ইউজার লগইন

প্রেম থেকে অপ্রেমে

মুখবন্ধ
সাধারণ মানুষ,ছাপোষা জীবনযাপনকারী ন'টা-পাঁচটার বৃত্তেবন্দী লোভকামমোহমাৎসর্যে আকণ্ঠ ডুবে থাকা জীবনেও প্রেম আসে। প্রেম ছককাটা জীবনটাকে উল্টেপাল্টে দেয়, নতুন করে বাঁচতে শেখায়। কিন্তু রোম্যান্সের চটজলদি আকুলতা কমলে যেটা পড়ে থাকে, সেটাকে প্রেমের ছাইভস্ম বলাটাই কি বেশি সঙ্গত? মানবিক টানাপোড়েন দানবিক হয়ে উঠলে প্রেম তো অপ্রেমেও পর্যবসিত হতে পারে দ্রুত, তাই না? ক'দিন আগে লেখা একটা সহজিয়া রোম্যান্সের পরিণতি নিয়ে ভাবছিলাম। বেশ কিছুটা লিখে ফেলেছিলাম- শেষটা এখনো চেষ্টা করছি মেলানোর। যদিও জীবনের হিসেব মেলানো খুব কঠিন।

এ সময় বরফ পড়াটা স্বাভাবিক নয়, অন্যান্য বছরগুলোতে এ সময়টায় রোদের আনাগোনা শুরু হয়, গাছে চেরী ফুলের কুঁড়ি দেখা যায়। স্বলপবসনা ললনাদের দেখার জন্য সদ্য আগত ইমিগ্র্যান্ট যুবকদের হুড়োহুড়ি চোখে পড়ার মতো দৃষ্টিকটু হয়। একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে সামিন ভাবে, একদিন সেও ওই যুবককুলের একজন ছিলো। কত্তো সহজ ছিলো জীবন তখন। দলবেঁধে বন্ধুরা মিলে বিচে বারবিকিউ বাঙালি কূটকাচালি কিছুক্ষণ, ওটা বাড়াবাড়ি রকমের বিরক্তিকর হয়ে গ্যালে মদের বোতল খুলে সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকা। হাসিখুশি দুয়েকজনের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাওয়া, পার্টিতে নাচা- টুকটাক শরীরী আদানপ্রদান।

অ্যামেরিকা তাকে বদলে দিয়েছে। অনেকটাই। প্রথম দু’ বছরের আবেগী, স্বল্পবাক যুবকটিকে সে মাঝে মাঝে নিজেই খুঁজে বেড়ায়। কথায় কথায় চোখে জল আসতো, বাড়ির জন্য মন কেমন করতো। হুটহাট ঝোঁকের মাথায় দেশে চলে যেতো- হাসি পায় তার। কতটা ছেলেমানুষ ছিলো! কেন জানেনা, আজ ঘনঘোর তুষারের মাঝে গাড়ি চালাতে চালাতে আগেকার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।

“গাড়িটা... একটুখানিক...” কাঁপা কণ্ঠের অনুরোধে পাশ ফিরে তাকায় সে।

সেই সিনসিন্যাটি থেকে গত প্রায় দু’ঘন্টা নিজের মধ্যে ডুবে ছিলো। পাশে কুশি, এতোদিন পর! তার যেমনটা লাগা উচিত তেমনটা লাগছেনা একথাটা এতোক্ষণ পর টের পায়।

গাড়ির গতি কমিয়ে চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে কুশির দিকে চেয়ে সে পড়ে নিতে চেষ্টা করে দূরযাত্রার ধকল শরীর সামলাতে পারছে কী’না। মেয়েটা এমনিতেই দুর্বল, উপরন্তু আজ আবীরদের বাসায় দাওয়াতে একেবারেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। সাজগোজ, গরম কাপড়, অস্বস্তিকর প্রশ্ন- অনেক কিছুই তার চোখ এড়ায়নি। তেমন কিছু খায়নি, বারবার বমি পাচ্ছে বলছিলো আবীরের বউকে সেটাও লক্ষ্য করেছে। হাজার খানিক মাইল উড়ে আসার পর জেটল্যাগ আর আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নিতে নিদেনপক্ষে দু’টো দিন দরকার ছিলো। কিন্তু আবীরদের চাপাচাপিতে সেটা আর হ’লো কই।

এ ক’বছরে কুশির চেহারায় ধারালো ভাবটা আরো স্পষ্ট হয়েছে। টলটলে চোখ দু’টো ঠিক আগের মতোই মায়াময়। কিন্তু ঠোঁটদু’টো পুরন্ত হয়েছে, হাতে পায়ে ঢলঢলে একটা লাবণ্য এসেছে, পুরোপুরি নারীত্বের আভাস স্ট্রেটকাট-সিল্কি-পিঠছাওয়া বহতা নদীর মতো চুলগুলোতে। সামিন মনে করার চেষ্টা করে কৈশোরের শুরুতে এই মেয়েটা তার হাতের মুঠোয় যখন ভয়ে ছটফটাতো, তখন চুলগুলো কেমন একঢাল মেঘের মতো মুখের চারদিকে ছড়িয়ে থাকতো! কতো বদলে গেছে। সবকিছুই!

