ইউজার লগইন

জীবিকা অথবা জীবন

এদিকটায় সকাল হলেই নানা রকম বিচিত্র হাঁক-ডাক আর নানাবিধ খুটখাট-ধুমধাম শব্দের খই ফুটতে থাকে অবিরাম। পাশেই কয়েকটি ওয়ার্কসপ, দুটি লেদ-কারখানা আর একটি টিনের বালতি তৈরির কারখানা। বলতে গেলে এগুলোই এ এলাকার প্রাণ। লোকজনের জগতও এই কটি কর্মক্ষেত্রকে ঘিরেই। এখানকার যতগুলো ঘরবাড়ি আছে প্রতিটি ঘর থেকেই কেউ না কেউ এখানকার কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। আর এ কারণেই গাড়ির ওয়ার্কসপের কর্মচারী গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে টিনের বালতির কারখানার জিয়াকে, তর বিটির জ্বরের কী অবস্থা? কিংবা লেদ মেশিনে কর্মরত হিমু পোদ্দার কাজের ফাঁকে কণ্ঠস্বর উঁচু করে গনি গ্যারেজ ঘরের টায়ার ম্যান আলিমুদ্দিনকে বলে, উরে আলিম্যা, ছা খাইতায়নিরে বো?

যদিও জাম তলা নামের এ জায়গাটিতে একটি জামগাছ তো দূরের কথা কোনো রকম গাছের অস্তিত্বই নেই। তবে খানিকটা দূরে মাড়োয়ারিদের ট্যানারির পেছনের খালের দুপাশে কিছু শিয়ালমূত্রা গাছের অস্তিত্ব চোখে পড়লেও তাদের শ্রেণীটা কখনোই গাছের আওতাভুক্ত হয় না। তাদের পরিচয় হয় ঝোপ-ঝাড় অথবা জংলা। হলুদ অথবা লালচে হলুদ কখনো বা কমলা রঙের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলে ছেয়ে যায় খালের দুপাশ। সৌন্দর্য বলতে অতটুকুই।

এলাকাটার প্রায় সবগুলো ঘরবাড়ি আর কারখানা গড়ে উঠেছে অবৈধভাবেই। কিন্তু যারা এখানে কাজ করছে তারা কেউ নিজেদের অবৈধ মনে করে না। তারা জানে, তাদের মালিক খুবই ভালো লোক। সামান্য ভাড়ার বিনিময়ে এখানে থাকতে দিয়েছে তাদের।

ছোটছোট এই প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন পাশাপাশি আর গা লাগালাগি, তেমনি মানুষগুলোও বেশ গলাগলি। যারা কথা বলার সময় নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া কথা বলতে চায় না। প্রত্যেকেই যার যার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে। কিন্তু কারো কোনো কথা বুঝতে অসুবিধা হয় বলেও মনে হয় না। এখানে কোনো অশান্তি নেই বা কারো মাঝে অমিল নেই। আপাত দৃষ্টিতে এমনটাই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন এলাকার আবহাওয়া কেমন থমথমে হয়ে উঠলো। মনে হচ্ছিলো দূরের ট্যানারির বর্জ্য পরিপূর্ণ প্রায় মরা খালটির পচা পানির দুর্গন্ধে আবহাওয়া ভারী হয়ে উঠবার ফলে শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে লোকগুলোর। সন্ধ্যার পর লোকজন আগের মত আর জায়গায় জায়গায় গোল হয়ে বসে কুপি বা হ্যারিকেনের আলোয় মেতে ওঠে না তাস কিংবা দাবা লুডোর আড্ডায়। কিংবা মেয়েরা কেউ কেউ ছোটছোট বাচ্চা কোলে ঘরের সামনের সামান্য বেড়া দেওয়া জায়গাটুকুর ভেতর চাপা কণ্ঠে কোনো এক অদ্ভুত বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে তেমনি চাপা আর রিনরিনে কণ্ঠে হেসে ওঠে না। এখন কারো ঘরের সামনেই কারো উপস্থিতি তেমন চোখে পড়ে না। কেবল কিছুদিন আগেই সপরিবারে গ্রামে চলে যাওয়া নিহার রঞ্জন মল্লিকের পরিত্যক্ত ঘরটাতে কয়েকজন উঠতি বয়সের ছেলে-ছোকরা মিলে ক্যারম খেলার ফাঁকে ফাঁকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ গুটি ফেলা নিয়ে অথবা জটিল কোনো কৌণিক অবস্থান থেকে স্ট্রাইকার বসিয়ে দুরূহ কোনো সাফল্যের আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠছে মাঝেমধ্যে।

শোনা যায়, নিহার রঞ্জন গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে বলে গেলেও আসলে সে সপরিবার চলে গেছে ভারতের মণিপুর। সেখানে তার অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে বলে আগে কোনো এক সময় গল্পে গল্পে বলছিলো কারো কাছে। আর তা এখন আড়ালে আড়ালে ফিরছে অনেকের মুখেই। কারো কারো ধারণা নিহার আসলে ভয় পেয়েছিলো। যেদিন শোনা গেল শেখ মজিবর রহমান নির্বাচনে জয়ী হলেও বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা বাংলাদেশীদের হাতে দেওয়া হবে না, তার প্রতিবাদে তিনি আরো গণ্যমান্য লোকদের সঙ্গে নিয়ে ছয়দফা আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন। আর এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে বালতি কারখানার ম্যানেজার গোলাম আলি প্লেন সিটের সাপ্লাইয়ার তাম্বির মিয়ার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলার সময় রাগ করে বলে উঠেছিলো, শ্যাখ মজিবর কি হাকিস্তানরে ভাঙ্গিবার যড়যন্ত গইজ্যে?

এ নিয়ে তুমুল বাক-বিতণ্ডার পর হঠাৎ গোলাম আলি সিন্দুকের ডালা খুলে এক তাড়া নোট ছুঁড়ে দিয়েছিলো তাম্বিরের মুখের ওপর। তারপর বলে উঠেছিলো, তোঁয়ার লগে ব্যবসা আর ন গরিম! তুঁই মালাউন ইন্ডিয়ার দালাল!

তাম্বির হাসিমুখে টাকাগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বের হওয়ার সময় বলেছিলো, হামাক ইন্ডিয়ার দালাল কইলে, তোমাক জানি কাও মুসলিম লিগের দালাল কতি না পারে!

গোলাম আলি সত্যি সত্যিই মুসলিম লিগের জন্য সর্বস্ব দিয়ে দিতে রাজি। কিন্তু সে মুহূর্তে তাম্বির মিয়ার কথায় প্রচণ্ড রাগে কাঁপতে থাকলে তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিলো না। শেষে নিজকে সামলাতেই হয়তো সে ফের চেয়ারে বসে পড়েছিলো ধপ করে।

এ সংবাদটি বাতাসের আগেই যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এমন কি মাড়োয়ারিদের ট্যানারির শ্রমিকদের মাঝেও এ কথা পৌঁছে গেলে অকস্মাৎ একদিন জয়বাংলা ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে ট্যানারি এলাকা। আর এ ধ্বনি বসন্তের বেগবান হাওয়ার বিপরীত ঢেউ উপেক্ষা করে কাঁপতে কাঁপতে এসে পৌঁছে যায় জাম তলা এলাকাতেও। আর কোনো এক রহস্যময় কারণে এলাকার লোকজনের মুখ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলো প্রসন্ন আর সুখি সুখি ভাবটি। তার বদলে সেখানে যেন নতুন করে জেঁকে বসেছিলো, দুশ্চিন্তা, অবিশ্বাস আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার দীর্ঘস্থায়ী একটি মলিন ছাপ।

গতকালই কুমিল্লার কালাসোনা থেকে এসেছে মনু মিয়া। তার ইচ্ছে কাজ করে বেশ কিছু টাকা জমলে গ্রামে ফিরে গিয়ে বোন রহিমার বিয়ে দেবে। এখানকার কোনো একটি বেকারিতেই কর্মরত তার মামা যাদু সরকার। কিন্তু এখানে এলেই যে কাজ পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা দিয়ে আসতে পারেনি তার মামা। এলাকায় কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে যে, বিহারি মালিকরা নতুন করে কোনো বাঙালিকে কাজে নেবে না। পুরোনো যত বাঙালী কর্মচারী আছে তাদেরও আস্তে ধীরে বরখাস্ত করে দেবে।

গ্রামাঞ্চলে বলতে গেলে তেমন কাজকাম নেই। ধান পাকার আগে এখন আর কারো কাছে কাজও তেমন নেই। যদিও যাদু সরকার তাকে যাওয়ার জন্য কোনো সংবাদ পাঠায় নি, তবুও মনু মিয়া অনন্যোপায় হয়ে চলে এসেছে। মা আর বোনটির জন্য যে সামান্য কিছু চাল রেখে এসেছে তা বড় জোর দু সপ্তাহ চলবে। কিন্তু সে সময়কালের মাঝে তাকে যে করেই হোক টাকা-পয়সা নিয়ে ফিরে গিয়ে খাবারের ব্যবস্থা করে দিয়ে আসতে হবে।

মনু মিয়া বাস ভাড়ার অভাবে কাঠ বোঝাই একটি ট্রাকে করে ঢাকা শহরের ঠাটারি বাজার এলাকায় নামতে বাধ্য হয়ে, শেষপর্যন্ত হেঁটে হেঁটে এতটা পথ এসেছে। জাম তলার ভাইয়া বেকারি খুঁজে পেতে তাকে জিজ্ঞেস করতে হয়েছে বেশ কজনকে। কিন্তু লোকজনের কথামত বেকারির সামনে এসে যাদু সরকারের কথা জানতে চাইলে কেউ বলতে পারে না। মনে মনে খানিকটা দমে গেলেও সে সাহস করে বেকারির টিনের দরজায় বসে ঝিমুতে থাকা দ্বার রক্ষককে ভয়ে ভয়ে শুধায়, এই ব্যাহারিত যাদু মামু চারহি করে, একটা খবর দিতারবেন? আমি তার ভাইগ্না মনু মিয়া!

দ্বাররক্ষী হয়তো বিরক্ত হয় কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ শুনে নিদ্রা ছুট লাল দৃষ্টি মেলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে মনু মিয়ার প্রতি।

মনু মিয়া ফের দ্বিগুণ উৎসাহে বলতে আরম্ভ করলে তাকে শুনতে হয়, ইধার যাদু-উদু কই নেহি হ্যায়!

এ কোন জগতের ভাষা বলছে লোকটি? মনু মিয়া বিস্মিত হয়ে তাকায়। দেখতে তো মানুষের মতই সব কিছু। কিন্তু ভাষাটা এমন বিশ্রী কেন? এমন ভাষায় কি কেউ কথা বলে? তারা মানুষ নাকি মানুষের মতই দেখতে ভিন্ন কোনো প্রাণী? অবশ্য বানর দেখতেও অনেকটা মানুষের মতই। কিন্তু তার ভাষা চিঁচিঁ ধরনের। তবে মানুষের মতই এর কণ্ঠস্বর পরিষ্কার। ভাষাটাই কেবল দুর্বোধ্য!

