ইউজার লগইন

নিশি কথন-৩

সেদিনও রোজকার মতোই বিকেল ছিল। শীতলক্ষার ঘাটে বসে ছিলাম আমি। কোন এক মন্ত্রী সাহেব নাকি ঘাটটাকে পাকা করে বাঁধাই করেছিলেন। তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলামনা। নয়তো বিকেলটা এতো সুন্দর হতো কি করে? ঘাটের একদিকে ডিঙ্গি আর যাত্রীবাহী ট্রলার ভিড়ানো আর অন্যদিকটা একদম খালী, সেদিকের একটা বেদীতে বসে আছি নদী'র দিকে মুখ করে। নদী আমাকে বরাবরই টানে। একটা সার্ব ক্ষণিক ঝিরঝিরে বাতাস উঠে আসছে নদী থেকে। ইষৎ ভেঁজা বাতাসের হলকে ভেতরটাও কেমন ফুরফুরে হয়ে উঠছে। এমনতর মুহূর্তে এক জোড়া ডানার অভাব আমি প্রায়ই বোধ করি। কেমন হতো যদি হাওয়া বেয়ে উড়ে যেতাম নদীর জল ছুঁয়ে?

ঘাট থেকে নদীকুল ধরে আধা কিলোমিটার উত্তরে আমার মাতুলালয়, আশৈশব কেটেছে এখানকার ধুলো মাটি জলে। এখানটাতেই দুরন্তপনায় বেড়ে উঠা, এখানের গাছে গাছে, পথের বাঁকে, ডোবা নালায়, কলমি ডগায়, শিমুল তলায়, পাখির বাসায়, নদীর জলে মিশে আছে আমার দুরন্ত বেলা। আবার এখানটাতেই কাকের বাসায় লালিত কোকিলের মতোই ছিন্ন হয়েছিলো শৈশব। তারপর যান্ত্রিক জীবন, নদী কি আমায় মনে রেখেছে, নাহ নদী কাউকে মনে রাখেনা, দায়টা আমারই। তবুও কোন এক অজানা টানে যান্ত্রিকতা পেছনে ফেলে প্রায়ই ছুটে আসি আমার শৈশব দেখতে। এখনো হৈহুল্লোড় করে শীতলক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বালক বালিকার দল, যেমনি করে ঝাঁপিয়ে পড়তাম আমি এবং আমরা।

কখনযে শাহালম আমার পাশে এসে বসেছে ঠিক খেয়াল করিনি। শাহালম আমার দুরন্ত বেলার বন্ধু। দারিদ্র তাকে অক্ষর জ্ঞানহীন বানিয়ে রাখলেও সে স্বাবলম্বী পুরুষ। জুট মিলে সে মজুরি করে। আমার আগমন বার্তা পেয়ে ছুটে এসেছে কাজ ফেলে। কুশল বিনিময়ের পর আমরা আরো কিছুক্ষণ ঘাটে ছিলাম। বিকেলটা তখন ধরে আসছে। কোথেকে যেন কিছু বাউন্ডুলে মেঘ ভর করেছে পশ্চিম আকাশের প্রান্তে। মেঘের ফাঁক গলে বর্ণালী আলো চুঁইয়ে পড়ছে নদীতে। নদীর জল তখন আবির রঙে সেজেছে। উছলে উছলে উঠছে যেন নব নব শিহরণে। এক সময় সূর্যকর এক স্তুপ মেঘের আড়ালে মুখ লুকালো, দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা নেমে এলো ঘাটে। ঘরে ফেরা মানুষের পদচারণায় তখন মুখর হয়ে গেছে গোটা অঞ্চল, কেবল আমারই ঘরে ফেরার তাড়া নেই। তারপরও শাহালমের সাথে উঠে পড়ি। ঝুমঝুম অন্ধকারে রওনা হই আমার ফেলে আসা মহল্লায়।

নৈশ ভোজ পর্ব শেষ করি বাজারের একটা হোটেলে। তার আগেই শাহালমকে একটা ডিঙ্গি ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম, সারারাত নদীতে ভাসব বলে। খুব অল্প ভাড়ায় মাঝিহীন একটা ডিঙ্গি এক রাতের জন্য ব্যবস্থা করে ফেলে সে। আমরা নৈশভোজ সেরে মহল্লায় ঢুকি। কয়েকজন বাল্য বন্ধুর সাথে বেশ কিছুক্ষন আড্ডা হয়। জমে থাকা অনেক অনেক কথা যেনো শেষ হতে চায় না। এদিকে রাত গভীর হতে থাকে সবার ভেতরই ঘরে ফেরার তাগিদ জাগে। এক সময় সবাইকে বিদায় দিয়ে আমি আর শাহালম পা বাড়াই ঘাটের দিকে।