“কী রে, শরীর খারাপ লাগছে, হিটার কি বেশি গরম? কমিয়ে দেই?”
“ন্‌ ন্‌ না...কিছু না...”কুশির কণ্ঠ স্তিমিত।

“আরে, বল্‌ না, আমি জানি তুই একটুও এঞ্জয় করিস্‌নি আজকে। এই তাড়াহুড়োয় করবিও না জানতাম, তারপরও আবীরদের বাসা বলে কথা, না করতে পারলাম না।”

সামিন একটু সহজ হবার চেষ্টা করে-“দম বন্ধ লাগলে বল্, জানালাটা নামিয়ে দিচ্ছি একটু।”

“ন্ ন্ না, লাগবে না...”- গলায় খুব অস্বস্তি।

এবার স্পষ্ট করে তাকায় কুশির দিকে। প্লেন থেকে নামার পর বোধকরি প্রথমবারের মতো।

ক্লান্ত চোখের তারায় কেমন যেন একটা মিনতি। কেমন যেন একটা আকুলতা। আধো অন্ধকারের মধ্যে তার মনে হয়, কুশি কি টলছে একটু?

“সমুদা, গাড়িটা থামাবে কোথাও? কাতর কণ্ঠে সেই ছোট্টবেলার মেয়েটা কথা বলে ওঠে।

“নিশ্চয়ই। শোন, তুই কি গ্যাস স্টেশন বা টয়লেট- ...”

“না না, সমুদা, সেসব কিচ্ছুনা...

“তোমার সুবিধে মত রাস্তার পাশেই কোথাও...” কুশির গলায় কেমন ছটফটানি। সামিনের ভালো বোধ হয়না।তুষারে রাস্তাঘাট ঢেকে গেছে। সাদা চাদর পরানো মাঠঘাট প্রান্তর। নির্জন, সুনসান। রাস্তা থেকে ডানে মোড় নিয়ে একটা শুকনো পাতাহীন গাছের তলে মাঠের পাশে গাড়িটা থামায়। মেয়েটা এতো চাপা! গত ক’বছরে এটা খুব ভালো বুঝেছে। শরীর খারাপের আলামত দেখলে কুশি তাকে অকপটে জানাবে এটা মোটেও বিশ্বাস করেনা।

কুশি হঠাৎ বলেঃ “সমুদা, দেখো কী বড় একটা চাঁদ!” তার কণ্ঠ কাঁপছে। ভয়ে না আবেগে সে জানেনা- “সমুদা, যেদিন রাতে তুমি আমাদের বাড়িতে ছিলে সেদিন রাতেও পূর্ণিমা ছিলো, তোমার মনে আছে?”

সামিনকে হঠাৎ কেউ সপাটে একটা চড় মেরেছে!

ওই রাতের কথা এখন কেন? এখানে কেন?

জীবনে যদি কোনকিছুকে সে ইরেজার দিয়ে ঘষে তুলে ফেলার সুযোগ পেতো তার তালিকাশীর্ষে থাকতো ওই রাতটা। সামিনের নিজের সাথে অসংখ্যবার তর্কাতর্কি, জ্বলে পুড়ে অনুতাপে দগ্ধ হওয়ার অগণিত নির্ঘুম রাত মনে পড়ে যায়। ঢেউয়ের মতো ছুটে আসে অসংখ্য স্মৃতি, কতক চূড়ান্ত আনন্দের, কতক তিক্ত বিষময়। স্মৃতিমেদুরতায় ডোবার অবকাশ নেই এখন তার, তখনকার স্মৃতির বোঝা আজ বড় দুর্বহ ঠেকে।

বাইরে তাকিয়ে দেখে, আসলেই রূপোলি গোল থালা চাঁদ তুষারাবৃত প্রান্তরে এক অপার্থিব জোছনার প্রলেপ বুলিয়ে দিয়েছে।
নিস্তব্ধ, একাকী আর বিষণ্ণ সেই সৌন্দর্যের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকা যায়না।
খুব মন খারাপ করে।

তার কি ঘোর লাগছে আবার?

এতোদিন পর??

সেই কান্না জড়ানো অনুরোধ, ফোঁপানি, অনিঃশেষ আতঙ্কের সতেরো বছরের চোখজোড়ার বিস্ফারিত দৃষ্টি, যন্ত্রণা, চিৎকার, গোঙানি -উফফ্‌!
ঈষৎ রক্তাভ চোখে সহযাত্রিণীর দিকে তাকায়। আবীরের বাসায় মাত্র দুপেগ। আজকাল দু পেগে তার কিস্যু হয়না। কিন্তু চোখ ঠিকই লাল হয়। বিরক্তিকর।

এই নারী কে? এতো সেদিনের সেই মেয়েটা নয়! সদ্য বড় হয়ে ওঠা কুমারীর আতঙ্ক, শরীর নিয়ে বিষম খাওয়া, আর শুচিতা রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টায় ছটফট করা হরিণছানা নয় তো!

