ইউজার লগইন

সাপলুড়ু

শিউলি চিরকুটে চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন-

-উনি কোথায়? হ্যাঁ, চলে আসতে বলুন।

-স্যার বাসার গেটে; গাড়িতে । আপনি একটু আসবেন?

দুতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজ মৃত্তিকা আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ।

তাঁর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে- কাঁপুনির মাত্রা এত তীব্র হতে পারে তিনি তা ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। ভাবতে পারার কথাও নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পর এ রকম কেউ ভাবতে পারে না। শিউলি কাঁপছেন আর ভাবছেন- কীভাবে তাঁকে রিসিভ করবেন ।

২.

শত সহস্র সবুজ সকাল আর রোদেলা দুপুর শেষে সায়াহ্ণের শেষ রাগিনী এখন বেজে উঠেছে; কিন্তু এই নামটি তাঁর কাছে আজও এক অমেয় শক্তির উৎস। তাই বুঝি আধাঁর রাতের চোরাগলি তাঁকে ছুঁতে পারেনি এতটুকু। এটি আঠারো বছর ধরে জ্বলতে থাকা এক জীবনবাতি । সতের বছরের যন্ত্রণা আর অবরোধবোধকে ছুঁড়ে মারতে পেরেছিলেন তিনি এই একটি নামের প্রচন্ড শক্তিতে। সেদিন উষ্ণ উত্তেজনা আর অপার আনন্দের হাতছানিতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন পঁচিশের ঘরে। আহা, কী মুক্তি! আনিস আহমেদ অযাচিতভাবেই নামটি পেয়েছিলেন ভালবাসার মহার্ঘ্যরূপে। কেউ যদি এভাবে অতল শূন্যতার নীলযন্ত্রণায় নিজেকে উন্মোচন করেন যে কোন মানুষ সহজে গলে যাবেন; দ্বিতীয় চিন্তা তার মাথায় আসবে না। কয়েক দিনের আলাপচারিতা- সেই মায়াবি কণ্ঠের তীব্র আকর্ষণ, অভাবনয়ীয় মুক্তির স্বপ্নে তিনি আজীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

আনিস আহমেদ ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি করতেন। তাঁর কবিতার অনুরাগী নিরালা তাঁরই প্রেমে পড়ে মনের অজান্তে। নিরালা নিরালাই- কোন রকম সাতপাঁচ সে বোঝে না। প্রেমে পড়েছে-কূলে ডুবেছে। বিয়ে করেই সে মুক্তি খোঁজে। অবশেষে একদিন বিয়ের সাঁনাই বেজে ওঠে। বিয়ের পর পরই আনিসের বাবা মারা যায়। নাগরিক জীবনের জটিলতা আর পেশাগত ব্যস্ততায় এবার যেন খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। লেখলেখি বন্ধ হয়ে যায় -সকাল বিকেল অফিস। শহর থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব একশো কিলোমিটার। কিন্তু পড়ার নেশাটা তাকে চেপে বসে দ্বিগুণ। রোহিতের আট বছর পর রিমি ঘরে আসে। রিমির আধো আধো কথা, মিটমিটে তারার মতো দুই চোখ তাঁকে আবার আনমনা করে তোলে- লেখালেখির দিকে টেনে নেয়।

ফেসবুক দূরের মানুষকে কাছে আনে; কাছের মানুষকে দূরে টেলে দেয়- দিন দিন বাড়তে থাকে বন্ধুদের তালিকা। এভাবে একদিন শিউলির সাথে তাঁর পরিচয়।

আনিসের গল্পকবিতার জন্যে যেন অধীর অপেক্ষায় থাকেন শিউলি। প্রতিটি লেখার নির্মোহ বিশ্লেষণে পারদর্শী মেয়েটি। তাঁর লেখা কয়েকটি ছোট কবিতা আনিসের দৃষ্টি কাড়ে- কৌতূহল বাড়তে থাকে। ছোট ছোট পংক্তির আটপৌরে শব্দরাজি তীরের ফলার মতো শাণিত - এক গভীর বোধ ও বেদনায় আচ্ছন্ন করে তোলে তাঁকে। একদিন নিছক খেয়ালের বসে আলাপ শুরু।

আপনার কি লেখালেখির প্রতি দুর্বলতা আছে?

-একটু একটু আছে।

শিউলি আনিসকে লেখালেখি বন্ধ না করতে অনুরোধ করেন। এক মাসের মাথায় তাঁরা ভালো বন্ধুরূপে পরস্পরের মনে জায়গা করে নেয়। এক ফাঁকে শিউলি তাঁর সাথে ফোনে কথা বলার আগ্রহ দেখায়। একদিন শেষ বিকেলে বেজে উঠে আনিসের মুঠোফোন।

হ্যালো, শিউলি বলছি- কেমন আছেন?

ওহ আপনি? ভালো। কী খবর বলুন। আপনি কেমন আছেন?

ভালো আছি। আপনি কোথায়?

বাসায়।

কে কে আছেন ? কথা বলা যাবে?

সবাই আছে। এক মিনিট পর আমি রিং করছি।

তারপর আনিস বাইরে আসেন। একচল্লিশ মিনিট কথা বলার পর আনিসের মধ্যে এক ধরনের বিমূঢ় বেদনা কাজ করে, করতে থাকে। জীবন এমনও হয়!

৩.

হ্যালো, হ্যালো, কেমন আছেন?

এই তো, আছি এক রকম।

কেন? এক রকম কেন?

দেখুন কেউ কি সব সময় ভাল থাকে। সব সময় এক নয় –মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা আলাদা সুর আর স্বরে জীবনকে স্পর্শ করে। এই যে একটু কথা বলবো গতকাল থেকে এই অপেক্ষা ।

বাসায় আর কে কে আছে? আপনি তো বেশ একা।

না, তেমন একা নয়। মিলি আর মাধুর্য আমার সঙ্গে থাকে-আমার ভাইয়ের দুই মেয়ে । ওরা আমাকে ‘মা’ ডাকে। এই ডাক শুনলে মাঝে মাঝে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। অভিশপ্ত জীবন আমার ... ...।

হায়, এভাবে জীবন চলে! আমি বুঝতে পারছি না- আপনি কেন এই দীর্ঘ সময়টুকু নিজেকে বঞ্চিত করলেন। কথাগুলো খুলে বললে হয়তো অনেক আগেই একটি সমাধান হয়ে যেত। (শিউলির কণ্ঠ আস্তে আস্তে ভারি হয়ে উঠে- দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা মোবাইলের গায়ে লেগে আনিসের কানে আছড়ে পড়ে।) স্যরি,আপনি কি কাঁদছেন? আনিস খুব সহজে বুঝতে পারছেন- ওপারে তিরিশ উত্তর এক নারী কাঁদছেন।

ওহ, ভাইজানের নামটা বলবেন? আপনাদের নিজেদের কোন সমস্যা নেই তো?

