ইউজার লগইন

এটি একটি প্রেমের গল্প হতে পারত

রেল-লাইনের স্লিপারের প্রতি কোনোকালেই আমার আগ্রহ ছিল না। কোনোদিন পথের প্রয়োজনে হয়ত রোদ জর্জরিত দুপুরে দৌড়ে, কখনো হেঁটে পার হয়েছি অসমান্তরাল সমাজের সাথে বেমানান সমান্তরাল দু’টো পাত ধরে। আজ বাড়ি থেকে বের হয়ে যখন কোনো রিকশা পাচ্ছিলাম না, ওদিকে হাতে সময় কম- তাই শর্টকার্ট হিসেবে রেললাইনের পথটাই বেছে নিলাম।
ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে কেবল। জন-মানুষহীন রাস্তায় কেবল মিহি দানার মতো আলো। এই আলোর মতোই যেন আমার অস্তিত্ব; তবে কখনো পরিপূর্ণ হয়ে ফোটে না,ফুটলে সন্ধ্যা হয়ে যায় তাড়াতাড়ি, অথচ আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছি, একটি পবিত্র আলোর জন্য, যে আলোতে আমার কদাকার মুখের মুচকি হাসি হঠাৎ করেই নিভে যাবে না, নিভলেও নেভার জন্য পর্যাপ্ত সময় আমাকে দেবে,যেন আমি মানিয়ে নিতে পারি।

কিছুদূর এগোতেই ধাক্কার মতো খেলাম। না, হঠাৎ করে পাহাড় এসে পড়ে নি, সাঁতরাতে পারি অবলীলায় তাই নদী দেখে থমকে যাওয়ার কারণ নেই। আচমকা কোনো ট্রেন এসে আমাকে পিষে ফেলার উপক্রম করে নি। কোনো মানুষ জটলা পাকিয়ে নেই। আমার থমকে যাওয়ার স্বাভাবিক কারণগুলো ছিল অনুপস্থিত।

একটি মেয়েকে দেখলাম চুপচাপ বসে রেললাইনের স্লিপারের দিকে অদ্ভূত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির পড়নে দামি পোশাক,পাশে ব্যাগ। ভেবেছিলাম বসে আছে থাকুক,আমার কী? সাড়ে ছ’টার ভেতর অফিসে পৌছাতে হবে। অফিস থেকে চালান নিয়ে যেতে হবে নেত্রোকোনা। কাল এসে বেতন তুলতে হবে, ছোটভাই টাকা চেয়েছে কিছু দিতে হবে। মা’র হাতের টাকাও নিশ্চয় শেষ। ওদিকে ঝুল পড়া বারান্দায় বসে বাবা একা একা কী যেন ভাবেন! আমার সাথে দেখা হলেই বলেন, রাসেল আই দাবা খেলি। আমি ক্লান্ত শরীরে দাবা খেলতে বসলে দেখি,বাবা তার সৈন্যসামন্তর দিকে উদাস দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে, যেন কেউ ঠিক জায়গাতে নেই, তিনি দিশেহারা একজন রাজা। মেয়েটি এখন ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে আছে। তাই এড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পারলাম না।
কোনো সমস্যা আপু?
মেয়েটি না তাকিয়ে বলল, পুকুরে হাঁস নেই কেন?
পুকুর! পুকুর কোথায়? হাঁস আসবে কোথা থেকে? মাথা ঠিক আছে আপনার?
মেয়েটি এবার মুখ তুলে তাকায়। চোখের কোণে জল। আশেপাশে পুকুর নেই, মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, পুকুর থাকা দরকার ছিল, পুকুরে হাঁস থাকা দরকার ছিল, হাঁসের সাঁতার কাটা দরকার ছিল।
সূর্য ফুটতে দেরি হচ্ছে। আকাশে হঠাৎ মেঘ। আধো আধো আলো অন্ধকারে বিষণ্ণ এক তরুণীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
আমার নতুন করে বিষণ্ণ হওয়ার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, বিষণ্ণ হওয়ার পরিধি এক জীবনে মেপে শেষ করা সম্ভব না।
হুম,আমি পাগল। দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলে যান। কামড়ে দিব। বলতে বলতে হাসতে শুরু করে। কোনো হাসিতে এমন কান্না মিশে থাকে, জানা ছিল না।
হঠাৎ উদয় হওয়া ভাব পলায়নপর মনোবৃত্তির কাছে হেরে যাওয়াতে বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়ালাম না। মেয়েটির ছায়া তবু আসতে থাকে পিছু পিছু। ছায়া ছায়া মেয়ে,আমার সাথে নেত্রোকোনা গেল। সেখানে পুকুরে হাঁসের সাঁতার দেখে তার সে কী হাসি! আমিও ছায়া ছায়া ভাবে হাসি।
বয়স ত্রিশের কোটা ছুঁইছুঁই। বিয়ের রাতে বন্ধুর সাথে পালিয়ে গেল বউ। সেই থেকে বন্ধু আর নারী থেকে আমি দূরে থাকি একশ হাত কিংবা তারো বেশি। আজ তাই এই ছায়া হাসির কারণ ছিল না। হয়ত ছিল,থাকলেও আমার জানা নেই। আমি বোকা,আমি অবুঝ। এত জ্ঞান আমার নেই। আমি বাবার সাথে দাবা খেলি, যে খেলা কোনোদিন শেষ হয় না। আমি মা’র হাতে টাকা তুলে দিই,যে টাকা শেষ হয়ে যায় খুব তাড়াতাড়ি। ছোট ভাই সিগারেট খেতে থাকলে আমি লুকিয়ে পড়ি। বেচারা আমার কারণে সিগারেটের টাকাটা কেন নষ্ট করবে? আমি অফিসে গাধার মতো খেটে ঘরে কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাতে পছন্দ করি। আমার ছায়া হয়ে ছায়ার সাথে হাঁটার কোনো কারণ ছিল না। যেমন ছিল না,আমার জন্ম হবার কারণ।
বাড়ি ফিরলে মা বলে, জানিস আজ একটা মেয়ে রেললাইনে কাটা পড়েছে?
আমি কিছু না বলে ঘুমোতে চলে যায়। কে কাটা পড়েছে,আমি জানি। আর কেনই বা কাটা পড়বে না? সেখানে কোনো পুকুর ছিল না,হাঁস ছিল না। মেয়েটি হাঁসের সাঁতার কাটা দেখতে চেয়েছিল।
এরপর থেকে প্রায় আমি রেললাইন ধরে হেঁটে অফিসের দিকে রওনা দিই। এখন আমি স্লিপার দেখি,সমান্তরাল পাত দেখি,পাতের ফাকে পাথর দেখি,ট্রেনের ভেতর মানুষ দেখি। হাঁটতে হাঁটতে পথ ভুলে চলে যাই স্টেশনে। সেখানে চায়ের দোকান দেখি,কুলিদের ব্যস্ততা দেখি,কত মানুষ দেখি। কেবল দেখি না ছায়া ছায়া মেয়েটিকে।
বাড়ি ফিরে বাবার সাথে দাবা খেলি এখনো। এখনো টাকা শেষ হয়ে যায়। কেবল আমার আগের মতো মন খারাপ হয় না। ব্যস্ততা বেড়ে গেছে,কত! স্লিপার দেখতে হয়,মানুষ দেখতে হয়, হাঁসের সাঁতার দেখতে হয়। যে ভিড়ে মানুষ হারিয়ে যায়,সেই ভীড়ে আমি ছায়া খুঁজে বেড়াই। সাংসরিক বিষয়গুলো মন খারাপের সময় হয় না। মাঝে মাঝে কেবল মনে পড়ে যায়, বিয়ের রাতে আমার বউ আমাকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। ছায়া মেয়েটির কারণে মন খারাপের সুযোগ পাই না একদম-ই।

