ইউজার লগইন

আসন

রুশনি আর কুলসুম
রুশনি যখন স্বামী-সন্তান নিয়ে নিদারুণ অভাবের তাড়নায় দুদিন উপোষ থেকে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্তে অবিচল, ঠিক তার মাস খানেক আগেই তার সুপ্রিয় পড়শি কুলসুম অন্ন-বস্ত্রের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে সপরিবার চলে গিয়েছে। যে কুলসুমকে একদিন না দেখলে, যার সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলতে না পারলে মনে হতো আজ কী একটা জরুরি কাজ যেন বাকি রয়ে গেছে। সেই কুলসুম কেমন যেন অচেনার মতোই কারো দিকে না তাকিয়ে সন্তানদের হাত ধরে আতাউল্লার পিছন পিছন চলে গিয়েছিলো। এমনকি রুশনিকে একবার বলে যাবারও প্রয়োজন বোধ করেনি।

রুশনি যে কথাগুলো ভাবতো হয়তো তেমনি প্রায় একই ধরনের ভাবনায় আচ্ছন্ন হতো কুলসুমের মনও। যদিও তারা ভিন্ন গ্রাম থেকে বিয়ের মাধ্যমে দুজন ভিন্ন দুটি পরিবারের বউ হয়ে এ গ্রামে এসেছিলো প্রায় এক যুগ আগে। এমনকি সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে দুজনের স্বামীর বাড়ি আর পরিবারের মাঝে খানিকটা উঁচু-নিচু প্রভেদের কথা, নতুন পরিবেশে, নতুন আত্মীয়তার সূত্রে নানা স্বজন, আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে পরিচয় বা কম বেশি সখ্য হওয়ার মতই বিষয়গুলো জানতে পেরেছিলো ধীরে ধীরে। বিশেষ করে দুটো বাড়ির মাঝখানে একটি পুকুরের ব্যবধান থাকলেও সেই পুকুরের একটি পাড়ই আবার দুটি গ্রামের মধ্যকার খালের ওপর স্থাপিত দুর্বল কাঠামোর নড়বড়ে সেতুর মতো একটি অস্পষ্ট বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছিলো বাড়ি দুটোকে।

যেহেতু পুকুর পাড় দিয়ে দুটো বাড়ির মানুষের কোনো রকম চলাচল ছিলো না, সেহেতু দু বাড়ির মানুষদের জন্য সে অর্থে প্রাত্যহিক চলাচলের পথ হিসেবে তা গণ্য হতো না। এ ছাড়াও পুকুরের পাড়টিতে নানা জাতের গুল্ম বা ঝোপ-ঝাড়ের একটি শক্ত প্রতিবন্ধকতা ছিলো স্পষ্ট। তবু রুশনি যখন গোসল করতে বা রান্না-বান্নার সময় কোনো কিছু ধোয়ার কাজে পুকুর ঘাটে আসতো, ঠিক সেই সময়টিতে কুলসুম হয়তো উঠোনের পাশে মাচায় অথবা কাপড় শুকানোর জন্য আড়াআড়ি করে দুটো ঘরের সঙ্গে আটকে রাখা বাঁশটিতে সদ্য ধুয়ে আনা কোনো পরিধেয় কাপড় মেলে দিয়ে ঘরে ফিরে যাবার সময় দেখতে পেতো রুশনিকে।

হয়তো বা সে সময় রুশনিও পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে এদিকে মুখ ফেরালে দেখতে পেতো কুলসুমকে।

দুজনকে দুজনের দেখাদেখি আরো কতদিন চলতো তারা কেউই হয়তো ব্যাপারটি নিয়ে কখনো ভাবেনি। অবশ্য এমন একটি ভাবনা যে ওদের কারো মাথায় আসতে পারে তার একটি সুনির্দিষ্ট কারণ থাকা খুব জরুরি হয়তো ছিলো না। যতটা জরুরি ছিলো তাদের পরস্পরের স্বামীদের বিপর্যয় সম্পর্কে খোঁজ-খবর করার নানা মাধ্যম অনুসন্ধান করা। যদিও কুলসুমের স্বামী আতাউল্লার মাস ছয়েক আগে রুশনির স্বামী মইনুদ্দিন পৈত্রিক সম্পত্তির কিছুটা বন্ধক রেখে আর কিছুটা বিক্রি করে দিয়ে দালালের কারসাজিতে আরো কিছু বাড়তি টাকা দণ্ড দিয়ে যখন কাকভোরে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে ঢাকা শহরের দিকে যাত্রা করে, সেই সংবাদটা কেমন করে যেন গ্রামের অনেক ছেলে-বুড়ো আর বউ-ঝিরা জেনে গিয়েছিলো। যে কারণে তার পিছু পিছু চলতে থাকা রুশনি আর তার শাশুড়ির পেছনেও একটি নীরব মিছিল এগিয়ে যেতে থাকে। ওরা দুজন, এমনকি মইনুদ্দিনও দৃশ্যটা দেখে ক্ষণিকের জন্য বিস্ময়ে না দাঁড়িয়ে পারেনি। বিস্ময় কাটিয়ে উঠে মইনুদ্দিন মিছিলটির সবচেয়ে বর্ষীয়ান পরশ আলির কাছে জানতে চেয়েছিলো, আপনেরা কই যান?

পরশ আলি কোনো রকম কথার মার-প্যাঁচে না গিয়ে সরাসরি বলে উঠলেন, বাজান, দ্যাশে-বিদেশের কথা, কে বাঁচে কে মরে কওন তো যায় না। আর কবে দেখা হইবো, নাকি আর দেখাই না হয়, এইডা বুইঝ্যা আমারে তুই মাপ-সাপ কইরা দিস! সময়-অসময়ে কত ভালা-মন্দ কথা কইছি! মনে কোনো কষ্ট রাখিস না!

মনে হচ্ছিলো পরশ আলির কথাটাই যেন প্রতিভাসিত হচ্ছে অপেক্ষমাণ অন্যান্যদের চোখে। নীরবে সবার দিকে একবার তাকিয়েছিলো মইনুদ্দিন। কিন্তু কী বলবে তাই যেন ভেবে পাচ্ছিলো না। হয়তো চেষ্টা করলে কিছু একটা বলতেও পারতো। কিন্তু সবার সজল নয়ন কিংবা কারো কারো চোখ মোছার দৃশ্য দেখতে পেয়ে তার চেষ্টাটাও হয়তো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো। গ্রামের প্রান্তে বড় রাস্তায় বাসে উঠে পড়ার আগ পর্যন্ত দলটি দাঁড়িয়েছিলো সেখানেই ।

সেই ঘটনার পর পরই কুলসুম একদিন আতাউল্লার মুখ থেকে শুনতে পেয়েছিলো মইনুদ্দিন আর রুশনির নাম। তারপর হঠাৎ করেই একদিন বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে বড় রাস্তার ঢালুতে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করার সময় প্রায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের দেখা হয়ে যায়। কুলসুমের কেন যেন মনে হচ্ছিলো এই হচ্ছে রুশনি। কিংবা রুশনি কুলসুমের ব্যাপারে একই কথা ভেবে থাকতে পারে । তবে একটি বিষয়ে দুজনেই নিশ্চিত যে, কেউ কারো নাম জিজ্ঞেস করেনি। যা নিয়ে পরে তাদের মাঝে হাসাহাসির ঘটনাও ঘটেছে।

যদিও দুজনের বাপের বাড়ি বিপরীত মুখি। তবু তারা কিছুক্ষণ তাকিয়েছিলো পরস্পরের দিকে। হয়তো কৌতূহল বা এমনিই পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিলো উদ্দেশ্যহীন। সেদিন তাদের মাঝে কোনো রকম কথা-বার্তা হয়েছিলো কিনা সে ঘটনা এতকাল পর তাদের মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু মইনুদ্দিনের পথ ধরে আতাউল্লা যেদিন ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমালো, সেদিনের পর থেকেই যেন তাদের সখ্য আর বোঝাপড়া দিনদিন নিকটতর হতে থাকে। পরে গ্রামের অনেকেই দেখেছে যে, দুজনে কালো বোরখায় নিজেদের আবৃত করে রিকশায় করে গ্রাম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কখনো মাছের বাজারে, কখনো বা সবজি বাজারে, কখনো কাপড়ের দোকানে একই সঙ্গে দেখা যায় দুজনকে। এমনকি কোনো কোনোদিন কাকতালীয় ভাবে কিনা দেখা যায় দুজনের শাড়ির রঙ আর ছাপাও একই ধরনের। হয়তো কোনো এক সময় একই রঙ আর ছাপার শাড়ি দুজনের পছন্দ হয়ে যাওয়াও একটি কারণ হতে পারে।

তাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ঘটনার কথা যেটা শোনা গিয়েছিলো, তা হচ্ছে যে, স্বামীদের দেশের বাইরে থাকার সুবাদে হাট-বাজারে এমনকি ঘরের নানা প্রয়োজনে নানা পেশার পুরুষদের সঙ্গে তাদের পরিচয় থেকে প্রণয় গড়ে উঠেছিলো। তাদের ব্যাপারে গুজব আছে প্রবাসী স্বামীদের পাঠানো টাকায় তারা জীবনে যেটা করতে পারেনি অর্থাৎ সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ পায়নি, সেটাই করে বেড়াচ্ছিলো।