কুশি খুব আস্তে করে মিউজিক সিস্টেমের আওয়াজটা একেবারে মৃদু করে দেয়। পোয়েটস অফ দ্য ফল মদির কণ্ঠে গেয়ে চলেছে-টেল মি ওয়্যার ডু উই ড্র দ্য লাইন........................?
একেবারে নিস্তব্ধ চারপাশ,শুধু গানের কথাগুলো ঘুরে ঘুরে বেজে যায়, কুশির চোখে ঘোর।

কেমন যেন টলছে।

আচ্ছন্নের মতো গলায় খুব অস্থিরতা নিয়ে বলেঃ “আমাকে...”
সামিন লালচে চোখেই চেয়ে আছে তার দিকে।
“আমাকে...” গলা আটকে যায় কুশির, শ্বাস আজো বন্ধ হয়ে আসে। হায়!

গলার ভেতরের আটকে রাখা শ্বাসটা ছাড়তে ছাড়তে বাইরের ধূসর অন্ধকারের দিকে চেয়ে বলে- “আমাকে... একটু.........আদর করবে?”

এর একমাস আগে-

সামিন একটু ঘাবড়ে গেছে।

পুরুষ হিসেবে নিজের সক্ষমতা বিচার করবার জন্য গত তিনটে বছর একটা ভালো স্টপ গ্যাপ ছিলো। কঠোর পরিশ্রমের ফলে সে আজ ক্যারিয়ারের এ জায়গাতে এসেছে – সে ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। আরেকটা জিনিস নিয়েও তার কিছুটা আত্মশ্লাঘা কাজ করে ইদানিং। হ্যাঁ, তার থেকে সুপুরুষ, মেধাবী, ধনী এমনকী সক্ষম পুরুষও অনেক আছে। খোদ বাঙালিদের মধ্যেই আছে। কিন্তু তারপরেও সে জানে, তার ভেতর এমন কিছু একটা আছে, যেটা মেয়েদেরকে নাড়ায়। বুনো আকর্ষণ জিনিসটার সাথে সে অপরিচিত ছিলো, আর কুশিকে যখন সে প্রথম পছন্দ করে তখন নরম কোমল কৈশোরিক প্রেমের সারল্য তাকে যতটা টানতো, বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারে সে টানটা আর তেমন নেই। নেকুপুষুসুন্টুনিমুন্টুনি ভাব ভালোবাসার চেয়ে ক্রমশঃ আঁচড়ে কামড়ে উদোম করে দেওয়া ভালোবাসা তাকে বেশি টানতে শুরু করে। এখানে প্রথম বান্ধবী ন্যাটালির সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার সেটাই মূল কারণ ছিলো।

আমেরিকার কাছে সে একরকম কৃতজ্ঞ। যৌন বিষয়ে রক্ষণশীল একটা গড়পড়তা সামাজিক বাতাবরণ থেকে এসে এই বাইরের বাতাসটুকুতে সে বুক ভরে শ্বাস নিতে পারে। এই প্রথম। কোনো অপরাধবোধ ছাড়া। যৌনতা যে আর সব খিদের মতোই একটা খিদে মাত্র, সেটার জন্য সম্পর্ক থাকাটা যে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান নয়, এটা প্রথম তাকে শেখায় এ দেশ। আড়ষ্টতা তাকে পর্যুদস্ত করতো, কিন্তু যেদিন প্রথম তার কলিগের সাথে হুট করেই শারীরিক আদানপ্রদানের ব্যাপারটা ঘটে, সেদিন সে ভদ্রমহিলা তাকে সহজ করেছিলেন এই বলেঃ দ্যাখো, এটা তোমার দেশ নয়, তোমার পরিবার নয়। তোমার ভালোমন্দ, পাপ পুণ্যের বিচার করবার মতো শক্তি শুধু তোমার। আমার স্বামী অক্ষম, আজ পাঁচ বছর ধরে পঙ্গু। মার্টিনকে আমি ভালোবাসি- কোনোদিন ওকে ছেড়ে যাবোনা। কিন্তু তারপরও আমি বুঝি, আমার শরীরের কিছু চাহিদা আছে। আমি মানুষ বলেই আছে। সেটা পূরণ করার মানে ওকে চিট করা সেটা আমার মনে হয়না। নিজেকে কষ্ট দিয়ে ওর সাথে থাকাটাই বরং চিটিং। আর ওকে ছেড়ে চলে যেতে আমার কষ্ট হবে কারণ ওর সোল কেয়ারার এখন আমি ছাড়া এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

