অন্য রকম জয় - ২৯শে জুলাই ১৯১১
ভারত উপমহাদেশ ইংরেজদের শাসনাধীন (শোষনাধীন) ছিল ১৯০ বছর (১৮৫৮ - ১৯৪৭)।
ঐ সময়কালে দক্ষিণ এশিয়ার ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলকে বৃটিশ ভারত বা ব্রিটিশ রাজ বলা হত। ১৮৭৬ সালে সমগ্র অঞ্চলটিকে সামগ্রিকভাবে ভারতীয় সাম্রাজ্য ঘোষণা করা হয়। ১৮৫৮ সালে এই অঞ্চলের শাসনভার রাণী ভিক্টীরিয়া নিজ হাতে শাসনভার তুলে নেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী হতে ব্রিটিশ রাজ শক্তির নিয়ন্ত্রনে।

ছবিঃ ব্রিটিশ রাজ এর তৎকালীন পতাকা
ব্রিটিশদের সময়কার এই অঞ্চলের ইতিহাস কম বেশি আমরা অনেকেই জানি। সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অগ্রভূমিকা পালনকারী মাস্টারদা সুর্যসেন, তিতুমীর, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ সহ অনেক বাঙ্গালীর নাম জানি আমরা অনেকেই। তাদের সম্পর্কে কম বেশি পড়েছি আমরা ইতিহাসের বইতে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় উল্লেখযোগ্যভাবে নাম আসেনি, কোন ভাবে সবার নজর এড়িয়ে গেছে এমনও আছে অনেক বাঙ্গালী। আজ আমরা তেমন একজন নয়, দুই জন নয়, তিন জন নয়, জানবো এগারো জন বাঙ্গালীর কথা। যারা গোলা বারুদ নিয়ে যুদ্ধ করেননি, প্রাণ দেননি ব্রিটিশদের বন্ধুকের গুলি কিংবা ফাঁসীর দড়িতে ঝুলে। তারা অন্যরকম এক যুদ্ধ করে বাঙ্গালী জাতীর মাথা অনেক উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন ১৯১১ সালের ২৯শে জুলাই।
আমরা অনেকেই হয়তো জানি সেই এগারো জনের সামষ্টিক নাম, সেই এগার জন মোহন বাগান এথলেটিক ক্লাব।

ছবিঃ মোহন বাগানের প্রথম লোগো
কলকাতার এই ক্লাবের জন্ম ১৮৮৯ সালে। এই ক্লাবই প্রথম প্রকাশ্যে ফিরীঙ্গীদের লাথি মেরেছিল সবার সামনে। কারো কিছুই বলার ছিলনা।
বাংলার ফুটবলের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা আছে ১৯১১ এর সেই দিনটির কথা। কারণ সে বছরই প্রথম কোন বাঙ্গালী দল আইএফএ( IFA – Indian Football Association) এর ফাইনাল খেলে এবং শিরোপা জিতে।

ছবিঃ ১৯১১ সালে আইএফএ শীল্ড
সেন্ট জেবিয়ার কে প্রথম রাউন্ডে ৩-০ গোলে হারিয়ে, দ্বিতীয় রাউন্ডে একই ফলাফলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রেইঞ্জারসকে হারিয়ে, রাইফেল ব্রিগেডকে ১-০ গোলে হারিয়ে পৌছে যায় শিবদাসের দল সেমিফাইনালে।
প্রথম সেমিফাইনাল ড্র হলেও পরের খেলায় ৩-০ গোলে মিডেসেক্স রেজিমেন্টকে হারিয়ে মোহন বাগান যখন ফাইনাল খেলাটা নিশ্চিত করে ফেলে তখন শ্বেতাঙ্গরা তাদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছিল কানু, বিজয়দাস আর হীরালালদের দলকে শিরোপা জয় থেকে বঞ্চিত করতে। এমনকি আই এফ এ-র প্রধানকেও সরকারীভাবে চাপ দেয়া হয় যেন যেকোন মূল্যে শোষিতশ্রেণীকে শিরোপা জয় থেকে বিরত রাখা যায়। কিন্তু সকল ষড়যন্ত্রকে হার মানিয়ে চলে আসে সেই দিনটি। ম্যানচেষ্টার গার্ডিয়ানের সংবাদ অনুযায়ী, ৮০,০০০ (আশি হাজার) দর্শক উপস্থিত হয়েছিল সেদিন বাঙ্গালীদের এই বিজয় দেখতে।
সেদিন ফাইনালে খেলেছিল যেই এগারো বীর বাঙ্গালী তারা হলেনঃ
১) হীরালাল মুখ্যার্জী (গোল রক্ষক)
২) ভুটি সুকুল (রক্ষনভাগ)
৩) সুধীর চ্যাটার্জী (রক্ষনভাগ)
৪) মনমোহন মুখ্যার্জী (রক্ষনভাগ)
৫) রাজেন সেনগুপ্ত (রক্ষনভাগ)
৬) নীলমাদেব ভট্টাচার্য (মধ্যভাগ)
৭) কানু রয় (আক্রমনভাগ)
৮) হাবুল সরকার (আক্রমনভাগ)
৯) অভিলাস ঘোষ (আক্রমনভাগ)
১০) বিজয়দাস ভাদূরী (আক্রমনভাগ)
এবং
১১) শিবদাস ভাদূরী (আক্রমনভাগ এবং অধিনায়ক)

