মাঝে মুক্ত বাতাসে,মুক্ত মানুষ হয়ে চা খেলাম আয়েশ করে।
তখন খেয়াল হলো- আমার জন্য জেলগেটের বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। দাঁড়ানোর কথা ছিল না,আমি প্রত্যাশাও করি নি। মা ছাড়া গত চৌদ্দ বছরে কেউ যোগাযোগ করে নি খুব একটা। তাই ফুলের মালা নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে এটা ভাবার মতো বোকা আমি না। তবু হয়ত অবচেতন মন কিছু একটা চাইছিল।
পুরোন ঢাকার ঘিঞ্জি রাস্তাগুলো যে আরো ঘিঞ্জি হয়েছে সেটা বুঝতে না বুঝতেই পেছন থেকে শুনতে পেলাম-
আব্বা, বাসায় চলেন। অনেক রোদ উঠছে আজকে।

এটি একটি প্রেমের গল্প হতে পারত

রেল-লাইনের স্লিপারের প্রতি কোনোকালেই আমার আগ্রহ ছিল না। কোনোদিন পথের প্রয়োজনে হয়ত রোদ জর্জরিত দুপুরে দৌড়ে, কখনো হেঁটে পার হয়েছি অসমান্তরাল সমাজের সাথে বেমানান সমান্তরাল দু’টো পাত ধরে। আজ বাড়ি থেকে বের হয়ে যখন কোনো রিকশা পাচ্ছিলাম না, ওদিকে হাতে সময় কম- তাই শর্টকার্ট হিসেবে রেললাইনের পথটাই বেছে নিলাম।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে কেবল। জন-মানুষহীন রাস্তায় কেবল মিহি দানার মতো আলো। এই আলোর মতোই যেন আমার অস্তিত্ব; তবে কখনো পরিপূর্ণ হয়ে ফোটে না,ফুটলে সন্ধ্যা হয়ে যায় তাড়াতাড়ি, অথচ আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছি, একটি পবিত্র আলোর জন্য, যে আলোতে আমার কদাকার মুখের মুচকি হাসি হঠাৎ করেই নিভে যাবে না, নিভলেও নেভার জন্য পর্যাপ্ত সময় আমাকে দেবে,যেন আমি মানিয়ে নিতে পারি।

চোখ

আমাকে একটা চোখ ধার দিবে? আমার চোখ দিয়ে কেবল রক্ত পড়ে। লাল লাল তাজা মানুষের রক্ত। আমার হাত এখন জীর্ণ-শীর্ণ আর বৃদ্ধ। আমি রক্ত মুছতে পারি না। রক্ত গাল বেয়ে বেয়ে পড়ে আমাকে ভিজিয়ে দেয়, আমার গাল,ঠোঁট,গলা এখন রক্তস্নাত। এমনকি তোমার দেয়া শার্টগুলো ভিজে ভিজে যখন শক্ত হয়ে যায়,আমি কেবল ব্যথিত চোখে দেখি তাদের নীরব মৃত্যু। আসলে দেখি না। যখন দেখতে যাই,শক্ত হয়ে যাওয়া শার্ট আবার ভিজতে শুরু করে।

আমাকে নতুন কিছু শার্ট দিবে? তোমার দেয়া শার্ট ছাড়া আমি কিছু পড়তে পারি না। পুরোনো হয়ে যাওয়া শার্টগুলো কত জায়গায় ছিড়ে গেছে,ধুতে ধুতে হয়ে গেছে ঘর মোছার কাপড়ের মতো। একদিন তো ভুল করে কাজের ছেলেটা একটি শার্ট দিয়ে ঘর মুছতে শুরু করল। আমি নীরবে শুধু চেয়ে দেখি, শার্টগুলোর অপমৃত্যু। আসলে চেয়ে দেখতে পারি না। আমার চোখ দিয়ে কেবল রক্ত পড়ে।

পূর্ণিমা রাত ও লুসিফার

একটি অন্যরকম রাতের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছি।
বাইরের প্রকৃতি অন্যান্য সব রাতের মতো। ভেতরের চেতনা একটু অস্থির। অস্থির না হলে সেটা হতো অস্বাভাবিক। এই রাতের জন্য অপেক্ষায় আছি দেখে বিয়ে করলাম না- অথচ আমি চিরকাল নারী ভক্ত ছিলাম।চাইলে ব্যবসা করতে পারতাম- ফুলে থাকা পৈত্রিক সম্পত্তি বাড়াতে পারতাম চক্রবৃদ্ধি হারে। খুলতে পারতাম একটি পাঁচতারা হোটেল- যে হোটেলের বারে বসে মাতাল হতে পারতাম ফ্রি’তে।
শুধু ধ্যান করেছি আমি। শয়তান হিসেবে যাদের আমরা চিনি,জানি কিংবা অনুভব করি তাদের দেবতা লুসিফারের সাথে দেখা করার জন্য প্রতি পূর্ণিমা রাতে রক্তস্নান করেছি।

আজ আবার পূর্ণিমা। আমি একশ’তম হত্যাকান্ডটি সম্পন্ন করে চুপচাপ বসে আছি। মিনিটে মিনিটে অস্থিরতা বেড়ে যাচ্ছে। লুসিফারের দেখা পাওয়া সহজ কথা নয়। স্বপ্নপ্রাপ্ত এক গোপন সূত্রের পথ ধরে এতদূর আগাতে পেরেছি।