বরিষ ধারা মাঝে - সমাপনী
ছেলেবেলা থেকেই তন্ময় বাবা মাকে এক সাথে পায়নি, তার ছয় বছর বয়সে তারা সেপারেশনে যান। নতুন করে সংসার না করলেও এখনো যে যার মত আলাদাই থাকেন। তন্ময় বাবার কাছে মানুষ। তবে সপ্তাহান্তে নিয়ম করে মায়র সাথে দেখা হতো। স্বাভাবিক একটা পারিবারিক পরিবেশ কখনোই পাইনি সে। ধীরে ধীরে পৃথিবীকে যখন বুঝতে শুরু করল তখন থেকেই মা-বাবার প্রতি চাপা অভিমানটা জমাট বাঁধতে বাঁধতে অগোচরেই চূরান্ত ঘৃণায় রূপ নিয়েছে।
তন্ময় এখন টগবগে যুবক। সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ পেরিয়েছে গত বছরই। এখনো কর্ম জীবনে প্রবেশ করেনি তবে তাকে দেখে মনে হয় না তেমন কোন কিছুর ইচ্ছা রাখে। অভিজাত এলাকায় পৈত্রিক একটা ফ্লাট খালী পড়ে ছিল। সেখানেই তন্ময় আলাদা থাকে। বাবা কিংবা মায়ের সাথে তেমন একটা দেখা হয়না। যদিও বাবা-মা কেউই চান না তন্ময় এভাবে একা থাকুক।
প্রতি মাসে তার একাউন্টে খরচের টাকা পাঠিয়ে দেয়া হয়, অভিজাত জীবন যাপন করার সুযোগ থাকলেও সীমিত চাহিদার মানুষ সে, হাতের টাকা না ফুরোলে সচরাচর ব্যাঙ্কে যাওয়া পড়েনা কিংবা জমাখরচার হিসেবের ধার ধারেনা সে। ইদানিং নতুন একটা ঝামেলা শুরু হয়েছে, তার বাবা-মা উভয়েই চাপ দিচ্ছেন বিয়েথা করে সংসারী হওয়ার জন্য, কিন্তু তন্ময় যথারীতি এ বিষয়েও নির্লিপ্ত।
কুয়াশার সাথে তন্ময়ের পরিচয় বছর দুয়েকের, তাদের পরিচয় পর্বটা উল্লেখ করার মতো কোন জমকানো বিষয় নয়।
(হুমায়ুন সাহেব এ জায়গায় নিশ্চয় পরিচয়ের মুহূর্তে তন্ময়কে একটা মদের বোতল ধরিয়ে দিতেন, যে কিনা মাতাল হয়ে মাঝ রাস্তায় কোন লাইট পোষ্টের নিচে বসে কাঁদছে, আর কুয়াশা মায়াভরা হৃদয় নিয়ে হাত রাখে অচেনা যুবকের মাথায়। কিংবা কুয়াশার ভেনেটি বেগে ভরে দিতেন একটা ছেড়া ৫০ টাকার নোট, আর কুয়াশা এই টাকাটা চালাতে পারছেনা কিছুতেই, কিন্তু ইতিমধ্যে রিকশাওয়লা বিশ্রী ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে, তখনই স্ক্রিনে তন্ময়ের এন্ট্রি। অথবা তন্ময়কে কানাবাবা টাইপ কিছু বানালেও বানাতে পারতেন যার কিনা চশমা পড়ে গেছে রাস্তার কোথাও। কিন্তু এ গল্পে তাদের পরিচয় পর্ব তেমন জরুরী নয় তাই হুমায়ুন সাহেবকে আপাতত বিদেয় করেছি)
হাল্কা আকাশি রঙের শাড়িতে কুয়াশাকে ইন্দ্রানীর মতই লাগছে। রিক্সায় আয়েশি ভঙ্গিতে বসে নগর জীবন দেখতে দেখতে যাচ্ছে সে। ঠিক যেন নগরের মহারানী নগর পরিদর্শনে বেরিয়েছে। মাঝেমাঝেই দমকা বাতাসের হলকে তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছিলো, উড়িয়ে নিতে চাইছে শাড়ির আচল। হাওয়ার দুষ্টুমিকে একদমই পাত্তা দিচ্ছেনা কুয়াশা। যার কারণে অনেকেই মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে রিক্সায় বসা ইন্দ্রানীর দিকে।