ওর নাম বাশার, আমি তাকে বকুল বলে ডাকি। তাই আমাদের বাড়ির নাম দিয়েছি- বকুলবিলাস।

ভাইজানকে ডাকেন বকুল। বেশ ভালোই তো। আর আমাকে?

আকাশ- আপনি আমার আকাশ; যাঁর বুকে আমার স্বপ্নরা লালনীলশাদা মেঘ হয়ে উড়ে বেড়ায়- মুক্তি খোঁজে।

খুব ভারি কথা। উনি কী করেন ?

পারিবারিকভাবে ওদের রেস্টুরন্ট বিজনেস। দেশে ফেরার পর উর্বশী আর অপ্সরী নামে আরো দুটো মটেল করেছে। এটি পর্যটন শহর-সারা বছরই গেস্ট থাকে।

ওহ, মূল কথায় আসি। আপনার বইগুলোর বিষয়ে বলুন- কারা, কখন প্রকাশ করলো ? জানেন তো দীর্ঘদিন লিখিনি।

হ্যাঁ, আমার তিনটি উপন্যাস আর দুটো কাব্যগ্রন্থ আছে। লেখালেখি মানে ব্যস্ত থাকা। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে- পড়ার নেশা আমার আছে। এগুলো ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে- শুদ্ধস্বর, ঐতিহ্য, পারিজাত ও পাঠসূত্র বইগুলো করেছে।

৪.

হ্যালো, আকাশ বলছি-কেমন আছেন?

হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি?

আমি ভালো। আজ আকাশ বেশ মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। একটি সুখবর আছে- আপনার নতুন নাম মৃত্তিকা। এটি আমার দেয়া। না করবেন না প্লিজ। গতকাল আমি চিকিৎসার কথা বলেছিলাম। আপনারা দুজনের... .. ..

হ্যাঁ, মৃত্তিকা- গভীর,গম্ভীর- ব্যঞ্জনাটা বেশ আলাদা। সারাজীবন মাটির মতো সব সয়ে গেলাম। জুতসই নামের জন্যে ধন্যবাদ। না, আমার কোন সমস্যা নেই। জানেন- নিঃসন্তান নামের অপবাদটা আমাকেই শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। বিয়ের তিন বছর পর সবাই বলাবলি শুরু করলে সে সেকেন্ড ম্যারেজ করে- তাঁর দূর সম্পর্কের এক মামাতো বোনকে। বিয়ের তের দিনের মাথায় সে সংসার ভেঙ্গে যায়। তখনই নানা কথা হাওয়ায় উড়তে শুরু করে।

কী কথা- বলা যাবে? সে সংসার তো এখন নেই।

রাইসা বিয়ের দুদিন পরই মুখ খোলে। তার দাদিকে বলে- বাশার অসুস্থ্, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। তখন সবাই আমার দিকে মুখ দেখাদেখি শুরু করে, আমি নীরবতায় চুপসে যাই। এই নীরবতাই এখন আমার জীবনের কাল হয়েছে।

আচ্ছা, রাইসা যা দুদিনের মাথায় পারলো তা আপনি এতদিনেও পারলেন না কেন? আপনার এমন কেউ কি ছিল না-যাঁরা আপনাকে... ...?

সবাই সব কিছু সমান পারে না। ভেবেছিলাম একদিন ঠিক হয়ে যাবে। শরীর বিষয়ে আমি বেশ মুর্খ- তা ছাড়া পুরুষের সুস্থতা মাপার নিক্তি তো আমার হাতে নেই। তার আচরণে কোন অমিল তেমন দেখিনি। শরীরী প্রসঙ্গে ও প্রায় নীরব থাকে। মাঝে মাঝে তাঁর এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করে। সে তখন ঠাট্টা করে বলতো- ‘তোমাকে আবার বিয়ে দিতে হবে।’ তখন তাঁর অক্ষমতার বিষয়টি আমি বুঝি। আমার মন ও শরীর তীব্র বঞ্চনায় আজ নীল হয়ে আছে। এভাবে আমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে মাথার দুঃসহ ব্যথায় ছটফট করি- বমি আসে। প্রেসারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

আপনি কি বিকল্প কিছু ভাবছেন?

না, তা বলিনি। কোন মানুষ কিছু কথা মনের ভেতর দাগ কেটে যায়, জখমটা কখনো সারে না।

যখন সব সয়ে গেলেন-এখন আবার এইসব কেন? এ জন্যে দায়ী কে?

যদি বলি আপনি।

(আকাশ এই বাক্যবাণে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।) আমরা যেহেতু ভাল বন্ধু- দায়তো নিতেই হয়। দুঃখিত। আপনাকে আদৌ কষ্ট দিতে চাইনি।

আপনাদের বিয়ে হলো কয় বছর আগে?

এগারো বছর আগে। পারিবারিক বিয়ে। ও বয়সে আমার বছর দশেক বড়। বিয়ের দুই বছর পর আমার মা মারা গেলে আমাকে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। ভাইয়ের পড়ালেখা, দুইবোনের বিয়ের কথা ভেবেছি দিনের পর দিন। তাদের বিয়ে দিলাম। এভাবে সময় গড়িয়ে গেল। যখন নিজের দিকে তাকাই বুকটা হুহু করে উঠে।

আমরা যে কথা বলছি- কিছু মনে করছেন না তো? আপনার পরিবারের আবহাওয়াটা কেমন?

আমি তার সাথে খোলামেলা আলাপ করি। আমরা উদার হলেও উগ্রতাকে পছন্দ করি না। এ রকম পরিবেশে বাবা আমাদের বড়ো করেছেন।

ঠিক আছে। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেন। ভাল থাকুন । আজ রাখি।

আপনিও ভাল থাকবেন।

৫.