সেই অদ্ভুত দোটানায় একটা সম্পর্কের শুরু। বেশ লাগতো মার্থাকে তার। মার্থা অন্য অফিসে বদলি হয়ে যাবার পর জুলিয়া, এরপর ওর পার্সোনাল ট্রেইনার মারিয়া, আরো বেশ ক’জনের সাথে সে শুয়েছে। হ্যাঁ, কয়েকটা স্রেফ শোয়া। কিন্তু কয়েকটা আবার বেশ একটু ভালো লাগা, গভীরতার দিকেও গেছে। কিন্তু প্রত্যেকটি মেয়ে তাকে একই কথা বলেছে। তার ভেতরে আদিম, বুনো একটা সেক্স আপিল আছে যেটা আজ পর্যন্ত তার কাছে অজানা ছিলো। শারীরিক এই সক্ষমতা তাকে আড়ালে আনন্দিত আর বিব্রত দুইই করে।

একটা আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রত্যেকটি মেয়েকে সে যখন নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরতো, চোখ বুঁজলেই সরল নিষ্পাপ টলটলে দু’টো চোখ অভিমানী ফোলা ঠোঁট নিয়ে তার দিয়ে চেয়ে থাকতো।

বড় অন্তর্ভেদী, তীক্ষ্ণ সে দৃষ্টি।

কে জানে কেন, এক পর্যায়ে সে ছটফটিয়ে উঠতো। হবো হবো করেও কারো সাথে এ জন্য তার গাঢ় সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারেনি। শেষবারের মতো দেশে যাবার যে স্মৃতি, মন থেকে তাকে মোছার হেন চেষ্টা নেই যা সে করেনি। নিয়মিত ডাক্তারের কাছ থেকে ঘুমের অষুধ নিয়ে এসেছে। রুটিন ফলো করেছে। কুশির সাথে একদম কোন মিল নেই এরকম মেয়েদেরকেই সে বেছে বেছে ডেইট করেছে।

কিন্তু তারপরও...

দীর্ঘদিন...দীর্ঘরাত...

মধ্যরাতে কুশির নিস্তেজ দেহটিকে নিজের পদতলগত কল্পনা করে সে শিউরে জেগে উঠেছে, তার মনে হয়েছে তার সারা গায়ে কুশির রক্ত- চটচট করছে- বাথরুমে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থেকেছে মধ্যরাতেই। ডাক্তার তাকে বলেছিলেন একা না থাকতে। দরকার হলে কোনো হাউসমেইট বা নিদেনপক্ষে পোষ্য রাখতে। একাকীত্ব এই সমস্যা গুলো বাড়ায় সে জানে।

এক সন্ধ্যায় গিয়ে ছোট্ট একটা ধবধবে সাদা বেড়ালছানা নিয়ে এলো। হরিণছানা এখানে পাওয়া যাবেনা, জানতো, আর অ্যাপার্টমেণ্টে হরিণ রাখবার প্রশ্নই ওঠেনা। শৈশবের মুগ্ধতার রেশ ধরে সে ওটার নাম রাখলো কিমারি। একই সাথে অবাক আর খুশি হলো যেদিন গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে গুটিশুটি মেরে শুতে আসা কিমারিকে জড়িয়ে ধরলো সে। নিজের অজান্তেই অস্ফুটে দু’বার “কুশি, কুশি” বললো।

কিন্তু তার দিনযাপনের বাস্তবতায় কুশির সাথে যে কোনরকমের সংসর্গ যে কতোটা অসম্ভব, সেটা সে বোঝে। মা’র সাথে তার কালেভদ্রে কথা হয়। বাবার সাথে আরো কম। ক্রমশঃ দূরে সরতে থাকা ছেলের প্রথম প্রেমের প্রতি শীতল আচরণ মা’কে অবাক করলেও আশাহত করেনা। বিশেষতঃ তিনি যখন শোনান, কুশি পড়তে আসছে অ্যামেরিকায়, তার শহর থেকে খুব কাছেই, সে ভেতরে ভেতরে একটু কেঁপে ওঠে। তার অপরাধের ক্ষমা নেই, জানে। কুশি কাউকে বলেনি তার নাম, সেটাও জানে। দু’বছর আগে কুশির বাবা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির একটা সেমিনারে দু’শহর পরের একটা শহরে এসেছিলেন। তাঁর সামনাসামনি হবার সাহস অনেক কষ্টে সঞ্চয় করেছিলো। কিন্তু খুব অবাক হয়েছিলো ভদ্রলোকের স্নেহশীল আচরণে। এ ক’বছরেই কেমন বুড়িয়ে গেছেন তিনি। কুশির কথা পুরোটা বলেননি। কিন্তু কুশি একটা বছর ড্রপ দিয়েছে শুনে তার বুকটা হঠাৎ ধ্বক্‌ করে ওঠে।

