ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ (২য় পর্ব) দীর্ঘশ্বাস

dhusor godhuli-2.jpg

বিভা মাষ্টার বাড়ি থেকে ফিরে দেখে তখনো ঘুমাচ্ছে প্রভা। চাল থেকে বৃষ্টির পানি পড়ে ঘরের অনেক জায়গাই ভিজে স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। প্রভার পায়ের কাছে কাঁথাটার অনেকখানিই ভিজা।
-ইস! বিছনাডা এক্কেবারে ভিইজা গ্যাছে, মাইয়াডা কিছুই দ্যাহে না। এই প্রভা, ওঠ।
চোখ মুছতে মুছতে উঠে বসে প্রভা।
-তুই দ্যাহস না খেতাগুলান ভিইজা গ্যাছে? পইড়া পইড়া খালি ঘুমাস ?
-আমি কি করুম? চালের সব জায়গা থেক্কাই তো পানি পড়ে। খেতাগুলান তো সরাইয়াই রাখছিলাম, বৃষ্টিতে ভিজা গ্যাছে।
বিভা ঘরের চালের দিকে তাকায় আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে- ঘরের চালে কত জায়গায় যে ছিদ্র গুণে শেষ করা যাবে না। আট বছর আগে, প্রভার বাপে মরণের আগের বছর ছন দিয়ে ছাওয়া পুরানো ঘর, বৃষ্টিতে ভিজে ছন পঁচে গেছে অনেক জায়গায়।
দারিদ্রের ছোবল এখানে বড়ই প্রকট। চালার ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির পানি এসে ভাসিয়ে দেয় ঘর, সেই পানি ওদের জন্য বয়ে আনে শুধুই দুর্ভাগ্য। চাঁদের আলো ঘরে এসে ঢোকে, নির্মম জ্যোৎস্না কখনো খেলা করে ভাঙ্গা ঘরের কার্নিশে, সে আলো ওদের মনে কোন অনুভূতি জাগায় না। জীবনের নান্দনিক রূপ এখানে ম্লান, স্বপ্ন-ধূসর। রোদ-বৃষ্টি আলো-ছায়া কোন প্রভাব ফেলে না এখানে। ওদের দুঃখকে, বুকের গভীরে জমে থাকা ক্রন্দনকে অনুভব করতে কেউ পাশে এসে দাঁড়ায় না।
নিজের এই অসহায়ত্ব জীবনের অরেকটা করুণ ছবিকে যেন আরও বেশী করে মনে করিয়ে দেয়। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে ঘর-বাড়ি-স্বপ্ন বিলীন হওয়ার দৃশ্য বার বার দুঃস্বপ্নের মতই ফিরে আসে মনে, অনেক বছর আগের ক্ষতটাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিতে। মনে পড়ে স্বামীর বাড়ির কথা। গভীর রাতের উজানীচর; সর্বগ্রাসী উত্তাল নদী আর ভাঙন। তারপর সব হারিয়ে উদ্বাস্তু। ফিরে আসে বাপের ভিটেয়, সেখানেও কেউটের ফণা। চাচার রাক্ষুসে ক্ষুধার কাছে সব হারিয়ে অবশেষে ঠাঁই হয়েছে বাড়ি থেকে দূরে এই জঙ্গলের ভিটেয়। অসীমের অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই জঙ্গলেই স্বর্গ পেতেছিল ওরা। খুব বেশী কিছু না হলেও ও পেয়েছিল বাগানের এক চিলতে জমিতে হোগলের বেড়া আরে ছনের তৈরী চালের একটা কুড়েঘর। সে ঘরে যদিও অঢেল সম্পদ ছিল না কিন্তু শান্তি ছিল, সুখ ছিল।