হয়তো সে কারণেই নতুন করে পরিচিত নানা জনের সঙ্গে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেতো তাদের। আরো মজার ঘটনা হচ্ছে যে, তারা যখন গ্রামের জয়নাল হাজির বাড়িতে সাপ্তাহিক তালিমে যেতো ধর্ম বিষয়ক বয়ান শুনতে। দেখা গেল হাজির বাড়িতে জায়গির থাকা মুন্সির প্রেমে দুজনেই হাবুডুবু খাচ্ছে। এ নিয়ে ছোটখাটো বিচার-শালিসও হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছিলো। অন্যদিকে ত্রিভুজ প্রেমের ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে নিজের মান বাঁচাতে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গিয়েছিলো মুন্সি।

দু সখির পেখম মেলে ঘুরে বেড়ানো কোথায় গিয়ে যে থামতো, তা তাদের অদৃষ্ট বা নিয়তিই বলতে পারতো, যদি না বছর তিনেক পর আতাউল্লা দুঃস্বপ্নের মতো একদিন সকালের দিকে ঝাড়া হাত-পা হয়ে ফিরে না আসতো। সেই সঙ্গে প্রবাসে মইনুদ্দিনের পাসপোর্ট বা ওয়ার্ক পারমিট হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হয়ে যাওয়ার কারণে বছর খানেক টাকা-পয়সা না পাঠানোর মতো অঘটনগুলো না ঘটতো।

স্বাচ্ছন্দ্য যেমন দু সখিকে এক সূত্রে গেঁথে রেখেছিলো তেমনি দুঃখ আর অভাব-অনটনও তাদের যেন আরো বেশি আপন করে তুলেছিলো। যে কারণে হয়তো দুটি সংসারেই অনটনের আগুনে জ্বলছিলো শান্তির আঁচল। যার উত্তাপকে খানিকটা প্রশমিত করতে বা বন্দী জীবনে একটু শ্বাস ফেলতেও হয়তো পরস্পরের কান্নাটা নিত্য-নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছিলো। প্রকারান্তরে তারা নিজেদের অজান্তেই হয়ে পড়েছিলো গৃহবন্দী। সেই সঙ্গে সংসার আর মননের ভেতরকার নিরুদ্ধ ব্যর্থতা আর নিরাশার ঠোকাঠুকির তীব্রতা খাঁখাঁ দুপুরে, কখনো বা ঝিঁঝিঁ ডাকা মধ্যরাতে তাদের নিজ নিজ সংসারের সীমানা পেরিয়ে প্রায়ই ভেদ করতো পড়শির ঘরের জানালা।

কুলসুমের একদিন
সকাল বেলা ঘরের কাজকর্ম সেরে মেয়েদের যার যার কাজে যাওয়ার জন্য খাবার খাইয়ে প্রস্তুত করে নিজের প্রাত্যহিক কাজে যাবার আগে দিয়ে প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন পাশের বিছানায় ঘুমে কি জাগরণে থাকা আতাউল্লার দিকে মুখ বাড়িয়ে কুলসুম বললো, এই, আইজগা কাজে যাইবা না?

আতাউল্লা বালিশ থেকে মাথা তুলে একবার তাকায় কুলসুমের দিকে। তারপর বালিশের পাশ থেকে বিড়ি আর লাইটার নিয়ে একটি বিড়ি ধরায়। তার নীরবতায় কুলসুমের হয়তো রাগ হয়। বলে, কী চুপ কইরা আছ যে?

আতাউল্লা বললো, কাইলকা কাজের কোনো লাইন করতে পারি নাই। তাও রহিম কইছে, কাজের ভাও হইলে আইয়া ডাইক্যা নিবো।

কুলসুম তার হাতের সেল ফোনে সময় দেখে কপাল কুঁচকে বলে, বেলা বাজে সাড়ে আটটা, লোক আইবো কোন সময়?

-মনে হয় কাজের জোগাড় হয় নাই!

-তুমি নিজে কাজ খুঁজতে গেছিলা? কাইলকা রাইতে কই গিয়া আড্ডায় বইছিলা?

-সকাল সকাল তুমি এত কথা কইতাছ ক্যান? আতাউল্লা প্রায় খেঁকিয়ে ওঠে। তোমার কাজে যাইতাছিলা যাও!

কুলসুম মুখটা কেমন বিকৃত করে হঠাৎ বলে ওঠে, শয়তান! শুইয়া শুইয়া খাওন পাইলে আর কাজ খুঁজবা কোন দিনের লাইগ্যা! বউ-মাইয়া কামাই করে, এর থাইক্যা মজা কী আর লাগে!

তারপর বিড়বিড় করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কুলসুম। তার শেষের কথাগুলো শুনতে পায় আতাউল্লা। দিমু নে একদিন উষ্টা দিয়া বাইর কইরা!

আতাউল্লা যে এমন কথায় কিছু মনে করে না বা স্ত্রীর রাগারাগিকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না কুলসুম নিজেও তা বোঝে। কেবল বুঝতে পারে না কেন এখনো এমন অকর্মা লোকটির সঙ্গে সে আছে! এভাবে আর কত যন্ত্রণা সইবে সে? তারপর বলে, হুহ! প্যাট খালি রাইখ্যা মাথায় ছাতি দিয়া দিন কাবার কর!

পাশের পথচারী কী বোঝে কে জানে। লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কুলসুমের প্রতি। কুলসুম তা দেখে লোকটির হ্যাংলামির আন্দাজটুকুর বাইরে কিছু ভাবতে পারে না।

মায়ের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করে কোনো ফল পাওয়া যায় না। তিনি তাকে উলটো বোঝান, সংসারে একটা পুরুষ মানুষ ছাতির মতন। মায়ের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সে পথ চলে। পৌনে নটা থেকে নটার ভেতর মাদ্রাসায় গিয়ে হাজির হতে হবে তাকে।

দশটার দিকে মাদ্রাসার মেয়েরা আসতে আরম্ভ করবে। তার আগেই ঝাট-পাট ক্লাসের মেঝে মোছার কাজগুলো সারতে হবে। তারপর বেলা বারোটার ভেতর আট-দশজন মানুষের ভাত-তরকারি রেঁধে প্রস্তুত রাখতে হবে। তারপরই তার ছুটি। পরদিন এসে এসব এঁটো থালা-বাটি আর হাড়ি-পাতিল পরিষ্কার করতে হবে তাকেই। কোনো ছুটি-ছাটা নেই। বছরের বারো মাস তাকে এ কাজ করতে হয়। কেবল দুটো ঈদের সময় ছাড়া তার ছুটি মেলে না। যদিও বা কখনো অসুস্থ হয়ে পড়ে, কাজে না যেতে পারলে সেদিনের টাকা বেতন থেকে কাটা যাবে। এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করলে তাকে শুনতে হয়, কাজ করলে কর, না করলে বিদায় হও!

মাসটা কোনো রকমে কাটাতে পারলেই হাতে আসে আড়াই হাজার টাকা। টাকাগুলো গুণতে গুণতেই সে ভুলে যায় বিগত মাসের যাবতীয় কষ্ট আর যন্ত্রণা। এই টাকা আর পোশাক কারখানায় কর্মরত বড় মেয়ে হাসনার বেতনের বড় অংশটা মিলিয়ে কোনো রকমে ঘর ভাড়া আর খাওয়ার খরচটা চলে যায়। আতাউল্লা যে মাসে কিছু আয় করে, তা দিয়ে বাকি খরচগুলো হয়ে যায় মোটামুটি। জীবনে তার খুব একটা চাওয়া নেই। কেবল একটি পুত্র সন্তানের আক্ষেপ মাঝে মাঝেই বাতাসের দিক বদলের মতোই যেন ভাবনা অথবা হৃদয়ের কোনো এক ফাঁক-ফোকর দিয়ে আসা-যাওয়া করে।

রান্নার কাজ শেষ করেই কুলসুম দপ্তরিকে ডেকে জানিয়ে দেয় রান্না প্রস্তুত। তারপর সে ছুট লাগায় ঘরের উদ্দেশ্যে। বেলা একটার সময় মেজ মেয়ে সালমা ট্রেনিঙ থেকে ফিরে আসবে। দুপুরের খাবার খেয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে যাবে প্রাইভেট পড়তে। ছোটো মেয়ে দুটো একটার দিকে আসবে স্কুল থেকে। তাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়াও ঘরের আরো নানা ধোয়া-মোছার কাজ তো আছেই প্রতিদিনকার মতো।

ঘরে ফিরে আতাউল্লাকে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে মেজাজটা বিগড়ে যায় কুলসুমের। যাওয়ার সময় সে বলতে ভুলে গিয়েছিলো যে, আতাউল্লা যদি কাজে না যায় তাহলে যেন ভাত আর ডালটা রান্না করে ফেলে। অবশ্য এমন একটি ব্যাপার কোনো পরিবারে ঘটলে তা নিয়মে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হাড়ি উলটে শূন্য দেখতে পেয়ে সে প্রায় তেড়ে আসে আতাউল্লার দিকে, কিরে শয়তানের ছাও! আজাইরা ঘরে হুইয়া বইয়া থাকলি দুইডা ভাত-ডাইল রাইন্দা থুইলে কী হইতো?