হ্যালো, মৃত্তিকা কেমন আছেন? আজও ডিস্টার্ব করছি।

ভালো আছি। ডিস্টার্ব হবে কেন? আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকি।

ধন্যবাদ, শুনে খুবই ভালো লাগল।

আপনি কেমন আছেন? আমি মুক্ত।

আপনি মুক্ত- কীভাবে! মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারে ? আমৃত্যু হাজারো শেকল তাকে আঁটসাঁটে বেঁধে রাখে। যাকে আমরা ডিসিপ্লিন বলি।

ঠিক আছে। মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ?

অহ, তাই ; যাওয়া যায়। কিন্তু এই যাওয়া-আসা একদিন সংজ্ঞা খুঁজবে, পরিচিতি চাইবে। আমাদের পরিবার বয়স পেশা তা কতটুকু অ্যালাও করবে- তা কিন্তু ভাববার বিষয়।

বাশার ভাইয়ের সাথে আপনার কী কোন গ্যাপ আছে?

না, আমরা খোলামেলা কথা বলি। সে কখনো আমাকে সন্দেহ করে না।

ফাইন, গুড রিলেশান। উনি আপনাকে সময় কেমন দেন? আপনার স্যাটিসফেকশান কেমন ?

রাতে বারোটার দিকে একবার দেখা হয়- তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। সে টা তো শূন্যের কোটায়।

হায়, আপনি তো অসুস্হ্য হয়ে যাবেন। এভাবে... ... ..

আমি প্রায়ই অসুস্থ থাকি। মাথা ব্যথা আর রক্তচাপ তো জীবনসঙ্গী হয়ে আছে।

আপনার ওয়েট কেমন? হাইটের সাথে মিল আছে আছে তো ?

এই তো ষাট-একষট্টি থাকে। আমি লম্বা না-পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি।

আপনার কালার বেশ চমৎকার।

এখন তেমন নেই- হ্যাঁ এক সময় তা ছিল।

বয়স তো তেমন বেশি নয় –আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখা শুরু করতে পারেন।

চত্রিশ বছর কম সময় নয়। আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় ফিরে যেতে চাই না। বরং আপনার কথা বলুন- শুনি, এখন কী করছেন?

আমার কী জানতে চান? সবই বলেছি। আমি ভূত নয়- ছেলে মানুষ; বউবাচ্ছা নিয়ে আছি। যুগের সাথে তাল মেলাতে পারি না। হৃদয় কাজ বেশি করে- মস্তিষ্ক কাজ করে না। লাভ লোকসান বুঝি না- বুঝতে চাই না। মানুষকে ভালবাসি-ভালোবাসা পেতে চাই। জীবনকে ভালো লাগে। হ্যাঁ, আমাদের দেখা হবে। আপনি যখনই চান।

একদিন হঠাৎ ফোন ধরা বন্ধ করে দেন মৃত্তিকা। অকারণে-একতরফাভাবে। আকাশ বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এমনকি তাঁকে আর ফেসবুকে পাওয়া যায় না। না, ছোড়বান্দা আকাশ এবার সবকিছু সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। ছবির অ্যালবাম, চ্যাটিং সংলাপ, মুঠোফোনের দীর্ঘ আলাপ সবই তিনি সযতনে রাখেন। প্রস্তুতি নিতে থাকেন যে কোন মূল্যে মুখোমুখি হবার। তখন তাঁর একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে তুমুল ঝড় তোলে-

‘কোথায় লুকোবে তুমি- সঙ্গমে শৃঙ্গারে, শূন্যতায় সংসারে- হৃদয়ে রেখেছি পুঁতে ঈশ্বরের চোখ।’- সাথে নিজের তরুণতম ছবিটির ডানভাগ ‘দ্বিখণ্ডিত’ নামে কাভার ব্যানার হিসেবে আপলোড করেন। বিষয়টি আর কারো অজানা থাকে না।

৬.

কেউ এই বয়সে একা হাসপাতালে আসে না। আসার কথা নয়। যার পরিবার পরিজন আছে- তিনি কেন এ রকম করবেন। সকাল সাড়ে এগারোটায় আজাদ নামের এক তরুণ কর্মচারী তাঁকে হাসপাতালে রেখে যায়। ডাক্তাররা তাঁর একজন আ্যাটেনডেন্টের কথা বলছেন। শ্বাসকষ্টটা বাড়ে- হঠাৎ বমি আসে। কখনো বুকের ব্যথায় দাঁতের পাটি দুটো খিঁচে থাকেন। গায়ে জ্বর- পাঁচ দিন ধরে অসুস্হ তিনি। আনিস আহমেদ এখন একটি কাগুজে নাম মাত্র। সোসাইটির কেউ এ নামে তাঁকে চেনে না। মেডিক্যাল কলেজের ৩০৩ নং ক্যাবিন। ফ্যামিলির কেউ নেই। কর্মস্থল থেকে সরাসরি হাসপাতালে। শুয়ে শুয়ে পুরোদিন খবরের কাগজ আর কবিতার বই পড়েন। এক নিরীশ্বর পৃথিবীর কথা ভাবেন- যেখানে প্রেম নেই, স্বপ্ন নেই; কিছু বিপন্ন বোধ নিঃসঙ্গ মানুষকে তাড়া করে।

দরজাটা প্রায় খোলাই থাকে। এই অতিরিক্ত কাব্যকাতরতা পাশের ক্যাবিনগুলোর রোগীর আত্মীয়স্বজনকে একটু হতচকিয়ে তুলে। তাদের কেউ কেউ আঁচ করেছেন গভীর অভিমানে তিনি পলাতক। শাহেদ তাঁর সঙ্গে খাতির জমায় সময় কাটাবার অছিলায়। তারও সময় কাটে না। খবরের কাগজের খেলাধুলার পাতাগুলোই মনের খোরাক । সে বড় মামাকে নিয়ে পাশের ক্যাবিনে আছে- আজ নয় দিন ।

রাত দুটোয় বুকের ব্যথাটা হঠাৎ বেড়ে যায়- মুখ ভরে বমি আসে। দরজাটা খোলা দেখে উঁকি দিতে গেলেই শাহেদ বুঝতে পারে মুরুব্বির সময় শেষ। তখন তাঁর পুরো শরীর ঘামে ভেজা। সে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নার্স ডাকতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে একজন আয়া দৌড়ে আসে।

৭.

