ইউজার লগইন

"..সোনার বাঁশি আর জীবনপথের টুকরো কথন.."

দুমদুম করে শব্দ হচ্ছে। মাথার ভেতর। এক কান দিয়ে ঢুকে মাথার অলিগলি দিয়ে ঘুরে আরেক কান দিয়ে বেরোচ্ছে। ওটুকু হলেও শান্তি ছিল, শব্দকণাগুলো লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা কণা ঢুকছে, মাথার অলিগলিতে মূহুর্তখানেক ঘোরাঘুরি করে আরেক কান দিয়ে বেরোচ্ছে, সাথে সাথে আরেকটা ঢুকছে, ঘুরছে, বেরোচ্ছে, ঘুরছে, বেরোচ্ছে।

এমনি দিন যাচ্ছে আজকাল। লেখাটা যখন লিখছি, তখন রাত দশটা বেজে তিন মিনিট। ঠিকঠাক তাহলে রাত দশটায় শুরু করেছি। কানে হেডফোনের একপাশ চাপা, আরেকপাশ সরিয়ে রেখেছি, হঠাত কারও ডাকে শুনতে না পেলে ভীষণ কেলেংকারি হয়ে যাবে। একটা সদ্য শোনা প্রিয় গান বেজে চলেছে প্রায় এগারতমবারের মত। মাথার মধ্যে সবসময় ছুটোছুটি করা শব্দগুলোর মাঝে এটাও একটা। তাহসানের, “এ যেন সহজ স্বীকারোক্তি আমি যুগান্তরী নই/ এ যে ভীষণ আক্ষেপ আমার, আমি দিগবিজয়ী নই/ শুধু একটাই আশা আমি বুকে জড়িয়ে, রব সারাটি জীবন তোমায় নিয়ে/ কোন এক নিঃসঙ্গ রোদেলা রাতে দেখেছি, প্রিয়তমা তোমার চোখে মিষ্টি হাসি/ কোন এক দুঃসহ জোছনা দিনে বাতি নিভে গেলে, কড়া নেড়েছি তোমার হাতে ঘরে/ কিছু অর্থহীন শব্দ গুণে লেখেছি তোমায়, প্রেম তুমি কোথায়/..বিন্দু আমি, তুমি আমায় ঘিরে, বৃত্তের ভেতর শুধু তুমি আছো…।“ তাহসানের গানের ভক্ত কোনদিনই ছিলাম না। একবার এক বান্ধবীর কথায় এ গানটা না শোনায় তার সীমাহীন বিস্ময় লক্ষ করে গানটা খুঁজে বের করলাম। বাহ! ভালই তো। ব্যস চলছে। গুনগুন করে গাওয়া কিংবা হেডফোনে ক্রমাগত বেজে চলা গানটার কোন মানে নেই, কিন্তু বেশ ভাল লাগে বিশেষত সুরটা। কিন্তু কিছু ভুল খুঁজে পেলাম। যেমন, রাত কখনও রোদেলা হয় না, কিংবা দিনে জোছনা হয় না। কে জানে, ইচ্ছেকৃতই ভুল কি না!