দেখতে দেখতেই রিক্সাটা তন্ময়ের বিলাস বহুল ভবনের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে কুয়াশা কল দেয় তন্ময়ের মোবাইলে। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও কোন সাড়াশব্দ পায় না। একটি নারী কণ্ঠ বারবারেই ইংরেজী ও বাংলায় বলছে মোবাইল বন্ধ আছে।
তন্ময় প্রায়শই মোবাইল বন্ধ রাখে। কিন্তু এই সময় সে বাসাতেই থাকার কথা তাই কুয়াশা সরাসরি চলে যায় রিসিপশনে। রিসিপশন রুমটা কয়েকটা বাহারী সোফা আর টি টেবিলে সাজানো। দেয়ালে ঝুলছে কিছু দুর্বোধ্য তৈল চিত্র। রিসিপশনে মাঝবয়সী একজন লোক বসে আছে । কুয়াশা সরাসরি রিসেপশনের দিকে এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলো তন্ময়ের কথা। এর আগেও এখানে আসার সুবাদে রুমের ডিটেইলসের প্রয়োজন পড়েনি।
কয়েকবার ইন্টারকমে কল করেও কোন সাড়া না পাওয়ায় রিসেপশনিস্ট কুয়াশাকে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেয়। হয়তো তন্ময় এখনো ঘুম থেকে জাগেনি। তন্ময়ের স্বভাব ঘুম থেকে দেরী করে উঠা তাই কোন রকম দ্বিধা ছাড়াই কুয়াশা একটা সোফায় বসল। সোফাটা সরাসরি রিসিপশনের সম্মুখে। কুয়াশা কাঁচের দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলেও ঠিকই বুঝতে পারছে, রিসেপশনিস্ট লোকটা সরাসরি কুয়াশার বুকের দিকে তাকিয়ে আছে। কয়েকবার চোখাচোখি হলেও রিসেপশনিস্ট লোকটার কোন পরিবর্তন দেখা গেলো না।
(হুমায়ুন সাহেব আবারো বিরক্ত করছেন, তিনি চাইছেন কুয়াশা উঠে গিয়ে লোকটাকে বলুক, এইযে ভাই সাহেব, শাড়ির উপর দিয়ে তাকিয়ে হয়তো আপনার তৃষ্ণা মিটছে না। আপনার সুবিধার্থে কি ব্লাউজটা খুলে বসব? কিন্তু কুয়াশা মোটেও সেই ধরণের মেয়ে নয়, সো হুমায়ুন সাহেব অফ যান)
কুয়াশা মোটেও বিব্রত বোধ করছেনা, এধরনের পরিস্থিতে সে এতোবার পড়েছে যে এখন আর এগুলোকে গায়ে মাখে না, চাইলেই সে টি-টেবিল থেকে একটা পত্রিকা তুলে নিয়ে নিজেকে আড়াল করতে পারে কিন্তু সেটারও প্রয়োজন বোধ করছে না।
ঘন্টা খানেক অপেক্ষার পর তন্ময়কে মোবাইলে বা ইন্টারকমে না পেয়ে কুয়াশা বিনম্র কণ্ঠে রিসেপশনিস্টকে অনুরোধ করল সে যেন উপরে গিয়ে একবার খবর দিয়ে আসে। অনিচ্ছা সত্বেও লোকটা লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।
রূপবতী তরুণীর অনুরোধকে অগ্রাহ্য কয়ে এমন ক্ষমতা প্রকৃতি কোন পুরুষকে দেয়নি।
কুয়াশা আবার তন্ময়কে নিয়ে ভাবছে, হয়তো সারা রাত জেগেছিলো তন্ময়, এমনিতেও অনেক রাতে পর্যন্ত জেগে থাকে সে। মাঝেমাঝেই মধ্য রাতের দিকে তন্ময় ফোন করে, অগোছালো খাপছাড়া কথামালায় কখন যে রাত পেরিয়ে যায় একদম খেয়াল থাকেনা। তবে তাদের কথায় কখনো তন্ময় বা কুয়াশার কথা থাকেনা। জোছনার কথা থাকে, নদীর কথা থাকে, রাতের কথা থাকে, শুধু তারা সেখানে অনুপস্থিত। আবারো কুয়াশার সত্তাকে ঘিরে ধরেছে সেই ঝিমঝিম আবেশ। এই আবেশ থেকে হয়তো মুক্তির কোন উপায় নেই।
