ইউজার লগইন

মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ'এর ব্লগ

সাপলুড়ু

শিউলি চিরকুটে চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন-

-উনি কোথায়? হ্যাঁ, চলে আসতে বলুন।

-স্যার বাসার গেটে; গাড়িতে । আপনি একটু আসবেন?

দুতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজ মৃত্তিকা আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ।

তাঁর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে- কাঁপুনির মাত্রা এত তীব্র হতে পারে তিনি তা ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। ভাবতে পারার কথাও নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পর এ রকম কেউ ভাবতে পারে না। শিউলি কাঁপছেন আর ভাবছেন- কীভাবে তাঁকে রিসিভ করবেন ।

২.

ওই দেখো, মানিকজোড় যায়

‘Long, long afterward, in an oak
I found the arrow, still unbroke;
And the song, from beginning to end,
I found again in the heart of a friend.’
―Henry Wadsworth Longfellow

১.
ভুলু বাঁশি বাজায় এবং টুলু পশুপাখি শিকার করে; শিকারী ও বংশীবাদক―দুই বন্ধু।
গাঁয়ের এক কোণায় দুই বন্ধুর দু’টো কুঁড়েঘর; মাটির দেয়াল, শনপাতায় ছাওয়া। দুর থেকে খুব সহজে চোখে পড়ে না―ঘন গাছপালার সবুজ আড়ালে ঘেরা। দু’জনের বয়স কাছাকাছি।

জরির স্বামী টুলু শিকারে যায় আর পরির স্বামী ভুলু বাঁশি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।
জরি ও পরি―হরি হর আত্মা; এক অপরকে পছন্দ করে ও ভালোবাসে। তারাও সই পাতায়; বিপদে আপদে পরস্পর কাছে এসে দাঁড়ায়।

তোমার জন্যে লাল গোলাপ

এক.
মাসুদ তাঁর বাবার ছবিটির ফ্রেম পাল্টান―প্রতি বছর; মার্চ এলেই। এটি তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে সারা বছর।
আজ আব্বু সকালেই টিভি দেখছেন; সকালের নাশতা সেরেই প্রতিদিন তাড়াহুড়ো করে তিনি বেরিয়ে পড়েন―অফিসে যান।
বাসার টিভি সেটটি ডাইনিং রুমেই। আব্বু ওখানে বসেই খবর শোনেন; রাত জেগে টক শো দেখেন। মাঝে মাঝে আম্মুও বসেন―খবর শোনেন।
―আব্বু , তুমি কী দেখছো? তোমার কী আজ অফিস নেই? এতো কোন খবর নয়―লাইভ অনুষ্ঠান। দীপা বাবার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়ায়।
―না, মা । আজ আমার ছুটি। স্বাধীনতা দিবসের ছুটি।
―আম্মু, আজ তোমারও কি ছুটি ? আজ তো ভাইয়ারও ছুটি, আমারও ছুটি, আব্বুরও ছুটি।
দীপা দৌড়ে গিয়ে ওর ভাইয়ের হাত ধরে গাইতে থাকে―দীপনও গলা মেলায় দীপার সাথে:
মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি,/ কী করি আজ ভেবে না পাই, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই / কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই সকল ছেলে জুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই আজ আমাদের ছুটি।

ডাহুক ও রাতের মানচিত্র -৪

ডাহুক, প্রণয় পাখি -সবুজ বিকেল শহিদ মিনার ছবি আর ছবি মনে পড়ে,
উদ্ভিদ উদ্যান -সবুজ ঘাসের মাঠ
হাজারো ফুলের মাঝে দোয়েল দখিনা বাড়ি নিরব কথার ধারা – শুধু মনে পড়ে;
আলাওল দিঘি – জোড়া চোখে প্রজাপতি, জোড়া চোখে জল,
নিজেকে পরখ করি তিমির গভীরে;
একটা বিশের ট্রেন – পাখির প্রথম প্রেম, পৃথিবীর সব রূপ জমে আছে চুলে অন্ধকারে।

ফুলজাগা রাতগুলো রাতজাগা ফুলগুলো তোমার আকাশে উড়ে
কখনো ফুলের রাত, কখনো রাতের ফুল তোমার হৃদয় জুড়ে,
এই ফুল এই রাত তোমার গানের মত শুধুই আমার – আমাকে জাগিয়ে রাখে,
এই কথা এই সুর আমার প্রেমের মত শুধুই তোমার – নিশীথে তোমাকে ডাকে।

