অনিমেষ রহমানের রাজনৈতিক গল্পঃ ০৭- সন্ধি
দৌঁড়াচ্ছে মধু হাজী…………! কালভার্টের কাছে এসে পিছনে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই-হঠাত সচেতন হয়ে উঠলো; কেউ দেখে নাইতো! সামনে পাটোয়ারী বাড়ী-ওহাব পাটোয়ারী একসময় ইয়ারদোস্ত থাকলেও এখন সে হয়ে গেছে দুশমন। তার লোভ আছে পৌরসভা বিল্ডিংয়ের উপর। আগে ছিলো কমিশনার আর তলে তলে বাকশালী। এখন কিছুটা চুপ-চাপ থাকে। ব্যবসা-বানিজ্যে মন দিয়েছে। পাটোয়ারী বাড়ীর কালভার্টের কাছে আসতেই দেখা হলো পাটোয়ারী বাড়ির ছোটো ছেলে-মধু হাজী ঠিক তার নাম জানেনা। উদ্ভ্রান্ত মধু হাজীকে দেখে গোল চশমা পরা ছেলেটা ভয়ে ভয়ে তাকালো।হালকা-পাতলা সুন্দর একটা ছেলে।
-তোমার নাম কি বাবা?
-লেনিন। ছেলেটা ভয়ে ভয়ে বললো।
-ভালো নাম? তুমি ওহাব পাটোয়ারীর ছেলে না?
-জ্বী আমার ভালো নাম হাসান ওহাব ডাক নাম লেনিন।
হাতের কনুইয়ে তখনো কাদামাটি লেগে ছিলো। মাথায় পেঁচানো হাজী গামছা উত্তেজনায় হাতে দলা করে রেখেছে মধু হাজী খেয়াল করে নাই। লুঙ্গিতেও কাদামাটির দাগ। হাজী গামছা দিয়ে কাদামাটি দিয়ে মুছতে মুছতে জিজ্ঞাস করলোঃ
-তুমি কোথায় পড়ো?
-চিটাগাং চাচা।
-ভালো-তুমি কিংবা তোমাদের ভাইদেরকে তো দেশ গ্রামে তেমন দেখিনা।
-আমরা দুই ভাই চাচা-বড় ভাই চিটাগাং ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ে।
-মাশাল্লাহ!
বলে হাঁটতে থাকলো মধু হাজী বাড়ির দিকে। মধু হাজীর পোলামাইয়া বেশুমার। আগে এক সময় গর্ববোধ করতো। মনে করার চেষ্টা করে তিন সংসার মিলিয়ে পোলাপাইন হবে মনে হয় এগারো জন। তার মাঝে মাত্র দুইজন মেট্রিক পাশ করছে। দুইটাই মেয়ে। তাও বিয়ে হয়ে গেছে। মধু হাজী মেয়েদের স্কুলে দিতে চায় নাই।মেয়েরা স্কুলে যাইয়া করবো কি? অন্যের হাড়ি ঠেলবো। শেষ সংসারের দুইটা পোলা এই দুইটারে নিয়ে আরো সমস্যা! একদিন গদিঘরে এক দূর মোকাম থেকে আসা এক পাইকার জিগাইলোঃ
-ছেলের ঘরের না মেয়ের ঘরের?
-বুঝলামনা। মধু হাজী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়।
-না এই দুইজন আপনার ছেলের না মেয়ের ঘরের নাতি?
সরকার ফিক কইরা হাইসা ফেলে। মধু হাজী উত্তর দেয়না। রাগান্বিত হয়ে চিল্লানি দেয়।‘এই কালু মাপ ঠিক মতো হইতাছে কিনা দেখ’।কিড়বিড় কইরা তাকায় সরকারের দিকে!
বাড়ীতে ফেরার আগে পাকা ঘাটলাতে গিয়ে ওজু করবে ভেবেও চিন্তিত হয়ে পুকুরে নেমে পড়ে। পুকুরের পাড়ে কামিন ছ্যামড়া গরুর জন্য বিছালি কাটতেছিলো। মধু হাজী হাঁক দিলোঃ ওই হারামজাদা বাড়ি থেইক্কা আমার লুঙ্গি গামছা নিয়া আয় ।গোসল সেরে উঠানে টানানো দড়িতে লুঙ্গি শুকিয়ে দিয়ে ঢুকে যায় ছোটো বউয়ের ঘরে। আজকাল সেখানেই থাকে মধু হাজী বেশীরভাগ সময়। তৃতীয়পক্ষের এই সংসারে ছোট দুই পোলা বুকে ঊঠে লাফালাফি করে। দাড়ি ধইরা টান দেয় আর খিল খিল কইরা হাসে।