মনু মিয়া বিরস মুখে বেকারির অদূরে একটি চালার নিচে বসে থাকে। তার স্পষ্ট মনে আছে যে, তাকে এই ভাইয়া বেকারির কথাই বলেছিলো তার মামা। তাহলে কি তাকে মিথ্যে বলেছে? মামা কি বেকারিতে কাজ করে না? না হলে কী করে বলতে পারলো, বেকারির আশপাশেও মজার মজার স্বাদের পাউরুটি-কেক-বিস্কুটের ঘ্রাণ লেপটে থাকে বাতাসে। হাটবারে তাদের হাটে যেমন মুড়ি-মুড়কির হাট দিয়ে চলার সময় এক ধরনের মিঠে সুবাস হাওয়ায় মিশে আছে টের পাওয়া যায়। তেমনি শুঁটকি অথবা মেছোহাটা। যেখানে যে সামগ্রী বেশি থাকে সেখানকার হাওয়ায় সে সামগ্রীর ঘ্রাণ। এখানেও তেমনি পাউরুটি-কেক-বিস্কুটের ঘ্রাণ।

তার যাদু মামা বলছিলো, বেকারি এলাকার বাতাস নাকে গেলে কিছুক্ষণের ভেতরই ক্ষুধা লেগে যায়। আর এ কথার সত্যতা প্রমাণেই হয়তো তার ক্ষুধা তীব্রতর হয়ে উঠলেও তার কিছুই করার থাকে না। সঙ্গে টাকা-পয়সাও নেই যে কিনে খাবে কিছু। আশপাশে কোনো পুকুর বা চাপ-কলও দেখতে পাচ্ছে না যে, সেখান থেকে দু আঁজলা জল তুলে খাবে। সে তেমনি বেকারির টিনের দারজার সামনে বসে বসে ঝিমুতে থাকা অদ্ভুত ভাষার প্রাণীটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

বেলা প্রায় মাথার উপর চলে এসেছে। তবুও সে এখান থেকে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে না। কারণ তার মামা মিথ্যে বলে থাকলেও যেহেতু এ বেকারির নাম বলেছে, তাহলে এখানে কাজ না করলেও এর আশপাশ দিয়েই তার চলাচল হবে। ঠিক তখনই কোথাও আজান ধ্বনিত হয়। সে মাথা ঘুরিয়ে আশপাশে কোনো মসজিদ দেখতে পায় না। অথচ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে খালি গলায় কেউ আজান দিচ্ছে। তাহলে কি কোনো ঘর-বাড়ির ভেতর থেকে আজান দিচ্ছে কেউ? ঠিক তখনই সে হঠাৎ দেখতে পায়, বেকারির টিনের দরজার সামনে ঝিমুতে থাকা মানব সদৃশ প্রাণীটি উঠে দাঁড়িয়েছে। দরজাটা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেতরের দিকে কয়েকটি মুখ ভেসে ওঠে।

অদ্ভুত ভাষার প্রাণীটি এক একজনের শরীর হাতিয়ে দেখছে। তারপরই হাত দিয়ে বেরিয়ে যেতে ইঙ্গিত করছে। এভাবে প্রতিটি মুখই মনোযোগ দিয়ে সে পর্যবেক্ষণ করে দূর থেকে। কিন্তু তাদের কেউ যাদু সরকার নয়। মনেমনে সে যখন হতাশায় প্রায় ভেঙে পড়তে যাচ্ছিলো, দু চোখ ভরে উঠতে চাচ্ছিলো কান্নায় ঠিক তখনই দেখা যায় যাদু সরকার হাতে একটি পুটলি মতন কিছু নিয়ে মানুষের মত প্রাণীটির সঙ্গে কিছু নিয়ে কথা বলছে। কিছু কিছু কথা বেশ বুঝতে পারলো মনু মিয়া। সে তখনই উঠে ছুটে যায় যাদু সরকারের দিকে।

তাকে দেখতে পেয়ে যাদু সরকার খুশি হওয়ার বদলে কেমন অপ্রসন্ন কণ্ঠে বলে উঠলো, কিরে, তুই আইলি কী বুইজ্যা?

মামু, চোহে আর পথ দেহি না! অ্যার লাইগ্যাই আইত্তুরলাম!

কর্কশ কণ্ঠে যাদু সরকার বললো, তরে অহন আওনের কতা কইছলাম?

কি করতাম? কোনো কাম-কাইজও পাই না। বাইত বইয়া থাকলে ভাত পাম কই?

এহানো তরে ভাত দিবো ক্যাডা?

মনু মিয়া হাসে।

কিন্তু যাদু সরকারের মুখের ম্লানিমা দূর হয় না। সে তেমনি নিরস কণ্ঠে বলে, চাইরো পাইলের খবর ভালা না। বাঙালীরারে কামের থাইক্যা বার কইরা দিবো হুনতাছি। আমারই যেহানো ভাতের যোগানের আশা নাই, তর ব্যবস্থা করি কেমতে?

মামু আল্লায় একটা ব্যবস্থা করবো। তুমি আমারে রাইতটা থাহনের ব্যবস্থা কইরা দেও!

যাদু সরকার ভাগ্নের সঙ্গে রাগ দেখালেও ভেতরে ভেতরে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে কোথায় তার কাজের ব্যবস্থা করা যায় আর কাকেই বা এ ব্যাপারে অনুরোধ করা যায় তাই ভাবছিলো আর হাঁটছিলো। এমন একটা দুঃসময়ে ছেলেটা এলো যে, তার সঙ্গে দুটো মিষ্টি কথা বলার মানসিকতাও অবশিষ্ট নেই। যে কারণে নিজেই যেন নিজের কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশ।

মগের পানিতে চুবিয়ে পাউরুটি খেতেখেতে মনু মিয়া বর্ণনা করছিলো তার ঘরের বর্তমান বেহাল অবস্থা। এ থেকে উত্তরণের কঠিন এক মরণ-পণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যেই মূলত তার আগমন। কিন্তু মামা যাদু সরকারের কথা তার সমস্ত আগ্রহের আগুনে যেন জল ঢেলে দেয়। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা থাকলেও তার খেতে ইচ্ছে হয় না আর। পাউরুটির একটি টুকরো খেতেই তার খিদে মরে গিয়েছিলো যেন। আসার পথে দেখেছে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে অনেক লোক ঝাঁকায় করে বালু অথবা পাথর নিয়ে ছোটছোট জাহাজে ফেলছে। অনেক আগে তাদের গ্রামের হবিউল্লা এখানে কাজ করার গল্প করেছিলো। কিন্তু যাদু সরকার যদি কাজের কোনো ব্যবস্থা করতে না পারে, তাহলে তাকে সেখানে গিয়েই কাজের সন্ধান করত হবে। তবে, সেখানে কাজ করার অনেক রকম যন্ত্রণা আর বিপদও আছে।কাজের হুড়োহুড়ির সময় ততটা সাবধানতা অবলম্বন করা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে, মাঝেমাঝে সামনের জনের ঝাঁকা থেকে অসাবধানে পাথর গড়িয়ে পড়ে হাতে পায়ে আঘাত লাগার ঘটনাও আছে বিস্তর।

তাকে তন্ময় হয়ে কিছু একটা ভাবতে দেখে যাদু সরকার বললো, এত চিন্তা করিস না! ব্যবস্থা একটা অইবোই!

কী আর ব্যবস্থা অইবো! বলে, অন্তর্গত হতাশা চেপে ফের চুপচাপ নিজের ভাবনায় হারিয়ে যায় মনু মিয়া। যে লোক ভাতের অভাবে বেকারি থেকে বাসি পাউরুটি এনে খায়, সেই লোক যে কতটা কাজের তা আচরণ দেখেই তার অনুধাবন করা উচিত ছিলো। সে মনেমনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, এখান থেকে আজই সে চলে যাবে। খুঁজে বের করবে শীতলক্ষ্যার পাড়ে স্বল্প পরিচিত হবিউল্লাকে।

যাদু মিয়া খাওয়া শেষ করে ঘরের বেড়ায় ঝুলানো হুঁকোটা নামিয়ে ভেতরের পানি বদলায়। তারপর খোলে নতুন পানি ঢেলে নিয়ে বাঁশের চোঙ থেকে তামাক বের করে নিয়ে ছিলিম সাজায়। টিকার অভাবেই হয়তো তাকে দেখা যায় নারকেলের ছোবা দিয়ে আগুন ধরিয়ে গুরুৎ গুরুৎ শব্দে তামাক টানতে।

যাদু মিয়া তামাক সেবনে মগ্ন হয়ে গেলে মনু মিয়ার হতাশা আরো বাড়ে। সে সঙ্গে কী বলে এখান থেকে বেরিয়ে যাবে সে সংলাপের জন্যই হয়তো মনেমনে শব্দ হাতড়ে ফেরে।

হুঁকো টানতে টানতে শেষের দিকে দীর্ঘ একটি গুররর শব্দ তুলে শূন্যে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যাদু মিয়া হঠাৎ কথা বলে ওঠে, বুঝলি মামু! কাম একটা আছে! বছর কামলার মতন। ট্যাহা-পইসা কি দিবো হেইডা লইয়া কোনো কতা অইছে না!

যাদু মিয়ার কথা শুনে ভেতরে ভেতরে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলেও মনু মিয়া কেমন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে যাদু মিয়ার মুখের দিকে।

যাদু মিয়া ছিলিম খুলে নিয়ে হুঁকোটা ফের বেড়ায় লটকিয়ে দিয়ে বাইরে গিয়ে ছিলিমের পোড়া তামাক ঝাড়ে। মাটিতে বার দুয়েক হালকা ভাবে আছড়ে ছাই আর পোড়া তামাকের গুঁড়ো ফেলে দিয়ে ফিরে এসে হুঁকোর নইচায় ছিলিমটা বসিয়ে দিয়ে মনু মিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো আবার, বছর কামলার কাম বইল্যা তরে কইতাম যুত পাইতাছি না। অহন তুই কি কস?

ট্যাহা পইসা না পাইলে আমার এহানো আইয়া লাভডা অইলো কি?

তাইলে ল যাই! এক লগে সব কতা নিজের কানেও হুইন্যা আইবি!

মনু মিয়ার মনে হয় ব্যাপারটা অন্তত একবার হলেও দেখা উচিত। সে শুনেছে শহুরে মানুষ নিজেরা গরম ভাত খায় আর পাশেই দু-তিনদিনের বাসি অথবা পচা পান্তাভাত খায় কাজের মানুষ। বাইরের ঠাট বজায় রাখার জন্য মানুষ যে কত রকম চালাকি আর প্রতারণার আশ্রয় নেয় তার কিছুটা হলেও নিজের চোখে দেখতে পাবে। এতদিনকার শোনা কথার সঙ্গে বাস্তবের মানুষগুলো কেমন সেটাও মিলিয়ে দেখার একটি আগ্রহ তৈরি হয় তার মনে। কিন্তু মনের কথা মনে চেপে রেখেই সে তার মামা যাদু সরকারের সঙ্গে রাস্তা পাড়ি দিতে থাকে।

খুব বেশিক্ষণ হাঁটতে হয় না তাদের। একটি দেয়াল ঘেরা বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যাদু সরকার বললো, আইয়া পড়ছি মামু! দুই বুড়াবুড়ি ছাড়া বাইত কেউ নাই! কয়ডা গরু-ছাগল আর হাঁস-মুরগি আছে হুনছি।

তাইলে কী কাম করন লাগবো?

যাই না আগে। এর পরে জানন যাইবো কী কাম করাইবো?

বড়সড় বন্ধ লোহার গেটের ফাঁকে উঁকি মেরে যাদু সরকার বললো, কেউ আছেননি?

কেরে?

ভেতর থেকে কারো কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এলে যাদু সরকার মনু মিয়াকে বললো, আর কদ্দুরা সবুর কর!

ক্ষানিক পর বড় গেটের মাঝে একটি ছোট জানালার মত দরজা খুলে একজন মাঝ বয়সী লোক মুখ বাড়ায়। কারে চাই? কোন কামে?

যাদু সরকার জানায়, আমি যাদু সরকার। কয়দিন আগে চাচার লগে কতা অইছে। আমার আওনের কতা আছিল।

খাঁড়াও। আমি আগে জিগাইয়া আই!

মনু মিয়া এবার তার কৌতুহল দমিয়ে না রাখতে পেরে বলে ফেলে, এত বড় বাইত বুড়াবুড়ি করে কি? পোলাপাইন নাই?

আছে রে! হুনছি সবেই বড় বড় চারকি করে। জাফান-আম্রিকা থাহে।

এই ব্যাডায় তাইলে ক্যাডা?

চহিদার।

বুড়াবুড়ি কোট্টে কোট্টে কষ্ট না পাইয়া পোলা-মাইয়াগ কাছে গেলেগাইত্তো পারে! কি, পারে না?

