ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প...

dhusor godhuli-12.jpg

ব্রিজ থেকে নেমে তিন ভাইবোনে হরিপদর বাড়ির দিকে এগোতে থাকে। মূল ফটক দিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই শিউলি দেখতে পায় বিজয়া কাকী বাড়ির উঠানে নানান ধরনের আচার শুকাতে ব্যস্ত। ওকে দেখে কাকী অবাক হয়ে অনেকক্ষণ ধরে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে, মুখে চিরচেনা সেই স্বভাবসুলভ হাসি। কাছাকাছি যেতেই ওকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-আরে, এ কারে দ্যখতাছি! নতুন মানুষ আমগো বাড়ি?
-আমি নতুন মানুষ কাকী? আমারে এতো তাড়াতাড়ি পর কইরা দিলা?
-আমরা পর করুম ক্যান? বিয়ার পর মাইয়ারা আর নিজেগো থাহে না রে মা! শ্বশুরবাড়িই তার আপন হইয়া ওডে। এই দ্যাখ, আমি তো বাপের বাড়ির কতা ভুইলাই গ্যাছি। একটা সত্যি কতা কমু?
-কও! শিউলি হাসতে হাসতে বলে
-তুই আগের চাইতে অনেক সুন্দর অইয়া গ্যাছোস
শিউলি যেন কিছুটা লজ্জা পেল। বিজয়া এগিয়ে এসে কানে কানে কিছু একটা বলতেই শিউলীর গাল দু’টো ক্রমশ লাল হয়ে উঠলো। কিছুটা কপট রাগের ছলে হাসতে হাসতে বলে, যাও কাকী, তুমি যে কি না! তারপর চারদিকে তাকিয়ে বলল, আইচ্ছা মালতি কই?
-উত্তর বাগানে, সুবলরে দিয়া চাইলতা পাড়াইতাছে

সুবল বাগানে শুনতে পেয়েই অয়ন সেদিকে এগিয়ে গেল। ওদের বাগানের প্রতিটা জায়গাই অয়নের চেনা, অনেকটা নিজেদের বাড়ির মতই। কিছুদূর এগিয়েই দেখতে পেল সুবল বাগানের মধ্যের ছোট পুকুরটার পাড়ে চালতা গাছটার অনেক উপরে উঠে একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কচি ডালে ঝুলন্ত চালতা পাড়ছে। অয়ন বেশ অবাক হয়ে যায় সুবলের এত উপরে উঠে যাওয়া দেখে। ও কখনও এমন করে পারবে না। ওর বেশ মন খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে, ও আসলে অনেককিছুই পারেনা যা সুবল আর মিরাজ পারে। অয়নকে দেখেই মালতি বলে ওঠে,
-আরে, অয়ন যে! কহন আইলি?
-এই তো এহনই আইলাম
-শিউলি কেমন আছে রে?
-ভাল, বড়দি আমার লগে আইছে তো!
-শিউলি আইছে? আমগো বাড়ি?
অয়ন মাথা ঝাকাতেই মালতির চোখ দু’টোতে যেন খুশির একটা ঝিলিক খেলে যায়। গাছের উপর দিকে তাকিয়ে ‘সুবল আর লাগবে না, এহন নাইমা আয়’ বলেই চালতার ঝুড়িটা ফেলে রেখে ভিতর বাড়ির দিকে ছুটতে থাকে। উঠানের প্রান্তে আসতেই দেখে ওদের ঘরের সামনের বাঁধানো সিঁড়িতে বসে ওর মায়ের সাথে গল্প করছে শিউলি। মালতি একছুটে এগিয়ে এসে পেছন থেকে শিউলির চোখদু’টো চেপে ধরে। শিউলি বেশ বুঝতে পারে এটি কার কাজ, হাত দু’টো ধরে একটানে মালতিকে সামনে নিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেই বলে,
-এই বান্দর! কই গেছিলি?
-আমি তো জানতাম তুই আইবি, তাই তোর লইগা চাইলতা পাড়তে গেছিলাম
-হ, এহন তো কইবাই। আমি গত পরশুদিন আইছি, একটা খোঁজ নিছ? আমি তো তোমার খবর পাইয়া ঠিকই চইলা আইলাম।
-এই বান্দর! আমি কি জানি তুই আইছস? জানলে আরও আগে গিয়া হাজির হইতাম
এইগুলার দুষ্টামি আর কমলো না! বলে হাসতে হাসতে ঘরের মধ্যে ঢুকে যায় সুরবালা। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় দুজনের মুখেই যেন খই ফুটতে থাকে। গত ছয় মাস ধরে কত না বলা কথা জমে আছে মনে!