ঘাটটা তখন অন্য রূপ ধারণ করেছে। কে বলবে এখানেই সারাদিন ছিলো মানুষের ভীড়? কয়েকটা অলস কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে টং দোকানগুলোর সামনে। আমাদের দেখে বিরক্ত হয়ে তারা মাথা উঁচু করে এক বার তাকিয়ে আবার আগের ভঙ্গীতে ফিরে গেল। আমরা নদীর তীরে নেমে এলাম। একটা খুঁটির সাথে সেঁকল দিয়ে বাঁধা ডিঙ্গির তালা খুলে আমরা মাঝ নদীতে চলে এলাম। আমরা ঠিক করলাম উত্তর দিকে যাবো বলে ঠিক করলাম, হাল্কা স্রোতও সেদিকে প্রবহমান। শাহালম বৈঠা বাইছে স্রোতের অনুকূলে। মাঝ নদীতে কখনোই ঘোর অন্ধকার হয় না। নক্ষত্রের আলোয় আবছা ভাবে দুই দিকের নদীতট দেখা যায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই দৃষ্টি সীমানায় এলো সেই ফেলে আসা নানু বাড়ি। বাংলো ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারকেল গাছগুলো মৃদু বাতাসে দুলছে, দুলছে আমার শৈশব। আবছা ভাবে দেখা যাচ্ছে বিরান বাড়ির চালাটাও। এখন আর সেখানে কেউ থাকেনা। হাজারো স্মৃতি বুকে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে যেনো কত অভিমান নিয়ে। কয়েকটা নাতিদীর্ঘশ্বাস গোপন করে আমরা এগিয়ে চলছি। শ্মশান ঘাট পেরিয়েই আমরা মিশে গেলাম নদীর চিরায়ত রূপে, এখানে যন্ত্রের কোন বালাই নেই। দুই তীরে ভুতুড়ে গাছগুলো দেয়াল হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। স্রোতের টানেই ভেসে চলে ডিঙ্গি।

আমি মাস্তুলে গা এলিয়ে দিয়ে আকাশমুখো হয়ে গেলাম। আকাশে কোন তারা দেখা যাচ্ছেনা। কোথা থেকে মেঘের দঙ্গল এসে সারা আকাশ ঢেকে দিয়েছে কালো চাদরে। আমি বড়ই আনমনা আজ। মেঘগুলো এতোটা নিচে দিয়ে যাচ্ছে যে আমার মোটেই ডানার অভাব বোধ হচ্ছেনা, এইতো আমি উড়ছি, আমার ডানা ডুবিয়েছি কাঁচ স্বচ্ছ হিম জলে। ডিঙ্গির আঘাতে চিরে যাচ্ছে নদীর বুক। মৃদু কলকল শব্দ তুলে নদী যেনো আমার কানেকানে কোন কথা বলছে। আমি ফিস্‌ফিস্‌ করে শুধালাম দেখেছো লক্ষা কুমারী। আমি এসেছি, চিনেছতো আমায়? জবাবে লক্ষা কুমারী কলকল হাসিতে ভেঙ্গে পড়ে, দীর্ঘদিনের জমানো কথামালা বিচিত্র ভাষায় আমার কানে এসে আছড়ে পড়ে। আমি তখন উড়ছি নদী ছুঁয়ে।

বিজলীর চমকে ঘোর কাটে, শাহালম চিন্তিত হয়ে বলল বৃষ্টি নামবেরে, নৌকো নিয়ে পাড়ে চলে যাই। আমি বলি, না, আসুক বৃষ্টি। তুই বৈঠা থামিয়ে দে, ডিঙ্গি চলুক স্রোতের টানে। দেখতে দেখতে নদীর জল পাখি হয়ে উড়ে গেল আকাশে, অভিমান নিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরছে আমাতে। আমি আর শাহালম তখন ডিঙ্গির মাঝখানে বসে পাটাতনের নিচে রাখা পলিথিনের বিশাল পরতে নিজেদের ঢেকে ফেলেছি। পলিথিনের উপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে অদ্ভুত শব্দ তৈরি করছে। আমার শরীরে বৃষ্টির হিম জল পড়ছে অথচ আমি ভিঁজছিনা মোটেও, তবে শরীরে অনুভব করছি প্রতিটি ফোঁটা। তখন আমরা জল বন্দী, নিচে জল উপরে জল। জল ঘেরা হয়ে মাঝ নদীতে ছোট্ট ডিঙ্গিতে এক অপার্থিব অনুভুতিতে থমকে গিয়েছিলো সময়।