আমিন আহমেদের দিকে চোখ তুলে তাকায় কিন্তু মুখে অস্বঃস্তির ছাপ স্পষ্ট। তিনি অবশ্য সেটা উপেক্ষা করে বলতে থাকেন, এ সবকিছুর পরেও কুশি কতো ভালো করছে, ভীষণ ভালো গান শিখেছে, বাস্কেটবলে শ্রীলঙ্কা থেকে ট্রফি নিয়ে এসেছে—“কিন্তু কি জানো, বাবা...” থেমে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি- “ আমার সেই হাসিখুশি মিষ্টি মেয়েটা আর নেই। কালো অমানিশার মতো একটা ছায়া ওকে সারাক্ষণ ঘিরে আছে। মনে আছে তুমি যখন ওকে পড়াতে তখন কি রকম উচ্ছ্বাস ছিলো, কী সুন্দর দেখতে ছিলো। কতো প্রাণ ছিলো। হয়তো আমার, আমাদের প্যারেন্টিং এর ই ভুল। খুব বেশি শাসন করতাম ওকে। ওর কাছ থেকে অনেক বেশি কিছু চাইতাম। সেটা নিতে পারেনি।”

মুখটা তেতো লাগছে সামিনের। ভালো লাগছে না এই কথাগুলো শুনতে।
সে তড়িঘড়ি করে কোনরকমে টুকটাক আলাপ সেরে বিদায় নেয়।
সেদিনকার সেই আলাপ মনে পড়ে যায়। আজ হঠাৎ করেই অফিস থেকে ফেরবার পথে।
আর তিক্ততাটা আবার ফিরে আসে। দু’বছর আগের প্রাবল্য নিয়ে।
ট্রেনে বসে লম্বা একটা চুমুক দেয় সদ্য কেনা হুইস্কির বোতলে। কাঁচা মদ, গলা জ্বালিয়ে দেয় তার। জ্বলুক। আরো জ্বলুক।

সে জানে, প্যারেন্টিং এর দোষ নয়।

কুশির দোষ নয়।

সে জানে দোষ কার।

সে দোষের কোন শাস্তি হয়নি, সেটাও সে জানে।

এখনকার সামিন অন্য একটা মানুষ। সেদিনের তালহারানো জ্ঞানহীন পশুটা নয়। আজ সে কোটপ্যান্ট পরা ভদ্র, আধুনিক সভ্য শহুরে হোয়াইট কলার সিক্স ফিগার বেতনের পেশাজীবী।
মানুষের জীবনে এরকম দু’একটা ছোটখাটো মিসহ্যাপ হয়- সে নিজেকে বোঝায়- বোঝায় আর চুমুক দেয়। গলা আরো জ্বলে-
খুব ভেতরে অনেক সূক্ষ্ম তীব্র একটা জ্বলন হয়।
সামিন সেটা টের পায়। টের পেয়ে ঘাবড়ে যায়।
যে অতীতকে সে পেছনে ফেলে এসেছে তা কেন তাকে অক্টোপাসের মতো দুবাহু বাড়িয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে চাইছে?

কেন? কেন?

এর তিনমাস আগে-

আই টুয়েন্টি এসে গ্যাছে, ৭০% স্কলারশিপ কনফার্মড, সামিনা খালার বাসায় প্রথম বছরটা থাকা কনফার্ম, খালাতো বোন তুষ্টি, তুষিতুষি-কুশিকুশি লিখে এন্তার এসেমেস পাঠাচ্ছে। তুষি মহাখুশি।ওই ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে থাকতে থাকতে সে নাকি হাঁপিয়ে উঠেছে। কুশি গ্যালে ট্রেকিং করতে যাবে, দু’জন মিলে ওহাইও শহরে মুভ করে যাবে, গান শিখবে, সাইকেল চালানো শেখাবে, উইকএণ্ডে বয়ফ্রন্ড নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে- হাজারটা প্ল্যান তার!

কুশির খুশি লাগে, ভয়ও লাগে।

পৃথিবীর অনেক কিছু মাত্র বিশ বছর বয়সে হাতের মুঠোয় পেয়ে গ্যালে যেরকম লাগে, অ্যামেরিকান এম্বেসি থেকে ভিসার সিল পাওয়া পাসপোর্ট হাতে পেয়ে তার ঠিক তেমন লাগছিলো! আর মাত্র তিনমাস পরে সে ঠান্ডা বরফ নিয়ে খেলবে! কঙ্কাটা আর তার ড্রেসিংরুম বইখাতা ওলটপালোট করতে আসবে না। মা রাতদুপুরে ঘরে আলো জ্বলতে দেখলে হাঁহাঁ করে ছুটে আসবে না- পুরো একটা ঘর, একটা বারান্দা,একটা জীবন হবে নিজের।