যাদু সরকার হুঁহ বলে একবার হাসে। মনু মিয়ার জিজ্ঞাসার কোনো জবাব দেয় না।

ঠিক তখনই আধা মানুষ উচ্চতায় আরেকটি দরজা খুলে লোকটি মাথা বের করে বলে, ভিতরে আইও!

তারা ঢুকেই বিস্তীর্ন ঘাসের ওপর পেতে রাখা টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে থাকা দুজন বেশ বয়স্ক নর-নারীকে দেখতে পায়। এত বয়সে নর-নারী কেউ এতটা সুন্দর আর মায়াকাড়া হতে পারে তা যেন ভাবনায় ছিলো না মনু মিয়ার। অথচ মৃতু্যর আগে তার নানি অনেক বয়স হওয়ার কারণে শেষ দিকে আর হাঁটাচলা করতে পারতেন না। দীর্ঘদিন বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছিলেন বলে, কাউকে ডাকলে সে না শোনার ভান করে সরে যেতো। এ করে করে বিছানা আর পরনের কাপড় প্রায়ই নষ্ট করে ফেলতেন। দুর্গন্ধে কাছে যাওয়া যেতো না। তবু অসহায় অবস্থা দেখে শেষ কদিন সে নিজেই তার নানির কাপড় বিছানা পরিষ্কার করা থেকে খাওয়ানো, প্রতিদিন গোসলের সময় ভেজা কাপড়ে শরীর মুছিয়ে দেওয়া, মাথায় নারকেল তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেওয়া সহ সবই করেছে। এ নিয়ে অন্যান্যরা তাকে নানির সম্পদের লোভী ভাবলেও তার নানি বেশ খুশি ছিলেন তার উপর। প্রতিদিনই দোয়া করতেন, তার যেন সব দিক দিয়ে উন্নতি হয়। যদিও বর্তমানে তার ঘোরতর দুর্দশা চলছে, তবুও সে বিশ্বাস করে মানুষের দোয়া, মন থেকে কারো জন্য কিছু চাওয়া বিফলে যায় না। সে শুনেছে যে, তাদের এলাকার মুন্সীরা অনেক আগে মাটি কাটার কাজ করতো। গরুর গাড়ি চালাতো। কিন্তু সেই মুন্সীর কোনো এক বংশধরই নাকি তার মায়ের অথবা দাদির দোয়াতে জীবনে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিলো। লঞ্চ থেকে স্টিমারেরও মালিক হতে পেরেছিলো। তাই সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, তার নানির চাওয়া কিছুটা দেরি হলেও অপূর্ণ থাকবে না।

বেশ নিশ্চিন্ত মনে কাজে লেগে যায় মনু মিয়া। গরুছাগল আর হাঁস-মুরগির যত্ন-আত্তি সে ভালোই পারবে। কিন্তু রাতের বেলা যখন রান্নাঘরে বসে হাঁড়ি-পাতিল, এঁটো বাসন-পেয়ালা ধুতে বসলো তখনই তার মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিলো কিছুক্ষণের জন্য।

গ্রামের বাড়ি যতটা কষ্টই করুক না কেন, তার মা কখনোই তাকে হাঁড়ি-পাতিল মাজার কাজ করতে বলেনি। তবে, এ কষ্টটাকেও সে দূর করে দিতে পারলো যখন মনে পড়লো, মায়ের কাছে একবার শুনছিলো যে, তার জন্মের পর তার মা বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। সে সময়গুলোতে নিকটজন কারো সহযোগিতা না পেয়ে তার বাবা নাকি সংসারের সব কাজ করতেন। ঘরবাড়ি ঝাঁট দেওয়া থেকে আরম্ভ করে রান্না-বান্না, কাপড় ধোওয়া, গোয়াল ঘর সাফ-সুতরো করা থেকে ক্ষেতের কাজেও অবহেলা করেননি। মায়ের বলা কথাগুলোর স্মৃতিটুকু যেন তাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সালসার কাজ করলো। তখনই তার মনে হলো, বুড়িটা রান্নাঘরে একাএকা রান্না করে কোনদিন কি থেকে কি হয়ে যায় তাহলে তার কাজ চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়ে যায়। আর কর্মহীন অনিশ্চিত ভবিষ্যত দেখতে চায় না সে।

মানুষ দুজন খুবই ভালো মনের বলেই হয়তো যাদু সরকারের হাতে পঞ্চাশ টাকার দুটি নোট তুলে দিয়ে বলেছিলেন, মনু মিয়ার মায়ের হাতে দিবা! আর সে দৃশ্য দেখেই যেন তার মনটা বয়স্ক দুজনের প্রতি আরো দুর্বল হয়ে উঠেছিলো। যে কারণে সে তার জন্য নির্ধারিত ঘরে ঘুমুতে গেলে অন্ধকারেই বিছানা হাতড়ায়। দিনের বেলা বুড়োবুড়ি দুজনে মিলে তাকে ঘরটা দেখিয়ে বলেছিলেন, এই খাটটায় ঘুমাবি। বিছনা পাতিও আছে। অখনই সব ঠিক কইরা ল। কামে ভর্তি হইলে আর টাইম পাবি না! কিন্তু ঘরের ভেতরকার ঘর বলে অন্ধকারটাকে যেন খুব বেশি অন্ধকার বলে মনে হয়। হয়তো ব্যাপারটি খেয়াল করেই রহমান সাহেব এগিয়ে এসে দেয়ালের সুইচ টিপে বাতি জ্বালিয়ে দিতেই ঘরটা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

মনু মিয়া হঠাৎ ভয় পেয়ে মাগো! বলে আর্তনাদ করে উঠলে রহমান সাহেব হেসে উঠে বললেন, ডরাইলি? বাতি না জ্বালায়া আন্ধারে করতাছিলি কি? তার পর তিনি তাকে ডেকে বললেন, তর নাম জানি কি?

মনু মিয়া ত্রস্ত কণ্ঠে বলে, মনু। মনু মিয়া!

ও। অখন চাইয়া দেখ, এইটা হইলো গিয়া সুইচ। এই যে কালা মতন এইটুকা বাইর হইয়া রইছে না, এইটারে এমনে নিচের মিহি নামাইলে বাত্তি জ্বলবো। আর উপরের মিহি উঠাইলে বাত্তি অফ হইয়া যাইবো!

অফ কথাটা বুঝতে না পারেলও রহমান সাহেব দুবার বাতি জ্বালিয়ে নিভিয়ে দেখালে ব্যাপারটি তার বোধের অগোচর থাকে না। তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রহমান সাহেব বললেন, আয়। তুই করা পারছ কিনা আমারে দেখা!

ভয়ে ভয়ে এগিয়ে এসে মনু মিয়া বাতি জ্বলানো নেভানো অনুশীলন করে। ভেতরে ভেতরে শিহরিত হয়। ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর আর জটিল বলে মনে হয়।

এইবার হুইয়া পড়! বলে তিনি চটিতে শব্দ করতে করতে চলে গেলেন।

রহমান সাহেব যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই শোনা যায় তিনি কাউকে ডাকছেন, সালমা, সালমা বেগম গেলা কোনহানে?

এবার বুড়ির কণ্ঠস্বর শুনতে পায় মনু মিয়া, হইছে কি? আমি কি মরছি?

এরপর আর কোনো কথাবার্তা শেনা যায় না। হয়তো তারা তাদের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন।

মনু মিয়া শোওয়ার আগে আরো বেশ কিছুক্ষণ বাতি জ্বালানো-নেভানো খেলা খেলে। কিন্তু বেশিক্ষণ জেগে থাকা সম্ভব হয় না। বিছানায় শুয়ে পড়লে তা মনে হয় বিছানা যেন খুব বেশিই নরম। এত নরম জায়গায় শুয়ে পড়ে তার কেমন অস্বস্তি হতে লাগলো। বেশ কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করলেও তার ঘুম আসে না। শেষটায় বিছানার চাদর আর বালিশ তুলে নিয়ে মেঝেতে পেতে শুয়ে পড়তেই পিঠের নিচে শক্ত মেঝের অস্তিত্ব টের পায়। আর হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ে।

খুব ভোরবেলা সূর্যোদয়ের আগেই তার ঘুম ভাঙে। সুস্থ অবস্থায় কখনো ঘুম থেকে জেগে উঠে সূর্য দেখতে পেয়েছে বলে মনে পড়ে না তার। প্রতিদিনই ঘুম থেকে উঠে রাঙা হয়ে ওঠা পূবের আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে সে। একটু একটু করে সূর্যটাও যেন আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে জেগে উঠে চোখ মেলার আগেই চারদিক কেমন ফর্সা হয়ে উঠতে থাকে। এ সময়টার একটি অদ্ভূত মাদকতা আছে। যা তার নিজের ভাষায় সে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম। আর সে কারণেই হয়তো ব্যাপারটি তার অনুভবের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে।

শীত প্রায় চলে গেলেও বাইরে কুয়াশার অস্তিত্ব বেশ ঘন মনে হয়। যে কারণে গাছের পাতায় পাতায় জমে থাকা শিশির টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায়। আর ক্রমাগত শিশিরের ফোঁটা পতনের ফলে গাছের নিচে নানা জায়গায় মাটি সরে যাওয়াতে ছোটছোট গর্ত দেখা যাচ্ছে। এ সময়টাতে বেশ শীতশীত লাগে মনু মিয়ার। বাড়ি থেকে আসার সময় সে গরম কাপড় হিসেবে কিছুই আনেনি। আসলে তার তেমন কিছু ছিলোও না। রাতে কাঁথা গায়ে ঘুমালেও বাড়তি কিছু তার নেই। তাই এখন শীতের ভাবটা খানিকটা বেশি মনে হলে সে বিছানা থেকে চাদরটা তুলে নিয়ে গায়ে জড়ায়।

ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছন দিককার গোয়াল ঘরটাতে একবার উঁকি মেরে দেখে মনু মিয়া। গতকাল সন্ধ্যায় মাগরিবের আজানের পরপরই গাইটাকে গোয়ালে বেঁধে দিয়েছিলো। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কখন বেরিয়ে এসেছে সে কিছুই টের পায়নি। ঘাসের উপর শুয়ে জাবর কাটছে গাইটা। সে এগিয়ে গিয়ে গোয়াল ঘরে উঁকি মারে ফের। খুঁটিতে দড়ি বাঁধা আছে ঠিকই। কেবল গাইটির গলাতেই দড়ি নেই। ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে একবার অবোলা-অবোধ প্রাণীটির দিকে তাকায়। আরেকবার তাকায় গোয়াল ঘরের দিকে।

সে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গতকালকের ঘটনা মনে করতে চেষ্টা করে। এমনও হতে পারে যে, সে গাইটাকে গোয়াল ঘরে নিয়ে এসেছিলো ঠিকই। কিন্তু কোনো কারণে না বেঁধেই ফিরে গিয়েছিলো। অনেক ভেবেও সে তেমন কিছু মনে করতে পারে না। তার ঠিকই মনে পড়ে যে, গাইটাকে বেঁধে রেখেই সে কিছুটা খড় টেনে দিয়েছিলো। তারপর হাতমুখ ধূয়ে রান্নাঘরে যাওয়ার সময় সালমা বেগম তাকে বলেছিলেন, আজগররে ডাক দেহি!

সে অবাক হয়ে বলে উঠেছিলো, আজগর ক্যাডা?

আরে ছেরা চকিদাররে আইবার ক! সালমা বেগমের কণ্ঠস্বর খানিকটা বিকৃত হলেও মুখাবয়বের কোনো পরিবর্তন পরিদৃষ্ট হয়নি।

মনু মিয়া আজগরের পাহারা ঘরের দিকে যেতে যেতে শুনতে পাচ্ছিলো গেটের ফোকর দিয়ে মাথা বের করে সে বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলছে। সে অবস্থাতেই মনু মিয়া বললো, চহিদার বাই! তোমারে নানি ডাহে!

আজগর খানিকটা বিরক্ত হয়েছিলো হয়তো। কেমন রূঢ় কণ্ঠে বলে উঠেছিলো, চহিদার কিরে? আমি হইলাম সিক্রুডি!

