আমার আকাশ দেখা(প্রথম পর্ব)
অনেক দিন বাদ আকাশের দিকে তাকালাম তাও আবার দক্ষিণ বারান্দায় দাড়িয়ে। সমান্তরাল নয় ১৫ ডিগ্রী থেকে ৯০ ডিগ্রী কোণে তাকালে আকাশটা দেখা যায়। না না ভূল হল ৯০ডিগ্রী পর্যন্ত তাকানো যাবে না,ছাদের ড্রপে বাঁধা আসবে। তাই সংশোধনটা করে নিলাম। নয়তো দুরবীন নিয়ে বসে থাকা মাস্টর ইকবাল নয়ত কানাডিয়ান পিঞ্জ লতিফুল কবির আবার ধরে বসবে। শালা চাপা মার। কি আর করব লতিফুল কবির, আমার বোনটা যে তোমাকে দিয়ে রেখেছি।
যাক সবার আগে আধা কিলো দূরে একটি ভবনে নজর পড়ল। হাই পাওয়ারের তিনটি হেলোজেন লাইট জ্বলছে। বুঝতে বাকি রইল না। দিনে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হলেও সারা রাত না হলেও মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে এর ফিনিসিং এর কাজ। কাজ গুলো করছে কিন্তু রাজমিস্ত্রিরা আর নামকা ওয়াস্তে কনট্রাকটরের কোন চেলা আছে মিস্ত্রিদের খুশি করার জন্য মুড়ি, চায়ের নাস্তা এবং রাতে এক পেটা খাবার দেবার জন্য। তাতেই রাতদিন পরিশ্রম করা শ্রমিক গুলো খুশি। আর পরদিন সাইট ইঞ্জিনিয়ার, প্রজেক্ট ম্যানেজার, বা জেনারেল ম্যানেজাররা পাবে মালিক পক্ষ থেকে বাহবা। অয়েল ডান। অনেক সুন্দর কাজ হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে সাইট ইঞ্জিনিয়ারাও হয়ত থাকে। এটাই চলে আসছে দিনের পর দিন। এ ক্ষেত্রে সবার অবস্থার উন্নতি হলেও হাতে কাজ করা শ্রমিকরা যেমন অন্ধকারে আছে তেমনি তিমিরেই থেকে যায়। তার উপর বিপদ আপদ দুর্ঘটনা তো আছেই।
এই নির্মাণ শিল্প এমন একটা শিল্প যাতে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অন্যান্য যে কোন শিল্প থেকেই বেশি। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, আমেরিকার মত সর্বোচ্চ উন্নত দেশেও তাই, যদিও সংখ্যায় তাদের পরিমানটা অনেক কম। কারন নিরাপত্তাই প্রথম এই স্লোগানকে সামনে রেখে তারা যেভাবে নির্মান কাজ করে আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ততটা এখনও মানতে পারি না।
যাক এই বিষয়ে অন্য কোনদিন কোন জায়গায় লিখব। আজ আমি আকাশ দেখতে বসেছি আকাশ দেখব। বউটা গেছে মার্কেটে, গ্রামে কাকে কোন কাপড় দিবে সেই সব কেনা কাটার শেষ করতে পারে নাই তাই ঘেন ঘেন করতে করতে গেল। কারণটা আমি সাথে যাই নাই। যাক এখন আমার আকাশ দেখতে কোন বাঁধা নাই। এবার অক্ষি দুটোকে প্রায় আগের থেকে ৪০ ডিগ্রী কোণে ঘুড়াতেই যে তিনতলা দালানটা নজরে পড়ল। তা আমাকে সপ্তাহ দুই পিছনে নিয়ে গেল।
আগে একটু ছাদের বর্ণনাটা দেই। সিঁড়ি ঘড়টা ভবিষ্যতে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত দালান করার মানষে নির্মান শেষ করেছেন। তার উপর পানির জলাধার যথারিতি বর্তমান। কলাম গুলো আড়াই ফুট ঢালাই করে দেখে দেয়া হয়েছে ভবিষ্যতে উপর দিকে উঠানোর জন্য। সুন্দর ও পরিপাটি করে প্যারাপেট করা হয়েছে। পেয়ারা সহ কয়েক জাতের ফলের টব ছাদে থাকায় সবুজায়নের রেখাপাত আখি দুটিকে ভবন মালিকের রুচি বোধের প্রশংসায় উৎসুক্য করে তুলেছে। সাদার উপর রং নাই তাই রংটাও বেশ মানিয়েছে। আমার দিককার বারান্দা এক্সপোষ্ট হওয়ায় আরও সুন্দর লাগছিল। এর চেয়ে অনেক অনেক সুন্দর ইমারত ঢাকা শহরে অনেক আছে। কিন্তু, কিন্তু কি?