ডাহুক ও রাতের মানচিত্র -৩

বিনিদ্র ডাহুক, নিশুতি রাতের সাথি; দুঃখ নীল পাখি
তোমাকে খুঁজিয়া ফিরে ভেজা ঘাসফুল,কালো মেঘ লাজরাঙা আঁখি।
ডাহুক প্রাণের পাখি - বীজতলা ভরে আছে নাকফুলে সোনার দানায়
নয় অভিমান-রুপোলি দিঘির জলে সরপুটি টাকিমাছ ঘুরিয়া বেড়ায়।
তোমার কোমল গ্রীবা প্রিয়ার অলক বেণী, মেঘের শরীর
তোমার হলুদ ঠ্যাং খুঁজে ভেজা মেঘ, কোহালিয়াচর মুহুরি নদীর তীর,
তোমার ক্রন্দন শুনে আঁধার শাওন রাত – পৃথিবী নিথর
কবির কোমল বুক পুড়ে ইটখোলা
মেঘের মলিন মুখ কবিতার চর।
ডাহুক, বাউল পাখি-
নগরের নাভিমূলে হাত রেখে চলি,
আকাশে অনার্য চাঁদ – অচল আধুলি।

নিজস্ব নিবাস

আমাকে বিকেল ডাকে-নদীর নরম ঢেউ,
আকাশে গোধূলি নামে আমাকে তবুও আর
খুঁজে নাকো কেউ;
দেখিনি প্রদীপ শিখা জুড়ে দুই চোখ... ...
আমাকে বিদীর্ণ করে আঁধার রাতের তারা
বিষধর নোখ,

নিদাগ নির্মাণে খুঁজি নিজস্ব নিবাস
সময় উপড়ে শুধু কবিতার ঘাস।

সচিত্র বাংলাদেশ
১৫ মে ১৯৯৩

ছায়া ও টিকটিকির সঙ্গে সংলাপ

টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বইটির দিকে তাকিয়ে থাকে আলো -‘ছায়াহীন কায়া’। দেখে আর ভাবে, ভাবতে থাকে। লাটিম ঘুরতে ঘুরতে যেমন ঝিম ধরে থাকে-এক পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি মেরুদণ্ডটা ঠিক সোজা করে আপন মনে বসে আছে সে। ফাঁকে একবার নিজের ছায়ার দিকেও থাকায় । সে বোঝে না ছায়াহীন কায়া কীভাবে হয় ? আনমনে সে আবার ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু আগে টিকটিকি তাকে ফোন করে। ভাগ্যিস বাবা তখন বাসার বাইরে। আজ টিউটরও নেই।
—কে বলছ? আলো ?
জ্বী, আলো।
আঙ্কেল কেমন আছ ?
হ্যাঁ, ভালো।
এখন স্কুলে আস না ? আর তো দেখা হল না।
না, এখন আমাদের ক্লাস অফ—জেএসসি পরীক্ষা ।
ক্লাস কখন শুরু হবে ? আবার কখন স্কুলে আসছ ?

ডাহুক ও রাতের মানচিত্র -১

ডাহুক, গানের পাখি – আঁধার বোরখা পরে
রাতের লাইলি ওহে কোন্ দিকে যাও?
তোমার পাখায় যদি আমার পাখনা রাখি
তোমার দু’চোখে যদি আমার দু’চোখ রাখি –
মুছে যায় বিনিদ্র রাতের ক্ষত–কবিতা কুড়িয়ে নেয়
কিশোর বোশেখ,কাঁচা পাকা আম, নানা বাড়ি–নাও।
আমার সমস্ত কথা এ কোন মোহন সুরে বাজছে ইথারে
আমার সমস্ত প্রেম গলে পড়ে সাগরে সমুদ্রে, স্মৃতির মিনারে।
ঈশ্বর, এ কেমন নিশীথ – ডাহুকের ডাক,রাতের আকাশ
নিয়তির ক্রুর চালে দীর্ণ যেন রাজা ইডিপাস।

অধরা

অধরা

হৃদয়ে রেখেছো হাত-
বুকের পাঁজর তলে হৃদয়রতন টকটকে লালতরমুজ-
অবোধ ষোড়শী হেসে খেলে ফালি ফালি কাটে,
আঁধার সমান বিরহপাথর-প্রেমের উত্তাপে গলে।

সময় বঙ্কিম সিঁথি খুঁজে তবু অধরার মুখ
পাতাল পাহাড় সাগর অরণ্যে ছুটে নিয়ন বাতির সাথে
ক্ষয়িষ্ণু কাহিল বুক।

ময়নামানব

আবাদি জমিন মেঘের জোয়ারে ভিজে,
আলপথ সিঁথি মিনিটে মিলিয়ে যায়, তামাটে মাটির বুক খরবেগে ভাঙ্গে,
মাছের দু’চোখে নাচে চিকচিকে আলো, ঢেউয়ে দোলায় জলডুবি খেলে সবুজ ফসল মুহুরি বহতানদী।

শাদা শাপলার স্নান জলডুবি খেলা ধূশর বাতাসে বাদল মোতির মালা-মেঘের নাওয়ে জানালাকার্নিশে,
ভিজতে ভিজতে বেঢপ কাকতাড়ুয়া খুঁজে মাঠ ফাটা রোদ।
লাল মরিচের ঠোঁট সবুজ টিয়েটা কোটরে গহনে লুকোয় উষ্ণতা যাঁচে; এক পা ডুবিয়ে এক পা উঠিয়ে
ধ্যানমগ্ন বক ঝিমুতে ঘুমুতে ভিজে।