মধু হাজী প্রতি মুহুর্তে চিন্তায় থাকে তার রাজনৈতিক উত্থান নিয়ে। তার মাথায় থাকে একাত্তরে তার কিংবা তাদের মতো মানুষদের পরাজয় নিয়ে। এখোনো মানুষ তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে রাজাকার বলে আর মধু হাজী অন্যমনষ্কের মতো হেঁটে যায়। গদিঘরে যাওয়ার পথে দেখে করিমুল্লাহ বলি বসে আছে গদিঘরে। পত্রিকায় মনোযোগ। সারাদিন পত্রিকা পড়ে আর ব্যবসা বানিজ্য ভালো করে। মধু হাজী টাকা কামাইছে শর্ট-কাট রাস্তায়। একাত্তরে মধু হাজীর যুদ্ধ শুধু ধর্ম বাঁচানো না; নিজের দোলবানে টাকা ঢুকানো ছিলো আরো বড় উদ্দেশ্য। মধু হাজী টাকা পয়সা দেখলে নিজেরে আর নিয়ন্ত্রন করতে পারেনা কিংবা যেমন পারেনা কোনো যৌবনবতী মেয়ে দেখলে। এই বয়সেও শির শির করে কোমরের নীচে। গদিঘরে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লো মধু হাজী। এবার তার সাথে আছে দুই বাবুইল্লা-লইট্টা আর ক্যাঁচকি বাবুল।বড় মসজিদের পাশ দিয়ে কালি বাড়ীর সামনে দিয়ে এগিয়ে যায় মধু হাজী। লোকমান উকিলের সাথে দেখা হয়না অনেকদিন। বেলা প্রায় মাঝামাঝি। এখন লোকমান উকিল কোর্টের বারান্দায় থাকতে পারে। এবার মনে মনে স্থির করে দীঘিরপারের কোর্ট-কাছারীতে যাওয়াই ভালো। লোকমান উকিলের লগে দেখা হবে আর নিজের কিছু মামলা-মোকদ্দমার খবর নেওন যাইবো।
-কি খবর হাজী সাহেব কেমন আছেন? লোকমান হাজী দূর থেকে হাঁক দিলো।
-জ্বী উকিল সাহেব ভালো আছি! আপনি কেমন?
-এই তো হাজী সাহেব আছি ভালোই। মিটিং ডাকবো কয়েকদিন পরে; গণভোটের অনেক খাটা খাটুনি গেলো-এবার সাঙ্গগঠনিক শক্তি বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করতে হবে।
-হা উকিল সাহেব আমি আছি আপনার সাথে!
-আরে আপনি তো আমাদের থানা কনভেনর; আপনি থানা কমিটির আন্ডারে গ্রাম-ইউনিয়ন আর পৌর কমিটিগুলো করে ফেলেন।
-পৌর ইলেকশনের কোনো খবর আছে উকিল সাব?
-না; তয় আগে এম পি ইলেকশন হইতে পারে।মন্ত্রী সাব কইছে প্রেসিডেন্ট সাহেব গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইতাছেন।
মধু হাজী মাথা নাড়ে-গণতন্ত্র খুব জরুরী। আর এই গনতন্ত্র খুবই যুতসই মনে হইতাছে। আর ক্ষমতাসীনরা বার-বার বলতেছে জাতিকে বিভক্ত না করতে! মধু হাজী অতিশয় চিন্তিত। দেশ কোনদিকে যাচ্ছে। কারন ৭১ এ লোকমান উকিল ছিলো মুক্তিদের মানুষ। আজকে মাত্র আট-দশ বছর পরে মধু হাজী আর লোকমান উকিলরা এক সাথে পথ হাটতেছে। লোকমান উকিল কাগজপত্র ঘাঁটা ঘাঁটি করতাছে দেখে মধু হাজি বেরিয়ে পড়ে উকিল লাইব্রেরী থেকে। দীঘির পাড় ধরে হাঁটতে থাকে মধু হাজী।
শহরের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে থাকে মধু হাজী। পিছনে এক বাবুলের হাতে ছাতা। চৈত্র মাসের ভ্যাপসা গরমে ঘামতে ঘামতে মধু হাজী বাজারের ভিতরে ঢুকে পড়ে। মাছবাজারে গিয়ে অজিত জলদাসের মাছের আড়তে গিয়ে বসলো। ভরদুপুরে মাছের আড়তগুলি সুনসান নীরব! হাঁকা-হাঁকি ডাকা-ডাকি নাই। নীরব-নীথর চারদিক।দূরে অজিত জলদাস তাস খেলতে বসেছিলো। মধু হাজীকে দেখেই দ্রুত ফিরে আসলো।
-কর্তা চা দিতে কই? সাথে নিমকি?
-বাড়ীর সম্বাদ ভালো অজিত?
-জী কর্তা সব ভালো।
-তোর পুলাপাইন কয়ডারে?
-দুইটা কর্তা।
-ভালো।
উদাস হয়ে যায় মধু হাজী। অজিত জলদাসের গদিঘরের জানালা দিয়ে অপরাহ্নের আকাশ দেখতে থাকেন। মাছের খালি ঝুড়ি উল্টাইয়া দুই বাবুইল্লা বইস্যা আছে।
-উলনপুরে মোট ভোটার কতো রে?
-কর্তা হইবে প্রায় হাজার খানেক।
-আমরা ভোট কেমন পাইমু?
-বেশীরভাগ পাইমু কর্তা।
-জাইল্লারা আমারে ভোট দিবো?