পড়ন্ত বিকেল বেলা। সাত আট বছরের একটি মেয়ে তার চেয়ে এক দু বছরের ছোট একটি মেয়েকে নিয়ে ছাদে আগে থেকেই নৃত্যকলায় মনঃনিবেশিত ছিল। পাশে একজন বয়স্ক মহিলা গাছের টবে অংগুলি চালনায় কৃষি কর্মে ব্রত ছিল বলা যাবে না বরং নৃত্য কলারত মেয়ে দুটিকে পাহারা দেবার কারনে নিয়োজিত ছিল বলেই আমার মন হল। আমার আগমন হেতু তাদের নৃত্য কলায় ব্যাঘাত হউক তা আমার মন চাইল না। বরং আমার তাদের নৃত্য কলা দেখার জন্য মন ব্যকুল হয়ে উঠল। নিজেকে বারন্দার পিলার ও নেড়ে দেয়া কাপড়ে আড়াল করে দেখতে লাগলাম। বড় মেয়েটি ছোটটিকে নাচের কিছু কৌশল বলে দিচ্ছে, পরে সে যা যা করছে মেয়েটিও তাই করছে।
একটি বৃক্ষ রোপণ করা থেকে তাতে ফুল ও ফল পেতে যেমন অনেক দিন দরকার এই কচি শিশু দুটি মনের পরম তৃপ্তিতে যে নৃত্যকলা প্রদর্শন করে যাচ্ছিল তা একদিনে নয় বরং তার জন্য তাকে অনেক দিন অনেক মাস অনেক বছর সাধনা করতে হয়েছে। বড় মেয়েটি অবশ্যই বাড়ীর বাসিন্দার মেয়ে আর তার সহচরীটি হয়ত তাদের বাসার কাজের জন্য রাখা অথবা গরীব কোন আত্নীয়ের কন্যাকে কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়েছে। তবে শিক্ষক ছাত্রীটিকে শিখিয়ে যে আনন্দ পাচ্ছে, ছাত্রীটি মনে হছিল তার চেয়ে অনেক অনেক গুন আনন্দ পাচ্ছিল। বিনা মিউজিকে তারা যে নৃত্য প্রদর্শন করছিল তা আমার নৃত্যকলায় কোন অভিজ্ঞতা না থাকলেও মনে হচ্ছিল,
মম চিত্তে নিতি নৃত্যে, কে যে নাচে
তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ
তারি সঙ্গে কী মৃদঙ্গে সদা বাজে
তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ
গানটির সুর ও ছন্দে তারা নাচছিল। এই গানটির অন্তরায় নাচা কত কঠিন তা যারা এ বিদ্যায় পারদর্শী তারাই শুধু জানেন।
ওই বয়সের কচি দুটি শিশুর ক্লান্তিহীন নাচ আর পড়ন্ত বিকেলের মৃদু শীতল হাওয়া আমার শরীর ও মনকে যে নির্মল আনন্দ দিল তা কোন অর্থ বা প্রশংসার মাপ কাঠিতে মাপা যায় না। শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।
ছোট্ট মেয়েটির আনন্দ দেখে আমার মনে হচ্ছিল সে যে কত সুখী। অথচ তার মত অনেক শিশু, অনেক পথ কলি বা পথ শিশু বাসা বাড়িতে কত না নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আমার মায়কানন গল্পে তারই একটি উদাহরণ তুলে ধরেছিলাম।
আমরা কি পারি না, এই শিশুটির মত একটু আদর স্নেহ, ভালবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে ওই রকম পথ শিশুদের একটু হাসি উপহার দিতে। (চলব)
০৩/০৫/২০১৩ খ্রীঃ
উত্তরা, ঢাকা।





তব চিত্ত আনন্দে উদভাসুক এ মম প্রার্থনা।
চলুক সবগুলি পর্ব একাধারে।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই গুনটি ছিল। লেখা ভাল চলেছে চলুক।
আপনার নামটা ব্যতিক্রমী, প্রোফাইলটা শূধু ব্যতিক্রমই নয় , অনন্য অসাধারন সুন্দর। আপনার মন্তব্য গুলোও তাদের সমার্থক।
আমি একটু যোগ করি
সকল চিত্ত অন ন্দে ভাসুক এ হোক সকলের প্রার্থনা ভাল থাকবেন।
ওই বয়সের কচি দুটি শিশুর ক্লান্তিহীন নাচ আর পড়ন্ত বিকেলের মৃদু শীতল হাওয়া আমার শরীর ও মনকে যে নির্মল আনন্দ দিল তা কোন অর্থ বা প্রশংসার মাপ কাঠিতে মাপা যায় না। শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়।
ঠিক তাই
মন্তব্য করুন