ছবিঃ ১৯১১ সালে শিরোপা জয়ী সেই মোহন বাগান
সেদিনে খেলার নির্ধারিত সময় ছিল ৫০ মিনিট এবং খেলার মধ্যবর্তীতে ৫ মিনিটের বিরতি। খেলার রেফারী ছিলেন এইচ জি পুলার এবং প্রতিপক্ষ দল ইস্ট ইয়োর্কশায়ার রেজিমেন্টের অধিনায়ক সার্জেন্ট জ্যাকসন সহ টস করলে হেরে যান মোহন বাগান দলের অধিনায়ক শিবদাস। টানটান উত্তেজনা, আক্রমণ এবং পালটা আক্রমনের মধ্য দুই দলের অনেক চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও গোলশুন্য থাকে খেলার প্রথমার্ধ্ব।
খেলার দ্বিতীয়ার্ধ্বের পনের মিনিটের মাথায় ইস্ট ইয়োর্কশায়ার রেজিমেন্টের অধিনায়ক সার্জেন্ট জ্যাকসনের চেষ্টায় বাঙ্গালীরা পিছিয়ে পরে ১-০ গোলে। কিন্তু, তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই শিবদাস আবারো খেলায় সমতা এনে সেই ৮০ হাজার দর্শক যার সিংহভাগই ছিল বাঙ্গালী, তাদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনে। এভাবেই যখন ১-১ গোলে খেলা চলছিল, সকলের মনে একটাই প্রশ্ন পারবে কি বাঙ্গালী ছেলেরা এই শ্বেতাঙ্গদের আজ হারিয়ে ইতিহাস গড়তে। একেতো শারিরীকভাবে দূর্বল জাতী তার উপর ছিল ফিরিঙ্গীদের মারমুখী আক্রমন। তারপরও হার মানেনি বুট পরিহিত ব্রিটিশ দলের সাথে খালি পায়ে খেলতে নামা সেই এগার বীর সন্তান। নির্ধারিত সময় শেষ হবার ঠিক দুই মিনিট আগে শিবদাসের চমৎকার একটি পাস থেকে অভিলাস ঘোষের গোলে সেদিন ইতিহাস গড়েছিল বাঙ্গালী সেই এগার সূর্য সন্তান। ফলাফলঃ ২-১।
প্রথমবার আইএফএ এর শিরোপা জিতে নিলো, কোন প্রকৃত বাঙ্গালী ফুটবল দল।
বিশ্বজুড়ে নামীদামী সংবাদপত্র সমূহে ভূয়সী প্রশংসা করা হয় মোহন বাগানের সাহস এবং ক্রীড়া নৈপূন্যতার। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে এই এগারো জনের নাম সেভাবে উল্লেখ না থাকলেও এটা স্বীকার করতেই হবে, সেদিনকার সেই স্নায়ুযুদ্ধে ব্রিটিশরা হেরে গিয়েছিল, আর তাদের সেই হার হয়েছিলো সকলের সামনে, ৮০,০০০ দর্শক সেদিন দেখেছিল ফিরিঙ্গীদের পরাজয়। কিছুই বলার উপায় ছিলোনা তাদের, লুকিয়ে ঘরে ফিরে যাওয়া ছাড়া।
এভাবেই বাঙ্গালীরা ইতিহাস গড়েছে। কোন ক্ষমতার লোভে নয়, নিজ জন্মগত অধিকার স্বাধীনতা আদায়ে যুগ যুগ ধরে এই উপমহাদেশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এই বাঙ্গালীরা।
পাদটীকাঃ এক শ্রেণীর মানুষ বলে থাকে বাঙ্গালীরা নিচু জাত, বাংলা ভাষা নিচু জাতীর ভাষা। সেই সকল তথাকথিত উঁচু শ্রেণীর মানুষদের বিপক্ষে বাঙ্গালী জাতীর সংগ্রাম চির অমর।
এই মোহন বাগানের আইএফএ এর প্রথম শিরোপা জয় নিয়ে একটি সিনেমা হয়েছে, লিঙ্ক
দিলাম, দেখে নিতে পারেন যাদের উৎসাহ হয়।
তথ্যসূত্রঃ মোহন বাগান ক্লাবের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট এবং উইকিপিডিয়া





লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো...
কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ
বাঙ্গালীর যা কিছু অর্জন, যা কিছু ভাল তার পুরোটাই বোধহয় অতীত...
~
নাহ, আরো অনেক জয় আছে, এই মূহুর্তে মনে পড়লো, শান্তিতে নোবেল জয়, খান একাডেমী, প্যারিসের দাবারু ফাহিম আরো অনেক অনেক জয় আমাদের হচ্ছে, হবে।
খুব ভালো লাগল। অন্যরকম কিছু পড়লাম। মন ভাল হয়ে গেলো
সিনেমাটা দেখেই লিখতে মন চাইলো, ধন্যবাদ, ঝারি মাস্টার
জানা ছিলো না এই খবরটা ।
ভালো লাগলো পড়ে, ছবি গুলো দেখে ।
আমারো অনেক ভাল লেগেছিল জানার পরে, অনেকদিন আগে অমি রহমান পিয়াল ভাই লিখেছিলেন এই বিষয়টা নিয়ে, আমার মনে ছিলোনা, এটা লিখার পড়ে তিনি আবার মনে করিয়ে দিলেন তার লিখাটার কথা।
খবরটা জানতাম, কিন্তু এতো ডিটেইলস জানা ছিলো না। ভালো লাগ্লো জেনে...
ধন্যবাদ, কষ্ট করে পড়ার জন্য
ওয়াও আমির খানে লগন সিনেমার মতো কাহিনী পুরা। ওয়েল লেখার জন্য মিশু ভাইরে মাইকে ধন্যবাদ। ইতিহাসের ক্লাসে আজীবন ফাঁকি দিসি বলে এখন আফসোস লাগতেসে।
আর একটা কথা, আগেকার দিনে সব লোকই কি গোঁফ রাখতো নাকি??
এইটা নিয়েও সিনেমা হয়েছে, আমি লিংক দিয়েছি নিচে। দেখতে পারেন।
জানা ছিল না, আজকে জানলাম।
জেনেছেন, এইবার ট্যাক্স দেন।
হিন্দু বাঙালিদের কাপ জয়।
হিন্দু মুসলমান ভাবিনি, বাঙ্গালী জাতি হিসেবে ভেবেছি।
যেই সময়ের কথা বলেছেন সেই সময়ে ওরা আলাদাই ছিল। আপনি ভেবেছেন কিন্তু বাঙালি হিন্দু বাঙালি মুসলমানদের বাঙালি হিসাবে গন্য করতনা।
এই ক্লাবে কোনো মুসলমান খেলোয়াড় সম্ভবতঃ সুযোগ পেতনা। সেজন্য মুসলমানদের জন্য আলাদা ক্লাব মোহামেডান স্পোর্টিং গঠান করতে হয়।
এই কথাটার কোন রেফারেন্স কি আছে? ব্যাপারটা মানতে পারছিনা, কারণ, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব কলকাতা -এর জন্ম ১৮৯১ সালে হলেও এর মূল টিম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৮৭ সালে, যা মোহন বাগান প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে।
মোহন বাগানের ইতিহাসে প্রথম মুসলমান খেলোয়ার ১৯২১ সালে খেলেছেন ফজলুল রহমান, অন্যদিকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এর প্রথম স্কোয়াডেই রয়েছে হিন্দু খেলোয়াড়। তাদের ইতিহাস বলছে, যারা ইসলামে বিশ্বাস করে তাদের জন্যই জন্ম হয়েছে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। এর মানেতো দাঁড়ায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তথা মুসলমানরাই শুরু করে ধর্ম ভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান।
সূত্রঃ http://en.wikipedia.org/wiki/Mohammedan_Sporting_Club_(Kolkata)
এবং http://www.sabujmaroonswapno.com/smsweb/common4.php?x=squad
তিনটা ক্লাবের তিন ধরণের ব্যাকগ্রাউন্ডঃ
মোহন বাগান - কোলকাতার বাবুদের ক্লাব, যারা পূর্ব বাংলার বাঙ্গাল কিংবা সর্বভারতীয় মুসলমান এই দুটোই অগ্রাহ্য করতো, যদিও তাদের গঠনতন্ত্রে সেটা লেখা নেই।
ইস্টবেঙ্গল - অবহেলিত পূর্ব বাংলার বাঙ্গাল দের ক্লাব।
মোহামেডান - সর্বভারতীয় মুসলমানদের ক্লাব।
একটু ভেবে দেখলে দেখা যায়, একটা শহর ভিত্তিক তিনটা বিশাল ক্লাব যা ভারতের আর কোন শহরের ক্ষেত্রে হয়নি। তার মানে দাঁড়ায়, আমাদের বিভেদের ইঙ্গিত বেশ আগেই ফুটবলের মাঠে ফুটে উঠে।
~
সিনেমাটা উইকেন্ডে দেখবো।
হ, রক্ত গরম হয়ে যায় শেষের দিকে।
দারুণ লাগলো পড়তে
অন্যরকম একটা লেখা পড়লাম। ভালো লাগলো।
দারুন লাগলো।
ভাল লাগল পড়ে। এরকম আরও লিখুন। ভাল থাকুন।
মন্তব্য করুন