চালতার ঝুড়ি নিয়ে উঠানে আসতেই সুবল দেখে বড়দি শিউলিদির সাথে গল্পে মশগুল। ঝুড়িটা উঠানে ফেলে রেখেই সুবল অয়নকে বলল,
-অয়ন, ল আমরা ডোঙা নিয়া বিল থেইক্যা ঘুইরা আহি। যাবি?
-ডোঙা বাইবো কেডা?
-ক্যান? আমি বামু
-তুই পারস?
-পারুম না ক্যান? আমি একলা একলা ডোঙা নিয়া কতদূর চইলা যাই! তুই যাবি আমার লগে?
-ল যাই

সুবল গোয়ালঘরের পাশের খাড়ির কাছে এসে দেখে ডোঙাটা ঘাটেই ভিড়ানো আছে। গোয়ালঘরের পাশে দাঁড় করানো লগিটা নিয়ে ডোঙায় গিয়ে ওঠে। অয়ন উঠে পড়লেই লগি দিয়ে খোঁচা দিয়ে পাড় থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে আসে ডোঙাটা, তারপর লগিটাকে উল্টাদিকে নিয়ে এসে ডোঙার মুখটা ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে ভরা পানির দিকে। প্রথম দিকে কিছুটা দুলুনিতে অয়নের দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ অসুবিধাই হচ্ছিল, কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য ঠিক হয়ে যায়। অয়ন বেশ অবাক হয়ে লক্ষ্য করে সুবল কেমন বড় মানুষদের মত লগি দিয়ে ডোঙ্গাটাকে সামলে নিল আর এখন বেশ দক্ষতার সাথেই এটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সুবল আর ও সমবয়সী হলেও সুবল অনেক কাজেই ওর থেকে এগিয়ে, অনেক বেশী সাহসীও। ও মনে মনে ঠিক করে নেয় এখন থেকে ওকেও এগুলো শিখতে হবে। দু’পাশে লম্বা ঘাস আর ভেসে থাকা কচুরিপানার মধ্যে দিয়ে ছুটে চলতে থাকে ওদের তরী, বড়দের ছত্রছায়া ছেড়ে এই প্রথম অয়ন মুক্ত স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছে।
-সুবল, আমারে লগি বাওয়া শিখাবি
-হ, শিখামুনা ক্যান? আয় আমার কাছে আগাইয়া আয়

অয়ন সুবলের কাছে এসে দাঁড়ায়। সুবল লগিটা অয়নের হাতে দিয়ে দেখিয়ে দেয় কিভাবে পানির মধ্যে ডুবন্ত মাটিতে খোচা দিলে ডোঙাটা সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। অয়ন অবশ্য সেভাবেই চেষ্টা করে কিন্তু বুঝতে পারে না কেমন করে যেন ডোঙাটা উল্টাদিকে ঘুরে যায়। সুবল আবার দেখিয়ে দেয় এমন হলে লগিটা অন্য পাশে নিয়ে আবার সামনের দিকে ধাক্কা দিতে হয়। অয়ন আবারও সেভাবেই চেষ্টা করে কিন্তু এবারও ডোঙাটা ঘুরে যায়। শেষমেশ বলে ওঠে, না রে! আমি মনে অয় পারুম না, আমি আসলে কিচ্ছু করতে পারিনা। সুবল বলে, প্রথম প্রথম এমনই অইব, আরও কয়বার চেষ্টা কর দেখবি ঠিক অইয়া গ্যাছে। আমিও তো অনেকদিন পারি নাই, কাকা আর গোপালদার লগে ডোঙায় চইড়া কয়েকদিন চেষ্টা করার পর এহন পারি। তুই মাঝে মধ্যে আমগো বাড়ি আহিস, আমি তোরে শিখাইয়া দিমু। এরপর বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর কিছুটা উন্নতি হয় অয়নের। সুবল অয়নের চেষ্টা দেখে অনেকটা বড়দের মত করে বলে,
-আইজ থাক। আইজকা তো প্রথম, আস্তে আস্তে দেখবি একদিন পুরাপুরি শিখা গেছস।
-হ, আইজ আর না। ল, ফিরা যাই।