-দিবোনা ক্যান কর্তা! আমাগো উলনপুরের লোকজন আপনারে ভালো পায়।
-দেখা যাক! আর তুই কমিশনার পদে খাড়াইবি?
-কর্তা আপনার দয়া।
মধু হাজী চিন্তিত হয়ে পড়লো আবার। চা-তে চুমুক দিতে দিতে মনে মনে অঙ্ক করছিলো। শহরের চার মাথায় চার রকম ভাব আছে। দক্ষিনে মধু হাজির লগে লাইগ্যা আছে করিমুল্লাহ বলি; আর আছে ওহাব পাটোয়ারী। করিম বলি আর ওহাব পাটোয়ারি একসাথে থাকাই স্বাভাবিক। সেখানে নিজের এলাকাতেই মধু হাজী কোনঠাসা হয়ে পড়ছে। উত্তুরে আওয়ামী লীগ হয়ে জাসদের শক্ত নেতা বাদল শিকদার, পুর্বে বাকশালী ফজলু আর শহরের পশ্চিম মাথায় আছে আরেক বাকশালী কফিল মিয়া। অঙ্ক বরাবর মধু হাজীর বিপক্ষে যায়। তারা তিনজনেই মাঠ ছাড়বোনা। আরো সমস্যার কথা তিনজন এক হয়ে যদি করিমুল্লাহ বলিরে সাপোর্ট দেয়, তাইলে মধু হাজী মাঠে মারা যাইবো। মাজা শক্ত কইরা দাঁড়াইতে পারবোনা।বাকি থাকে উলনপুর! উলনপুরের ভোট বেশিরভাগ পাইবো করিম বলি নাইলে ফজলু। এই খেলায় মধু হাজী কই? চিন্তিত মধু হাজী! কপালে ভাঁজ পড়ে। বিড় বিড় করে নিজেই হিসেব মিলায়। হিসেব তো মিলেনা। আবার কি অন্য রাস্তা ধরতে হবে? করিমুল্লাহ বলিরে সরাইয়া দিতে হবে? এবার কি সম্ভব? হঠাত দুই বাবুইল্লার দিকে চোখ গেলো। খুব বিশ্বস্থ দুইজন। করিমুল্লাহ বলিরে সরানোর জন্য এখন আর নিজের শরীরে তাগদ নাই। কাজে লাগাইতে হইবো ক্যাঁচকি আর লইট্টা বাবুইল্লারে। লইট্টা বাবুইল্লার সাহস বেশী। সেই পারবো কাজটা। চিন্তিত মধু হাজী শহরের প্রধান সড়ক ধরে আবার শহরের দক্ষিন দিকে হাঁটতে লাগলো। পিছনে চুপ-চাপ দুই বাবুইল্লা।বাড়ীর পথে যেতেই ওহাব পাটোয়ারীর সাথে দেখা।
-পাটোয়ারী কই যাও?
-এইতো বাজারে যামু।
-কেমন আছো?
-এই তো ভালো।
-আইজ কাইল আমারে তেমন দেখোনা-কথা বার্তা কম বলো।
-তোমার সাথে আমি কবে কথাবার্তা বেশি কইতাম? আর এখন তুমি হইলা আমাগো পাট মন্ত্রীর ডানহাত; শহরের মা বাপ। তোমার লগে আমি কথা বার্তা কম কমু-এতো সাহস আমার আছে নাকি?
-তুমি কি কও পাটয়ারী-আমরা এক লগে বড় হইছি।একলগে কত হাউজি খেলছি আর যাত্রা দেখছি।
এবার হেসে ফেলে ওহাব পাটোয়ারী।
-আমার কাছে তোমার কি কোনো কাজ আছে হাজী?
-না তা নাই; কাজ ছাড়া কি কথা কওন যায়না?
-তা যায়-বলো কি কইবা?
-ঠিক আছে পরে কথা কইমুনে।বাজারে যাইবা-যাও।
-ঠিক আছে গেলাম।ওহাব পাটোয়ারী হাঁটা শুরু করলো।
মধু হাজী বাড়ীর দিকে এগুতে থাকে।
-লইট্টা বাবুইল্লা-ওহাব পাটোয়ারী মানুষ কেমুন?
-ভালোনা। আমাদেরকে সেদিন উনার বাড়ীর সামনে পাইয়া জিগাইছে-ওইদিকে কেন গেছি-আর কইছে না যাইতে!
-তুই তার বাড়ীর দিকে গেছিলি?
-হ’ হাইঞ্জা বেলায় গেছিলাম।
-হারামজাদা হাইঞ্জাবেলায় গেছিলি কেন?
-ওহাব পাটোয়ারীর পোলারা খুব দামী জামা গায়ে দেয়।
-তুই চুরি করতে গেছিলি?
-না এম্নিতে গেছিলাম।
-এমনিতে রাইতে ওইদিকে যাইবি কেন?
-গেছিলাম এমনি এমনি হাজী সাব।
চুপ মেরে যায় মধু হাজী। কোথায় যেনো নিজের জীবনের সাথে মিল খুঁজে পায় মধু হাজি। আপনমনে ভাবতে থাকে-এই দুই বাবুইল্লা কি তার পিছে থেকে থেকে জীবন পার করবে না আরো কিছু করবে! দুই বাবুইল্লাকেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার রাস্তা দেখাবে মধু হাজী-যদি তারা প্রতিষ্ঠা পেতে চায়।





