ইউজার লগইন

খরার পরে বৃষ্টি (শেষ পর্ব)

দুপুরের কাঠফাঁটা রোদে আবার রাস্তায় নামে অমিয়। শান্তিনগর মোড়ের দিকে হাটতে থাকে, রাস্তায় প্রচুর যানজট। বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি, রিকশা, ভ্যানে রাস্তা গিজ গিজ করছে। যানজটে মানুযের জীবনযাত্রা দিনকে দিন কঠিন হয়ে উঠছে। প্রচণ্ড গরমে অস্থির। এর মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে থাকা ! বেঁচে থাকার তাগিদে ছুটে চলে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বড় বড় অফিসের ব্যাস্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া দিন মজুর পর্যন্ত। সবাই ছুটছে জীবিকার প্রয়োজনে !

শান্তিনগর মোড়ে এসে অমিয় ভাবতে থাকে কোথায় যাওয়া যায় ? ঠিক এই মুহূর্তে ওর কোন কাজ নেই। কাজ না থাকাও একটা সমস্যা। ফাঁকা বাসায় একা একা সময়ও কাটবে না, ভাবতে ভাবতে একটা রিকশায় উঠে পড়ে।
-রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করে- কই যাইবেন ?
-মতিঝিলের দিকে চলেন।
রিকশা ধীরে ধীরে এগুতে থাকে মতিঝিলের দিকে। রিকশাওয়ালা লোকটা বেশ বয়স্ক। রুগ্ন শরীর, বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। প্রচন্ড গরমে দরদর করে ঘামছে।
-চাচা, আপনার বাড়িতে কে কে আছে ?
-আমি আর আমার স্ত্রী।
-ছেলেমেয়ে নাই?
-তিনডা পোলা আছে, তারা যার যার সংসার নিয়া আছে।
-আপনারে দেখে না?
-একটা দীর্ঘশ্বাস ছেঁড়ে বৃদ্ধ বলে- না বাবা ! হেগো মা বিছনায় পইরা আছে, একবার খোঁজও নেয় না ! হেরা নাকি নিজেরাই চলতে পারে না, আমগো দেখবে ক্যামতে !
অমিয় আর কথা বাড়ায় না, খারাপ লাগে। কত বিচিত্র মানুষের জীবন ! পলওয়েল মার্কেট পার হয়ে এলে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকান দেখে রিকশা থামাতে বলল অমিয়। নিজে একটা বেনসন ধরিয়ে বৃদ্ধকে বলল- আপনি কি খাবেন খান। বৃদ্ধ লোকটি একটি রুটি আর এক কাপ চা খেল।
-চলেন এবার যাই, বলে আবার রিকশায় উঠে পড়ে অমিয়। রিকশা আস্তে আস্তে এগিয়ে চলে মতিঝিলের দিকে, কিছুদূর এগুতেই ফোনটা বেজে ওঠে, পকেট থেকে বের করে তাকিয়ে দেখে - রূপা।
-হ্যালো !
-হ্যা, বল।
-কি ব্যাপার ! তুমি চলে গেলে কেন ?
-তুমি কি থাকতে বলেছিলে ?
-তাই বলে দুপুর বেলা তুমি এভাবে চলে যাবে ?
-তুমিই তো চলে আসতে বললে !
-সেটা তো রাগ করে বলেছি, একবার আম্মুর সাথে দেখাও করবে না !
-অনেকক্ষণ বসে ছিলাম, ভাল লাগছিল না তাই চলে এলাম।
-এখন কোথায় ?
-মতিঝিল, তুমি কি বাসায় যাবে?
-না।
ওপাশ থেকে আর কোন কথা শোনা যায় না। অমিয় মনে মনে হাসে, বরফ গলতে শুরু করেছে ! রিকশা মতিঝিলের কাছাকাছি চলে আসে। অমিয় সেনা কল্যাণ ভবনের সামনে নেমে পড়ে। মনে মনে ভাবে ফারুক ভাইকে কি এখন পাওয়া যাবে ! দেখিই না যেয়ে !
অনেক দিন পর ফারুক ভাইয়ের অফিসে আসলো অমিয়, প্রায় দুই বছর হবে! অফিসটা নতুন করে ডেকোরেশন করা, আগের থেকে অনেক সুন্দর। ফারুক ভাইকে অফিসেই পাওয়া গেল। অমিয়কে দেখে বেশ অবাকই হলেন ফারুক ভাই।
-আরে ! আমাদের অমি বাবু যে ! তুমি তো আজকাল ডুমুরের ফুল হয়ে গেছ !
-না ফারুক ভাই, প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকি, তাই আসা হয় না। কেমন আছেন ?
-আমি ভাল আছি, তোমার খবর কি ?
-ভাল। আপনার অফিসটা আগের থেকে অনেক সুন্দর করে সাজিয়েছেন।
-এই তো মাস ছয়েক আগে নতুন করে ডেকোরেশন করিয়েছি। বাইরে চকচকে না হলে ক্লায়েন্টরা আসতে চায় না।
-এখন বেশ ভাল লাগছে।
-রূপা কেমন আছে ?
-ভাল আছে।
-কি খাবে ?
-এদিকটায় অনেকদিন আসা হয় না, ঘরোয়ার বিরানী খাওয়া যেতে পারে ! অমিয়র মনে পড়ে এই অফিসে বসে কতদিন ঘরোয়ার বিরানী, খিচুড়ি খেয়েছে ! সেই দুপুর থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত আড্ডা দিয়েছে !
ফারুক ভাইয়ের সাথে সেই ইউনিভার্সিটিতে পরিচয়য়। অমিয়র তিন বছরের সিনিয়র, খুব মনখোলা মানুষ। মহসিন হলে একই রুমে থাকতো। খুব স্নেহ করতেন অমিয়কে, আদর করে বাবু বলে ডাকতেন। ভার্সিটি থেকে বের হয়ে ফারুক ভাই ব্যবসায় নেমে গেলেন। অমিয় সহ আরো কয়েকজনের কাছে এই অফিসটা হয়ে গিয়েছিল ওদের আড্ডা দেয়ার কেন্দ্রস্থল। অমিয়র বিয়ের সময়ও অনেক সাহায্য করেছেন ফারুক ভাই। ওই সময় উনি এগিয়ে না এলে হয়ত বিয়েটাই হত না। সাতটা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে ফারুক ভাইয়ের অফিস থেকে বের হল।