তারপর সে মনু মিয়ার আগে আগে হেঁটে সালমা বেগমের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আজগরকে বলেছিলেন, বাইরের ইয়ার দোস্তগো লগে এত পিতলা আলাপের কোন কাম? গেইটের সব তালা লাগাইয়া চাবি দিয়া যা!

তখনই আজগর ফিরে যেতে যেতে কেমন আড়চোখে একবার তাকিয়েছিলো মনু মিয়ার দিকে।

সালমা বেগম বলেছিলেন, এই চকিদারডা বদেরও বদ! অর লগে মিশবি না!

আর বলতে গেলে তখনই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায় মনু মিয়ার কাছে। একবার তার ইচ্ছে হয় আজগরের পাহারা ঘরে গিয়ে দেখে আসতে। তখনই গাইটা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালে সে গিয়ে গাইটার গলায় দড়িটা বেঁধে দিয়ে খোলা জায়গায় নিয়ে খুঁটির সঙ্গে বাঁধে। সে সময়টাতেই তার ভাবনায় আজগর আলিকে একজন প্রকৃতই শঠ আর কুটিল চরিত্রের মানুষ বলে চিহ্নিত করে সে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতে এখানে শান্তি মত থাকতে গেলে হয় আজগরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে নয়তো সমানে সমানে প্রতিপক্ষ হয়ে লড়তে হবে। মনু মিয়া নিজে যেমন গ্রামের ছেলে, তেমনি হয়তো আজগর আলি। তবুও কেন আজগর আলি কুটিলতাকেই বেছে নিল তা বোধগম্য হয় না তার। এমন হতো যে তার কোনো রকম স্বার্থ জড়িয়ে আছে তেমনও তো মনে হয় না। মনে হয় না যে, সে এ বাড়িতে এসে কাজে লেগেছে বলে, আজগর আলির প্রাপ্তির পরিমাণ কমে গেছে।

তাদের পাশের গ্রাম লক্ষণ হাটের পেশকার অক্ষয় বাবুর বড় ছেলে অখিল তাদের মুনিষ সুনীলকে পছন্দ করতো না বলে তার বাবাকে বলেছিলো সুনীলকে তাড়িয়ে দিতে। কিন্তু অক্ষয় বাবু শোনেননি ছেলের কথা। তাই বাপের কাছ সুনীলকে খারাপ সাব্যস্ত করতে মাঝরাতে গরু দুটোকে ছেড়ে দিতো। আর ছাড়া পেয়ে গরু দুটো বাড়ির পাশের ক্ষেতের অর্ধেক ধানগাছ খেয়ে ফেলেছিলো। তিনচারদিন পর একই ঘটনা ঘটে। অক্ষয় বাবু বাধ্য হয়ে সুনীলকে ছাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

অখিলের কুটিলতায় তার মনোবাসনা পূরণ হয়েছিলো। সুনীল বিদায় হয়েছিলো বাড়ি থেকে। তেমন কোনো স্বার্থ থাকলে না হয় আজগরের কুটিল পথ অবলম্বনকে মেনে নেওয়া যেতো। কিন্তু আজগরের আচরণ সত্যিই বড় অদ্ভূত ঠেকে মনু মিয়ার কাছে।

রান্নাঘরে খুটখাট শব্দ শুনে মনু মিয়া এগিয়ে গিয়ে দেখলো সালমা বেগম একটি টিন হাতে নিয়ে কিছু করছেন। হয়তো খুলতেই চেষ্টা করছিলেন। তা দেখে সে বললো, নানি আমি কিছু করনের আছে?

করলে তো অনেক কিছুই করা পারছ।

কন কি করন লাগবো? বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে সালমা বেগমের পাশে দাঁড়ায় সে।

তিনি টিনটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, এইটার ঢাকনাটা দেখ দেখি খোলা পারছ কি না!

চুলোর পাশেই পেতলের একটি খুন্তি পড়েছিলো মেঝেতে। সেটি তুল নিয়ে টিনের ঢাকনার পাশে লাগিয়ে সামান্য চাড় দিতেই সেটা উঠে এলো। সালমা বেগম খুশি হয়ে বললেন, আরে করছস কি? এই বুদ্ধিটা তো আমারও জাননের কথা আছিলো!

মনু মিয়া হাসে। বলে, নানি, অহন আফনের বুদ্ধিরও বয়স অইছে। এইসব ছোডমোডো বুদ্ধি আফনের মাতাত কাম করে না!

ঠিকই কইছসরে! আমার বয়স হইছে। এই কথাটা মনে থাকে না। অনেক বছর ধইরা নিজে নিজেই সব করতাছি তো, তার লাইগ্যা বুঝা পারি না!

টিনের ঢাকনা খুলে এগিয়ে দেওয়ার সময় মনু মিয়া টিনের ভেতরে তাকিয়ে দেখলো অনেকগুলো সিমের বিচি। আর তা দেখতে পেয়ে তার মনে হলো এত বড় বাড়ি, কত জায়গা এমনি এমনি খালি পড়ে আছে। অথচ শীত চলে গেলেও সিম লাগানোর কথা মনে হয়নি কারো। তার বেশ খারাপ লাগতে লাগলো। বললো, নানি, ঘরে সিমের বীজ আছে, লাগাইলেন না?

এইগিলা তো আমার গাছেরই সিমের বীজ। এইবার শইলে তাল পাইনাই।

সে বুঝতে পারলো, শহরের মানুষ হলেও তিনি সংসারী। মাটি বুঝেন। ফসল বুঝেন। সে মনেমনে ঠিক করে ফেলে যে, এখন থেকে এ সংসারের ভালোর জন্য বিনা খরচের কিছু করতে হলে আর কাউকে জিজ্ঞেস করবে না। সে ফের জিজ্ঞেস করলো, সিমের বীজ দিয়া করবেন কি?

ভিজামু। তারবাদে বালুতে ভাজমু!

এ কথা শুনে কেমন অবাক হয়ে তাকায় সে সালমা বেগমের মুখের দিকে। আর তার অবাক দৃষ্টি দেখেই যেন তিনি তার মনোভাব আঁচ করতে পেরে বললেন, তুই কি মনে করছস এই বুড়ির দাঁত নাইকা? আমগো দুইজনরে দেখলে কি তর এমনই মনে হয়?

মনু মিয়া এ কথার জবাব দেওয়া নিরাপদ মনে করে না। সে কথা ঘুরিয়ে বলে, না, মনে করলাম হুঁটকি দিয়া রানবেন!

তর নানা ওইসবের বাস হুনবার পারে না বইল্যা আনে না। আমিও রান্দি না। রান্দা জানিও না। তয় কি জানস? এইসব শুটকি খাইবার মন চায়। কিন্তু কেমনে খামু ক? পাইলে তো!

এ কথা শুনে বিপুল আগ্রহে সে বলে উঠলো, আমি কিছু কিছু রান্দা জানি! মারে দেখছি সিমের বীজ দিয়া হুটকি রানতে!

সালমা বেগম কৌতুহল নিয়ে তাকান মনু মিয়ার দিকে। বলেন, হাচা কথা? তুই রান্দা জানস?

কিছু কিছু জানি! বলে দাঁত বের করে বোকার মত হাসতে থাকে সে।

তাইলে ক তো হুনি, কি কি রান্দা পারছ?

এবার খানিকটা বিভ্রান্ত দেখা যায় মনু মিয়াকে।

কি? রান্দা পারলে চুপ কইরা আছস কেন?

আমরা অইলাম গ্যারাইম্যা মানু। আমগো রান্দা কি আর আফনেরা সাব মানষ্যে খাইতারবেন?

আরে ছেরা ক না হুনি! তুই রান্দা পারলে তো মাঝে মইধ্যে আমি বিছনা থাইক্যা উঠা না পারলে চাইরটা ভাত পাকাইতে পারবি! হোটেল থাইক্যা ভাত-তরকারি কিনা আননের থাইকা তো ভালো হইবো। নাকি কস?

যদিও সালমা বেগমের জন্ম-বৃদ্ধি-বাস শহরেই। তবুও ছোটবেলা মাঝেমধ্যে নানার বাড়ি যেতেন মায়ের সঙ্গে। তার গ্রাম প্রীতিকে পছন্দ করতেন না সালমা বেগমের বাবা কালেক্টর অফিসের মেজবাবু সামসুদ্দিন চৌধুরী। তিনি মাঝে মধ্যে কোনো কাজে কলকাতা গেলে পরদিনই মা তার হাত মুঠো করে ধরে গ্রামের বাড়ি ছুটতেন। ফিরে আসতেন তার বাবা ফিরে আসার আগেই। নানি অথবা বড় মামির হাতের রান্না, কি মাছ, কি গোস্ত, এমনকি শাক-শুঁটকি যাই রান্না করতেন তাই যেন অসাধারণ স্বাদ-গন্ধে মন ভরিয়ে দিতো। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময়, কে কোথায় ছিটকে গেলেন, জীবীত কি মৃত তারও কোনো হদিস পাননি। সালমা বেগম কী করে যে এ বাড়িতে এসে জুটেছিলেন তাও আজ আর মনে করতে পারেন না। মনে করতে পারেন না সেই নদীটির নাম। মায়ের সঙ্গে নানার বাড়ি বলতে কোন গ্রামে যেতেন। ঘোড়াগাড়ি চড়ে দীর্ঘ একটি সময় চলার পর লঞ্চে উঠতেন। তারপর আরো দীর্ঘ সময় পর তারা দুটো কাঠের উপর দিয়ে হেঁটে নদীর তীরে নেমে পড়তেন। ক্ষেতের আইল ঘুরে ঘুরে পথ চলতে চলতে গাছ-গাছড়ার নিবিড় ছায়া ঢাকা একটি গ্রামের ভেতর দিয়ে পৌঁছে যেতেন নানার বাড়ি। শুধু আবছা মত মনে পড়ে একটি নদী। অনেকগুলো নৌকা। লঞ্চ আর স্টিমার আসা যাওয়া করতো সে নদীতে। মাঝে মাঝে স্টিমারের ভেপু শুনে জেগে উঠতেন মাঝরাতে।

মনু মিয়া জিভ দিয়ে একবার তার নিচের ঠৌঁট চাটে। বলে, ভাত-ডাইল, মাছ-গোস সালুন, ভর্তা-শাকপাতা!

তাইলে তো ভালাই পারস মনে কয়! কবে রাইন্দা খাওয়াবি ক!

মুরগা রান্দা পারস?

মনু মিয়া মাথা দোলায়।

তাইলে আইজই তোর রান্দার পরীক্ষা হইয়া যাউক!

মনু মিয়া সে কথার জবাব না দিয়ে খানিকটা ইতস্ত করে বললো, নানি, বিয়ানে আফনেরা কিছু খান না?

খাই তো! সকালে চা-নাস্তা করি। তর নানা ফজরের নমাজ পড়বার গেলে ফিরনের সময় হোটল থাইকা নাস্তা কিনা আনে। আমি ততক্ষণে চা বানায়া থুই। তারপর তিনি কিছুটা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয় বললেন, এই কথা জিগাছ কেন? তর কি ক্ষিদা লাগছে?

ভোর বেলা ঘুম ভাঙার কিছুক্ষণ পরই তার বেশ ক্ষুধা লাগে। সে সময় সে রাতের বেলা রেখে দেওয়া ভাত খায়। কিন্তু এখানে এত বেলা হয়ে গেল এখনও খাওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না। তাই সে বললো, বিয়ান বেলা ঘুম ভাঙলে আমার জব্বর ভোক লাগে!

তাইলে ফ্রিজে দেখ কাইলকার ভাত-তরকারি আছে। গরম কইরা খাইয়া ল!

মনু মিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সালমা বেগমের মুখের দিকে। কোথায় ভাত-তরকারি রাখা আছে কথাটা সে বুঝতে পারেনি। সে ভাবে কথাটা আবার জিজ্ঞেস করবে কিনা।

তাকে চুপ করে থাকতে দেখে তিনি বললেন, আয় আমার লগে!