আতাউল্লা জানায়, শইলডা ভালা লাগতাছে না।

হঠাৎ করেই কুলসুমের যে কী হয়। অকস্মাৎ সে ঝাঁটা হাতে বলে ওঠে, হুইয়া-বইয়া থাইক্যা তর শইল ভালা লাগে না ক্যান রে হারামজাদা? আমি সারা বিয়ান পরের বাইন্দালি কইরা ভালা থাকি ক্যামনে হেইডা দেহি কইলি না একবার? আমার শইল কি খারাপ লাগতে পারে না?

-অই, মুখ সামলা খানকি! নাঙ দৌড়াইয়া আইয়া বেশি ত্যাজ দেখাবি না!

-হারামজাদায় কইলো কী! আমি নাঙ দৌড়াইয়া আইছি?

দেহের কোথাও আকস্মিক আঘাতে যেমন কোনো বোধ কাজ করে না, তেমনই যেন ব্যাপারটা বুঝে উঠবার আগে কিংবা কথাটার নিগূঢ়তা উপলব্ধিতে যতটা সময় লাগে ততক্ষণ সে যেন বোধ বিবেচনাহীন হয়ে থাকলো। তারপরই যেন হঠাৎ জেগে উঠে কোনো এক আসুরিক শক্তিতে আতাউল্লার একটি হাত ধরে বিছানা থেকে তাকে টেনে তুলে ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে ঠেলে দেয়। তর মতন পুরুষ আমার দরকার নাই। ভাদাইম্যার ঘরের ভাদাইম্যা, যে তরে নাঙের কামাই খাওয়াইবো তার কাছে যা! বলতে বলতে দরজা বন্ধ করে হুড়কো আটকে দেয় সে।

কুলসুমের উচ্চকিত কণ্ঠস্বরে আশপাশের ঘরের মেয়েরা বাইরে থেকে জানতে চায়, রূপবানের মা ঘটনা কী?

-বাইরের কুত্তাডারে জিগাও! ঘরের ভেতর থেকেই চিৎকার করে ওঠে কুলসুম।

তারপর নিজে নিজেই মেঝেতে বসে কিছুক্ষণ কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে অদৃষ্টকে গালাগালি করে। তারপর আতাউল্লার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে, তুই যদি মনে করস আমি নাঙ দৌড়াইয়া থাকি তাইলে তর মতন মানুষ দিয়া আমার কী উপকার? তুই তর রাস্তা দেখ! আমার খাওন পিন্দন পোলাপাইনের খরচ আমি নিজে যোগাইতে পারলে তরে পাইল্যা আমার কোনো লাভ নাই বেঈমান কোহাঙ্কার!

কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে অনবরত দরজায় খটখটানোর শব্দে হয়তো বিরক্ত হয়ে হাতে বটি নিয়ে দরজা খুলে কুলসুম বলে ওঠে, ঘরে আইলে তরে টুকরা কইরা ফালামু!
কিন্তু তারপরই সে অবাক হয়ে দেখে যে, সালমা দাঁড়িয়ে আছে।

রুশনির পরিবৃত্ত
প্রথম দিকে রুশনি কাজকর্ম কিছুই করতো না। ভেবেছিলো কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ জুটিয়ে নেবে। কাজও শুরু করে দিয়েছিলো সে। কিন্তু মইনুদ্দিনের আয় মাসে দু হাজারের বেশি হয় না। আর সে কাজ করলে ছেলে মেয়েদের প্রতি মনোযোগ দিতে পারে না। সন্তানদের সহায় সম্পদ দিয়ে যেতে না পারলেও কম বেশি শিক্ষা নি দিতে পারলে এ জীবনের কী অর্থ! কিন্তু বিকল্প কোনো পথ খুঁজে পায় না। তা ছাড়া দিনভর পরিশ্রম করে ঘরে ফিরে স্বামীর নানাবিধ সন্দেহের সন্তোষজনক জবাব দিতে দিতে হয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে নয়তো রেগে যায়। নিত্যদিন একই রকম যন্ত্রণায় হাঁপিয়ে পড়ে রুশনি। শেষটায় যেন যাবতীয় ধৈর্যের বাঁধ রাগ আর ঘৃণার স্রোতে ভেসে যায়।

সেদিন ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটার কিছু বেশি সময় হয়ে গেলে, ক্ষুধার্ত মইনুদ্দিন অপেক্ষা করতে করতে গুম হয়ে বসে ছিলো। রুশনি ফিরে আসতেই তার রাগ ফণা উঁচিয়ে মাথা তোলে। বলে, এত রাইত করলে এমন কাজ করনের দরকার নাই!

মইনুদ্দিনের রাগের হেতু জানে রুশনি। মাত্র সে কাজ থেকে ফিরে এলো। এখন চুলায় ভাত বসিয়ে দিয়েই নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে ঢুকবে বাথরুমে। তারপর রান্না হলে ঘুমিয়ে যাওয়া ছেলে মেয়ে দুটোকে ডেকে তুলে সবাইকে নিয়ে নিজেও খেতে বসবে। এই রুটিনের বাইরে যদি পিত্তি জ্বালানো কথা শুনতে হয়, তা বেশিদিন সহ্য করা কঠিন। পশু হোক আর মানুষ হোক, ভার বইবার বা আঘাত সইবার নির্দিষ্ট একটি সীমা আছে তার। সীমা ছাড়িয়ে গেলে সে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবেই।

রুশনি প্রায় প্রতিদিনই মইনুদ্দিনের কথার প্রেক্ষিতে রাগারাগি অথবা গালাগালি করে। কিন্তু আজ কোনো মতেই রাগারাগি করে না সে। তার ওপর অনেক ভেবে ঠিক করে ফেলেছে যে, প্রয়োজনে এই যন্ত্রণাময় সংসার ছেড়ে দেবে। তাই বলে ওঠে, আমি যা খুশি করমু, তুই আমারে নিয়া সংসার করবি? আর তর যদি এতই সন্দেহ থাকে তাইলে বউরে দিয়া চাকরি করাইস না। তুই তর কামাই দিয়া যেমন রাখবি হ্যামনই থাকবো তর বউ! আজাইরা সন্দেহ করিস না! এইডা ছাড়াও আমার একটা প্যাট। চালাইতে কোনো কষ্ট হইবো না। কষ্ট করতাছি তর যেই কুত্তার বাচ্চাগুলারে প্যাটে ধরছি হেইডির লাইগ্যা। নাইলে তর মতন এমন পালোয়ানের ভাত আমার না খাইলেও দিন পার হইবো।

রুশনির মুখ দিয়ে এমন কথা বের হবে তা কল্পনাতেও ছিলো না মইনুদ্দিনের। তার চেয়ে বরং প্রতিদিনকার মতই সে রাগারাগি বা গালাগালি করলেও অতটা আঘাত লাগতো না তার বুকে। দিনে দিনে সেগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এ কোন রুশনিকে দেখছে সে? রুশনি কি এমন ছিলো?

আর কিছু যেন ভাবতে পারে না মইনুদ্দিন। এ মুহূর্তে রুশনির সঙ্গে কেমন ধরনের আচরণ করা উচিত তাই যেন ভেবে ঠিক করে উঠতে পারে না সে। রুশনির কথার চাবুকে তার স্তব্ধতার আড়ালে নতুন করে ভাবনার উদয় হয় যে, সত্যিই যদি তাকে রুশনি ছেড়ে যায় তাহলে সে কী করতে পারে? কী এমন কাজ সে করছে যে, রুশনি তার সংসারে পুরোনো বটবৃক্ষের মতো ডাল-পালা-ঝুড়ি আর শিকড় গজিয়ে বসে পুরো জীবন পার করে দেবে? রুশনি তো ঠিক কথাই বলেছে। তবে চাকরির অহংকারেই রুশনির এতটা বাড় বেড়েছে বলে তার মনে হয়। তা ছাড়া নতুন কারো সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে উঠবার সম্ভাবনাটাকে ছোট করে দেখলেও চলে না। কিন্তু তার সুদিন না এলে তো সে রুশনির কথার সমুচিত জবাব দিতে পারছে না। কিন্তু সেই সুদিন কি আদৌ তার জীবনে আসবে?