অনেকদিন পর সন্ধ্যায় এই দিকে আসলো অমিয়। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। অমিয় তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে মানুষের ঘরে ফেরার ব্যাস্ততা। সবাই ব্যস্ত, অফিস ফেরত মানুষের দল, ফুটপাতের দোকানদার, ভিক্ষুক- সবাই। অমিয়র কোন তাড়া নেই, তার জন্যে অপেক্ষা করে নেই কেউ। উদ্দেশ্যহীন ভাবে অনেকক্ষণ হাঁটলো। সোডিয়াম লাইটের হালকা আলোয়ে অদ্ভুদ লাগছে শহরটিকে। সে হেঁটে চলেছে স্টেডিয়াম অঞ্চলের দিকে আর দেখছে বিচিত্র মানুষদের। এই আলো আধাঁরিতে অনেক সময় মানুষ চেনা যায়।

কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদপুরগামী একটি বাসে উঠে পড়ল অমিয়। পিঁপড়ার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাস। মৎস্য ভবনের মোড়ে এসে একেবারে স্থির হয়ে গেল। প্রায় এক ঘন্টা লাগল শাহবাগ পর্যন্ত পৌছুতে। বাসায় ফিরতে রাত দশটা বেজে গেলো
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দরজায় চাবি ঢুকাতে যাবে, এমন সময় ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল। ওপাশে দাঁড়িয়ে রূপা !
-কখন এসেছ ?
-বিকেলে, উত্তরে বলল রূপা।
ভিতরে ঢুকতেই কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল আদৃতা
-বাবা, তুমি আমার কাছে আসনি কেন ? আমি তোমার জন্যে কেঁদেছি।
-এই তো এসেছি বাবা, আমি তো তোমার কাছেই এসেছি !
মেয়েকে আদর করতে করতে তাকিয়ে দেখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে রূপা। অমিয় কাছে এসে দাঁড়ায়, মুখটা ওর দিকে ঘুরাতেই দেখে- চোখ দুটো পানিতে চিক চিক করছে। দুহাত দিয়ে চোখ মুছিয়ে দেয়, অমিয়র বুকে মাথা রেখে রুপা খুঁজে পায় নির্ভরতা।

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শামান সাত্ত্বিক's picture


লিখে চলুন। শুভ কামনা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


THNX

এ টি এম কাদের's picture


এন্ডিং দারুণ হয়েছে ! লিখতে থাকুন !

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ

রন's picture


ভাল লেগেছে লেখা! নতুন সিরিজের অপেক্ষায় রইলাম Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক ধন্যবাদ।

অনিমেষ রহমান's picture


চমৎকার হয়েছে ভাইজান।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক ধন্যবাদ অনি’দা।

অনিমেষ রহমান's picture


ধইন্যা পাতা ধইন্যা পাতা
আপনারেও ধইন্নাপাতা।

১০

মীর's picture


আপনার ভেতরে একজন শহুরে গল্পকার আছে। দারুণ লিখতে পারেন আপনি! দুই পর্বই পড়েছি এবং লাইক করেছি Smile

১১

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ।

১২

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


এইবার গ্রামের পটভূমিতে লেখার চেষ্টা করতাছি, কিছু হবে কিনা জানিনা !

১৩

মৃন্ময় মিজান's picture


দুই পর্বই পড়লাম। বেশ ভাল লেখা। সুন্দর।

১৪

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধইন্যা পাতা

১৫

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


খুব সুন্দর হয়েছে। আপনি মানুষজন কে ভাল স্টাডি করতে পারেন বলে মনে হল।

বানানের ব্যাপারে আরেকটু সচেতন হলেই হবে। নিয়মিত লিখুন।

১৬

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ পরামর্শের জন্য। ভাল থাকুন।

১৭

তানবীরা's picture


চমৎকার হয়েছে ভাইজান।

Big smile Big smile Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।