তিনি বড় একটি ঘরের ভেতর ঢুকতেই মাঝখানে একটি বিশালাকৃতির টেবিল দেখতে পেলো। টেবিলটার চারদিকে বেশ কটি চেয়ার। এ ঘরটি আগে দেখেনি সে। এখানে আসার কোনো প্রয়োজনই পড়েনি। একটি বড়সড় সাদা বাকসের দরজা খুলে সালমা বেগম দুটো ছোট ছোট ঢাকনাঅলা পাত্র দেখিয়ে বললেন, এই দুইটা বাইর কর। সব পরিষ্কার কইরা খাবি কইলাম। খাওয়া হইলে ডিশ দুইটা ধুইয়া পরিষ্কার কইরা থুবি!

পাত্র দুটো বের করার জন্য বাকসটার ভেতরে হাত ঢুকাতেই তার মনে হলো বাকসটার ভেতর দিকটা বেশ ঠাণ্ডা।

চারটা মোরগ আর ষোলোটা মুরগির ভেতর দশটা মুরগি ডিম দেয়। প্রতিদিন সকালে গোয়াল ঘরের কাজ সেরে গুনেগুনে মোরগ মুরগিগুলোকে পাশের দেয়ালের সঙ্গে লাগানো তিনদিকে তারের জাল দিয়ে ঢাকা আলাদা খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়ে খুদ-কুঁড়ো খেতে দিয়ে মুরগির খোঁয়াড় পরিষ্কার করার আগে ডিম আছে কি না উঁকি মেরে দেখে মনু মিয়া। সে এখানে আসার আগে সব ডিম নিয়ে যেতো আজগর চকিদার। রহমান সাহেব আর সালমা বেগম স্বাস্থ্য আর বয়সের কারণে ডিম-দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।

মনু মিয়া অবাক হয়ে বলেছিলো, কন কি নানি? মুরগার পিছে যত খাওন খরচ যায় হেই ট্যাহা ডিমা বেইচ্যাই পাওনের কতা! চহিদাররে দিলে খরচ কমলো কেমনে?

মনু মিয়ার কথা শুনে সালমা বেগম হাসতে হাসতে বাঁকা হয় যান। শেষে রহমান সাহেবকে ডেকে বলেন, মন্টুর বাপ হুনছো পাগলের কথা?

রহমান সাহেব স্ত্রীর কথা বুঝতে না পেরে বলেন, কোন কথা?

তিনি মনু মিয়াকে দেখিয়ে বললেন, এই পাগলে কয়, আণ্ডা বেইচা মুরগার খাওন কিনা আনবো!

স্ত্রীর কতা শুনে হাসিমুখে রহমান সাহেব বললেন, কথা তো ঠিকই কইছে! খুদ-কুঁড়া কিনতে বিশ-পঁচিশ ট্যাকার কম লাগনের কথা না। হিসাব কইরা দেখছো কতট্যাকা যায়? পোলায় কথা তেমন ভুল কয় নাই!

সালমা বেগম ফের হাসতে হাসতে বলেন, কে বেচবো, তুমি? রাস্তায় ঘুইরা ঘুইরা চিল্লাইবা আণ্ডা রাখবেন, আণ্ডা!

হুন বউ, হাসনের কথা না কইলাম। আমরা কি ঘরে ঘরে দুধ বেচতে যাইতাম? পারুলের মায় আইসা দুধ দোয়াইয়া মাইপ্যা নিয়া যাইতো না? হ্যায় কি তোমারে দুধের ট্যাকা দিতো না? এমন কারু লগে কথা কইয়া নিলেই হইবো। তিন-চাইরদিন পরপর আইসা আণ্ডা নিয়া গেল!

তাইলে যার ব্যবস্থা তারে করতে কও! বলে, সালমা বেগম রান্নায় মনোযোগ দিয়েছিলেন।

রহমান সাহেব বলেছিলেন, কাইলকা তুই আমার লগে বাজারে যাবি। নাইলে রাস্তার মোড়ে যেই মুদি দোকানটা আছে না, দোকানদারের লগে কথা কইয়া লবি। হ্যায় যেই দামে কিনে তুইও তারে হেই দামে দিয়া দিলি!

আমগো গ্যারাম এমন না। দুই-তিন দিনে ডিমা ব্যাহারি আইয়ে। বাড়ি বাড়ি ঘুইরা ডিমা কিন্যা নেয়। কোনো কোনো বাইত থাইক্যা একটা ডিমাও কিনে।

এমন চমৎকার একটি ব্যাপার জানা ছিলো না রহমান সাহেবের। বললেন, এমন হইলে তো ভালাই অইতো।

পরদিনই বাজারে গিয়ে ডিম বিক্রতাদের সঙ্গে কথা বলে তেমন একটা পাত্তা পায় না মনু মিয়া। শেষে রাস্তার মোড়ের বুড়ো মুদি দোকানী ইসুব মিয়ার সঙ্গেই কথা পাকা করে আসে। আর এ কথা কোনোভাবে জানতে পেরে আজগর চকিদার রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললো, আম্মায় কি গরিবের প্যাডে লাত্থি দিতে পারলেন?

সালমা বেগম অবাক হয়ে বললেন, এইটা কেমন কথা কইলি তুই? তোর প্যাটে লাথি মারলাম ক্যামনে?

আজগর সালমা বেগমের দিকে মুখ তুলে তাকায় না। হয়তো তার ভেতরকার ক্রোধ দৃষ্টিকেও আচ্ছন্ন করে থাকতে পারে। তাই তার চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয় না। বলে, আণ্ডাগুলা আমি নিতাম। মনু মিয়ার কথায় বুদ্ধি বদলায় ফালাইলেন। আমার অন্যায়ডা কি?

সালমা বেগম এবার বুঝতে পারেন যে, আজগরের মূল রাগ মনু মিয়ার ওপর। তাই কৌশলে মনু মিয়ার ওপর দোষটা চাপিয়ে দিলো। তবে, আজগর অনেকদিন ধরেই এখানে আছে। বলতে গেলে কিশোর বয়স থেকেই। কিন্তু মনু মিয়ার মন মানসিকতা আর আজগরের মন মানসিকতায় অনেক প্রভেদ। মনু মিয়া যতটা আন্তরিকতা নিয়ে কাজকর্ম করে তার মাঝে এমনটা কখনোই দেখা যায়নি। সুতরাং আজগরকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো মানে নেই। তাই তিনি কিছুটা রুক্ষস্বরে বললেন, তোরে কি মাসে মাসে বেতন দেই না? দুই ঈদে নতুন কাপড় দেই না? বেতনের পরেও তিনবেলা ডাইকা আইনা খাইতে দিয়াও যদি তর মনে হয় যে, প্যাটে লাত্থি মারতে পারি, তাইলে তর মত এমন নিমক হারাম আমার বাইত্যে থাকনের কাম নাই!

রহমান সাহেব স্ত্রীর উচ্চকিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে ছুটে এলেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগি এভাবে রাগারাগি করলে বিপদের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই তিনি রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, এত চ্যাতলা কেন? তারপর আজগরের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি কইছছ তুই?

আজগর কোনো জবাব না দিয়ে তেমনি আনত দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকে।

সালমা বেগম বললেন, মুরগির আণ্ডা দেওন বন্ধ হইছে দেইখ্যা তার জিগরে লাগছে। কয় প্যাটে লাত্থি মারছি! এমন নিমক হারামরে কামে রাখলেও আরো বিপদ হইবো! এইটারে বিদায় করনের ব্যবস্থা কর! গতরে চর্বি হইয়া গেছে!

হয়তো প্রসঙ্গ থেকে দূরে নিতেই রহমান সাহেব বললেন, তরে যে কইছিলাম রাজমিস্ত্রিরে খবর দিতে, কইছিলি?

নাহ! গিয়া হুনি কামে গেছে!

তরে না কইছিলাম সক্কাল সক্কাল যাইতে!

আমি যাওনের আগেই হ্যায় বাইর হইয়া গেছে।

রহমান সাহেব খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললেন, তরে এত কইরা কই, তাও যদি কোনো একটা কাম ভালা মতন করতে পারতি!

আজগর চুপচাপ থাকলে রহমান সাহেব বললেন, সন্ধ্যার সময় আবার যাবি। কাইল সক্কাল সক্কাল আইয়া পড়তে কবি! তারপর তিনি ফের বলেন, মনে থাকবো তো? নাকি ইয়ার-দোস্তরা গেইটের সামনে আইলে সব ভুইল্যা যাবি?

না। ভুলুম না!

মনে কইরা কইস। বিষ্টি-বাদলার দিন আইতে বেশি দেরি নাই!

আজগর দাঁড়িয়ে থাকলে, তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, কিছু কইবার চাস?

দশটা ট্যাকা যদি দিতেন!

দশট্যাকা দিয়া করবি কি? আর যা তর বেতন সব নিয়াও আরো বিশট্যাকা বেশি নিয়া নিছস! পুরা মাসতো পইরাই থাকলো!

এবার আজগর চোখ তুলে তাকায়। বলে, শেষবার দেন, এই মাসে আর চাইতাম না!

রহমান সাহেব হেসে উঠে বললেন, আগেও তো এই কথাই কইছিলি!

আজগর কিছু না বলে মাথা চুলকায়।

সকালের দিকে রাতের বাসি ভাত-তরকারি খাওয়ার পর আর কিছু করার থাকে না মনু মিয়ার। দুপুরের খানিকটা আগে দিয়ে যদি সালমা বেগম তাকে রান্নাঘরে ডাকেন তো কিছু তরি-তরকারি বা মাছ-গোস্ত কেটেকুটে চাল ধূয়ে দেওয়ার পর ফের খাওয়ার আগ পর্যন্ত তার তেমন কাজকর্ম থাকে না। দুপুরের খাওয়ার পর হাঁড়ি-বাসন-কোসন পরিষ্কার করে গাইটাকে কিছু খেতে দেয়। কোনো দিন কলের মুখে দীর্ঘ পাইপ লাগিয়ে সেই পানি দিয়ে ফেলে দেওয়া গন্ধসাবান দিয়ে ডলে গাইটাকে গোসল করায়। গাইয়ের জন্য সাবান দেখে একদিন রহমান সাহেব আর সালমা বেগম দুজনেই হাসতে হাসতে যেন পড়ে যাবেন এমন হয়। রহমান সাহেব বলেছিলেন, গরুরে সাবান দিয়া গোসল দিতে কই দেখছস? আরো জমিদারেও মনে কয় এমন করবো না!

মনু মিয়া গাইটার শরীরে সাবান ডলতে ডলতে হেসে বলেছিলো, টুকরা-টাকরা সাবান কতডি জমছে! হালায় না দিয়া কাম লাগাইতাছি!