বাড়িওয়ালা নতুন আরেকটি বাড়ির নির্মাণ কাজে হাত দেওয়ার আগে সব কিছু যাতে ঠিকঠাক মতো হয়ে যায় সেই উদ্দেশ্যে ঘরে মিলাদের আয়োজন করলে রুশনিও নিমন্ত্রিত হয়ে সেখানে যায়। বৃদ্ধা বাড়িওয়ালী তাকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে বলেন, এই এলাকায় তেমন কোনো ভালো ভাতের হোটেল নেই। ছোটখাটো নানা পদের কারখানার শ্রমিকরা তিন বেলা খাওয়ার জন্য এমন মানুষদের খোঁজ করে, যাকে মাসে বা সপ্তাহে সপ্তাহে টাকা দিলে সে তাদের খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেবে। ইচ্ছে করলে সে গার্মেন্টস-এর কাজটা ছেড়ে দিতে পারে। লাভ মোটামুটি খারাপ হবে না। মাসে দু হাজারের চেয়ে ভালোই আয় হবে। তা ছাড়া সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া তরি-তরকারি দিয়েই তার ঘরের মানুষদের খাওয়া হয়ে যাবে। আলাদা করে রান্না করতে হবে না। যেহেতু রাতের বেলা দেরি করে ফেরা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংসারে অশান্তি হয় তার চেয়ে এ কাজটা করলে সে তার ঘরে থেকেই স্বামী-সন্তানদের দেখাশুনার কাজটাও করতে পারবে ভালো মতো।

রুশনি বলে উঠলো, এমন মানুষ আমি পামু কই?

-আমিই ব্যবস্থা কইরা দিমু নে। ঘ্যাসের চুলা তো আছেই। তর আর চিন্তা কি?

-বাজার সদাই?

দৃষ্টিতে যেন রাজ্যের হতাশা লেপটে থাকে রুশনির।

-তুই কি নিজের লাইগ্যা বাজার সদাই করস না? হেই সময় করবি। মানুষগুলারে ভালা ভালা খাওয়াতে চেষ্টা করবি।

পরদিন থেকেই কাজে লেগে পড়েছিলো রুশনি। একজন ঘরে এসে খেয়ে যায় আর সে যাওয়ার সময় ভাত তরকারির হাড়ি-পাতিল ব্যাগে ভরে নিয়ে যায়। তারপর সেই খালি পাত্র সন্ধ্যার আগে দিয়ে ফেরত দিয়ে যায়। রাতের খাওয়ার সময়ও একই ব্যবস্থা। রুশনি সারাদিন কষ্ট করলেও মনে আক্ষেপ নেই। বড় ছেলেটাকে একটি দোকানে কাজ জুটিয়ে দিয়েছে। বাকি ছেলেমেয়ে দুটোকে ভর্তি করে দিয়েছে স্কুলে।

আস্তে ধীরে সে খোঁজ পেয়ে যায় এমন কয়েকজন যারা তারই মতো এমন কাজ করছে আরো আগে থেকেই। তাদের সঙ্গে আলাপ করে মাঝে মাঝে নানা বুদ্ধি পরামর্শ নেয় সে। এখন তার খাওয়া-পরার পর সঞ্চয়ের সুযোগও রয়েছে বেশ। অথচ একটা সময় খাওয়া-পরা নিয়ে কতই না কষ্ট করেছে।

কিন্তু কারো কপালে যদি শনি বা অনর্থ থাকে তা থেকে তার মুক্তি মেলে না কিছুতেই। তেমনি মইনুদ্দিনেরও গালি অথবা স্ত্রীর মুখ ঝামটা না খেলে হয়তো ভালো লাগে না। পেশাগত কারণেই রুশনিকে বাজারে যেতে হয়। বিভিন্ন দোকানের কর্মচারীর সঙ্গে সদ্ভাব রাখতে হয়। সব সময় হাতে টাকা পয়সা থাকে না। দোকান পরিচিত থাকলে নুনটা বা তেলটা কখনো বা দরকারি মসলা ধারে বা বাকিতেও নিয়ে আসা যায়। এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আছে বলে মোটামুটি বড় না হলেও পরিচিতির বৃত্ত একটি তৈরি হয়েছে তার। পথে ঘাটে যে কারণে মানুষের দু একটা কথার জবাব দিতে হয়। কখনো বা কিছু না বলে হাসি দিয়ে হলেও পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। সে ব্যাপারগুলোতেও মইনুদ্দিনের মনে বেজায় সুড়সুড়ি লাগে হয়তো। বলে, বাইরের মানুষের লগে তর এত কথা কিসের? আর এত দাঁত বার কইরা হাইস্যা হাইস্যা কথা কওনের কোন কাম?

আজকাল মইনুদ্দিনের কথায় কিছু যায় আসে না রুশনির। দিন যতো যাচ্ছে ততই সে অনুভব করতে পারছে যে, এই অপদার্থ লোকটিকে ছাড়াও ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাকি দিনগুলো ভালো ভাবেই উতরে যাওয়া যাবে। তাই হয়তো নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারে, ব্যাডারা যে আমার নাঙ লাগে তার লাইগ্যাই কথা কই। হাসাহাসি করি। বলদ ব্যাডা তুই বুঝস না ক্যান?

মইনুদ্দিন ফের স্তব্ধ হয়ে যায় কিছুদিনের জন্যে। তাই কারণে অকারণে রুশনিকে খোঁচা দিতে তেমন আগ্রহ বোধ করে না।

মুক্তির আনন্দ দীর্ঘদিন পর
ঈদের ছুটি আরম্ভ হওয়ার তিন দিন আগেই মাদ্রাসার ছুটি শুরু হয়ে যায়। পুরো এক সপ্তাহ বন্ধ থাকবে মাদ্রাসা। যে কারণে ছুটির আগেই কুলসুম বেতন আর ঈদের বখশিশ সহ বেশ কিছু টাকা পেয়ে যায় হাতে। ছুটি পাওয়ার আনন্দে তার ইচ্ছে হয় এখনি ছুটে যায় বাপের বাড়ি। কতদিন হয়ে গেল সে তার মা আর ভাইদের দেখে না। দেখে না ছেড়ে আসা তার ভিটেটুকু, বিয়ের পর যেখানে শুরু হয়েছিলো তার নতুন আরেকটি জীবন। সেই ভিটেটুকুর চৌহদ্দিতেই আতাউল্লা নামের অকর্মাটার প্রতি গাঢ় প্রেমে মশগুল হয়ে খেয়ে না খেয়ে, রোগে-শোকে ভুগে ভুগে পার করে দিয়েছিলো বেশ কটি বছর। কিন্তু সেই প্রেম-বিশ্বস্ততা অথবা নির্ভরতার মূল্য যথাযথ পাওয়া যায়নি গোঁয়ারটার কাছ থেকে।

আজ ফিরতে ফিরতে বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিলো কুলসুমের। কিন্তু ঘরে ফিরে সে দেখতে পায় আতাউল্লা তার পেটিকোট রোদে শুকোতে দিচ্ছে। দৃশ্যটি দেখে হঠাৎ করেই মনটা ভালো হয়ে যায় তার। এমন ছোট খাট কাজেও যদি আসতো লোকটা, তাহলে তার কষ্টগুলোকে তেমন একটা কষ্ট মনে হতো না। প্রয়োজনে লোকটির জন্য আরো বেশি কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুতি নিতো।

ঘরে ঢুকে সে হাড়ি উল্টিয়ে দেখে যে, ডাল আর ভাত রান্না করা আছে। এখন কেবল তরকারিটা রান্না করলেই চলবে। মেয়েরা আর কিছুক্ষণের ভেতরই হয়তো চলে আসবে। মনে মনে আরো খুশি হয়ে ভাবে কুলসুম, বাটপারটারে মাপ কইরা দিয়া তেমন একটা খারাপ করি নাই তাইলে!

মেয়েরা ঘরে ফিরে এলে কুলসুম জানায় সে আজই বাড়ি যেতে চাচ্ছে। কিন্তু বড় মেয়ে হাসনা ফিরে আসতে আসতে হয়তো রাত হয়ে যাবে। কিন্তু ততক্ষণ অপেক্ষা করতে তার মন সায় দেয় না। মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে তাকে ফোন করে সে। কিন্তু মেয়ের কাছ থেকে জানা যায় তার ছুটি শুরু হবে ঈদের আগের দিন থেকে। এ কথা শুনে যেন তার হাত পা ভেঙে আসতে চায়। তাহলে কি তার মুক্তি নেই? ঈদের আগের দিন গেলে কি তার হাতে ততটা সময় থাকবে? তাই মেয়েকে জানিয়ে দেয়, তাইলে তরা পরে আয়। আমি অখনই বাইর অইতাছি।

এ নিয়ে হাসনার কোনো মতামত পাওয়া যায় না। এমনকি আতাউল্লাও আজ তার পৌরুষ প্রদর্শনে যেন কোনো উৎসাহ পায় না।

আমি আইজ বাইত্যে যাইতাছি। তোমার মাইয়াগো নিয়া তুমি তুমি যাইও! বলে, আতাউল্লার উত্তরের অপেক্ষা করে কুলসুম। কিন্তু আতাউল্লা বলে, কাইলকা আমার কামে না গেলে বাকি ট্যাকা পাওয়া যাইবো না।

কুলসুমের মনে হয় বৃথাই সময় ক্ষেপণ করছে সে। তাই সে ছোট মেয়ে দুটোকে বললো, তোরা তগো বাপের লগে আইস। আমি যাই!