যে ঘরে এই গণকযন্ত্রটা বসে, তার ঠিক একপাশে সেই নারকেল গাছগুলো, আর পাশে ভগ্ন দালানটা। খুব দ্রুত কাজ চলছে। তিনতলা বাড়ি, প্রায় দু সপ্তাহের মাঝে শেষ করে এনেছে। আমি চাইছি, আরও দেরি হোক, নারকেল গাছগুলো আরও মাসখানেক থাকুক। আরও মাসখানেক আমার নির্জন রাত্রিতে সরসর বাতাস বইয়ে দিয়ে যাক। পূর্ণিমায় শুভ্র-সফেদ চাঁদের গায়ে ছায়া ফেলুক, চোখ দুটোকে স্থির করে রাখুক কিছুক্ষণ। আর কালবোশেখে প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়ে আমার বিরোধিতা করুক, তছনছ করে দিক চারদিক। জানি না, আর কদিন বাকি। ওরা কি বোঝে আমার এই ভালবাসার কথা? কেন যেন এই ভাষাহীন গাছগুলোর প্রতি ভালবাসা জন্মে গেছে। যখন ছোট ছিলাম, তখন এই গাছগুলোকে ভারি ভয় পেতাম। রাতের অন্ধকারে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়তে পড়তে হঠাত যখন গাছগুলোর দিকে চোখ পড়ত, মনে হত, রূপকথার দত্যি-দানব তার বিশাল লম্বা চুল ছড়িয়ে লম্বা দাঁত নিয়ে হাঁ করে তেড়ে আসছে। গাছগুলো মৃদু বাতাসে পাতাগুলো নেড়ে ছোট্ট দু’বেণি করা মেয়েটাকে অভয় দিত। গ্রিলটা আঙুল দিয়ে আলতো করে একবার স্পর্শ করে আবার পড়ায় মন দিত সে। সে এক চিলতে ঘরটা ছেড়ে আসবার সময়ও গাছগুলোর জন্য প্রাণটা বড্ড কেঁদেছিল, কিন্তু এই ঘরে এসে গাছগুলোকে খানিকটা দূর থেকে দেখলেও প্রাণটা জুড়োয় বেশ।

গাছগুলো হয়ত সত্যিই বোঝে না। অথবা হয়ত বোঝে। ইদানিং গাছগুলোকে দেখি নিশ্চুপ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। হয়ত আমার মনের ভুল। রবিঠাকুরের সুভার মত ভালবাসি গাছগুলোকে। জানি না, তারা বোঝে কি না। আর বুঝলেই কি…আর তো কটা দিন।

হেডফোনটা দু কানেই এঁটে দিতে পারলে বোধহয় বেশ হত। বিল্ডিং এর শেষ তলাটা ভাঙছে। দিনরাত কাজ চলে এখন। হলদে আলোর বালবে ধূলি-ধূসরিত কতগুলো মানুষকে দেখি প্রবল বিক্রমে হাতুড়িটা নিয়ে দেয়ালে বারবার আঘাত করে যেতে। দুমদুম করে আওয়াজ হয়। ওপরে একবার তোলে, তারপর হঠাতই নেমে আসে, দুম করে শব্দ হয়, আর ধূলিকণায় তাদের পায়ের কাছটা আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই দেখছিলাম। ফ্যাকাশে আলোয় ভাল করে বুঝতে পারছিলাম না। অনেকক্ষণ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝতে পারলাম, তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই, স্রেফ রড। ভাবনাটা বিদ্যুতঝলকের মত আমার মনকে আলোড়িত করে যায়। টালমাটাল পায়ে লোকগুলো দেয়াল ভাঙছে। জীবনের একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে এর সাথে? আমরা টালমাটাল পায়ে জীবন পথে হেঁটে চলি, কখনও লোকটার মত টাল খেয়ে পড়ি, কখনও পাশ থেকে কেউ একজন হাত ধরে টেনে তোলে, আবার কখনও হোঁচট খেয়ে মাটিতেই পড়ি, আবার উঠে দাঁড়াই। জীবন পথে যে হাঁটতেই হবে। থেমে যাবার সাহস যে নেই।