পুরোপুরি নিজের।

ড্রাইভিং ক্লাসের ইন্সট্রাকটরের চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে তার বাবা। সামিনা খালাদের পুরনো একটা ২০০০ মডেলের হোন্ডা একর্ড ওকে দেওয়া হবে বলা হয়েছে। মুখে কিছু না বল্লেও তুষির এন্তার প্ল্যান শুনে চোখমুখে উত্তেজনার ঝিলিক সে লুকোতে পারেনি। তাতেই বাবা উদ্যোগী হয়ে গত ছ’মাস কাজ থেকে ফিরে নিজেদের হোণ্ডা একর্ড দিয়ে রোজ দু’ ঘন্টা প্র্যাক্টিস করাচ্ছে। যতোই বলে ইন্সট্রাক্টর করান তো- বাবা আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে রাইট হ্যান্ড সাইড ড্রাইভিং নিয়ে একগাদা বকরবকর করে মাথা ধরিয়ে দেয়। সে প্রথম প্রথম খানিক উসখুস করলেও একদিন চালানোর ফাঁকে ওর মাথায় হাত রেখে গভীর চোখে চেয়েছিলেন –“আমার ছোট্ট কুশ্‌ সোনা, তুই আর ফিরবিনা- ক’দিন পরে কেমন অন্ধকার আর ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়ি চালাবি, আমার ভয় করে মা...সেজন্য বারবার বলি...আর তো সুযোগ পাবিনা...বারবার বলি এজন্য...”

“আর শোন। আরেকটা কথা, খুব জরুরি কথা। তুই যখন গাড়ি চালাচ্ছিস, তুই আর কিচ্ছু ভাববিনা। আমাকে কথা দে, প্রমিস কর। আমি জানি গত ক’টা বছর তোর ওপর দিয়ে অনেক কিছু গেছে। কিন্তু সবসময় ডিপ্রেসড হয়ে থাকলে একটা গাড়ি পাশ থেকে এসে এক মুহূর্তে ধাম্ করে ধাক্কা লাগিয়ে চলে যাবে...” বাবার উদ্বেগে ভরা চোখ - তার ভেতরে, খুব গভীরে একটা মায়াভাব জাগায়। দেশ থেকে চলে গ্যালে এই মানুষটাকে সে বড্ড মিস্ করবে। আশ্চর্যের বিষয় বাবার সাথে তার কাটানো সময় অনেক কম মা’র তুলনায়। কঙ্কার মতো বাবার সাথে আহ্লাদী করাটাও তার হয়ে ওঠেনা। লজ্জা করে, ছোটবেলা থেকেই করতো।

কিন্তু গত দু’বছরে বাবাই তাকে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে গেছে। তার পড়াশনার খুব কঠিন একটা সময়ে হাল ধরেছে, যত্নে নোট পড়ে পড়ে পরীক্ষার আগের রাতে মুখস্থ করিয়েছে। পরীক্ষার লম্বা দু’টো মাস কাজ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে বসে অঙ্ক করিয়েছে, একাউন্টিং বিজনেস রিপোর্টিং স্ট্যাটিস্টিক্সের এনালিসিস সব কিছু অর্ণবের সাথে একসাথে বসে শিখিয়েছে। সে আবিষ্কার করেছে, বাবা মানুষটা রাগতে জানেনা। অনেক অনেক বোকার মতো ভুল করার পরও বাবা আদর করে আবার বুঝিয়ে দিয়েছে, অর্ণবকেও তাই করতো। একটা অসম্ভব ভালো গুণ। এখনো শিখে ওঠেনি। শিখতে হবে। ডঃ শামীম আন্টির বাকেট লিস্টে আরেকটা জিনিস যোগ হলো শেখার।

কিন্তু এ জিনিসটা ভালো।উনি অনেকগুলো খারাপ জিনিস শিখতে বলেছেন যেটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। ঠিক কীভাবে সেগুলো শিখে ওঠা যায়, তা নিয়ে সে চিন্তিত। কিন্তু সে জানে, বিশ বছর বয়সে একা পৃথিবীর আরেক প্রান্তে থাকতে গেলে এর থেকে শক্ত তাকে হতে হবে।

“স্টকহোম সিন্ড্রোম কি জানো তুমি?” চশমার ফাঁক দিয়ে ক্ষুরধার দৃষ্টিতে গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্নটা ছুঁড়েছিলেন ওর দিকে। প্রথমদিককার সাপ্তাহিক সেশনগুলো এখন মাসিকে এসে ঠেকেছে। বাইরে চলে যাবে বলে গত মাস আর এমাসে দু’বার করে বসেছে। এখানে আসতে তার ভালো লাগে। এই ভদ্রমহিলা তাকে নিজেকে চিনতে শেখান। এই বিশ বছর অব্দি যেটা কেউ করেনি। ওনার প্রশ্নগুলো অন্তর্ভেদী, চক্ষুজাগানিয়া। বাবার তাকে এখানে আনার সেটাই কারণ ছিলো, সেটা সে অনেক পরে বুঝেছে।