-বিভা, ও বিভা কি করস? পারুলের কথায় ঘোর কেটে যায় বিভার।
-কি আর করুম, সবই আমার কপাল!
-এই বিহান বেলা কই গেছিলি?
-মাষ্টার চাচার বাড়ি। চাচী ধান সেদ্ধ করনের লইগা যাইতে কইছিল, মেঘলা দিনের লইগা আইজ করল না। দ্যাহো, বৃষ্টিতে খেতাগুলান সব ভিইজা গেল।
-হ, তোর ঘরের যা অবস্থা যে কোন সময় ভাইঙ্গা পড়তে পারে। ঘরটা ঠিক করন দরকার।
-ক্যামনে করুম কও? দুই বেলা ঠিকমত খাওনই জোডে না, তায় আবার ঘর ঠিক করা! চাচারে কইছিলাম কয়ডা খ্যাড় দিতে, আমারে খ্যাড় দিলে নাকি হের গরু না খাইয়া মরবো।
-মফিজ চাচায় যে দিবো না তা জানি। হে তো চায় না তুই এইহানে থাহস, আপন ভাবলে তোর বাপের সব সম্পত্তি কাইড়া নিয়া এই বাগানের মধ্যে ফালাইয়া রাখত? বুঝোস না?
-বুঝি পারু’বু, সবই বুঝি। এইডাই তো চিন্তা করি। কোনদিন জানি লাত্থি দিয়া আমগো খেদাইয়া দেয়! প্রভার বাপ তো মইরা বাঁচছে আর আমারে ভাসাইয়া গ্যাছে সমুদ্দুরের মধ্যে। আইজ দুইডা ভাতের লইগা মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে অয়, সাতটা বছর ধইরা মানুষের লাত্থি গুতা খাইয়া মাইয়াডারে লইয়া যে রহম বাঁইচা আছি, এইডারে কি বাঁচন কয়? বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিভা।

-বুঝলি বিভা, আমগো মত গরীব মানুষগো বাইচা থাকা বড় কষ্টের! মতির বাপে এহন আর তেমন কাম করতে পারে না। মতির মিলের চাকরিডা না থাকলে আমগোও চলতে খুব কষ্ট অইতো।
-হ, তোমার তো দুইডা পোলা আছে, একটা তো কামাই করতে পারে। আমার মাইয়াডারে লইয়া তো আরও চিন্তা অয়। আর কয়ডা বছর গেলেই তো অরে বিয়া দিতে অইব। ক্যামনে কি অইব আল্লাই জানে!
-হেইডা যহন অইব তহন দেহা যাইব, এহন চিন্তা কইরা কি অইব?
-পারুবু, চিন্তা করন লাগেনা, এমনিতেই চইলা আহে
-বুঝি, কিন্তু কি করবি? ল, কয়ডা শাপলা তুইলা আনি।
-হ, লও। আমারও ঘরে রান্ধনের কিছু নাই। চাচী কয়ডা চাউল দিছে, আইজকের দিনডা কোন রকমে চইলা যাইব।

বিভা প্রভারে মুরগী আর হাঁসগুলোকে ছাড়তে বলে পারুর সাথে ঘাটে বাঁধা ডোঙা নিয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে ভরা বিলের মাঝখানে। বৃষ্টি থেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। যদিও সূর্য্য ওঠেনি এখনো তবে মেঘ কেটে যাওয়ায় চারপাশ পরিষ্কার হয়ে এসেছে অনেকটাই। দুজনে মিলে বেশ কিছু শাপলা তুলে ফেরার পথে বিভা ওর হাঁসের জন্য কিছু শামুকও তুলে নেয় ডোঙায়।

চলবে...

ধূসর গোধূলি - প্রথম পর্ব

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


কথার স্টাইলের সাথে প্রভা-বিভা-অয়ন নাম গুলো ঠিক যাইতেছে না বইলা মনে হইতেছে Sad

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ শুভ ভাই প্রশ্নটা তোলার জন্য। এই প্রশ্ন যে আসবে তা আমিও ভেবেছি।
আমি তখন অনেক ছোট, এই গল্পের অয়নের বয়সী। আমাদের বাড়িতে ২৫/২৬ বছর বয়সী এক বিধবা মহিলা ভিক্ষা করতে আসতো, কোলে ছোট একটি বাচ্চা নিয়ে আর সাথে আসত তাঁর বৃদ্ধা মা। মহিলার নাম ছিল-বিভা আর তাঁর মায়ের নাম ছিল-প্রভা। সেই ছেলেবেলায় আমার মনে প্রশ্ন ছিল- ভিক্ষা করে অথচ এত সুন্দর নাম ! যদিও তারা ছিল হিন্দু কিন্তু এখানে এই নাম দুটো ব্যবহারের লোভ সামলাতে পারিনি !
অয়নের বাবা কিন্তু একজন টিচার, তাঁর ছেলের নাম আধুনিক হতে পারে বলেই মনে হয়। গ্রামে যারা থাকে- নাম যত আধুনিকই হোক, কথায় আঞ্চলিকতা অনেকেরই থাকে।

অনিমেষ রহমান's picture


পড়লাম আবার।
Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ অনিদা

তানবীরা's picture


বর্ননা সুন্দর লেগেছে।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।