মালতির সাথে কথা বলার মাঝে বকুল এসে বাড়ি যাবার কথা বলতেই শিউলির খেয়াল হয় অনেক বেলা হয়ে গেছে, এখন যাওয়া দরকার। সবকথা বলতে গেলে দুপুর পার হয়ে যাবে, তাই ঠিক হয় বিকালে শিউলিদের বাড়ি যাবে মালতি।
-অয়ন কই রে? বাড়ি যাওয়া দরকার তো!
-সুবলের লগে খেলতাছে মনেহয় মালতি বলে।

অয়নকে বাড়ির ভিতরে কোথাও খুঁজে না পেয়ে বকুল খুব চিন্তিত হয়ে পড়ে, শেষমেশ ওর চোখে পড়ে বিলের পানিতে ডোঙায় করে সুবলের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাড়ি থেকে বেশ দূরে চলে গেছে ওদের ডোঙা। অয়নকে কখনও একা ছাড়ে না ওরা, তাই বকুল বেশ ভয় পেয়ে যায়। শিউলি কাছে এসে দাঁড়াতেই বকুল যেন খুব অস্থির হয়ে বলে, দ্যাখ বড়দি, অনু কতদূর চইলা গ্যাছে? চারু বকুলকে আশ্বস্ত করে বলে, সুবল ভালই ডোঙা বাইতে পারে, ডরানের কিছু নাই।
-তোরা অনুরে এতডা ঘরুমইন্যা কইরা রাহস ক্যান? ও তো একটা ছেলে, অর সবকিছু শিখন লাগবো না? বকুলের অস্থিরতা দেখে মালতি বলে ওঠে
-ও অনেক চঞ্চল মালতিদি, চারদিগে এত পানি, জোঁক- তাই ডর লাগে।
-গাঁয়ের ছেলে, চঞ্চল হওয়াই ভাল। অরে ছাইড়া দে, দেখবি নিজেই সবকিছু শিইখা নিবে।
বকুলের অস্থিরতা দেখে চারু গোয়ালঘরে কাজে ব্যস্ত গোপালকে গিয়ে বলে- ও গোপালদা, সুবলরে একটু ডাইক্যা দাওনা, বকুলরা অয়নরে নিয়া বাড়ি ফিরব। গোপাল বেশ জোরে সুবলের নাম ধইরা কয়েকবার ডাক দিলে ওরা বাড়ির দিকে ফিরে তাকায়, চারু হাতের ইশারায় ওদেরকে বাড়ি ফিরতে বলে।
গাছের ছায়ায় বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসে ওরা চারজনে গল্প কথায় মেতে ওঠে আবার। কখন যে সময় পার হয়ে যায় টেরই পায় না, কিছুক্ষণ পর পেছনে তাকিয়ে দেখে ওরা ডোঙা নিয়ে ফিরে এসেছে। অয়নকে দেখে অনেক খুশি মনে হয়। শিউলির কাছে এগিয়ে এসে বলে,
-জান বড়দি, সুবল অনেক ভাল ডোঙা বায়। আমরা তো অনেকদূর চইলা গেছিলাম
-হুম, খুব মজা লাগছে না? এহন বাড়ি লও।
শিউলি ওড়না দিয়ে ছোটভাইয়ের মুখের ঘাম মুছিয়ে দেয়। তারপর মালতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে চলে বাড়ির পথে।

চলবে.....

আগের কিছু পর্বঃ

• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


অনেকদিন পর গল্প পড়লাম।
ভালো লেগেছে।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক ধন্যবাদ আপুমনি Laughing out loud

আরাফাত শান্ত's picture


পড়লাম, পড়ছি, পড়বো সামনেও!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


হ, পড়বাই তো। সবাই তো আর পড়বে না! Smile

টোকাই's picture


দারুন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


THNX

সামছা আকিদা জাহান's picture


আরাফাত শান্ত বলেছেন
পড়লাম, পড়ছি, পড়বো সামনেও!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা

তানবীরা's picture


পড়লাম, পড়ছি, পড়বো সামনেও
ভালো লেগেছে।

১০

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


থেঙ্কু তাতা'পু Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।