আনিস স্বপ্নকে ছুঁয়ে যাবে, নিরালার নৈকট্য তাঁকে করে তুলবে প্রবল আত্মবিশ্বাসী-এই প্রত্যয়ে জীবনটি শুরু হয়েছিল। তা দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। যেখানে কোন চকচকে গাড়ির স্বপ্ন নেই, সুরম্য প্রাসাদের আকাঙক্ষা নেই, বিদেশের সেরা লোকেসনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা আকাশকুসুম কল্পনা- সেখানে একজন আধুনিক শিক্ষিত নারীর দম তো বন্ধ হয়ে আসতে পারে। হাঁপিয়ে ওঠেন নিরালা। জীবনের শুরুতে আনিসকে দেয়া কথাগুলো এখন অনেকটা তাঁর মনে নেই। দর কষাকষিটা শুরু হয়েছিল রোহিত কোন মিডিয়ামে পড়বে- বাংলা না ইংলিশ তা নিয়ে। পরে এটি ডালপালা মেলেছে। শহরে এক টুকরো জমি, ফ্ল্যাটবাড়ি এই সব ইস্যু নিরালা-আনিসের বন্ধনটুকু শিথিল করে দেয় ।

মানুষ তার গন্তব্য জানে না। সাপলুড়ু খেলার মতো সে হাঁটতে গিয়ে দৌড়ায় আবার দৌড়াতে গিয়ে কুপোকাত। কে হাঁটেন, কে হাঁটান; কে দৌড়েন, কে দৌড়ান তা সে ভাবে না। এই অবকাশটুকু তার নেই। অথবা সে ভাবতে জানে না। আবার কেউ কেউ ভাবেন; ভেবে কী হবে-কোন কূল কিনারা নেই। কিন্তু সে মন্তব্য করতে ভালেবাসে, গন্তব্য চেনে না। সময় আর জীবনের সম্পর্ক ভুলে যায় অনায়াশে। ভোগে বিশ্বাসী মানুষ উপভোগের কদর বোঝে না। অনুভূতির জগতে একদিন সে ফতুর হয়ে পড়ে।

ছক কাটা ঘর থেকে বের হতে চেয়েছে আকাশ- রোদের আলোয় পুড়তে ভালোবেসেছে, জোছনার আভায় ভিজতে ভালোবেসেছে। এই সরল সময়যাপনই তাঁকে পরিবার-পরিজনের কাছে উনমানুষে পরিণত করে। নিরালা-তার স্ত্রী; দুজন দুজনের বন্ধু। বত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পূর্বেও তাঁদের বন্ধুতা ছিল কয়েক বছর। জানাশোনা, ঘোরাঘুরি, আড্ডবাজি সবই তো ছিল। ক্যাম্পাসের পরিচিত যুগলদের মধ্যে তাঁরাই ছিল শীর্ষজুটি। কিন্তু দাম্পত্যের বিপ্রতীপ বিন্যাসে দায়বোধ যতটা বেড়েছে অনুভবের তীব্রতা কমেছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। কেন এমন হলো! কেন এমন হবে!

সেই ছোট রিমি এখন কানাডায়- যার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ছড়া শোনাতেন তরুণ অনিস। প্রকৌশলী তুহিনের সংসার আলো করে তাদের ঘরে এসেছে সারাহ আর সুজাত। এই কথাগুলো মনে পড়লে ক্যাবিনের এই একা একঘেঁয়ে জীবনেও যেন এক মায়াবী সুরের দোলা নেচে যায়। সুজাত একদম রোহিতের মতো- মামার ফটোকপি যেন।

৮.

অ্যাম্বুলেন্সটি সকাল নটা নাগাদ বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে দুজন তরুণ- রাশেদ ও আজাদ। যাঁরা গত চার দিন ধরে তাঁর সেবা করেছেন। ঔষধপত্র খাবার দাবার এনে দিয়েছেন- পরম ভালোবাসায়। রাশেদের পকেটেই চিঠিটি ছিল। চিঠি নিয়ে সে সরাসরি গেট পেরিয়ে বাসায় ভেতরে ঢোকে। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে চিঠিটি নিলেন। শিউলিকে লেখা এক টুকরো পুরোন কাগজ।

“নীল, আমি এসেছি; আর কোথাও যাবো না কিন্তু। হ্যাঁ, এটি আমাদের প্রথম দেখা। তুমি যে বলেছিলে- ‘মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ’-দুঃখিত, তখন আসতে পারিনি। কেন পারিনি তা তো তুমি জান। আজ হঠাৎ ভাবলাম তোমাকে না দেখে আমার ফেরা হবে না। আমি আমার কথা রেখেছি। তুমি কী এখন আমাকে চিনবে? আমি তোমার আকাশ- যার বুকে মাথা রেখে নীলমেঘ ঘুমিয়েছে অনেক রাত।

তুমি এবার আমাকে নিরালার কাছে নিয়ে যাবে- সে যাতে আর আমাদের আর ভুল না বোঝে।”

শিউলি চিরকুটে চোখ বুলিয়েই বলে উঠলেন-

-উনি কোথায়? হ্যাঁ, চলে আসতে বলুন।

-স্যার বাসার গেটে; গাড়িতে । আপনি একটু আসবেন?

দুতলার সিঁড়ি ভেঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন তিনি। আজ মৃত্তিকা আর আকাশের প্রথম সাক্ষাৎ।

তাঁর পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছে- কাঁপুনির মাত্রা এত তীব্র হতে পারে তিনি তা ঘূণাক্ষরেও ভাবেননি। ভাবতে পারার কথাও নয়। দীর্ঘ আঠারো বছর পর এ রকম কেউ ভাবতে পারে না। শিউলি কাঁপছেন আর ভাবছেন- কীভাবে তাঁকে রিসিভ করবেন ।

২.