গতকালই গাইটাকে গোসল দিয়েছে সে। এখন ঘরে শুয়ে শুয়ে সে কিছু একটা করার কথা ভাবছিলো। এভাবে শুয়ে বসে থাকাটা তার জন্য অস্বস্তিকর। এখানে আসার কদিন পরই মুরগির খাঁচাটার পাশে প্রায় মরে যাওয়া বেশ ক’টি অচেনা গাছ দেখতে পেয়েছিলো সে। সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে সেগুলোর গোড়ায় পানি দিয়ে দিতো। গোড়ার দিকের আগাছা সাফ-সুতরো করে গোয়ালঘরের পেছনে স্তুপ করা পুরোনো গোবর সার এনে দিয়েছে। দিনে দিনে গাছগুলোর মাঝে বেশ সতেজতা ফিরে এসেছে। এখন গাছগুলোর দিকে তাকালে খুব ভালো লাগে তার। কিন্তু ফুল ফোঁটার কোনো লক্ষণ দেখতে না পেয়ে মাঝেমাঝে তার মন খারাপ হতো। তারপর দু-তিনদিন পরপর যত্ন নিতো গাছগুলোর। ভাবতো গাছগুলো হয়তো পুরুষ নয়তো বন্ধ্যা নারীর মতই ফুল-ফলহীন। তবুও তার সান্ত্বনা থাকে এই ভেবে যে, গাছগুলো তাদের জীবন ফিরে পেয়েছে। আগের চেয়ে দেখতে অনেক ভালো লাগে।

একাএকা থাকলে তার মন খারাপ হয়ে যায়। বাড়ির কথা মনে পড়ে। মরিয়ম আর মাকে দেখতে মনটা খুব ছটফট করে। কিন্তু যাদু মিয়া তাকে এক্ষুনি বাড়ি যাওয়ার কথা ভাবতে বারণ করে দিয়েছে। বলেছে তারা বেশ ভালোই আছে। বাড়ির ঢালুতে একটা জমিতে লাউ আর পাতাসিম লাগিয়ে এসেছিলো সে। লাউ-সিম নাকি এখন ভালোই বিক্রি হচ্ছে। তার ইচ্ছে হয় যে, তাদের গাছের লাউ আর সিম এই দু বয়ষ্ক জনের জন্যও কিছুটা নিয়ে আসে। আর তখনই তার মনে হয়েছিলো যে, যাদু মিয়াকে যদি কথাটা বলে দিতো তাহলে হয়তো সে কিছু না কিছু নিয়ে আসতে পারতো। মনু মিয়া মনেমনে ঠিক করে রেখেছে, যাদু মিয়া এবার তার সঙ্গে দেখা করতে এলে লাউ-সিম নিয়ে আসতে বলবে।

আজও সে ঘর থেকে বেরিয়ে ফুলগাছগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পায় একটি গাছে রক্তের মত ঘন কলি চোখ মেলতে আরম্ভ করেছে। এতদিনকার শ্রম আর ভালোবাসার প্রতিদানের মতই মনে হচ্ছিলো ব্যাপারটি। অকস্মাৎ অপার খুশিতে কী করবে তাই যেন ভেবে পাচ্ছিলো না সে।

সে কিছুক্ষণ এদিক ওদিক চেয়ে নিজের অস্থিরতাকে বাগে আনতে চেষ্টা করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কেমন অদ্ভূত ধরনের একটি কম্পন অনুভূত হলে সেখানেই ঘাসের ওপর থেবড়ে বসে পড়ে। অচেনা গাছগুলোকে বেশ আপন মনে হতে থাকে। মনে হতে থাকে গাছগুলো যেন ঠিক ঠিক তার মনের কথা বুঝতে পারে।

তার মনে পড়ে মরিয়মের যেদিন জন্ম হয় ঠিক এমনই এক অদ্ভূত ভালো লাগায় শিহরিত হচ্ছিল বারবার। সেদিন সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। আর বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মায়ে কোঁকানোও বাড়ছিলো। রান্নাঘরে শাড়ি দিয়ে আড়াল করে কলাপাতায় শুইয়ে দাই নানি সহ আরো মেয়েরা ভিড় করে তার মাকে ঘিরে বসেছিলো। মায়ের কষ্টে তারও কান্না পাচ্ছিলো। সে রান্নাঘরের কাছাকাছি যেতেই একজন বুড়ি মত মহিলা বললো, আরে পোলা শয়তানি না কইরা আল্লারে ডাক!

ততটুকু বয়সেই সে বুঝে গিয়েছিলো যে, আল্লা সবার ডাক শোনেন না। তার কিছু কিছু পছন্দের মানুষ আছে। তারা ডাকলে তিনি ঠিকই সাড়া দেন। কাজেই সে অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে মনের কষ্ট ভুলে থাকতে চেষ্টা করছিলো। খুব বেশি বৃষ্টি হওয়ার কারণে হয়তো সেবার বর্ষার পানি বাড়ির উঠোনের কাছাকাছি এসে গিয়েছিলো বলে যখন তখন সেই পানিতে নেমে ছোট ছোট চক্কুনি আর দারকিলা মাছ ধরার প্রিয় খেলাটা খেলতে চেষ্টা করছিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর পরই রান্নাঘর থেকে কেউ না কেউ বলে উঠছিলো, আল্লারে ডাক! আল্লারে ডাক! আর তা শুনে তার মনপ্রাণ ছুটে যাচ্ছিলো রান্নাঘরের দিকে। ঠিক তখনই তার বাবা একটি নৌকা নিয়ে এসে বলছিলো, তর চাচি-জেডিগোরে ক তর মারে নাওয়ের উফরে দিয়া যাইতো!

মনু মিয়া ছুটে যাচ্ছিলো সেদিকে। আর তখনই হয়তো কারো ডাক আল্লার কাছে পৌঁছে গিয়েছিলো। একটি তীক্ষ্ন আর যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকার শুনে সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলো। এ চিৎকার তার অনেক চেনা। কোনো শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই এমন ট্যাঁ করে একটি চিৎকার দিয়ে ওঠে। সেটা সে হয়তো খুব ভয়ের কারণে করে। অথবা নিষ্ঠুর মানুষগুলোর শক্ত হাতের চাপ সইতে না পেরেও এমনটা করতে পারে। একজন কেউ মুখ বাড়িয়ে বললো, মউন্যারে, তর বইন অইছে!

তারপরই সে ছুটে গিয়েছিলো রান্নাঘরে। শাড়ির আড়ালের বাধা অতিক্রম করে সে পৌঁছে গিয়েছিলো তার মায়ের কাছে। তার মায়ের দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছিলো। কিন্তু মা হাসছিলো তার দিকে চেয়ে। মুখ আর ঠোঁট দুটো কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিলো।

মনু মিয়া মায়ের চোখে পানি দেখে কেঁদে বলেছিলো, মা তোমার কত কষ্ট অইতাছে না?

মা এক হাত তার মাথায় রেখে বলেছিলো, আর কষ্ট নাই! তর বইনেরে দেখছসনি? দেখতে তর মতন অইছে বলে!

হঠাৎ একটি মুরগির কড়কড় শব্দ শুনে তার ভাবনার তার কেঁপে উঠে যেন। আর সঙ্গেসঙ্গে বাস্তবতা তাকে জানিয়ে দেয় মুরগিটা নিশ্চই ডিম পেড়েছে। ডিম পাড়ার আগে পরে মুরগি এমন কিছু বিচিত্র শব্দ করে জানান দেয়।

সে উঠে মুরগিটা যেদিক থেকে আসছিলো সেদিকে যায়। খড়ের গাদার কাছাকাছি মুরগিটা প্রথম ডেকে উঠেছিলো। শেষে খড়ের গাদার নিচে উঁকি দিতেই দেখতে পেলো আরেকটি মুরগি বসে আছে। তার খানিকটা পাশেই দুটি সাদা ডিম পড়ে আছে। তাহলে আরকটা মুরগি ডিম পাড়তে আরম্ভ করলো। বসেথাকা মুরগিটাকে হুস হাস করে তাড়াতেই দেখতে পেলো আরো কিছু ডিম আছে। মুরগিটা হয়তো সেগুলোতে তা দিতে বসেছে।

খানিকটা হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গতে সে খড়ের গাদার নিচে ঢুকতে চেষ্টা করেও পারে না। পিঠ আটকে গেছে খড়ের গাদার মাচার বাঁশে। মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লে হয়তো সে ঢুকে ডিমটা আনতে পারতো। কিন্তু মাটিতে শুয়ে পড়েও সে সেভাবেই থাকে কিছুক্ষণ। ভাবে যে, নতুন ডিমগুলোও থাকুক। আর যে মুরগিটা তা দিতে বসেছে সেটাও তেমনি থাকুক। কিন্তু রাতের বেলা চিকা বা ইঁদুর যদি কোনো সমস্যা না করে ক্ষতি নেই। আর এমন সমস্যা থাকলে আগের মুরগিটা দশ-বারোটা ডিম তা দিতে বসতে পারতো না।

সে সেখান থেকে উঠে এসে গাইটার কাছে যেতে যেতে ভাবে যে, এভাবে কিছু মুরগির বাচ্চা ফোটানোরও দরকার আছে।

সকালের দিকে হঠাৎ করেই বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন রহমান সাহেব। তাদের ডাক্তার বন্ধু শৈলেশ বর্মন এসে খানিকটা রাগারাগি করলে রহমান সাহেব বন্ধুর হাত ধরে বললেন, দোস্ত তুই আগে আমার কথাটা হোন!

ডাক্তার সরোষে রহমান সাহেবের হাত সরিয়ে দিয়ে বললেন, তরে কইছিলাম দুধ-ডিম আর এইসবের তৈরী হাবিজাবি কিছু না খাইতে। এক ঠ্যাং কবরে গিয়া রইছে অখনও নোলা সামলাইতে পারছ না! কই নাই তর নোলা তরে একদিন শেষ করবো!

খানিকটা বিষন্ন হাসি হেসে রহমান সাহেব বললেন, দোস্ত দশ বছর ধইরা তো একই কথা কইতাছস, অখনও তো মরলাম না!

তাইলে মর! আমি যাই!

না দোস্ত, আমারে অষুধ দিয়া যা। কাইলকা সকালের আগেই আমারে যেমনে হউক সুস্থ হইতে হইবো।

এবার ডাক্তার শৈলেশ বর্মনের মুখে কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো। বললেন, কাইলকা শহিদ মিনার যাইবা। ফুল দিবা। তারপরে তোমার দেশ উদ্ধার হইয়া গেল! অথচ পোলা মাইয়াগুলারে বানাইছস আম্রিকান-জার্মান!

দোস্ত এখন ভাবতাছি এইটাই আমার মস্ত একটা ভুল আছিলো। ভাবছিলাম, নিজে তো অভাবে ডিগ্রি লইতে পারলাম না। জীবনভর কেরানিগীরি করলাম। বাবায় যদি এই বাড়িটা না কিনতো আর লঞ্চ দুইটা না থাকতো তাইলে কি আমার পোলা মাইয়ারা মানুষ হইতো?

কেন? তুমি কি উল্লুক আছিলা?

রহমান সাহেব ক্লিষ্ট হাসি হাসতে হাসতে বলেন, আবার চিপা দিছে। তুই বয়, আমি আইতাছি!

রহমান সাহেব ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে শৈলেশ বর্মন সালমা বেগমকে বললেন, সত্যি কইরা ক তো সালমা, তর পুডিং খাওনের শখ হইলো কেন?

সালমা বেগম বললেন, আমার কি আর এমনে এমনে শখ হইছে? আপনের দোস্ত কইলো কতদিন ধইরা পুডিং বানাও না। আণ্ডারও অভাব নাই। খোদা না করে যদি দুই একদিনের মইধ্যে মরি তাইলে আমার আত্মাটা মুরগির খোঁয়াড়ে আইসা বাসা বানাইবো।

আর তুমি পইট্যা গেলা। পুডিং বানাইলা। ফটকাটারে খাওয়াইলা আর বিধবা হওনের ডরে আমারে বাইন্ধা আনলা।

এমন কথা কইলে কি মন মানে? বলে সালমা বেগম যেন উত্তরের প্রত্যাশায় চেয়ে থাকেন শৈলেশ বর্মনের মুখের দিকে।

নাহ! মন মানে না। তুই বুদ্ধু আছিলি বইল্যাই তরে পটাইয়া বিয়া করতে পারছিলো। সংসারী হইতে পারছিলো। নাইলে এর কপালে বউ জুটনের কথা আছিলো না। অন্তত হেই সম্ভাবনা আছিলো না।

সালমা বেগম সে কথার ধারেকাছে না গিয়ে বললেন, আজকের মইধ্যে ঠিক হইবো তো?

আর কিছু না খাইলে পেটের ভিতরে যা আছে, বাইর হইয়া গেলেই ঠিক হইয়া যাইবো। ডরাইস না! একটা স্যালাইন দিয়া সারাদিন রেস্টের ব্যবস্থা কইরা যামু।

ডাক্তারের কথা শুনে সালমা বেগমের মুখটা বেশ উজ্জ্বল হয় উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, আপনের লাইগা পুডিং নিয়া আসি?

তখনই রহমান সাহেব ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, দোস্ত হ্যাবভি টেস্ট হইছে! আমি তো একলাই দুই জামবাটি পুরাইয়া খাইছি!

