ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...

সবাই নানান কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লে অয়নকে নিয়ে বাজারের দিকে যায় নাহিদ। বাড়ি থেকে পূর্বদিকে বের হয়ে সোজা রাস্তাটা কোটাখালী খাল বরাবর গেছে আর দক্ষিন দিক দিয়ে ছুটে চলা রাস্তাটা কিছুদূর গিয়ে দু’ভাগে ভাগ হয়েছে। একটি পথ সরাসরি কলাবতী বাজারের দিকে চলে গেছে আরেকটি সরু রাস্তা ডানদিক দিয়ে একেবেঁকে নদীর পাড়ের রাস্তার সাথে মিশেছে। অয়ন নাহিদকে নিয়ে সোজা রাস্তা ধরে বাজারে ঢুকে মাষ্টার সাহেবের বইয়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায়। দোকানের সামনে বেশ কিছুটা খোলা জায়গা, তারপর নদীর পাড় ঘেঁষে ডালপালা ছড়ানো ছোট একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। সূর্য্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, এই গাছটা তখন চমৎকার ছায়া দিয়ে ঢেকে রাখে মাষ্টারের দোকানের সামনের জায়গাটিকে। দোকান খোলা থাকলে এখানে সবসময়ই কয়েকটা চেয়ার পাতা থাকে, এই কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় নদীর দিক থেকে আসা চমৎকার ঠান্ডা বাতাসে ফুসফুসটাকে ভরিয়ে তুলতে এখানেই ভিড় করে গ্রামের মাষ্টারের সমবয়সী কিছু মানুষ। চায়ের দোকানগুলো ইদানিং এদের কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে, উঠতি যুবকদের ভিড়ে নিজেদের ঠিক মানিয়ে নিতে পারেন না। নাহিদ একটা চেয়ার টেনে গাছতলাতে বসে, খেয়াল করে দোকানে লোকজনের ভিড় তেমন একটা নেই। মাষ্টার হরিপদর দোকানের বয় ছেলেটাকে ডেকে কিছু মিষ্টি দিতে বলে।
-এ আমাদের শিউলি মা’র জামাই না? পিছন থেকে ছেলেবেলার বন্ধু এবং মাষ্টারের দাবা খেলার পার্টনার হামিদ শেখ বলে,
-হ, তুমি জামাইরে দ্যাহোনাই আগে?
-বিয়ার সময় দ্যাখছিলাম, তা বাবাজি কেমন আছ?
নাহিদ সালাম দিয়ে বলে জ্বি ভাল আছি, আপনি ভাল আছেন?
-আমগো আর ভাল থাকা, বয়স অইছে না?
কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পর আরও লোকজন এসে হাজির হয়। বয়স্কদের ভিড়ে নাহিদ বেশ অস্বস্তি বোধ করে। শ্বশুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ক্লাবঘরের দিকে এগিয়ে যায়। এই এলাকায় ও আগেও এসেছে, অবশ্য বিয়ের আগে। তখন ওর কিছু বন্ধু বান্ধব ছিল এখানে, এখন আর কাউকেই দেখা যায় না। জীবিকার সন্ধানে একেকজন একেকদিকে চলে গেছে। কিছুক্ষণ বাজারে ঘোরাঘুরি করে অয়নকে নিয়ে ফিরে চলল। হাঁটতে হাঁটতে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ায়। একটা সরু কাঁচা রাস্তা নদীর পাড় ঘেসে এগিয়ে গেছে। এই রাস্তা দিয়ে সাইকেল বা বড়জোড় রিকশা চলাচল করতে পারবে। রাস্তাটা বইয়ের দোকানের পাশ দিয়ে এসে বড় পাকা রাস্তায় মিশেছে। অয়নকে জিজ্ঞেস করে-
-এই রাস্তা ধরে তোমাদের বাড়ি যাওয়া যায় না?
-হ, যাওন যায়, তয় একটু ঘুইরা যাইতে অয় দেইখা আমরা সবসময় যাই না।
-তুমি কখনও গিয়েছ?
-হ, বাবার লগে কয়েকবার গ্যাছি।
চল আজ এই পথ ধরেই যাই। অয়নকে নিয়ে নদীর পাড় দিয়ে ফিরে চলে নাহিদ। চমৎকার আবহাওয়ায় নদীর পাড় ধরে হাঁটতে বেশ লাগছে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবি ডুবি করছে, শেষ বিকেলের মায়ায় গোধূলির লাল রঙে আকাশটা কেমন নববধূর সাজে সেজেছে। জোয়ার থাকায় নদীর পানি পাড় ছুঁই ছুঁই, পরিস্কার টলটলে পানি। নদীটা কিছুদূর গিয়ে বাম দিকে বাঁক নেওয়ায় নদীর পাড় ছেঁড়ে ডান দিকের রাস্তায় নেমে যায় ওরা।
নাহিদের ছুটি শেষ হয়ে এলে ওকে ফিরে যেতে হয় কর্মক্ষেত্রে। নতুন চাকরি, তাই আর দেরী করা গেলনা। সাত্তার মাষ্টারের অনুরোধে আরও কয়েকদিন শ্যামলপুরে থাকার সুযোগ পায় শিউলি। ঠিক হয় এক সপ্তাহ পর দেবর শিপন এসে ওকে নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি। বড়দিকে পেয়ে অয়ন যেন আর কাছ ছাড়া হতে চায় না। একমাত্র ছোট ভাইটির প্রতি শিউলিরও অনেক টান। ছোটবেলা থেকে ওকে প্রায় কোলে পিঠে করে বড় করে তুলেছে ও। মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকত, তাই বেশীরভাগ সময় ওকে সামলাতে হত শিউলিকেই।
-বড়দি, তুমি শহরে চইলা যাইবা?