বেশ ক’দিন পর বুঝতে পারি রেললাইনের স্লিপারগুলো বড্ড পুরোনো হয়ে গেছে।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সামছা আকিদা জাহান's picture


উঠোনে দাঁড়িয়ে সে পরনে ঢাকাই শাড়ি সিঁথতে সিদুর।

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


উঠোনে কেন,শুধু সব জায়গাতেই হয়ত দাঁড়িয়ে থাকে,ধন্যবাদ পাঠের জন্য

অরিত্র's picture


মেয়েটি না তাকিয়ে বলল, পুকুরে হাঁস নেই কেন?

অসাধারণ

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


পাঠে কৃতজ্ঞতা। ভালো থাকুন সবসময়।

হাসান রায়হান's picture


একদম শেষ লাইনটা বুঝলাম না; মনে হল দরকারও ছিলনা। তবে,
গল্পটা চমৎকার। এমন গল্প আরো চাই। ধন্যবাদ।

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


শেষ লাইনটা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছি, সে এখন ছায়া নিয়ে বিষণ্ণ হতে হতে ক্লান্ত। আরেকটু, বিষদভাবে লিখলে মনে হয় ভালো হত। অনুপ্রেরণার জন্য ধন্যবাদ

লীনা দিলরুবা's picture


গল্পটা অনেক সুন্দর। কথকের অনুভূতিগুলো ভালো লাগলো।

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


লীনাপু অনেক ভালো লাগে আপনার ,মন্তব্য পেলে ।) Smile Smile

নজরুল ইসলাম's picture


ভালো লাগলো

১০

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


অনেক ধন্যবাদ নজরুল ভাইয়া। :ধইন্যাপাতা:

১১

লীনা ফেরদৌস's picture


গল্পটা চমৎকার। তোমার লেখার হাত সত্যি চমৎকার।

এই আলোর মতোই যেন আমার অস্তিত্ব; তবে কখনো পরিপূর্ণ হয়ে ফোটে না,ফুটলে সন্ধ্যা হয়ে যায় তাড়াতাড়ি, অথচ আমি অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় আছি, একটি পবিত্র আলোর জন্য,- খুব সুন্দর

১২

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


লেখার হাত চমৎকার যেন হয় সেই চর্চাই করছি । অনেক ধন্যবাদ, আপু

১৩

শওকত মাসুম's picture


ভাল লাগছে। চমৎকার উপস্থাপনা

১৪

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


আমার তিনটা পোস্ট। সব কটাতেই পেয়েছি, আপনার মন্তব্য। নিঃসন্দেহে আমার জন্য অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক।

১৫

নরাধম's picture


দারুন গল্প!

১৬

তানবীরা's picture


ভাল লাগছে। চমৎকার উপস্থাপনা

১৭

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture

নিজের সম্পর্কে

বলার মতো কিছু নেই।বলার মতো কিছু তৈরী করতে চাই