ঘর থেকে বের হতেই কুলসুমের মনে হয় দীর্ঘকাল যেন সে আকাশ দেখেনি। শ্বাস নিতে পারেনি মুক্ত বাতাসে। অথচ পরিচিত রাস্তা ধরে স্টেশনের উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকলেও তার কেন যেন মনে হতে থাকে এ পথে সে আজই প্রথম এলো। সন্দেহ কাটাতে সে এদিক ওদিক তাকায়। প্রতিদিন যে দোকানটা থেকে পান কেনে সেটা দেখতে পেয়ে তার ভুল ভাঙলেও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারে না।

স্টেশনে বেজায় ভিড়। ট্রেনের টিকেটের নিশ্চয়তা পাওয়া না গেলে সে খোঁজ করে মেইল ট্রেনের। কিন্তু সেখানেও কোনো আশার আলো দেখতে পায় না। স্টেশন মাস্টারের কথা থেকে জানা যায় টিকেট পেলেও দালালদের কাছ থেকে আলাদা টাকা দিয়ে সিট না কিনলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। টিকেটের দাম দালালের টাকা মিলিয়ে বাসের ভাড়া হয়ে যেতো। ঈদের সময় বলে এখন আরো বেশি ভাড়া গুণতে হবে।

বাস স্টেশনে এলে সেখানেও দেখতে পায় মানুষের মাথা মানুষে খায়। টিকেটের দাম তার ভাবনার চাইতেও অনেক বেশি। ভেতরে ভেতরে নিজকে বেশ অসহায় মনে হয় কুলসুমের। একবার ভাবে দাঁড়িয়ে যাবে বলে টিকেট নিয়ে গাড়ির মেঝেতে হলেও বসতে পারবে। তবে মানুষের লাথি না খেলেও কটু কথা শুনতে হতে পারে। হঠাৎ তার মনে হয়, আজ যে করে হোক তাকে বাড়িতে পৌঁছুতেই হবে। টিকেটের মূল্য যতই হোক। যখনই সে এমন একটি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছুলো ঠিক তখনই যেন মনটা ফের ফুরফুরে হয়ে উঠলো। টিকেট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন দেখে সে খানিকটা ইতস্তত করলে দু-একজন জানালো, পাশে দিয়া যান। মহিলার লাইনে খাড়াইতে হয় না।

কুলসুম কাউন্টারের দিকে আগাতে আগাতে দেখতে পায় ঠিক সমিরের মতোই একটি লোক, মাটিতে নামিয়ে রাখা ব্যাগ হাতড়িয়ে কিছু একটা খুঁজছে। লোকটি হঠাৎ মাথা তুলে কুলসুমকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলো, আরে কুলসুম! তুই এহানে কী করস?
সমির ভাই? সঙ্গে সঙ্গেই যেন কুলসুমের মন থেকে যাবতীয় উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা দূর হয়ে যায়। মনে হয় দীর্ঘকাল পর খুবই আপন কারো সাক্ষাৎ পেয়ে মনের ভেতরটা সবুজ হয়ে উঠেছে।

সমির ব্যাগের জিপার টেনে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে খানিকটা এগিয়ে আসে। বলে, আমি কি এতডাই বুড়া অইয়া গেলাম যে, তুই আমারে চিনস না!

-না চিননের কথা কইসি?

সমির হাসে। বলে, বাইত্যে যাইতাসস নাকি? তর জামাই কই? পোলাপান?

-তারা পরে আইবো। আমি আগেই ছুটি পাইলাম দেইখ্যা আগে আগে যাইতাসি।

-টিকেটের যেই দাম চায়, আমি সাহস পাইতাসি না। আবার সিট লইলে আরো বেশি দাম দেওন লাগবো।

-তুমি যাইবা, না যাইবা না, হেইডাই আগে ঠিক কর!

-না গিয়া কি উপায় আছে?

-যেইডা করতেই অইবো হেইডা করতে দেরি কইরা কী লাভ? তাইলে দুইডা টিকেটই লও!

কুলসুম পাঁচশত টাকার একটি নতুন নোট বাড়িয়ে ধরে সমিরের প্রতি। কিন্তু সমির সে টাকা না নিয়ে বলে, তর কাছেই রাখ অহন। দরকার অইলে নিমু।

-তুমি না কইলা দাম দেইখ্যা টিকেট কিন নাই!

-এইডা অইলো গরিবের খাসলত। অভাবের কতা জানান দেয় আগে আগে!

সমির হাসতে হাসতে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়।

সেদিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে একবার আকাশের দিকে তাকায় কুলসুম। আকাশটা কেমন যেন ভারী ভারী মনে হয়। যদিও মেঘের কোনো দেখা নেই তবু কেমন যেন বিষণè। হতে পারে দূরে কোথাও ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে অথবা আকাশ নিজেকে শানিয়ে নিচ্ছে রাতের বেলা হানা দেবে বলে।

সমির প্রায়ই তাদের বাড়ির কাছাকাছি ক্ষেতে নিড়ানি নিয়ে ক্ষেত নিড়ানি দিতো । নয়তো বা গরুর জন্যে ঘাস কাটতো। কী আশায় যে সে পড়ে থাকতো তাদের বাড়ির আশপাশে তা কুলসুম বুঝতে পারলেও কারো মনে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ দেখা দেয়নি। বেশ অভাবি ছিলো সমির। তার বিয়ের কথা কেউ তুললেই প্রথম প্রশ্ন উড়ে আসতো, বউরে কী খাওয়াইবো? নিজেই কামলা দেয় পরের বাইত্যে!

ঝিমিয়ে পড়তো সে চেষ্টা। কিন্তু মানুষটাকে সৎ বলেই বিশ্বাস করতো কুলসুম। হয়তো এখনও করে। লোকটা একবারও যদি নিজের মুখ ফুটে কথাটা বলতে পারতো, তাহলে জগতের যাবতীয় বাধাকেও সে উপেক্ষা করতে পারতো। অন্তত আতাউল্লার সংসারের চাইতে খারাপ হতো না হয়তো তার সংসার। কিন্তু লোকটির দৃষ্টিতে কাতরতা থাকলেও মুখ যেন এ প্রসঙ্গে একেবারে সেলাই করা।

সমিরের বুক ভাঙে, কথা ফোটে না
টিকেট হাতে নিয়ে লোকজনের ভীড়ের আড়াল থেকে এক দৃষ্টে কুলসুমের দিকে তাকিয়ে থাকে সমির। এ পর্যন্ত কুলসুম সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছে, তাতে মনে হয় কুলসুম ততটা শান্তিতে নেই। অকর্মা স্বামীর সংসারের অভাব মেটাতে তাকে চাকরি করতে হচ্ছে। কখনও এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া-ঝাটিও লেগে যায়। তার ইচ্ছে হয় যে, কুলসুমকে বলে, আতাউল্লার সংসারে কী পাইলি? আমার না হয় জমি ক্ষেতি আছিলো না, আতাউল্লার কী আছিলো যে, তর বাপ-মা তারেই বেশি উপযুক্ত মনে করলো? এহন আমার জমি, ভিটা, পুকুর তিনটাই আছে। এহনও কি আমার দাম আতাউল্লার থাইক্যা কম?

সমির ভাবতে ভাবতে বুঝি আনমনা হয়ে যায়। হয়তো বা সে কারণেই বিষাদ মুখে কাউন্টারের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে টিকেট হাতে। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে বুকের ভেতরটা কেমন ভার ভার বোধ হয় কুলসুমের। ইচ্ছে হয় এখনই ছুটে গিয়ে জাপটে ধরে সমিরকে। সেই যে কিশোরী কুলসুম প্রতিদিন দেখতো নিবিষ্ট মনে ঘাস কাটায় ব্যস্ত সমিরকে, সেই তখন থেকেই তার জন্যে মনের কোথাও যেন একটু কোমলতার সৃষ্টি হয়েছিলো। সে কারণেই হয়তো সমিরকে কখনো দূরের বা পর বলে মনে না হলেও বয়সের অপরিপক্কতার কারণেই হয়তো সেদিকে তার দৃষ্টি পতিত হয়নি সময় মতো। কিন্তু আজ যেন তার বোধের যাবতীয় অদৃশ্য প্রাচীর নিজেদের দৃঢ়তা ভুলে গিয়ে খানিক স্পর্শেই ভূলুণ্ঠিত হতে প্রস্তুত হয়ে আছে নিজ থেকে। কিন্তু সেই প্রাচীরে যাতে নিঃশ্বাসেরও কোনো রকম স্পর্শ না লাগে সেই পণই যেন করে বসে আছে সমির। আর সে পণ রক্ষা করতেই হয়তো এগিয়ে না এসে কুলসুমের দিকে তাকিয়ে হাত উঁচু করে টিকেট দুটো দেখায়।

কুলসুম নিজের ব্যাগটি হাতে করে এগিয়ে যেতে থাকলে সমিরও এগিয়ে আসে। টার্মিনালে থেমে থাকা বাসগুলোর দিকে তাকিয়ে সমির জানায় বাস ছাড়বো তিনটার সময়, এতক্ষণ কী করি?