শত সহস্র সবুজ সকাল আর রোদেলা দুপুর শেষে সায়াহ্ণের শেষ রাগিনী এখন বেজে উঠেছে; কিন্তু এই নামটি তাঁর কাছে আজও এক অমেয় শক্তির উৎস। তাই বুঝি আধাঁর রাতের চোরাগলি তাঁকে ছুঁতে পারেনি এতটুকু। এটি আঠারো বছর ধরে জ্বলতে থাকা এক জীবনবাতি । সতের বছরের যন্ত্রণা আর অবরোধবোধকে ছুঁড়ে মারতে পেরেছিলেন তিনি এই একটি নামের প্রচন্ড শক্তিতে। সেদিন উষ্ণ উত্তেজনা আর অপার আনন্দের হাতছানিতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন পঁচিশের ঘরে। আহা, কী মুক্তি! আনিস আহমেদ অযাচিতভাবেই নামটি পেয়েছিলেন ভালবাসার মহার্ঘ্যরূপে। কেউ যদি এভাবে অতল শূন্যতার নীলযন্ত্রণায় নিজেকে উন্মোচন করেন যে কোন মানুষ সহজে গলে যাবেন; দ্বিতীয় চিন্তা তার মাথায় আসবে না। কয়েক দিনের আলাপচারিতা- সেই মায়াবি কণ্ঠের তীব্র আকর্ষণ, অভাবনয়ীয় মুক্তির স্বপ্নে তিনি আজীবন ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

আনিস আহমেদ ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি করতেন। তাঁর কবিতার অনুরাগী নিরালা তাঁরই প্রেমে পড়ে মনের অজান্তে। নিরালা নিরালাই- কোন রকম সাতপাঁচ সে বোঝে না। প্রেমে পড়েছে-কূলে ডুবেছে। বিয়ে করেই সে মুক্তি খোঁজে। অবশেষে একদিন বিয়ের সাঁনাই বেজে ওঠে। বিয়ের পর পরই আনিসের বাবা মারা যায়। নাগরিক জীবনের জটিলতা আর পেশাগত ব্যস্ততায় এবার যেন খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। লেখলেখি বন্ধ হয়ে যায় -সকাল বিকেল অফিস। শহর থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব একশো কিলোমিটার। কিন্তু পড়ার নেশাটা তাকে চেপে বসে দ্বিগুণ। রোহিতের আট বছর পর রিমি ঘরে আসে। রিমির আধো আধো কথা, মিটমিটে তারার মতো দুই চোখ তাঁকে আবার আনমনা করে তোলে- লেখালেখির দিকে টেনে নেয়।

ফেসবুক দূরের মানুষকে কাছে আনে; কাছের মানুষকে দূরে টেলে দেয়- দিন দিন বাড়তে থাকে বন্ধুদের তালিকা। এভাবে একদিন শিউলির সাথে তাঁর পরিচয়।

আনিসের গল্পকবিতার জন্যে যেন অধীর অপেক্ষায় থাকেন শিউলি। প্রতিটি লেখার নির্মোহ বিশ্লেষণে পারদর্শী মেয়েটি। তাঁর লেখা কয়েকটি ছোট কবিতা আনিসের দৃষ্টি কাড়ে- কৌতূহল বাড়তে থাকে। ছোট ছোট পংক্তির আটপৌরে শব্দরাজি তীরের ফলার মতো শাণিত - এক গভীর বোধ ও বেদনায় আচ্ছন্ন করে তোলে তাঁকে। একদিন নিছক খেয়ালের বসে আলাপ শুরু।

আপনার কি লেখালেখির প্রতি দুর্বলতা আছে?

-একটু একটু আছে।

শিউলি আনিসকে লেখালেখি বন্ধ না করতে অনুরোধ করেন। এক মাসের মাথায় তাঁরা ভালো বন্ধুরূপে পরস্পরের মনে জায়গা করে নেয়। এক ফাঁকে শিউলি তাঁর সাথে ফোনে কথা বলার আগ্রহ দেখায়। একদিন শেষ বিকেলে বেজে উঠে আনিসের মুঠোফোন।

হ্যালো, শিউলি বলছি- কেমন আছেন?

ওহ আপনি? ভালো। কী খবর বলুন। আপনি কেমন আছেন?

ভালো আছি। আপনি কোথায়?

বাসায়।

কে কে আছেন ? কথা বলা যাবে?

সবাই আছে। এক মিনিট পর আমি রিং করছি।

তারপর আনিস বাইরে আসেন। একচল্লিশ মিনিট কথা বলার পর আনিসের মধ্যে এক ধরনের বিমূঢ় বেদনা কাজ করে, করতে থাকে। জীবন এমনও হয়!

৩.

হ্যালো, হ্যালো, কেমন আছেন?

এই তো, আছি এক রকম।

কেন? এক রকম কেন?

দেখুন কেউ কি সব সময় ভাল থাকে। সব সময় এক নয় –মানুষের প্রতিটি মুহূর্ত আলাদা আলাদা সুর আর স্বরে জীবনকে স্পর্শ করে। এই যে একটু কথা বলবো গতকাল থেকে এই অপেক্ষা ।

বাসায় আর কে কে আছে? আপনি তো বেশ একা।

না, তেমন একা নয়। মিলি আর মাধুর্য আমার সঙ্গে থাকে-আমার ভাইয়ের দুই মেয়ে । ওরা আমাকে ‘মা’ ডাকে। এই ডাক শুনলে মাঝে মাঝে আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। অভিশপ্ত জীবন আমার ... ...।

হায়, এভাবে জীবন চলে! আমি বুঝতে পারছি না- আপনি কেন এই দীর্ঘ সময়টুকু নিজেকে বঞ্চিত করলেন। কথাগুলো খুলে বললে হয়তো অনেক আগেই একটি সমাধান হয়ে যেত। (শিউলির কণ্ঠ আস্তে আস্তে ভারি হয়ে উঠে- দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতা মোবাইলের গায়ে লেগে আনিসের কানে আছড়ে পড়ে।) স্যরি,আপনি কি কাঁদছেন? আনিস খুব সহজে বুঝতে পারছেন- ওপারে তিরিশ উত্তর এক নারী কাঁদছেন।

ওহ, ভাইজানের নামটা বলবেন? আপনাদের নিজেদের কোন সমস্যা নেই তো?

ওর নাম বাশার, আমি তাকে বকুল বলে ডাকি। তাই আমাদের বাড়ির নাম দিয়েছি- বকুলবিলাস।

ভাইজানকে ডাকেন বকুল। বেশ ভালোই তো। আর আমাকে?

আকাশ- আপনি আমার আকাশ; যাঁর বুকে আমার স্বপ্নরা লালনীলশাদা মেঘ হয়ে উড়ে বেড়ায়- মুক্তি খোঁজে।

খুব ভারি কথা। উনি কী করেন ?