রবিঠাকুরের কিশোর রচনাবলি পড়লাম। স্কুল লাইব্রেরিটা নিয়ে আমার বরাবরই বেশ ক্ষোভ ছিল। সেরকম বই নেই, বই খুঁজে বের করতে ঝামেলা, এই সেই হাজারটা সমস্যা। নতুন লাইব্রেরিয়ান এসেছেন বেশ অনেকদিন। তিনি আসবার পর বেশ সুবিধা হয়েছে। বেশ উৎসাহী, প্রাণবন্ত, বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ। আমি বইটা নিয়ে যখন তাঁর কাছে গেলাম, তিনি স্মিত হেসে বললেন, “কিশোর রচনাবলি পড়বে? এত সময় কি আছে মেয়ে?” আমি বললাম, “নেই বটে, বের করে নেবো।“ “বেশ তো, নিয়ে নাও। নামটা লিখতে ভুলবে না মেয়ে।“ আনলাম, পড়তে শুরু করলাম। একটানা পড়িনি, বেছে বেছে পড়েছি। কেমন লেগেছে সে এক কথায় বলতে পারব না। সুভার কথাটা এই লেখায় কেন এল, সহজেই বোঝা উচিত। আর দিনরাত মাথার ভেতর ঘুরে বেড়ানো শব্দমালাগুলোর মধ্যে একটা বলতে পারি, সুয়োরানির দুঃখ গল্প থেকে, “তার ঐ বাঁশের বাঁশিতে সুর বাজল, আর আমি সোনার বাঁশি বয়ে বেড়ালেম, আগলে বেড়ালেম, বাজাতে পারলেম না।“ সুয়োরানি যখন বলল, “ঐ দুয়োরানির দুঃখ আমার চাই।“ আর সবশেষে ঐ কথাটা, চোখে জল এসে গেল। পুরোটা পড়ে শেষ করতে পারলাম না। তার আগে ফেরতও দিচ্ছি না। সেদিন অনেকটা সময় নিয়ে লাইব্রেরিটা ঘেটে বেড়ালাম, কিছু বই চোখে পড়েছে...

“তার বাঁশের বাঁশিতে সুর বাজল, আর আমি সোনার বাঁশি বয়ে বেড়ালেম, আগলে বেড়ালেম, বাজাতে পারলেম না।“

এই আক্ষেপটা জীবন থেকে কবে সরাতে পারব, কে জানে!

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

ভাস্কর's picture


অসাধারণ লাগলো অনুভূতির প্রকাশ...

কাঠপুতুল's picture


ধন্যবাদ ভাস্কর'দা। ভাল থাকুন।

টুটুল's picture


আরে জোশতো Smile
সুন্দর লেখা Smile

কাঠপুতুল's picture


থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু!

বকলম's picture


লেখাটা খুউব ভাল লেগেছে।

আপনি নিশ্চই স্কুলে পড়েন না?

কাঠপুতুল's picture


ইয়ে, সত্যি বলতে, স্কুলেই পড়ি। আর ২ বছর বাকি, স্কুল শেষ করতে....Puzzled

বকলম's picture


আপনি নিশ্চই ঠাট্টা করছেন। একটা স্কুলে পড়ুয়া মেয়ে এ বয়সে এত গুছিয়ে এত সুন্দর করে লিখতে পারে আমার বিশ্বাস হতে চায় না।

কাঠপুতুল's picture


এইজন্য কাউকে বলতে চাই না। কেউ বিশ্বাস করে না। http://www.ondormoholer-rupkotha.blogspot.com/ এখানে গিয়ে দেখা যায়। সব আমার বাচ্চাবাচ্চা কাজকর্ম নিয়ে লিখা। Sad

বকলম's picture


বিশ্বাস করলাম। প্লিজ মন খারাপ করবেন না। আমিতো আপনার প্রশংসাই করলাম প্রকারান্তরে। আর এই যে দেখুন আমি কিন্তু আপনাকে আপনি করে বলছি। ছোট হিসেবে দেখলে কিন্তু তুমি করে বলতাম টুটুল ভাইয়ের মত, সেটা তো করছিনা। Wink

১০

কাঠপুতুল's picture


আপনি করে বললে মন খারাপ হবে। কেউ আমার ওপর রেগে গেলে আপনি করে বলে...........

১১

বকলম's picture


ঠিকাছে তোমাকে 'তুমি' করে বললাম কিন্তু তোমার লেখনিকে 'আপনি'।

১২

কাঠপুতুল's picture


নাআআআ! Sad Sad

১৩

টুটুল's picture


স্কুলে পড়লে তুমি করেই বলি?

প্রথম লেখাটা মিস্কর্সিলাম ... সরি Sad
পরে পড়ে নেব Smile

১৪

কাঠপুতুল's picture


প্রথম লেখায় কিছু নাই। খালি আমি আসছি এই টাইপ কথাবার্তা। আর তুমি করে বলা? নিইইইইইইসন্দেহে! পিচ্চি মানুষ, আপনি শুনতে কষ্ট হয় Sad

১৫

নরাধম's picture


বাহ্‌, দারুন ত। একদম ম্যাচিউর লেখা।

১৬

কাঠপুতুল's picture


থ্যাংকু! থ্যাংকু!