প্রায় আধাঘন্টা পর রিসেপশনিস্ট একটা চিরকুট হাতে ফিরে এলো। ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছে না কুয়াশা। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে চিরকুটটা খুলল কুয়াশা, সেখানে তন্ময়ের সম্ভাষণ হীন গুছানো হাতের লেখা
"গতরাতে পূর্ণিমা ছিলো। সারারাত রাত চাঁদের সাথে জেগেছিলাম, নিরবে আমাদের কথা হয়েছিলো সারারাত। গতকালও গাঁজার ঘোরে বিভোর হয়ে চাঁদকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। চাঁদ আমাকে নিয়ে গিয়েছিলো ছায়াপথের ওপাড়ে ঠিক যেখানটাতে মহাকালের শুরু ঠিক সেখানে। আমরা বসেছিলাম নিভৃত্তে। পথিমধ্যে দেখা হয়ে গেল সৃষ্টিকর্তা নামক পাষন্ড ব্যাক্তিটির সাথে। আমাকে দেখে মুচকি হাসছিলো লোকটা, কেন জানি খুব শক্ত কয়েকটা কথা বলতে গিয়েও কিছুই বলা হয়নি, হয়তো তাকে করুনা করতে মনে চাইলো।
গতরাতেই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যা তোমাকে জানানো হয়নি।
আমার পারিবারিক অবস্থান সবই জানো তাই বিস্তারিত বলার নেই, আমার শৈশবকে যারা বিষিয়ে দিয়েছে, যারা আমার শৈশবকে ভালোবাসাহীন করেছে আমি তাদের উপর চরম একটা প্রতিশোধ নেব। শেষ বয়সে এসে আমার জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী চাইছেন আমি যেনো কাউকে বিয়ে করে ঘরে তুলি। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাদের জীবদ্দশায় আমি সংসার করবনা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তারা একাকী থাকবে, তাদের কোন উত্তরাধিকারী দর্শনের সুজোগ আমি দেবনা, এটা আমার নিরব প্রতিশোধ।
দিনদিন তোমার প্রতি ক্যামন আশক্ত হয়ে পড়ছি। জানি ভালোবাসা জিনিষটা প্রকাশ করার মতো ঠুনকো বিষয় নয়, তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না সেটা কোনদিন না বললেও আমি দিব্যি বুঝতে পারি। তাই দোষটা আমার ভাগেই রইলো।
আজ মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, শেষ বারের মত এক সাথে ভিজতে চাইলে ছাদে চলে আসতে পারো। এরপর হয়তো আমাদের কখনো দেখা হবে না।"
চিঠিটা হাতে নিয়ে কুয়াশা অদ্ভুত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, ক্ষণিকেই তার চেহারা মৃত মাছের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। পৃথিবীটা কেবলই শুন্য আর অর্থহীন হয়ে আসছে। অদূরে বসে থাকা রিসেপশনিস্ট আর তন্ময়ের পার্থক্য ঠিক ধরতে পারছেনা সে। বারবার ঘোলাটে দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাচ্ছে। তার এই মুহূর্তে কি করা উচিত ঠিক বুঝতে পারছে না। বাইরের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে মনে হলো নিজের ওজন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, বিশ্রী ভাবে টলছে কুয়াশা।