বিস্মিত “উম্?” শুনে শামীম খান বুঝতে পারেন- “শোনো কুশানা”, সবসময় ভালো নাম ধরে ডাকেন তিনি। কাজের সময় এই ফর্ম্যালিটুটুকু রাখা জরুরী বিবেচনায়। “নির্যাতিত কেউ যখন অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে নির্যাতকের পক্ষে সাফাই গায়, এর একটা ভালো নাম হ’লো স্টকহোম সিন্ড্রোম।তুমি গত বারোটা...না চোদ্দটা”...ফাইল দেখে হিসেব মিলিয়ে নেন...“সেশনে যা করেছো বা বলেছো...অথবা বলোনি...সেগুলো সমস্ত মেলালে তাই মনে হয়।”

কুশির চোখ সোজা ডাক্তারের দিকে। আশু অপমানের আশঙ্কায় ক্রমশঃ গরম হয়ে ওঠা দুগালের রক্তোচ্ছ্বাসকে কোনোরকম গোপন করার চেষ্টা না করেই সে বলে, থেমে থেমে-“আমি...আপনাকে বলেছি...আমি একটা ভুল করেছি...আমি...খুব বড় একটা ভুল করেছি...আমার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল।এজন্য আমি লজ্জিত। আমি ভীষণভাবে লজ্জিত। আমি যদি পারতাম ওই রাতটাকে, ওই ঘটনাগুলোকে সামলাতে তাহলে আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হতোনা...” সে টের পায় অনেক জোর দিয়ে বলা শুরু করলেও তার গলা রুদ্ধ হয়ে আসছে। ঢোঁক গেলে, গলাটা পরিষ্কার করে নিতে চায়। আরো কিছু বলার জন্য মুখ খোলবার আগেই বাধা পায়-

“কুশানা, প্রথমত “তুমি” কোনো “ভুল” করোনি। তোমার সাথে একটা অন্যায় করা হয়েছে। সামলানোর প্রশ্ন তখনই উঠতো যখন ব্যাপারটা তোমার কন্ট্রোলে থাকতো। তোমার থেকে লোকটা বয়সে দশ বছরের বড়। শরীরে শক্তি অনেক বেশী। ব্যক্তিত্ব প্রবল যার কাছে তুমি মুখ না খুলতেই অর্ধেক কাবু হয়ে যাও। লোকটা একসময় তোমার ডিরেক্ট টিচার ছিলো, সুতরাং পাওয়ার রিলেশনশিপ চিন্তা করলেও লোকটা তোমার থেকে বেশি পাওয়ারফুল স্ট্যাটাসে আছে। তোমাকে ধমকাবার, মারবার, গায়ে টাচ করবার সবরকম নষ্টামি করবার অধিকারকে সে একরকম হালাল বলেই মনে করে নিয়েছিলো।”

কুশির চোখ ফেটে জল আসছে, বুকে ব্যথা করছে, কিন্তু ডঃ শামীম তার দিকে সোজা তাকিয়ে আছেন। যন্ত্রণায় তার মুখ বিকৃত হতে দেখে খানিক থামেন তিনি। তারপর ফের শুরু করেনঃ “কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানো? এরপরেও...তুমি লোকটা সম্পর্কে কোনোরকম খারাপ কথা শুনতে পারোনা। তুমি বারবার ওই দিনটাতে, এর আগে, প্রথম পড়তে যাবার সময় “তোমার” কী কী দোষ ছিলো সেগুলো খুব বিস্তারিত বলো। খুব খুঁটিয়ে শুনলে বোঝা যায়, ওই লোকটার ভেতরে এমন কিছু আছে যা তোমাকে সম্মোহিত করে রেখেছে।”

“ন্...ন্...না...আপনি ভুল করছেন...”বসে যাওয়া গলায় বিকৃত মুখে প্রতিবাদ করে সে। কিন্তু কন্ঠ দুর্বল।

“শোনো, সামিন দেখতে সুন্দর, জীবনে তুমি এতো সুন্দর মানে তোমার ভাষায় হ্যাণ্ডসাম কাউকে দেখোনি, এটা তুমি একদিন নিজেই আমার কাছে স্বীকার করেছো। সেটাকে সত্যি বলে ধরে নিলে, তোমার অ্যাডোলেসেন্ট এইজে ইনফ্যচুয়েশন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু শারীরিক আকর্ষণ এক জিনিস আর ডিলিউশন-যেটা তোমার হচ্ছে- সেটা আরেক জিনিস।

“আপনি বারবার শারীরিক... আকর্ষণ... কেন...” কুশি অপমানে নীল হয়ে গেছে, কথা বেরুতে কষ্ট হয় তার।