সড়ক পুলিশ সতর্ক অপেক্ষা হুইশেল, তীব্রচিৎকার- পকেটে পুরোয় পঙ্কিল পুরীষ, ন্যাড়াকাটা পাহাড় শহুরে ফ্ল্যাট ভিজে- পিগমিপরানে পুড়ে ময়নামানব।

তটিনী / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

তটিনী কিশোরী রাঙ্গা- করে বার বার ভুল,
ভাঙ্গে কুল- রাখে এলোমেলো খোলা চুল,
টিকালো নাকের ‌‌‌'পরে জ্বেলেছে মুক্তোর দীপ –শ্বেত নাকফুল।

তটিনী মানেনা ব্যাকরণ -শুধু অকারণ কবিতা ও কথা লিখে-
চিকন সুচারু দেহ সুপুরি গাছের মতো একেবারে লিকলিকে।

তটিনী মেলছে ডানা হৃদয়ে বাঁধছে দানা রমণের বিষ,
উড়ু উড়ু মন যখন তখন বাজে মুঠোফোন অহর্নিশ।

সাজছে প্রথম নারী- তটিনী পরছে শাড়ি, বাড়ি বাড়ি পই পই করে ফিরে,
রঙের বারতা মেখে ছুটছে সে এঁকেবেঁকে নোঙর বসাবে বুঝি শবরের তীরে।

তটিনী উতলা বেশ - খুলছে হৃদয়দেশ, যাদুর সকল জানালা কপাট-
জাতমান ভুলে চড়বে রতির শূলে তালিম নেবে সে প্রেম-প্রণয়ের পাঠ।

২১.০৩.২০১২ইং
চট্টগ্রাম।

কুশল / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

বেলা বাড়ে- বাড়ে উত্তাপ শীত বর্ষা হেমন্ত বসন্তে
দোয়েল গায়না , চড়ুই হাসেনা-
ডানা ভাঙ্গা প্রজাপতি, কাকের কান ফাটা চিৎকার কার ভালো লাগে বলো;
পানের বরজ,আমের বাগান, আমনের ক্ষেত এখনো বর্গীর দখলে,
পদ্ম পুকুর গেলো, সবুজ পাহাড় গেলো,
সমুদ্র আকাশ গেলো- চেতনার রং ক্রমে কেঁদে কেঁদে শেষ-
কীভাবে এখন ভালো থাকা যায় বলো।

প্রণয়প্রপাত / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

শব্দের জরায়ু ছিড়ে মিশে যায় রাত,
নদীর দু’তীর ভাঙ্গে নায়েগ্রা প্রপাত।
ত্রিভুজ বিদীর্ণ করে লাঙ্গলের ফণা-
অধীর আদম বুনে আনাজের কণা।

সমুদ্র ভেলায় ভাসে লখিন্দর ; ভাঙ্গে ঢেউ উপকূল মহুয়ার বন,
ধুশর মাঘের রাত- প্রণয় শিখায় পুড়ে কামরাঙ্গা বেহুলার মন।

১৩.০৩.২০১২ইং
চট্টগ্রাম।

চড়ুইভাতির লালটিপ / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

আম্মু, তোমার নাম কী ?
- আব্বুর পাশের চাচুটি আমার নাম জানতে চায় ।
আমি আমার নামটি বলি-অপূর্বা শৈলী।
ভারি সুন্দর নাম বলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আদর করেন। আমার বেশ ভাল লাগে। চাচুটি বেশ মজার-ক্লিক, ক্লিক করে তিনি আমার ছবি তুলেন, আম্মুর ছবি তুলেন, আমাদের ছবি তুলেন। এটি আমাদের অন্যরকম দিন।
আব্বুরা কেউ আজ অফিসে যায়নি। এমনকি আমাকেও খুব ভোরে ওঠে স্কুলের জন্য ছুটতে হয়নি। অন্যরকম দিন বার বার আসেনা। অনেকদিন পর অনেকদিন পর একবার আসে।

না-না / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

এখন আঁধার, নিকষ আঁধার-শুনি শুধু হুতোম পেঁচার ডাক,
আড়মোড়া ভেঙ্গে দেশলাই খুঁজে সহজে অবাক... ... ...
আমার পৃথিবী নড়েনা চড়েনা কেমন আদিম বোকা
এখন চাঁদ তারা স্বপ্ন প্রেম কিছু নেই-
জানালার পাশে উড়েনা এখন একটি জোনাক পোকা।

না-না, এটাকিছু নয়-হয়তো ভূতের বাতি,
এটা কি সোনার ডিম;
এখনো গোখরো চরে বিষাক্ত ফণায় জমে পউষের হিম।