আকাশের কোনায় জমে থাকা সকালের বিক্ষিপ্ত মেঘগুলো পুরো আকাশটাকে দখল করে ফেলেছে। মেঘের দল সুর্য্যকে ঢেকে দিয়ে ঠান্ডা বাতাসের চাবুক চালাচ্ছে নগরীর বুকে। কালো মেঘকে ধরে রাখতে আকাশের খুব কষ্ট হচ্ছে, হয়তো মেঘগুলো কোন লগ্নের অপেক্ষায়। রাস্তার গাড়ীগুলোর গতিবেগ বেড়ে গেছে, বেড়েগেছে পায়েচলা মানুষের হাঁটার বেগ। এরই মাঝে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে এলোমেলো হেটে যাচ্ছে একজন অপ্সরা। অপ্সরার কেন জানি খুব কান্না পাচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে অশ্রু চেপে রাখতে। মনে মনে প্রার্থনা করছে তুমুল ঝুম বর্ষণের।
প্রকৃতি তার আপন মানুষগুলোকে কখনী লজ্জাইয় ফেলে না। সেদিন তুমুল ধারায় ঝরেছিলো বর্ষন। বর্ষণের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছলো মাঝ রাস্তায় হেটে যাওয়া কারো চোখের জল। কোন বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের সাউন্ড সিস্টেমে বেজে উঠেছিলো
"বরিষ ধারা মাঝে শান্তির বারি
শুষ্ক হৃদয় লয়ে আছে দাঁড়ায়ে
উর্ধ মুখো নরনারী"





মনে মনে প্রার্থনা করছে তুমুল ঝুম বর্ষণের।
প্রকৃতি তার আপন মানুষগুলোকে কখনী লজ্জাইয় ফেলে না। সেদিন তুমুল ধারায় ঝরেছিলো বর্ষন।
পড়ার জন্য থেঙ্ক্যু জয়িবু
হু আ স্টাইল হইছে পুরা।
উদ্যেশ্য সেটাই ছিলো
পছন্দ হইলো...এই গল্প উপন্যাস হওনের সম্ভাবনাও রাখে মনে হইছে...
হাঃহাঃহাঃ ধন্যবাদ। হয়তো রাখে, তবে সাহিত্য বুঝি না
"রূপবতী তরুণীর অনুরোধকে অগ্রাহ্য কয়ে এমন ক্ষমতা প্রকৃতি কোন পুরুষকে দেয়নি।"--এইটা ব্র্যাকেটে ঢুকান;হুমায়ূন আহমেদের বাণী।
লিখা ভালো লাগলো; লাইক্কর্লাম
ব্যারকেট দিতে ভুলইয়া গেছে

লাইক্করার লাগি ধনিয়া
এইটা হু আ হাজার বার ব্যবহার করছে ঃ)
পুরাই হু আ হইছে তবে আপনার নিজের স্টাইলও কিন্তু মন্দ না
ভাল্লাগছে। আরো দেন গল্প।
ধনিয়া
চেষ্টামু
ভাল্লাগলো....
ধনিয়াজ
হ বুঝলাম!!
চামে চামে ফাইজলামিগুলান হু.আ. উপ্রে দিয়া চালায়া দিলেন??
মাঝে তন্ময়ের ফোন না ধরার ঘটনায় মনে হইল আত্মহত্যার ঘটনা দিয়া শেষ করবেন, তা না করায়, ভাল্লাগ্লো।
++
হাঃহাঃহাঃ ধরতে পারছেন

নাহ আমি আত্মহত্যার বিরুধী।
ভাল্লাগায় শুকরিয়া
...কুয়াশা নামটা খুব পছন্দ হৈছে...
ফিনিশিংটা মিলাইয়া দিয়া নিজের একটা টাচ রাখলেও রাখতে পার্তেন....তাইলে আরেকটু ভালো পাইতাম...
হাঃহাঃহাঃ এইটা মুমায়ুন্রে দিয়া লেখানো তাই নিজের টাচ দেইনাই খুব একটা।

কুয়াশা নামটা আমারো পছন্দের একটা নাম
vallaglo...
ধনিয়া
মন্তব্য করুন