পারিবারিকভাবে ওদের রেস্টুরন্ট বিজনেস। দেশে ফেরার পর উর্বশী আর অপ্সরী নামে আরো দুটো মটেল করেছে। এটি পর্যটন শহর-সারা বছরই গেস্ট থাকে।

ওহ, মূল কথায় আসি। আপনার বইগুলোর বিষয়ে বলুন- কারা, কখন প্রকাশ করলো ? জানেন তো দীর্ঘদিন লিখিনি।

হ্যাঁ, আমার তিনটি উপন্যাস আর দুটো কাব্যগ্রন্থ আছে। লেখালেখি মানে ব্যস্ত থাকা। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে- পড়ার নেশা আমার আছে। এগুলো ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয়েছে- শুদ্ধস্বর, ঐতিহ্য, পারিজাত ও পাঠসূত্র বইগুলো করেছে।

৪.

হ্যালো, আকাশ বলছি-কেমন আছেন?

হ্যাঁ, ভালো আছি। আপনি?

আমি ভালো। আজ আকাশ বেশ মেঘলা, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। একটি সুখবর আছে- আপনার নতুন নাম মৃত্তিকা। এটি আমার দেয়া। না করবেন না প্লিজ। গতকাল আমি চিকিৎসার কথা বলেছিলাম। আপনারা দুজনের... .. ..

হ্যাঁ, মৃত্তিকা- গভীর,গম্ভীর- ব্যঞ্জনাটা বেশ আলাদা। সারাজীবন মাটির মতো সব সয়ে গেলাম। জুতসই নামের জন্যে ধন্যবাদ। না, আমার কোন সমস্যা নেই। জানেন- নিঃসন্তান নামের অপবাদটা আমাকেই শুনতে হয়েছে দীর্ঘদিন। বিয়ের তিন বছর পর সবাই বলাবলি শুরু করলে সে সেকেন্ড ম্যারেজ করে- তাঁর দূর সম্পর্কের এক মামাতো বোনকে। বিয়ের তের দিনের মাথায় সে সংসার ভেঙ্গে যায়। তখনই নানা কথা হাওয়ায় উড়তে শুরু করে।

কী কথা- বলা যাবে? সে সংসার তো এখন নেই।

রাইসা বিয়ের দুদিন পরই মুখ খোলে। তার দাদিকে বলে- বাশার অসুস্থ্, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নেই। তখন সবাই আমার দিকে মুখ দেখাদেখি শুরু করে, আমি নীরবতায় চুপসে যাই। এই নীরবতাই এখন আমার জীবনের কাল হয়েছে।

আচ্ছা, রাইসা যা দুদিনের মাথায় পারলো তা আপনি এতদিনেও পারলেন না কেন? আপনার এমন কেউ কি ছিল না-যাঁরা আপনাকে... ...?

সবাই সব কিছু সমান পারে না। ভেবেছিলাম একদিন ঠিক হয়ে যাবে। শরীর বিষয়ে আমি বেশ মুর্খ- তা ছাড়া পুরুষের সুস্থতা মাপার নিক্তি তো আমার হাতে নেই। তার আচরণে কোন অমিল তেমন দেখিনি। শরীরী প্রসঙ্গে ও প্রায় নীরব থাকে। মাঝে মাঝে তাঁর এক ডাক্তার বন্ধুর সাথে আলাপ করে। সে তখন ঠাট্টা করে বলতো- ‘তোমাকে আবার বিয়ে দিতে হবে।’ তখন তাঁর অক্ষমতার বিষয়টি আমি বুঝি। আমার মন ও শরীর তীব্র বঞ্চনায় আজ নীল হয়ে আছে। এভাবে আমি দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ি। মাঝে মাঝে মাথার দুঃসহ ব্যথায় ছটফট করি- বমি আসে। প্রেসারটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

আপনি কি বিকল্প কিছু ভাবছেন?

না, তা বলিনি। কোন মানুষ কিছু কথা মনের ভেতর দাগ কেটে যায়, জখমটা কখনো সারে না।

যখন সব সয়ে গেলেন-এখন আবার এইসব কেন? এ জন্যে দায়ী কে?

যদি বলি আপনি।

(আকাশ এই বাক্যবাণে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।) আমরা যেহেতু ভাল বন্ধু- দায়তো নিতেই হয়। দুঃখিত। আপনাকে আদৌ কষ্ট দিতে চাইনি।

আপনাদের বিয়ে হলো কয় বছর আগে?

এগারো বছর আগে। পারিবারিক বিয়ে। ও বয়সে আমার বছর দশেক বড়। বিয়ের দুই বছর পর আমার মা মারা গেলে আমাকে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ বাবাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। ভাইয়ের পড়ালেখা, দুইবোনের বিয়ের কথা ভেবেছি দিনের পর দিন। তাদের বিয়ে দিলাম। এভাবে সময় গড়িয়ে গেল। যখন নিজের দিকে তাকাই বুকটা হুহু করে উঠে।

আমরা যে কথা বলছি- কিছু মনে করছেন না তো? আপনার পরিবারের আবহাওয়াটা কেমন?

আমি তার সাথে খোলামেলা আলাপ করি। আমরা উদার হলেও উগ্রতাকে পছন্দ করি না। এ রকম পরিবেশে বাবা আমাদের বড়ো করেছেন।

ঠিক আছে। শরীরের দিকে খেয়াল রাখবেন। ভাল থাকুন । আজ রাখি।

আপনিও ভাল থাকবেন।

৫.

হ্যালো, মৃত্তিকা কেমন আছেন? আজও ডিস্টার্ব করছি।

ভালো আছি। ডিস্টার্ব হবে কেন? আমি তো আপনার ফোনের অপেক্ষায় থাকি।

ধন্যবাদ, শুনে খুবই ভালো লাগল।

আপনি কেমন আছেন? আমি মুক্ত।

আপনি মুক্ত- কীভাবে! মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারে ? আমৃত্যু হাজারো শেকল তাকে আঁটসাঁটে বেঁধে রাখে। যাকে আমরা ডিসিপ্লিন বলি।

ঠিক আছে। মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ?

অহ, তাই ; যাওয়া যায়। কিন্তু এই যাওয়া-আসা একদিন সংজ্ঞা খুঁজবে, পরিচিতি চাইবে। আমাদের পরিবার বয়স পেশা তা কতটুকু অ্যালাও করবে- তা কিন্তু ভাববার বিষয়।

বাশার ভাইয়ের সাথে আপনার কী কোন গ্যাপ আছে?