লও, কোনোখানে বইয়া থাকি। এদিক ওদিক তাকিয়ে বসার জায়গা সন্ধান করতে করতেই প্রস্তাব দেয় কুলসুম।

কই বওনের জাগা আছে? সবখানেই তো মানুষ। সমিরের কণ্ঠে হতাশা উথলে উঠে ঝুরঝুর করে ভাঙে যেন।

দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বসার জায়গা খোঁজে। কিন্তু খানিকটা স্থির হয়ে কিছুক্ষণ বসা যায় এমন কোনো জায়গা খুঁজে পায় না ওরা। শেষে কুলসুমই ফের বলে, তাইলে যেই বাসে যাইবা হেই বাসে উইঠ্যা পড়ি!

তাও যায়! অনিশ্চিত কণ্ঠে বললেও টিকেটের সঙ্গে মিলিয়ে বাস খুঁজতে তৎপর হয় সমির। কিন্তু ঘোরাঘুরি করে নির্দিষ্ট বাস দেখতে না পেয়ে ফের টিকেট কাউন্টারে ফিরে যেতে মনস্থ করে সে।
কাউন্টারে ফিরে এসে বাসের কথা জানতে চাইলে লোকটি জানায়, পাশে যাত্রীদের বসার জন্য আলাদা ঘর আছে। তারা যেন সেখানেই অপেক্ষা করে। সময় হলে টিকেট দেখে দেখে সবাইকে বাসে তুলে দেওয়া হবে।

নিজেদের নির্বুদ্ধিতায় দুজনই হাসে। হাসতে হাসতে তারা ঢুকে পড়ে ওয়েটিং রুমে। পাশাপাশি দুটো আসনে বসে পড়ে হঠাৎ করে দুজনেই যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। হয়তো কিছু বলার মতো না পেয়ে নিজেদের অজান্তেই উসখুস করতে থাকে। কুলসুমের একবার ইচ্ছে হয় সমিরের স্ত্রী-সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু আরেক মন বলে নিজ থেকে যদি না বলতে চায় তাহলে মানুষটিকে শুধু শুধু বিব্রত করা হবে। তাই তার মনের ভেতর নানাবিধ জিজ্ঞাসার বুদবুদ টগবগ করতে থাকলেও আঁচল কামড়ে ধরে নীরব থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করে।

আস্তে ধীরে লোকজনের ভীড় বাড়তে থাকে। বসার জন্য পেতে রাখা আসনগুলো ভর্তি হয়ে গেলে কিছু মানুষকে দেখা যায় পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকতে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও কোনো বাস এসে দাঁড়ায় না। এ নিয়ে উপস্থিত লোকজন হৈ-চৈ করতে আরম্ভ করলে, শঙ্কিত কুলসুম সমিরের বাহু আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে, উঠো দেহি, বাইর হইয়া যাই! মানুষ সুযুগ পাইলেই ভাঙ্গা-ভাঙ্গি শুরু করে।

অস্থির আর উত্তেজিত যাত্রীদের ভীড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই আরো নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে সমির বললো, এইসব ভাঙ্গা-ভাঙ্গি জ্বালাও-পোড়াও হইলো আমার মতন গরিব মানষ্যের কাম। নিজের বাপ-চাচার তো নাই, হ্যার লাইগ্যা সুযুগ পাইলে পরের সম্পদের উপরে নিজের জিদ মজানি! এমন সুযুগ কি গরিবে ছাড়ে?

ঠিক তখনই হলুদ-লাল-নীলে ছোপানো একটি বাস বিকট গর্জন করতে করতে কালো ধোঁয়ায় আশপাশ আচ্ছন্ন করে দিয়ে কাউন্টারের সামনে এসে থামে। দেখতে দেখতে লোকজন হুড়মুড় করে সবাই বাইরে বেরিয়ে এসে বাসের দরজা দুটো আড়াল করে ফেলে।

কুলসুম আর সমির যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। হুড়োহুড়ি দেখে হয়তো শঙ্কিত দুজনেই। হঠাৎ কুলসুম সমিরের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, তোমার বউ-পোলাপাইন শহরে না গ্যারামে?

কুলসুমের আচানক জিজ্ঞাসায় সমির কেমন থতমত খেয়ে উঠে ফের জিজ্ঞেস করে, কিছু কইলি?
কই গিয়া রইসে তোমার মন? বলেই আবার বলে, জিগাইসিলাম তোমার বউ-পোলাপাইন কই?
এবার সমির হেসে ওঠে। বলে, বউ-পোলাপাইন যার যার জাগায় আছে!

সমিরের এমন হেয়ালী ভালো লাগে না কুলসুমের। খানিকটা রাগ দেখিয়ে বলে, মশকারি কইরো না কইলাম।

-মশকারির কী আছে? কইলাম না তারা যার যার জাগায় আছে!

-তাইলে কও কই বিয়া করলা? পোলাপাইন কয়ডা?

সমির সে কথার উত্তর না দিয়ে বলে, আগে গাড়িত উডি যাইয়া। এত পাগল অইস না, সবই কমু তরে!

গাড়িতে উঠার পর তাদের দুজনের সিটের নাম্বার আলাদা আলাদা পড়ে। তখনই একজন পুরুষের পাশে গিয়ে গাড়ির কন্ডাকটর লোকটি বললো, সিট ছাড়েন। নম্বর মিলাইয়া নিজের সিটে যান!

লোকটি জানালো, আমার সঙ্গে মহিলা আছে।

-মহিলা মহিলার লগে দি দ্যান!

-টিকেট অদল-বদল করে ব্যবস্থা কর না কেন? এত লম্বা পথে আলাদা বসে যাওয়াটা সমস্যা।

-নিজেরা পারলে ঠিক করি লন! অহন এই মহিলারে বইতো দ্যান!

লোকটি অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গেলে কুলসুমের বসতে খারাপ লাগে। সমিরকে বলে, দেখ না ব্যবস্থা অয় কিনা!

বাস ছাড়ি ছাড়ি অবস্থায় লোকটি সমিরের হাতে ধরা টিকেট দেখে নিজের টিকেট দিয়ে একটি টিকেট নিয়ে তার সঙ্গে থাকা মহিলাটিকে বললো, উঠে এসো!

মহিলা উঠে যেতেই জানালার দিকে সরে গিয়ে কুলসুম সমিরের একটি হাত টেনে ধরে পাশে বসিয়ে দেয়। তারপর কেমন বোকা বোকা হাসিতে মুখ উজ্জ্বল করে তাকিয়ে থাকে সমিরের মুখের দিকে।

একটু উষ্ণতার ছোঁয়া
বাস চলে বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে। যাত্রীদের কেউ কেউ ধীর গতির জন্য গালমন্দ করে ড্রাইভারকে। ড্রাইভার লোকটি বোকার মতো আচরণ করলেও তার উদ্দেশ্যে বর্ষিত যাত্রীদের গালি বা অভিযোগের উত্তর বোকার মতো মনে হয় না। সে জানায়, দেরি করি ঘরত যাইলে খুশি অইবেন, নাকি তাড়াতাড়ি করি হসপিটালত যাইলে খুশি অইবেন, ঠিক গরি কন!

কোনো কোনো যাত্রী বিরক্ত হয়ে বলে, পণ্ডিতি বাদ দিয়া গাড়ি আরো জোরে চালাও!

ড্রাইভার হয়তো যাত্রীদের মূঢ়তায় হতাশ হয়েই বলে, আইজ আমি গাড়ি চালাই বিশ বছর। এই পইজ্জন্ত আমার গাড়ি এক্সিডিন ন গরের। আফনেরা বেশি চিল্লাচিল্লি গইল্লে গাড়ি নামাত চলি যাইবো গি! দৈর্য দরি বন!

কিন্তু উপদেশ কারোই ভালো লাগে না হয়তো। তবে যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য বন্ধ হয়ে যায়, যখন ধীরে ধীরে গাড়ির গতি মন্থর হতে হতে এক সময় থেমে যায়। সামনে যতদূর দৃষ্টি পতিত হয় অসংখ্য বাস-ট্রাক আর ছোট আকৃতির নানা জাতের গাড়িকে স্থির দেখা যায়। এ নিয়ে যাত্রীদের মাঝে এক ধরণের হতাশার গুঞ্জরন ওঠে। কারো কারো কণ্ঠে এমন আক্ষেপও শোনা যায়, আইজ আর আশা নাই। গাড়ির ভিত্রেই ঘুম যাওন লাইগবো!