পরদিন সকালে যথারীতি আমার শহরে পৌঁছে আমি ঘরের দিকে চলছিলাম পরিচিত পথে। অথচ সারা শহরবাসী জানতেও পারেনি আমার বুকের নিশিপাত্রে জমা পড়েছে আরো একটি মায়াবী রাতের উপাখ্যান।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


মায়াবী রাতের উপাখ্যান....
চমৎকার একটা লেখা পড়লাম

সোহেল কাজী's picture


অতিথি পাখি's picture


প্রতিটা মুহুর্ত উদাস থাকতেই ভালো লাগে ।
আরো ভালো লাগে মনের মত কিছু লেখা পড়লে ।।

লেখাটা মনের মত হইলো গো ভাইডি ।।

সোহেল কাজী's picture


ভাল্লাগেনা কিছু, আমিতো অল্টাইম উদাস মাঝে মাঝে হুতাস।
গত রাইতে দেশে বন্ধুবান্ধবের সাথে কথা হইলো।
আতকাই মন উচাটন হইয়া গেল

সাঈদ's picture


আহা । কি দারুন । রাঙ্গামাটি তে আমরা তিন বন্ধু মিলে এরকম রাত কাটাইছিলাম , লেকে।

সোহেল কাজী's picture


রাঙা মাটিতে যাওয়া হয়নি কখনো। Sad
নামাইয়া ফেলান, দেখি কি আছে সেখানে Wink

হাসান রায়হান's picture


সেইরকম অভিজ্ঞতা। লেকাটাও ভালো লাগল।

হাসান রায়হান's picture


স্যরি ফর টাইপো। লাক্কার্লাম লেখাটা।

সোহেল কাজী's picture


আমার কাছে টাইপো সমস্যা নাই বস Laughing out loud
লাইক্করছেন জেনে

১০

নীড় সন্ধানী's picture


.........তখন আমরা জল বন্দী, নিচে জল উপরে জল। জল ঘেরা হয়ে মাঝ নদীতে ছোট্ট ডিঙ্গিতে এক অপার্থিব অনুভুতিতে থমকে গিয়েছিলো সময়।..........
**************************************

এই জায়গাটাতে সেঁদিয়ে গেলাম আমিও, কানে বাজছে বৃষ্টি জল ঝিরররররররররর.......

১১

সোহেল কাজী's picture


ব্যাপক ধনিয়া নীড়'দা 
আপনার জন্য সরবত বরাদ্দ করা হলো

১২

বিহঙ্গ's picture


অনেকদিনপর পুরা তৃপ্তিত একখান লেখা পড়ে লগইন না করে পারলাম না...........................পড়তে পড়তে মনোঅইল যেন অফায় নৌকাত্নন উইঠ্যায়া লেখলেন.........................জোশ লাগছে কাজীদা।.........................

১৩

সোহেল কাজী's picture


ব্যাপকজ ধনিয়া প্রদান করা হইলো।
এই লন জুস

১৪

কাঁকন's picture


ভালো লাগলো

১৫

সোহেল কাজী's picture


থেঙ্ক্যু

১৬

তানবীরা's picture


সারা শহরবাসী জানতেও পারেনি আমার বুকের নিশিপাত্রে জমা পড়েছে আরো একটি মায়াবী রাতের উপাখ্যান।

আমি জেনে গেলাম। অপূর্ব।

১৭

সোহেল কাজী's picture


শুকরীয়া তানবীরাফু

১৮

নড়বড়ে's picture



খুব খুব ভাল লাগলো। মোহাবিষ্ট হয়ে পড়লাম।
শৈশবকে যদি ফিরে পাওয়া যেত!

১৯

সোহেল কাজী's picture


হুম, যাহা যায় তাহা একেবারেই যায়।
অনেক অনেক ধন্যবাদ।

২০

নুশেরা's picture


চমৎকার। প্রতিটা পর্ব আগেরটাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

২১

সোহেল কাজী's picture


অনেক ধন্যবাদ নুশেরাপু

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সোহেল কাজী's picture

নিজের সম্পর্কে

আমার অন্তরের অলিতে গলিতে জট লেগে আছে থোকায় থোকায় অন্ধকার। দৈনন্দিন হাজারো চাহিদায় পুড়ছে শরীরের প্রতিটি কোষ। অপারগতার আক্রোশে টগবগ করে ফুটে রক্তের প্রতিটি কণিকা। হৃদয়ে বাস করা জন্তু-টা প্রতিনিয়ত-ই নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমানে ব্যাস্ত।

প্রতিদিনের যুদ্ধটা তাই নিজের সাথেই। সেকারণে-ই হয়তো প্রেমে পড়ে যাই দ্বিতীয় সত্ত্বার, নিজের এবং অন্যের।