না, আমরা খোলামেলা কথা বলি। সে কখনো আমাকে সন্দেহ করে না।

ফাইন, গুড রিলেশান। উনি আপনাকে সময় কেমন দেন? আপনার স্যাটিসফেকশান কেমন ?

রাতে বারোটার দিকে একবার দেখা হয়- তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। সে টা তো শূন্যের কোটায়।

হায়, আপনি তো অসুস্হ্য হয়ে যাবেন। এভাবে... ... ..

আমি প্রায়ই অসুস্থ থাকি। মাথা ব্যথা আর রক্তচাপ তো জীবনসঙ্গী হয়ে আছে।

আপনার ওয়েট কেমন? হাইটের সাথে মিল আছে আছে তো ?

এই তো ষাট-একষট্টি থাকে। আমি লম্বা না-পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি।

আপনার কালার বেশ চমৎকার।

এখন তেমন নেই- হ্যাঁ এক সময় তা ছিল।

বয়স তো তেমন বেশি নয় –আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখা শুরু করতে পারেন।

চত্রিশ বছর কম সময় নয়। আবার অ্যাকাডেমিক পড়ালেখায় ফিরে যেতে চাই না। বরং আপনার কথা বলুন- শুনি, এখন কী করছেন?

আমার কী জানতে চান? সবই বলেছি। আমি ভূত নয়- ছেলে মানুষ; বউবাচ্ছা নিয়ে আছি। যুগের সাথে তাল মেলাতে পারি না। হৃদয় কাজ বেশি করে- মস্তিষ্ক কাজ করে না। লাভ লোকসান বুঝি না- বুঝতে চাই না। মানুষকে ভালবাসি-ভালোবাসা পেতে চাই। জীবনকে ভালো লাগে। হ্যাঁ, আমাদের দেখা হবে। আপনি যখনই চান।

একদিন হঠাৎ ফোন ধরা বন্ধ করে দেন মৃত্তিকা। অকারণে-একতরফাভাবে। আকাশ বার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এমনকি তাঁকে আর ফেসবুকে পাওয়া যায় না। না, ছোড়বান্দা আকাশ এবার সবকিছু সংরক্ষণ করতে শুরু করেন। ছবির অ্যালবাম, চ্যাটিং সংলাপ, মুঠোফোনের দীর্ঘ আলাপ সবই তিনি সযতনে রাখেন। প্রস্তুতি নিতে থাকেন যে কোন মূল্যে মুখোমুখি হবার। তখন তাঁর একটি স্ট্যাটাস ফেসবুকে তুমুল ঝড় তোলে-

‘কোথায় লুকোবে তুমি- সঙ্গমে শৃঙ্গারে, শূন্যতায় সংসারে- হৃদয়ে রেখেছি পুঁতে ঈশ্বরের চোখ।’- সাথে নিজের তরুণতম ছবিটির ডানভাগ ‘দ্বিখণ্ডিত’ নামে কাভার ব্যানার হিসেবে আপলোড করেন। বিষয়টি আর কারো অজানা থাকে না।

৬.

কেউ এই বয়সে একা হাসপাতালে আসে না। আসার কথা নয়। যার পরিবার পরিজন আছে- তিনি কেন এ রকম করবেন। সকাল সাড়ে এগারোটায় আজাদ নামের এক তরুণ কর্মচারী তাঁকে হাসপাতালে রেখে যায়। ডাক্তাররা তাঁর একজন আ্যাটেনডেন্টের কথা বলছেন। শ্বাসকষ্টটা বাড়ে- হঠাৎ বমি আসে। কখনো বুকের ব্যথায় দাঁতের পাটি দুটো খিঁচে থাকেন। গায়ে জ্বর- পাঁচ দিন ধরে অসুস্হ তিনি। আনিস আহমেদ এখন একটি কাগুজে নাম মাত্র। সোসাইটির কেউ এ নামে তাঁকে চেনে না। মেডিক্যাল কলেজের ৩০৩ নং ক্যাবিন। ফ্যামিলির কেউ নেই। কর্মস্থল থেকে সরাসরি হাসপাতালে। শুয়ে শুয়ে পুরোদিন খবরের কাগজ আর কবিতার বই পড়েন। এক নিরীশ্বর পৃথিবীর কথা ভাবেন- যেখানে প্রেম নেই, স্বপ্ন নেই; কিছু বিপন্ন বোধ নিঃসঙ্গ মানুষকে তাড়া করে।

দরজাটা প্রায় খোলাই থাকে। এই অতিরিক্ত কাব্যকাতরতা পাশের ক্যাবিনগুলোর রোগীর আত্মীয়স্বজনকে একটু হতচকিয়ে তুলে। তাদের কেউ কেউ আঁচ করেছেন গভীর অভিমানে তিনি পলাতক। শাহেদ তাঁর সঙ্গে খাতির জমায় সময় কাটাবার অছিলায়। তারও সময় কাটে না। খবরের কাগজের খেলাধুলার পাতাগুলোই মনের খোরাক । সে বড় মামাকে নিয়ে পাশের ক্যাবিনে আছে- আজ নয় দিন ।

রাত দুটোয় বুকের ব্যথাটা হঠাৎ বেড়ে যায়- মুখ ভরে বমি আসে। দরজাটা খোলা দেখে উঁকি দিতে গেলেই শাহেদ বুঝতে পারে মুরুব্বির সময় শেষ। তখন তাঁর পুরো শরীর ঘামে ভেজা। সে তাঁকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নার্স ডাকতে যায়। সঙ্গে সঙ্গে একজন আয়া দৌড়ে আসে।

৭.