“শারীরিক আকর্ষণ ছিলোনা তোমার? মিথ্যে কথা বলছো কেন? কিন্তু সমস্যাটা তো সেটা থাকা নিয়ে নয় কুশানা। সমস্যা হলো সেটাকে সাপ্রেস করতে তুমি এত চেষ্টা করছো গত ক’টা বছর ধরে যে ওই লোকটার অপরাধটাও তোমার কাছে গৌন হয়ে যাচ্ছে। সেক্সুয়াল অ্যাট্রাকশান কোনো পাপ নয়। তুমি শারীরিকভাবে লো্কটার প্রতি আকর্ষিত হয়ে কোনো অপরাধ করোনি। কিন্তু লোকটা করেছে। লোকটা তোমাকে জোর করেছে, তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমার শরীরকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত করেছে। তোমাকে তোমার জীবনের প্রথম শারীরিক অভিজ্ঞতা পেতে হয়েছে ধর্ষণের ভেতর দিয়ে। শুধুমাত্র তার শরীর পছন্দ করার কারণে এত বড় শাস্তি তোমার পাওনা ছিলো না। তুমি এটা বুঝতে পারছো না। তুমি আছো সেলফ ডিনায়াল স্টেইজে। বারবার তুমি নিজের শরীরকে দায়ী করছো, নিজের কাজকে দায়ী করছো। আরো খারাপ ব্যাপার হচ্ছে তুমি সামিনকে ডিফেন্ড করছো! যেটা সে একেবারেই ডিজার্ভ করেনা।”

কুশির কান দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে। সে দু’কান চেপে ধরে। মুখ নিচু করে কাঁদতে শুরু করে করে। গুমরে গুমরে।

কিছুক্ষণ তাকে কাঁদতে দেন ডঃ শামীম। তারপর নরম কন্ঠে বলেনঃ কুশি, আমাকে একটা সত্যি কথা বলবে?”

কুশি জলেভাসা চোখ নিয়ে মাথা উঁচু করে-“তোমাকে যেদিন ও প্রথম চুমু খায় তোমার ভালো লেগেছিলো?”

মাথা নিচু করে সে। আড়ষ্টভাবে মাথা ঝাঁকায়।

তাহলে যদি বলি, তুমি ওকে ভালোবাসো, তাহলে কি খুব ভুল বলা হবে?” আরো নরম, বন্ধুত্বপূর্ণ স্বর এবার।

কুশি দু’দিকে মাথা নাড়ে।

“তুমি আজও ভালোবাসো ওকে?”

শোনা যায়না এমন অস্ফুট স্বরে সে বলতে চায় “হুঁ” কিন্তু শব্দ বেরোয়না গলা দিয়ে। ওপরে নিচে আস্তে মাথা নাড়ে শুধু।

“তাহলে তুমি মনে করো সে যেটা করেছে সেটা ঠিক? আবার কোনোদিন যদি তার সামনে গিয়ে দাঁড়াও তাহলে তার এরকম অন্যায় মেনে নিতে পারবে?”

কুশি রুমালে চোখ মোছে। ভাঙা গলা, ধীর কিন্তু খুব স্পষ্ট তার উচ্চারণ –“আমি.........বিশ্বাস করি ও ভুল করেছিলো...... ভাবি না, বিশ্বাস করি... আমি যদি কখনও ওর সামনে আবার দাঁড়াই তাহলে এই বিশ্বাসটা আমি যাচাই করে নিতে চাই। আমি জানি, আমিও ভুল করেছিলাম। আমি কখনও নিজের মনের কথা খোলাখুলি ওকে জানাইনি। তাহলে হয়তো ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে এরকম দাঁড়াতো না। আমি এটাও বিশ্বাস করি যে আমি ছাড়া ওর জীবনে আর কেউ নেই, ছিলোনা। ও আমার জন্যেই এটা করে ফেলেছে। অন্য কেউ আমার জায়গায় থাকলে হয়তো এটা হতোনা।”

“দ্যা ডাজ নট মেইক হিজ ক্রাইম এনি লেস, কুশানা!” স্পষ্টতঃই বিরক্তি ডঃ শামীম খানের গলায়। “তুমি তার জীবনে একমাত্র কি দশমাত্র তা দিয়ে একটা রেইপ হালাল হয়ে যায়না। রেইপ ইজ আ রেইপ। আন্ডার এনি সারকামস্ট্যান্স। এটা তুমি এতো ইণ্টেলিজেন্ট মেয়ে হয়েও বুঝতে পারছোনা কেন? তুমি একটা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছো কেন?”

“ডঃ, আমি আর কথা বলবো না এটা নিয়ে,” কুশি ঝটিতি উঠে দাঁড়িয়েছে, চোখেমুখে শঙ্কা, অপরাধবোধ। “আমাকে মাপ করবেন, আমি আসি”- একরকম ছুটে বেরিয়ে যায় চেম্বার থেকে।

ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফ্যালেন ডঃ শামীম। তারপর ওর ফাইল খুলে লিখতে শুরু করেন, ডিলিউশন, সাপ্রেশন, সেক্সুয়াল কনফিউশন, স্টকহোম ...........

(চলবে)

শেষাংশ এখানে

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিঃসঙ্গতা's picture

নিজের সম্পর্কে

নিজের সম্পর্কে বলবার মতো উল্লেখযোগ্য যা কিছু তা লেখাতেই বলি? পরে মনে হলে যোগ করে দেবো।