-কে কইলো তোরে?
-আমি হুনছি। ভাইয়া বাবারে কইতেছিল, আর কয়মাস পরই শহরে বাসা ঠিক কইরা ভাইয়া তোমারে নিয়া যাইব।
-তাই নাকি? তুই তো অনেক কিছু জাইনা ফেলছস অনু
-হ, আমি ঠিকই হুনছি। আইচ্ছা বড়দি, শহর কি অনেক দূরে?
-না রে, বেশী দূরে না। বেশী দূরে অইলে লোকজন কি এত তাড়াতাড়ি আসা যাওয়া করতে পারত?
-কতক্ষণ লাগে? বড় বড় গাড়িতে কইরা যাইতে অয়?
-হ, গাড়িতে কইরাই যাইতে অয়, এই ধর পাঁচ ছয় ঘন্টা লাগে।
-এত্ত সময়! তাইলে তো অনেক দূর!
-তোর কি শহরে যাইতে খুব ইচ্ছা করে অনু?
-হ, করেই তো। আমি তো কোনদিনও শহর দেহিনাই।
-তুই দেখবি কোত্থেইকা? তুই তো অইলি হেইদিন! বড় হ, তোরে আমি আমার কাছে লইয়া যামু।
-সত্য কইতাছ বড়দি? তাইলে তো অনেক মজা অইব।
-অনু, তুই একটা কাম করতে পারবি?
-তুমি কইলে সব করতে পারুম, খালি কও কি কাম?
শিউলি হাসতে থাকে অয়নের উচ্ছ্বাস দেখে। না রে! তেমন কিছু না, হরিকাকাগো বাড়ি গিয়ে একটু খবর নিতে পারবি মালতি শ্বশুরবাড়ি থেইকা ফিরছে নাকি?
-ও, হেই কথা? এইডা তো আমি আগে থেইক্যাই জানি। মালতিদি তো কাইলকাই আইছে।
-তাই নাকি? তুই ক্যামনে জানলি?
-আরে আমি জানুম না? সুবল আর আমি একলগে পড়ি না? তুমি কি এহনই হরিকাকাগো বাড়ি যাইবা?
-দাঁড়া, মার কাছে কইয়া আহি।
ওদেরকে রাস্তার দিকে এগুতে দেখেই বকুলও পিছু নেয়। তিন ভাইবোন একসাথে বড় রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে কোটাখালী ব্রিজের দিকে। অনেকদিন পর বড়দির সাথে আবার হরিকাকাদের বাড়ি যাচ্ছে অয়ন। দুই বোনকে পিছনে ফেলে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্রিজের কাছে চলে এলো ও। পিছনে তাকিয়ে দেখল বড়দি আর ছোটদি এখনও অনেক দূরে। ব্রিজের কাঠের রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে অয়ন দেখছে খালের পানিগুলো কেমন দ্রুত ছুটে যাচ্ছে একদিক থেকে অন্যদিকে, আর ঘোলা জলে ভাসমান কচুরিপানা ঘাস লতাপাতাগুলো ছুটে এসে কেমন করে যেন হারিয়ে যাচ্ছে খালের মাঝখানের ঘুর্নির মধ্যে। এই রাস্তার পাশ দিয়ে ওদের বাড়ির দিকে যে ছোট্ট খালটি বয়ে গেছে, যেটা দিয়ে ওদের পুকুরে পানি আসা যাওয়া করে, সেটা দিয়েও এখন কলকল করে পানি এসে নেমে যাছে এই খালে। অয়ন তাকিয়ে দেখছে সুবলদের বাড়ির সোজাসোজি ঘাটে ওদের বাড়ির গোপালদা জাল ধুচ্ছে। ব্রিজের দুই পাশেই খালের পাড়ে নারিকেল গাছ দিয়ে বানানো ঘাট, যাদের বাড়ি খালের পাড়ে তারা অনেকেই এই ঘাটে গোসল করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রিজের কাছে পৌছে যায় শিউলি আর বকুল। শিউলিকে দেখে অয়ন বলে,
-বড়দি দ্যাহো, খালের পানিগুলান কেমন কইরা গড়গড়াইয়া ঐদিগে ছুইটা যাইতাছে! আইচ্ছা বড়দি, এই পানিগুলান কই যায়?
-এইগুলান উজানগাঙে গিয়া পড়ে। ভাটার সময়ে পানিগুলান এই খাল দিয়া সব নদীতে গিয়া পড়ে আবার জোয়ার আইলেই নদী থেইকা পানি আইসা খাল বিল সব ডুইবা যায়।
-ও, আইচ্ছা
চলবে.....
আগের কিছু পর্বঃ
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন





আগের মতই ভালো!
জোশশশশশশ
অনেক ধইন্না ভাইজান
আগের মতই ভালো!
সাথে আছি
সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ আপুমনি
চমৎকার। সাথেই আছি।
একজন পাঠককে নিয়মিতভাবে সাথে পাওয়াটা অনেক বেশী অনুপ্রেরনাদায়ক।
সবগুলোই পড়লাম একে একে
লেখার হাত চমৎকার আপনার
কষ্ট করে সবগুলো পড়ার জন্য থেঙ্কু। সামনে আরও অনেক পর্ব আছে...
মন্তব্য করুন