১৭

তানবীরা's picture


পড়া আর লেখা দুটোই সমান তালে চলুক।

১৮

কাঠপুতুল's picture


হুমমম। ঠিক ঠিক ঠিকই! Laughing out loud কিন্তু লেখাটা কম হয় আজকাল।নাইনের যে কি জ্বালা!

১৯

নীড় সন্ধানী's picture


পছন্দ করলাম। চমৎকার হয়েছে লেখাটা।
গাছকে নিয়ে ভাবনাগুলো সবচেয়ে ভালো লেগেছে...

২০

কাঠপুতুল's picture


অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ। গাছগুলো না এখনও আছে, কাটা, মাটিতে পড়া....।:(

২১

বকলম's picture


এমন শোক পাশ কাটিয়েই বড় হতে হয়। হয়ত একদিন ভুলে যাবে, হয়তো কোন একদিন, কোন এক অলস দুপুরে, অন্য কোন এক জানালার পাশে বসে গাছগুলো কথা মনে পড়বে, হয়ত পড়বে না।

২২

কাঠপুতুল's picture


হুমমম। নিষ্ঠুর স্মৃতি, নিষ্ঠুর জীবন। Sigh

২৩

জ্যোতি's picture


পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মুগ্ধতা নিয়ে গেলাম।

২৪

কাঠপুতুল's picture


অনেক ধন্যবাদ! আনন্দ হচ্ছে। Laughing out loud

২৫

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


??

২৬

কাঠপুতুল's picture


!! (এখনও চিনো নাই? প্রিন্সেস Alana অথবা শাহরিনা) :-[

২৭

মীর's picture


"জীবনটা অনেকটা পুতুলখেলার মত। কখনও নিজেরা অন্যদের নিয়ে খেলি, কখনও অন্যেরা আমাদের নিয়ে খেলে। আর সবসময় মাথার ওপরে যিনি আছেন, তিনি তো সৃষ্টি করেছেন, খেলবার অধিকার তো তার আছেই!"-নিকটা নেবার পেছনে এই ভাবনাই কাজ করছে। আমি সাধারণ মানুষ, ছোট্ট একটা মানুষ, বয়সের দিক থেকেও, অভিজ্ঞতার দিক থেকেও। শতভাগ বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে চাই। আর দেশের সীমারেখা পেরোলে এই পরিচয়টাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব, কেননা, এটা ছাড়া সেরকম কিছু নেই, যা আগ বাড়িয়ে বলতে পারি।

বাপরে বয়সের তুলনায় ঈষর্ণীয় পরিপক্বতা। >)

যাই হোক, প্রথম লেখার ছবিগুলো সবচে' ভালো পাইসি। তবে রূপকথা এইখানে দেয়ার কথা বলসিলেন, সেটা নিয়মিত দিচ্ছেন না; এই অনুযোগও জানিয়ে যাচ্ছি। আশা করি এদিকটায় নজর দেবেন। রইলো শুভেচ্ছা নিরন্তর।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

কাঠপুতুল's picture

নিজের সম্পর্কে

"জীবনটা অনেকটা পুতুলখেলার মত। কখনও নিজেরা অন্যদের নিয়ে খেলি, কখনও অন্যেরা আমাদের নিয়ে খেলে। আর সবসময় মাথার ওপরে যিনি আছেন, তিনি তো সৃষ্টি করেছেন, খেলবার অধিকার তো তার আছেই!"-নিকটা নেবার পেছনে এই ভাবনাই কাজ করছে। আমি সাধারণ মানুষ, ছোট্ট একটা মানুষ, বয়সের দিক থেকেও, অভিজ্ঞতার দিক থেকেও। শতভাগ বাঙালিয়ানা ধরে রাখতে চাই। আর দেশের সীমারেখা পেরোলে এই পরিচয়টাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব, কেননা, এটা ছাড়া সেরকম কিছু নেই, যা আগ বাড়িয়ে বলতে পারি।