অনেক দিন পর নূরানী চেহারার মধু হাজীরে দ্যাখলাম

বেশ ভাল লাগলো, পরের পর্বের অপেক্ষায়।
খ্যাকজ !!

অনেক দিন পর লইট্যা আর কাচকিরে পাইলাম
এই ব্লগের মডুরা ঘুমায় নি?
একটা নিক এপ্রুভ করতে কয়দিন লাগে
(শিমুল)
কেমুন আছেন শিমুল?

মডু ভাইয়েরা প্লিজ শিমুলের নিকটা রেজিঃ করে দেন।
শিমুল আপনার নিক রেজিঃ হয়ে গেছে।

এখন কোপান।
দারূন!
ধন্যবাদ আরাফাত শান্ত সাথে থাকার জন্য।
অঃটঃ আপনার প্রো-পিক চমতকার।
কর্ণেল তাহের এবং তাঁর এই ছবিটা আমার খুব পছন্দ।
সেই অনবদ্য লেখনী- সেই শব্দের নিটোল বুনন- সেই প্রাণবন্ত উপস্থাপনায় স্রোতস্বিনী বেনুমতি- যেনো হৃদয়ের কিনারা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেলো।
ধন্যবাদ শনি।
চলুক।
ধন্যবাদ !! সাথে থাকার জন্য।

চলুক দাদা
কবি ভাই, আপ্নে শেষ পর্যন্ত এইখানে আইসা মৌরসী পাট্টা গাড়লেন!!!!!!এইটা আশা করি নাই। --- বেকুব
কেন এইখানে সমস্যা কিতা?

আছেন কেমুন?
প্রথম কমেন্ট তাই পোস্ট না পড়েই দিয়েছি।

আপনাকে দিয়েই বনি হলো।দুই একটা ইমু ট্রাই করে দেখলাম। হা হা হা.....
দ্রুত পোষ্ট দেন।

যাহোক খুঁজে পেলাম শেষ অব্দি আপনার ধারাবাহিক লেখা। পড়লাম। বরাবরের মতোই ভালোলাগা। ভাল থাকবেন। শুভেচ্ছা ও শুভকামনা রইল।
আছি আপনাদের সাথে;
লেখাটা ধারাবাহিকভাবে চলবে।
নিজেকে সম্মানিত বোধ করছি!
চমৎকার লেখা। ভাল থাকুন।
(মাতরিয়শকা)
মধু হাজীরা আজীবন দৌঁড়ের উপর।
লেখাটা খুব ভালো লাগলো। আরো চাইইইইই
মন্তব্য করুন