খুব ভালা করছস! আইজ সারাদিন আর কিছু খাইতে পারবি না। স্যালাইন দিতে হইবো।

স্যালাইনের কথা শুনতেই রহমান সাহেবের মুখটা যেন অর্ধেক হয়ে গেল। তারপর বললেন, কাইলকা সকালের দিকে বাইর হইতে পারমু তো?

একবার না গেলে হয় কি? প্রত্যেক বছর যাইতে হইবো এমন তো কথা নাই!

কথা নাই মানে? যেন আকাশ থেকে পড়েই নির্বাক হয়ে গেলেন রহমান সাহেব।

শৈলেশ বর্মন ব্যাগ খুলে স্যালাইনের একটি কাচের বোতল বের করে বললেন, বোবা হইয়া গেলি নাকি?

তুই কথাটা কইলি কি? সেই প্রথমবার থাইক্যা আমি যাইতাসি, মরার আগ পর্যন্ত যামু যেমনে পারি। মিছিলে থাকতে পারছিলাম আর তাগরে মনে কইরা সম্মান করতে যামু না?

তর সামর্থ না থাকলে যাবি কেমনে?

দরকার হইলে ঠেলাগাড়িতে শুইয়া শুইয়া যামু। তারপরই তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন শৈলেশ বর্মনকে, তর বাগানে ফুল আছে না? রাইতে যামু, নাইলে মনু মিয়ারে পাঠামু। কয়টা ফুল দিয়া দিবি!

তখনই মনু মিয়া দরজার বাইরে থেকে বলে উঠলো, আমরার গাছোই ফুল আছে রাইজ্যের!

কস কি? গাছতো সব মইরা গেছিলো দেখছিলাম! সালমা বেগম বিস্ময় গোপন করতে পারেন না।

মনু মিয়া দাঁত বের করে হাসিমুখে জানায়, আমি পরতিদিন পানি দিছি। হাস-গোবর দিয়া গোড়া নিড়াইয়া দিছি। অহন কত সোন্দর ফুল অইছে!

তখনই ব্যস্ত হয়ে রহমান সাহেব বলে উঠলেন, চল তো শৈলেশ দেইখ্যা আসি!

না। তুই যা! আমি নাস্তা কইরা আই নাই!

রহমান সাহেব বেরোতে বোরোতে শুনতে পেলেন, শৈলেশ বর্মন বলছেন, সালমা, জলদি যা দিদি! জামবাটি পুরাইয়া নিয়া আয়!

মোরগ-মুরগির খোঁয়াড়টার পাশে বেশ কিছুটা জায়গা বাগানের জন্য রাখা হয়েছিলো। এখানটায় ঠিক মত আলোবাতাস চলাচল করতে পারে বলে সালমা বেগম নিজে পছন্দ করে প্রথমবার ফুলগাছ লাগিয়েছিলেন। তারপর অনেক বছরই চর্চাটা ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু এবারই সালমা বেগম কেমন যেন হেলে পড়া সূর্যের মতই খানিকটা নিস্তেজ হয়ে গেছেন। বেশ কিছু ফুলগাছ তাজা দেখালেও কেবল গন্ধরাজ আর জবাফুলই আছে। তবুও রহমান সাহেব বেশ খুশি হয়ে উঠলেন। বললেন, খুব ভালা একটা কাম করছস! তরে এই মাসে ভালা একটা বখশিখ দিমু!

রহমান সাহেব দ্রুত ঘরে ফিরেই বিছানায় শুয়ে পড়ে শৈলেশ বর্মনকে বললেন, তুই পরে সারাদিন লাগাইয়া খাইস। আগে আমারে স্যালাইন লাগা!

শৈলেশ বর্মন আয়েশ করে চামুচে নিয়ে পুডিং খেতে খেতে মিটমিট করে হাসছিলেন আর মাথা ঘুরিয়ে রহমান সাহেবের দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিন্তু রহমান সাহেব ছটফট করলেও তার অস্থিরতা যেন তাকে মোটেও স্পর্শ করছিলো না।

খুব ভোরবেলা ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগে রহমান সাহেব মনু মিয়ার রুমে উঁকি দিয়ে তাকে দেখতে না পেয়ে কিছুটা অবাক হয়ে গেলেন। তারপর কিছু একটা ভাবতে ভাবতে গেট খুলে বাইরে বেরোবার আগে আজগরকে ডেকে তুলে বললেন, আমি আইতাছি। ঘুমাইয়া পরিস না জানি!

আজগর বিছানায় উঠে বসে চোখ ডলতে ডলতে হাই তুলে বললো, আইচ্ছা যান!

আজগর তার ঘরের জানালা দিয়ে একবার বাইরে উঁকি দিয়ে ফের বিছানায় গিয়ে বসে। জানালা পথে দেখতে পায় মনু মিয়া মোরগ-মুরগিগুলোকে খোঁয়াড় থেকে বের করে তারের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তখনই সে আবার উঠে জানালায় মুখ বাড়িয়ে শব্দ করে থুতু ফেলে।

শব্দ শুনে মনু মিয়া একবার ফিরে তাকালেও কিছু বললো না। বাসিমুখে কেউ কথা বললে তার মনে হয় যে, সেই মুখ থেকে ভকভক করে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।

আজগর নিমের দাঁতন হাতে ঘর থেকে বের হয়ে পকেট গেট খুলে বাইরে যায়। তারপরই শোনা যায় কারো সঙ্গে কিছু বলতে। মনু মিয়া সবটা বুঝতে না পারলেও কাউকে সময় মত চলে আসার কথাটা পরিষ্কার শুনতে পেলো।

মোরগ-মুরগির খাবার দিয়ে মনু মিয়া গোয়ালঘরের কাছে গিয়ে খড়ের গাদার নিচে উঁকি দিয়ে কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে কোনো শব্দ শুনতে চেষ্টা করে হয়তো। কিন্তু প্রত্যাশা পূরণ না হওয়াতে তার মুখের ভাবে কোনো রকম পরিবর্তন হয় না। আর তাই হয়তো বিরস মুখে উঠে গিয়ে গোয়ালঘরের দরজা খুলে গাইটাকে বের করে এনে খোলা জায়গায় খুঁটির সঙ্গে বেঁধে কিছু খড় টেনে দেয়।

ঠিক তখনি রহমান সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়। মনু মিয়া কই গেলি?

মনু মিয়া রহমান সাহেবের ডাক শুনতে পেয়ে ছুটে যায়। নানা ভাই!

রহমান সাহেব আর সালমা বেগমের হাতে তাজা ক’টি ফুল। মনু মিয়া সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, তুই করস কি? যাবি না?

মনু মিয়া বুঝতে পেরে বললো, কই?

আরে আমাগো লগে! জলদি তৈয়ার হইয়া আয়!

মনু মিয়ার তৈরি হওয়া বা না হওয়া একই কথা। গামছাটা কোমর থেকে খুলে নিয়ে হাত-মুখ মুছে নিয়ে বললো, আমি তৈয়ার!

তাইলে তর হাতে ফুল কই?

সালমা বেগমের কথা শুনে মনু মিয়া নির্বোধের মত তাকিয়ে থাকলে সালমা বেগম বললেন, তর লাইগা দুইটা আছে। যা নিয়া আয়!

মনু মিয়া তার এত যত্নের গাছগুলোতে কেবল দুটো ফুল দেখতে পেয়ে কেঁদে ফেলার অবস্থা হলো। ফুল-ফল গাছে দেখতেই সুন্দর! কিন্তু যারা এই গাছগুলোর প্রকৃত মালিক তারাই ফুলগুলো ছিঁড়ে নিয়েছেন। যে কারণে তার কিছু করার বা বলার নেই। এখন হুকুম হয়েছে বাকি দুটো ফুলও ছিঁড়ে নিয়ে বাগানটাকে নগ্ন করে দিতে। হিন্দুরা না হয় পূজা করে বলে তাদের ফুলের প্রয়োজন আছে। মুসলমান হয়ে তারা ফুল নিয়ে যাবেন কোথায় ব্যাপারটা বোধগম্য হয় না মনু মিয়ার। মনে কষ্ট হলেও সে ফুল নিয়ে ফিরে আসে।

চল যাই! বলে, রহমান সাহেব গেটের দিকে এগোতে এগোতে আজগরের উদ্দেশ্যে বললেন, আজগর আলি, ভালা কাম তো তরে দিয়া হইবো না, আমাগো লগে যাইতে রাজি হইলি না, তয় বাড়ি খালি পাইয়া ইয়ার দোস্ত নিয়া বাজার বসাইস না!

কতক্ষণে ফিরা আইবেন? গেট খুলে দিতে দিতে জানতে চায় আজগর।

শহিদ মিনারে ফুল দিতে যতক্ষণ লাগে আর কতক্ষণ ঘুরতে ফিরতে যতক্ষণ লাগে! তা ধর, ফিরতে ফিরতে বেলা খাড়া হইয়া যাইবো!

ঠিক আছে, চিন্তা কইরেন না!

রহমান সাহেব আর সালমা বেগমের পেছন পেছন গেটের বাইরে বের হয়ে এলে বাড়ির সামনের রাস্তায় একটি এক ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে দেখতে পায় মনু মিয়া। প্রথম ঢাকা শহরে এসে ঘোড়ার গাড়ি দেখতে পেয়ে তার শখ হয়েছিলো এতে চড়ে দেখবে। কিন্তু এ পর্যন্ত ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার সুযোগ বা উপলক্ষ কোনোটারই সাক্ষাৎ পায় নি সে।

রহমান সাহেব মনু মিয়ার দিকে একবার ফিরে ঘোড়ার গাড়িটি দেখিয়ে বললেন, এইটা চিনস?

ঘোড়ার গাড়ি! বলে, সে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।

যা উইঠা বয়! এইটার নাম টমটম। এক ঘোড়ায় টানে।

মনু মিয়া যুগপৎ বিস্ময় আর অবাক হওয়ার ঘূর্ণিপাকে পড়ে কী করবে বুঝতে পারে না। তখনই সালমা বেগম মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, কি কয় বুঝস না?

মনু মিয়া মহানন্দে লাফিয়ে উঠলো গাড়িতে। তারপর কোচোয়ানের পাশে গিয়ে বসলো।

রহমান সাহেব আর সালমা বেগম আস্তে-ধীরে উঠে সিটে বসলে, মনু মিয়া পেছন ফিরে আনন্দে উদ্ভাসিত মুখে জানালো, এহানতেনে হগল কিছু দেখতাইরাম!

সালমা বেগম বললেন, আরে গাধা আমাগো সামনে আইসা বয়!

মনু মিয়া দৃষ্টিতে পরম বিস্ময় নিয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বললো, এহেনোই ভালা! কত কিছু দেহা যায়!

আইচ্ছা, তুই কত কিছু দেখতে থাক, বলদ! বলে, সালমা বেগম হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়েন সিটের ওপর।

রহমান সাহেব কোচোয়ানের উদ্দেশ্যে বললেন, মেডিক্যালের সামনের রাস্তা দিয়া যাইস! তারপরই তিনি সালমা বেগমকে বললেন, আহা, জাগাটা দেখলে আমার খুশিও লাগে আবার খারাপও লাগে! আমরা মিছিলে যামু ঠিক করছিলাম, কিন্তু তার আগেই গুলি শুরু হইলো! আহা!