পাশাপাশি বসে থাকলেও সমির আর কুলসুমের যেন কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। তারা ঝিমুচ্ছিলো দুজনেই। হয়তো ঘুমুচ্ছিলো এভাবেই। পরিশ্রমী মানুষ বিনা কাজে একা থাকলে ঘুম ছাড়া আর কিছু হয়তো প্রত্যাশা করে না। আস্তে ধীরে লোকজন নেমে যেতে থাকলে বিচিত্র রকমের শব্দে হয়তো তাদের ঝিমুনি বা ঘুম কেটে যায়। চোখ মেলে দুজনে আবিষ্কার করে যে, স্থির গাড়িতে তারা কেবল দুজনই বসে আছে পাশাপাশি। বাইরের আলো বেশ ঝিমিয়ে এসেছে। হয়তো ঘণ্টা খানেক পরই সন্ধ্যা নেমে আসবে।

দু চোখ কচলে নিয়ে কুলসুম বললো, গাড়ি থাইম্যা রইছে ক্যান?

-সামনে কিছু হইছে লাগে! নামবি? নাম, ভালা লাগবো।

কুলসুম প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালে সমির বলে, কি?

-ব্যাগ বোচকা লইয়া একবার নামন আবার টানাটানি কইরা উডা ঝামেলার!

-গাড়ির লগেই থাকিস। বেশি দূর না গেলেই অইলো।

কথাটায় হয়তো যথেষ্ট যুক্তির উপস্থিতি খুঁজে পায় কুলসুম। আর তাই হয়তো ব্যাগটি কাঁধে করে উঠে দাঁড়ায় সে। তারপর নিচে নেমে এসে দুটো হাত দু’দিকে টানটান করে মেলে দিয়ে হয়তো দেহের জড়তা কাটাতে চেষ্টা করে। গাড়ির বহর দেখে সে বলে, কত্ত গাড়ি থাইম্যা রইছে। অইছে কি সামনে?

সমির খানিকটা হাসতে চেষ্টা করে। বলে, ল, সামনে যাইয়া দেইখ্যা আই!

সমিরের আচরণ দেখে বেশ কিছুটা অবাক হয় কুলসুম। এখন যতটা সহজ হয়ে কথাবার্তা বলতে পারছে লোকটা, আরো বছর কয়েক আগে হলে হয়তো তাদের দুজনের জীবনটাই এখনকার চেয়ে কিছুটা হলেও ভিন্ন রকম হতো সন্দেহ নেই। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করার মানুষ জগতে খুব বেশি হয় না।

বিভিন্ন গাড়ি থেকে নেমে আসা নানা বয়সের যাত্রী গাড়ির আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছিলো। কেউ কেউ তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের হিসু করাচ্ছে। রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে অনেক বয়স্ক পুরুষকেও সামনের দিকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কুলসুমেরও প্রয়োজন ছিলো রাস্তার ঢালুতে নেমে ঝোপের আড়ালে বসে পড়ে ভার লাঘব করার। কিন্তু বৈরী সময়ে তা সম্ভব নয় বলেই তাকে আরো বেশ কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। হয়তো বা অন্ধকার না নামা পর্যন্ত, নয়তো কোথাও যাত্রা বিরতির আগ পর্যন্ত।

কুলসুম হঠাৎ সমিরকে জিজ্ঞেস করে, তোমারে জিগাইছিলাম, বিয়া করছো কই, পোলাপাইন কয়ডা? তার কিছুই তো কইলা না!

সমির হঠাৎ হেসে উঠে বলে, কী কইতাম? কওনের কিছু নাই!

-কওনের কিছু নাই, এইডা কেমন কতা কইলা?

কুলসুম কণ্ঠস্বরে রুক্ষতা গোপন করতে চেষ্টা করে না। হয়তো দৃষ্টিতে বিরক্তি নিয়েই তাকায় সমিরের মুখের দিকে।

সমির ব্যাগের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি চানাচুরের প্যাকেট বের করে সেটার মুখ খুলতে খুলতে জানায়, যা নাই, যেইডা অয় নাই হেইডা কেমনে কই?

-পরিষ্কার কইরা কও!

-না করছি বিয়া, না আছে পোলাপাইন!

খুব সহজ ভঙ্গীতেই সমির কুলসুমের একটি হাত টেনে নিয়ে তাতে খানিকটা চানাচুর ঢেলে দিয়ে বলে, এই কপালে আর বিয়া নাই, বুঝলি? সময় মতন কেউ মাইয়া দিলো না, বুড়া কালে এই চিন্তা করি কোন সাহসে?

সমিরের কথা খুব স্বাভাবিক থাকলেও কুলসুমের বুকের ভেতরে যেন বড় সড় একটি আঘাতের মতই ধাক্কা মারে। হয়তো সে কারণেই কিছুটা চানাচুর ঝুরঝুর করে হাতের তালু বেয়ে গড়িয়ে পড়ে যায় নিচে কালো রাস্তার ওপর। বেশ কিছুক্ষণ যেন কোনো কথা খুঁজে পায় না সে। হয়তো ভুলে যায় হাতের চানাচুরের কথাও।

-কি ভাবতাছস? চানাচুর মুহে দে! বলে নিজেও মুখে খানিকটা চানাচুর পুরে নিয়ে চিবাতে আরম্ভ করে সমির।

হাতের চানাচুর থেকে একটা দুটো করে টুকরো তুলে মুখে দিতে দিতে কিছু একটা গভীর ভাবে ভাবতে থাকে কুলসুম। আর তা দেখেই হয়তো সমির আবার বলে, তুই মন খারাপ করলি কী বুইঝ্যা? তর সংসারে অভাব থাকলেও বাকি সবই আছে। আমার তো কিছুই নাই। তয় এইডা কওন যায়- অহন যেই কারণে কেউ তহন মাইয়া দিতে সাহস পায় নাই, অহন হেই অভাবডা নাই। মাইয়া তো কেউ কেউ দিতে চায় হুনতাছি।

সমিরের কথার সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কুলসুমের মুখের উজ্জ্বলতাও যেন ফিরে আসতে থাকে। বিপরীতে পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যার লাজ রাঙা লালিমাও ছড়াতে থাকে পাল্লা দিয়ে। হাতের বাকি চানাচুর মুখে পুরে নিয়ে কুলসুম বলে উঠলো, তাইলে বইয়া রইছো ক্যান? হুনছি গোলাম আলি ভূঁইয়ার ছোডো মাইয়ার অহনতরি বিয়া অয় নাই। যেমন তেমন জামাইও পায় না। তুমি রাজি থাকলে কও আলাপ দিয়া দেহি!

-কোন মাইয়াডা? বিস্ময় যেন কাটে না সমিরের। আরো বলে, তর বিয়ার পর ভূঁইয়ার বাইত্যে তো এক বছর কামলা আছিলাম।

কুলসুম সমিরের দিকে হাত বাড়ালে হাতের তালুতে সে আরো খানিকটা চানাচুর ঢেলে দিয়ে বললো, ভূঁইয়ার মাইয়া তো সবডিই সোন্দর আছিলো!

-হেই যে একবার ঈদের দিন বিষ খাইছিলো, হুনো নাই?

-না। কোন বছর ঘটনা?

-আমার হাসিনা যেই বছর হইলো।

-আরে তর হাসিনার খবরই তো আমি হুনি নাই! বলে, হাহা করে হেসে ওঠে সমির। তারপর বলে, ভূঁইয়ার বাড়ির কাম শ্যাষ কইরা তগো গ্যারামে আইজ তক যাই নাই। কুরুন খাল গ্যারামে জমি কিন্যা বাড়ি বানাইছি।

-কে আছে বাইত্যে?

-কেউ নাই!

কুলসুম যেন ভাষা খুঁজে পায় না। সে তাকিয়ে থাকে সামনের দিকের গাড়িগুলোর ধীর গতিতে এগিয়ে চলা।

প্রাণের সখি গলাগলি এবং বিদায়
এমন একটি সময়ে দাউদকান্দি ঘাটের কাছে বাসটি যখন থামে, তখন না ভোর না রাত্রি। স্থানীয়রা সময়টাকে বলে কালি হাইঞ্জালা। পোশাকি ভাষায় বলা যায় কালি-সন্ধ্যাবেলা। বাস থেকে সমিরের হাত ধরে নেমে এসেই কেমন অবাক করা দৃষ্টিতে রাস্তার পাশে পাকা অংশে বসে থাকা নারী যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকে কুলসুম। তারপরই প্রায় ছুটে গিয়ে তারই সমবয়সী একজন রমণীকে ধরে চেঁচিয়ে ওঠে। রুশনি, তুই এহানে ক্যামনে?

রমণী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, আপনে আমার নাম জানেন ক্যামনে, চিনেন ক্যামনে?

-আরে তরে চিনিই না খালি, তর নাম তর চোইদ্দ গুষ্টিরে জানি!

রমণীর সন্দেহ তবু ঘোঁচে না।

-অ্যামন কইরা দেহস কি? তর জামাইর নাম মইনুদ্দিন না? তুই তর জামাইর গ্যারামের আতাউল্লার বউ কুলসুমরে চিনস না?

রমণীর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। চলন্ত গাড়ির হেড লাইটের আলো প্রতিফলিত হয়ে সেই মুখের দাঁতের ঔজ্জ্বল্য বাড়িয়ে দেয় আরো। সে কুলসুমকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, বইন, তরে তো চিনন যায় না। কত্তদিন বাদে দেহা অইলো!