আনিস স্বপ্নকে ছুঁয়ে যাবে, নিরালার নৈকট্য তাঁকে করে তুলবে প্রবল আত্মবিশ্বাসী-এই প্রত্যয়ে জীবনটি শুরু হয়েছিল। তা দিনে দিনে ফিকে হয়ে গেছে। যেখানে কোন চকচকে গাড়ির স্বপ্ন নেই, সুরম্য প্রাসাদের আকাঙক্ষা নেই, বিদেশের সেরা লোকেসনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা আকাশকুসুম কল্পনা- সেখানে একজন আধুনিক শিক্ষিত নারীর দম তো বন্ধ হয়ে আসতে পারে। হাঁপিয়ে ওঠেন নিরালা। জীবনের শুরুতে আনিসকে দেয়া কথাগুলো এখন অনেকটা তাঁর মনে নেই। দর কষাকষিটা শুরু হয়েছিল রোহিত কোন মিডিয়ামে পড়বে- বাংলা না ইংলিশ তা নিয়ে। পরে এটি ডালপালা মেলেছে। শহরে এক টুকরো জমি, ফ্ল্যাটবাড়ি এই সব ইস্যু নিরালা-আনিসের বন্ধনটুকু শিথিল করে দেয় ।

মানুষ তার গন্তব্য জানে না। সাপলুড়ু খেলার মতো সে হাঁটতে গিয়ে দৌড়ায় আবার দৌড়াতে গিয়ে কুপোকাত। কে হাঁটেন, কে হাঁটান; কে দৌড়েন, কে দৌড়ান তা সে ভাবে না। এই অবকাশটুকু তার নেই। অথবা সে ভাবতে জানে না। আবার কেউ কেউ ভাবেন; ভেবে কী হবে-কোন কূল কিনারা নেই। কিন্তু সে মন্তব্য করতে ভালেবাসে, গন্তব্য চেনে না। সময় আর জীবনের সম্পর্ক ভুলে যায় অনায়াশে। ভোগে বিশ্বাসী মানুষ উপভোগের কদর বোঝে না। অনুভূতির জগতে একদিন সে ফতুর হয়ে পড়ে।

ছক কাটা ঘর থেকে বের হতে চেয়েছে আকাশ- রোদের আলোয় পুড়তে ভালোবেসেছে, জোছনার আভায় ভিজতে ভালোবেসেছে। এই সরল সময়যাপনই তাঁকে পরিবার-পরিজনের কাছে উনমানুষে পরিণত করে। নিরালা-তার স্ত্রী; দুজন দুজনের বন্ধু। বত্রিশ বছরের দাম্পত্য জীবনের পূর্বেও তাঁদের বন্ধুতা ছিল কয়েক বছর। জানাশোনা, ঘোরাঘুরি, আড্ডবাজি সবই তো ছিল। ক্যাম্পাসের পরিচিত যুগলদের মধ্যে তাঁরাই ছিল শীর্ষজুটি। কিন্তু দাম্পত্যের বিপ্রতীপ বিন্যাসে দায়বোধ যতটা বেড়েছে অনুভবের তীব্রতা কমেছে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। কেন এমন হলো! কেন এমন হবে!

সেই ছোট রিমি এখন কানাডায়- যার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে ছড়া শোনাতেন তরুণ অনিস। প্রকৌশলী তুহিনের সংসার আলো করে তাদের ঘরে এসেছে সারাহ আর সুজাত। এই কথাগুলো মনে পড়লে ক্যাবিনের এই একা একঘেঁয়ে জীবনেও যেন এক মায়াবী সুরের দোলা নেচে যায়। সুজাত একদম রোহিতের মতো- মামার ফটোকপি যেন।

৮.

অ্যাম্বুলেন্সটি সকাল নটা নাগাদ বাসার সামনে এসে দাঁড়ালো। সঙ্গে দুজন তরুণ- রাশেদ ও আজাদ। যাঁরা গত চার দিন ধরে তাঁর সেবা করেছেন। ঔষধপত্র খাবার দাবার এনে দিয়েছেন- পরম ভালোবাসায়। রাশেদের পকেটেই চিঠিটি ছিল। চিঠি নিয়ে সে সরাসরি গেট পেরিয়ে বাসায় ভেতরে ঢোকে। কলিং বেল বাজাতেই এক ভদ্র মহিলা দরজা খুলে চিঠিটি নিলেন। শিউলিকে লেখা এক টুকরো পুরোন কাগজ।

“নীল, আমি এসেছি; আর কোথাও যাবো না কিন্তু। হ্যাঁ, এটি আমাদের প্রথম দেখা। তুমি যে বলেছিলে- ‘মাঝে মাঝে আসতে পারবেন তো ’-দুঃখিত, তখন আসতে পারিনি। কেন পারিনি তা তো তুমি জান। আজ হঠাৎ ভাবলাম তোমাকে না দেখে আমার ফেরা হবে না। আমি আমার কথা রেখেছি। তুমি কী এখন আমাকে চিনবে? আমি তোমার আকাশ- যার বুকে মাথা রেখে নীলমেঘ ঘুমিয়েছে অনেক রাত।

তুমি এবার আমাকে নিরালার কাছে নিয়ে যাবে- সে যাতে আর আমাদের আর ভুল না বোঝে।”

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শেহজাদ আমান's picture


ভাল লাগল। আপনার গল্প লেখার হাত আছে। চালিয়ে যান।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ's picture

নিজের সম্পর্কে

কবি-গল্পকার:
জন্ম:১ আগস্ট ১৯৬৭ সাল। বাবা মৌলানা মুহাম্মাদ হুসাইন এবং মা মুহসেনা বেগম। মৌলানাবাড়ি, জামালপাড়া,হোয়ানক, মহেশখালি,কক্সবাজার,বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি যথাক্রমে ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে ।
নব্বই দশকে কবিতা ও প্রবন্ধ দিয়ে লেখালেখির সূচনা। মূলত কবি,গল্প ও প্রবন্ধের পাশাপাশি শিশুসাহিত্য রচনায় বিশেষভাবে অনুরক্ত। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো, সমকাল, ইত্তেফাক, সংবাদ, জনকন্ঠ, আলোকিত বাংলাদেশ, করতোয়াসহ চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ, সুপ্রভাত বাংলাদেশ,পূর্বদেশে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সচিত্র বাংলাদেশ, মাসিক উত্তরাধিকার,মাসিক শিশু ও সুন্দরমে লিখে থাকি। ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে দুটো বই- প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মায়াবী রোদের ডানা' (শুদ্ধস্বর,ঢাকা) ও 'চড়ুইভাতির লাল টিপ' (শৈলী প্রকাশন-চট্টগ্রাম)।
গবেষণা অভিসন্দর্ভ - নদী কেন্দ্রিক উপন্যাসে বাঙালির জীবন।
পেশাগত জীবনে একজন নিবেদিত শিক্ষাসেবী; শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।