তারপর বিযুক্ত হয়ে দুজন দুজনের দুহাত চেপে ধরে মুখর হয়ে ওঠে। কুলসুম বলে, তুই এহানে বইয়া রইছস ক্যান?

-গাড়ি নষ্ট অইয়া গেছিলো। তার বাদে রাস্তার জাম! এই সময় তো কোনো লঞ্চ নাই। ট্রলারও নাই। নায়ে গেলে ডর আছে।

তারপর কুলসুমকে সমিরের কাছ থেকে আরো বেশ খানিকটা দূরে টেনে নিয়ে বলে, তুই দেরি করলি কি বুইজ্যা? সেই সঙ্গে একবার সমিরকে দেখে নিয়ে আবার বলে, ব্যাডায় কে? ভাইরে কি ছাইড়া দিছস?

-আলো মাগি না! ব্যাক্কলের মতন কস কি তুই? দিনের আলো থাকলে হয়তো এ লজ্জা গোপন করতে পারতো না কুলসুম। কিন্তু আলো-আঁধারীর কারণেই ব্যাপারটা ধরা পড়ে না রুশনির চোখে। সে তখন নতুন প্রশ্নের অবতারণা করেছে, তর জামাই কই, মাইয়ারা আইলো না? একলা বাইর অইয়া আইলি, আবার কাইজ্যা করছসনি?

কুলসুম রুশনির সব জিজ্ঞাসার জবাব দিয়ে একটি হাত তুলে সমিরের উদ্দেশ্যে বলে, এই হুনেন না? এদিক আইয়েন!

সমির এগিয়ে গেলে কুলসুম বলে, এইডা অইলো আমার বন্ধু রুশনি। ঢাকা আছে। আমরা এই বাড়ি আর হেই বাড়ি। মাঝ খান দিয়া একটা পুষ্কুনী আছে।

সমির গম্ভীর মুখে বলে, বন্ধু দুইজন যে গলায় গলায় বন্ধু হেইডা তো দেইখ্যাই বুঝলাম।

দুজনেই বুঝতে পারে সমিরকে নিয়া আলাপ করে যুত পাওয়া যাবে না। তাই হয়তো কুলসুম বলে, লঞ্চ কয়ডা বাজে খবরডা লইবেন?

-লইতাছি! বলেই দু সখির কাছ থেকে দূরে সরে যায় সমির।

আয় বই! বলে, কুলসুমের হাত ধরে টানে রুশনি। কালো রাস্তার বাইরে পাকা অংশে বসে রুশনি জানায়, আমি আইছি কাইজ্যা কইরা। একলা একলা! বাপের বাইত্যে যাইয়া উঠমু!

-আমিও। আগে মা’রে না দেখলে আমার কইলজা ঠাণ্ডা অইবো না।

তাইলে কি তিন লঞ্চে তিনজন উডন লাগবো? বলেই হেসে ওঠে রুশনি।

ফজরের আজান ধ্বনিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চের ভেঁপুও শোনা যায়। উপস্থিত যাত্রীদের মাঝে হঠাৎ করেই ব্যস্ততা ফুটে ওঠে। সুটকেস, ব্যাগ, বাক্স, বস্তা সমেত নারী-পুরুষ সবাই ঢালের দিকে নেমে যেতে থাকে লঞ্চের উদ্দেশ্যে। কিন্তু দুই সখির মাঝে কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না। তারা মগ্ন হয়ে আছে নিজেদের কথায়।

বেশ কিছুক্ষণ পর ভোরের আলো ফুটে উঠলে ধীর পায়ে এগিয়ে আসতে দেখা যায় সমিরকে। কাঁধের ব্যাগের পাশে ঝুলন্ত হাতে একটি পলিথিনের ব্যাগও ঝুলতে দেখা যায়। কাছাকাছি এগিয়ে এসে সে বললো, কালিগুঞ্জের একটা লঞ্চ আছে। ছয়টায় ছাড়বো কইছে।

সঙ্গে সঙ্গেই রুশনি উঠে পড়ে বলে, এই লঞ্চই তো আমার!

কিন্তু তখনই হাত টেনে ধরে কুলসুম, এত ত্বরা কিয়ের?

সমির জানায়, নাস্তা আনছি, নাস্তা কইরা লন! তারপরই সে কুলসুমকে জিজ্ঞেস করে, তর ব্যাগের ভিতরে পানি আছে?

আমি পানি আনছি! বলেই ফের বসে পড়ে রুশনি।

নাস্তা করতে করতেই বেশ সহজ হয়ে আসে যেন সমির। রুশনি সমিরকে বলে, ঈদের দিন আইয়েন আমার বন্ধুর লগে। তারপর সে কুলসুমের দিকে ফিরে বলে, সমির ভাইরে লইয়া আইয়া পড়িস। একলাই তো আছস।

সমির জানায়, আমি কতা দেই না। তয় আপনেরা দুইজন আইলে বেশি ভালা অয়। আমার বাড়ি খালি। ঈদের দিন বিরান বাইত্যে আমি একলা থাকতে অইবো।

-তার লাইগ্যাই তো কইসি কুলসুমের লগে আইয়া পইড়েন। রুশনির কণ্ঠে অনেকটা আন্তরিকতার সুর।

-কুলসুম আমার বাড়ি চিনে না। বলেই, হেসে ওঠে সমির।

-তাইলে আপনে কুলসুমের বাইত্যে যাইবেন! রুশনি বেশ জোর দিয়ে বলে।

রুশনির কথায় কিছু বলে না সমির। সে নিজে যেমন জানে, তেমনই কুলসুমও ভালো করেই জানে যে, কুলসুমকে এভাবে আনতে সে কখনোই যাবে না।

হঠাৎ করেই খানিকটা নীরবতা চলে আসে তিনজনের মাঝে। আর তখনই লঞ্চের ভেঁপু বাজতে থাকে ঘন ঘন। রুশনি চমকে উঠে বলে, লঞ্চ তো ছাইড়া দিবো!

তাইলে যা। বলে, খাওয়ায় মন দেয় কুলসুম। অনেকটা সময় ধরে সে অভুক্ত। এখন খাওয়ার চাইতে আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়।

রুশনি বোতল বের করে তা থেকে কয়েক ঢোক পানি খেয়েই, বতলডা রাখ, আমি গেলাম!

রুশনি ছুটে যায় রাস্তার ঢাল বেয়ে ঘাটের দিকে।

আস্তে ধীরে নাস্তা খাওয়া শেষ করে সমির আর কুলসুম ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু একটি ট্রলার থেকে একজন লোক ডাকছিলো, রামপুর, রামপুর! ছাইড়া গেলো!

চঞ্চল হয়ে ওঠে দুজনেই। রামপুর নামলে কুলসুমের বেশি পথ হাঁটতে হয় না। কিন্তু সমিরকে হাটতে হবে অনেকটা পথ। যে কারণে ইচ্ছে থাকলেও সে কুলসুমের সঙ্গে একই ট্রলারে যেতে চায় না। কুলসুমও এ নিয়ে তেমন জোরাজুরি করে না। তবে, এক ফাঁকে টিকেট বাবদ টাকা সাধে সমিরকে। সমির কুলসুমের সেই হাত ঠেলে ফিরিয়ে দেয়। কুলসুম হঠাৎ সমিরের একটি হাত নিজের বুকের সঙ্গে চেপে ধরে বলে ওঠে, বিয়া করবা কবে, কও? হারা জীবন কি একলা থাকবা?

সমির কিছু বলে না। হাসিমুখে জানাতে চেষ্টা করে যে, তার মনে বিয়ের আসনে যে বসে আছে, সেখানে তো এ জীবনে আর কারো স্থান হবে না। কিন্তু কুলসুম হয়তো ততটা অনুধাবনে সমর্থ হয় না। ট্রলারের দিকে ফিরতে ফিরতে বলে, তোমার ব্যাগে আমার ফোনের নম্বর দিছি! ফোন কইরো!

কুলসুম উঠে পড়ার পর বেশিক্ষণ দেরি হয় না। ট্রলার ছেড়ে দেয়। নদী পথে দক্ষিণে যাত্রা করে। কুলসুমকে দেখা যায় আঁচল কামড়ে ধরে সমিরের দিকেই তাকিয়ে আছে। সমির একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে একবার আকাশের দিকে তাকায়। কিন্তু ফের কুলসুমকে দেখার জন্য দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় নদীর বাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে ট্রলার।

(সমাপ্ত)

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


পড়ছি। বেশ ভাল লেগেছে

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধন্যবাদ।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


চলুক। ভালই লাগছে।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ঠিক আছে। ধন্যবাদ।

টুটুল's picture


দূর্দান্ত লেখেন বস...

অপেক্ষায় থাকলাম

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


দিবোনে।

জ্যোতি's picture


বাকিটা কই? ভালো লাগছে তো !

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


বাকিটা দিয়ে দিবো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture

নিজের সম্পর্কে

অনেক কিছুই করতে মন চায়। কিন্তু লেখলেখিতে যে আনন্দটা পাই তার তুলনা খুব কম আনন্দের সঙ্গেই চলে।