শহিদ মিনার যাওনের সময় প্রত্যেক বছরই এই কথা কও! সারা বছরে একবারও তো কইতে শুনি না! বলে, ঘাড় ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকান।

রহমান সাহেব স্ত্রীর কথার জবাব দিতে কোনো আগ্রহ বোধ কেরেন কিনা বোঝা যায় না। হয়তো এমনও হতে পারে তিনি সে কথা শুনতে পাননি। একমনে রাস্তায় চলাচল করা লোকজন, গাড়ি-ঘোড়া দেখতে থাকেন।

১০

ঘোড়ার গাড়ি চলতে আরম্ভ করলে কালো রাস্তার ওপর দিয়ে হালকা ছন্দে ছুটন্ত ঘোড়ার ক্ষুরের ঠকাঠক শব্দ কান পেতে শোনে মনু মিয়া। বড্ড অদ্ভুত সে ধ্বণি! কেমন যেন নেশা ধরে যায়। ঘোড়ার ক্ষুরধ্বণি শুনতে শুনতে হঠাৎ তার মনে হয় যে, ঘোড়ার গাড়ি চালানোর কাজটা খুব একটা মন্দ না হলেও মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাটা খুব বেশি সুবিধার বলে মনে হয় না। প্রতিদিন কাজ খোঁজার মতই, যা না পেলে পুরো দিনই মাটি বলতে গেলে। আর এভাবেই শ্রমজীবী মানুষেরা সুবিধাবাদী মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে বাঁধা পড়ে যায় ধীরে ধীরে।

চলতি রিকশায়ও অনেক যাত্রীর হাতে ফুল দেখা যায়। কারো হাতে অনেক ফুল দিয়ে বানানো তোড়া। কেউ বা কোলে দাঁড়া করিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চাকার মত গোলাকার কিছু। নানা বর্ণের পাতার চাকতির মাঝে লাল-হলুদ ফুলের আরেকটি চাকতি। মেডিক্যাল কলেজের সামনে আসতেই দেখা যায় খালি পায়ে কালো রাস্তার ওপর দিয়ে লঘু ছন্দে হেঁটে যাচ্ছে বিভিন্ন বয়সের নারী পুরুষ। তাদের প্রত্যেকের হাতেই কোনো না কোনো ধরনের ফুল দেখতে পায় মনু মিয়া। বাবা কিংবা মামা-চাচার কোলে একটি ছোট্ট পরীর মত দেখতে মেয়ের হাতে ধরা আছে একটি সাদা ফুল। মেয়েটি খুব যত্ন করেই ফুলটি ধরে রেখেছে বোঝা যায়। কারণ, ফুল ধরা হাতটিকে একটু উঁচিয়ে রেখেছে সে। তার চেহারায়ও ফুটে উঠেছে বেশ গর্বিত একটি অভিব্যক্তি। তার যেন খুব ভালো করেই জানা আছে, কেন এই ফুলেল যাত্রা, কিসের নিমিত্ত এই ফুল! তখনই মনু মিয়ার খানিকটা বোধোদয় হয় যে, এভাবে ফুল নিয়ে খালি পায়ে এগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য নিছক কোথাও ফুলগুলোকে ছুঁড়ে ফেলতে নয়, এর পেছনে নিশ্চয় মহৎ কোনো ব্যাপার জড়িয়ে রয়েছে।

টমটমের চালক একবার অস্ফুটে বললো, সামনে তো আর যাওন যাইবো না লাগে!

তখনই মনু মিয়া প্রায় ফিস ফিসে স্বরে চালকের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, মানুষজন ফুল নিয়া যায় কই?

কথা শুনে যেন ক্ষেপে গেল লোকটি। চিবিয়ে বলার মত করে বললো, জঙ্গল থাইকা আইছ নিকি? ব্যাবাকতে শহিদ মিনার যাইতাছে! উনিশশ বায়ান্ন সালে আমাগো বাংলা ভাষারে বাঁচাইতে কয়জন ছাত্র জান দিছিলো, তাগোর সম্মান জানাইতে এই ফুল। হেদিন ওই পোলাপানগুলা যদি বাংলায় কথা কওনের দাবি লইয়া রাস্তায় না নামতো আইজগা তুমি আমি উর্দুতে কথা কওন লাগতো! বুঝলা কিছু?

তারপরই মনু মিয়ার ওপর ঝাড়তে না পারা রাগটা যেন সে ঢাললো হাতে ধরা ঘোড়াটির রশির ওপর। আচমকা টান খেয়ে ঘোড়াটির মুখ একপাশে বেঁকে গেল। তার সাথে সাথেই থেমে গেল গাড়িটিও। মনু মিয়ার দিকে তাকিয়ে লোকটি ফের বলে উঠলো, নাইমা পড় মিয়া! গাড়ি আর সামনে যাইবো না। মানুষজনের ভীড় বাইড়া গেছে!

মনু মিয়া নামার আগেই রহমান সাহেব আর সালমা বেগম নেমে রাস্তায় দাঁড়ালেন। সালমা বেগম বললেন, গাড়ি কি থাকবো?

রহমান সাহেব বললেন, থাকুক না! ফিরা যাইতে যদি কিছু না পাই?

মনু মিয়া বেশ কসরৎ করে নেমে রহমান সাহেবের পেছনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, চল! আমাগো কাছাকাছিই থাকিস! নয়তো হারায় যাইবার পারস!

টমটম চালক জানালো, আমি এইখানেই থাকলাম!

থাক! বলে, রহমান সাহেব সালমা বেগমের একটি হাত ধরলেন।

খানিকটা এগোতেই লোকজনের ভীড় আরো বেড়ে যাচ্ছিলো। আর এভাবে আশপাশে তাকাতে তাকাতে আর বিস্ময়ের পর বিস্ময় হজম করতে করতে কখন যে মনু মিয়া দলছুট হয়ে পড়েছে বলতে পারবে না। মেয়ে আর পুরুষের লাইন দুটো। পুরূষদের লাইনে এগোতে এগোতে সে দেখতে পেলো খানিকটা দূরে পাকা তিনটি থামের মত যাতে জানালার শিকের মত লোহা লাগানো আছে। যার রহস্য তার কাছে দূরবর্তী গ্রামের সীমানায় যেখানে আকাশটা মাটিতে নেমে গেছে তার পেছনকার অজানা সব রহস্যের মতই দূর্বোধ্য মনে হয় যেন।

সে এদিক ওদিক সামনে পেছনে তাকিয়ে রহমান সাহেব আর সালমা বেগমের খোঁজ করে। কিন্তু দুজনের কারো উপস্থিতি চোখে পড়ে না। ঠিক তখনই পেছনের লোকটির ধাক্কা খেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে শুনতে পায় খুব মিষ্টি শব্দে কোনো বাচ্চা মেয়ে কথা বলছে। সে মনযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করে, তাহলে ওটা বড় কেন?

মনু মিয়া খেয়াল করে দেখতে পায় সিমেন্ট আর লোহার তৈরী জানালার মত স্তম্ভের ব্যাপারেই শিশুটির কৌতুহল।

তাকে কোলে নিয়ে রাখা মানুষটি বলছে, ওটি মা, তাই বড়!

তাহলে পাশেরগুলো কি বাচ্চা?

হ্যাঁ আম্মু! মায়ের দু পাশে দুটি করে চারটি বাচ্চা!

এই আম্মুটা কে? কাদের আম্মু?

এই আম্মুটা আমাদের দেশ আর ছোটগুলো হচ্ছি আমরা সব মানুষ!

মনু মিয়ার খুব কষ্ট হয় এই ভেবে যে, এতটুকুন একটি শিশু যা ভাবতে পারে তা তার মত ধাড়ী পুরুষের বোধে আসে না কেন? মূর্খ বলেই কি? আর তখনই যেন তার কাছে শহিদ মিনার, অগণিত নর-নারী-শিশুর ফুল নিয়ে এখানে ছুটে আসার রহস্য দিনের আলোর মতই পরিষ্কার হয়ে যায়। শহিদ মিনারের সামনে আসতেই তার কেমন শিহরণ লাগে। নিচু হয়ে ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্যে নিবেদিত অগ্রবর্তী জনতার ফুলের স্তুপে নিজের হাতের ফুল দুটি রাখতেই পুরো দেহ কেমন কেঁপে ওঠে থরথর করে। মনে হয় ভাষার জন্যে নিজেদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন যাঁরা, তাদের গর্বিত আত্মার খুশি, মানুষের মনে এখনো যাঁদের জন্যে অফুরন্ত ভালোবাসা বিদ্যমান সেই আনব্দ যেন ছুঁয়ে গেল তাকেও। শহিদ মিনার ছাড়িয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় চোখ দুটো বারবার ভিজে উঠতে লাগলো। আর সে অবস্থাতেই সে রহমান সাহেব আর সালমা বেগমকে খুঁজতে খুঁজতে পাশের রাস্তা দিয়ে যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকেই এগিয়ে যেতে থাকে। চলতে চলতে তার মনে হয় ঠিক পথে যদি সে এগিয়ে যেতে পারে তাহলে যেখানে ঘোড়ার গাড়িটা ছেড়ে এসেছে, সেখানে পৌঁছে যেতে পারবে সহজেই।

১১

সেদিন শহিদ মিনার থেকে ফিরে আসার পর মনু মিয়ার জীবনটা যেন আরো জটিলতার ঘেরাটোপে আটকে গেল। সবার আগে ঘোড়াগাড়ি থেকে নেমে গেটে ধাক্কা দিতেই ভেতর থেকে কেমন হুটোপুটির শব্দ ভেসে আসে। সে যেন মৃদু কথাবার্তাও শুনতে পেলো বলে মনে হলো। তাই সে আরো জোরালো আর দ্রুত শব্দ তোলে গেটের ধাতব পাতে। সেই সঙ্গে খানিকটা চিৎকার করে ডেকে ওঠে, আজগর বাই! ওই আজগর বাই! হুনছেন?

খানিক পর আজগর গেট খুলে সবাইকে একই সঙ্গে দেখতে পেয়ে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। তরা আইতে না আরো দেরি হওনের কথা আছিলো? কথা বলার সময় জিভের আগায় শব্দগুলো যেন জড়িয়ে যায় আজগরের।

পেছন থেকে সালমা বেগম ধমকে উঠে আজগরকে বললেন, এতক্ষণ কি করতাছিলি?

আজগরকে অকস্মাৎ দিশেহারা মনে হয়। কেমন এক শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।

সালমা বেগম তাকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে আজগরের ঘরে উঁকি দিয়ে বেশ অবাক হয়ে গেলেন। দরজার একটি কপাটের আড়ালে নিচের দিকে নেইল পলিশ রাঙানো দুটো পায়ের আঙুল দেখতে পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, ওই ছেরি বাইর হ!

সালমা বেগমের কথার সঙ্গে সঙ্গে রহমান সাহেব ছুটে এলেন, কি অইছে?

মেয়েটি মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসতেই তাকে দেখতে পেয়ে রহমান সাহেব বলে উঠলেন, তুই বেকারির চকিদারের মাইয়া না? এহানে কি করতাছস?

কিছু হুনবার কাম নাই! এক্ষনি দুইটারে বাইর কর! সালমা বেগমের মুখটা যেন আগুনের তাপে লালচে হয়ে উঠেছে এমন দেখাচ্ছিলো।

রহমান সাহেব আজগরের দিকে ফিরে বললেন, কিরে আজগইরা, হুনছস? তর কিছু কওনের থাকলে কইতে পারস!

আজগর একবার মাথা তুলে সালমা বেগমের দিকে তাকায়। তারপর মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলে, মুস্কান, বাহার আ যা!

মেয়েটি গেটের বাইরে গুটিগুটি পায়ে চলে গেলে সালমা বেগম রহমান সাহেবকে বললেন, এখনই বাজারে যাও। গেইটের লাইগা নতুন তালা-চাবি নিয়া আহ গা! মনু মিয়ারে কও বদমাইশটার যা যা আছে সব বাইরে ফালাইতে! আমি গেলাম!

সালমা বেগম হনহন করে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। সেই অবসরে রহমান সাহেব বললেন, আজগর, দেখ তর কিকি আছে।

আজগর রুমটিতে ঢুকে তার কাপড়-চোপড় যা আছে তার সবই একটি পুটলি মতন বানিয়ে বেরিয়ে আসে। হাতের মুঠো থেকে একগোছা চাবি ঝনাৎ করে ছুঁড়ে ফেলে মনু মিয়ার পায়ের সামনে। তারপর যেতে যেতে বলে, আবার দেহা অইবো!

মনু মিয়া ঘটনার আকস্মিকতায় বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে, রহমান সাহেব বললেন, তুই ভিতরে যা। গেইট বন্ধ কইরা দে! আমি বাজারে যাইতাছি!

বাড়ির ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দিলে শুধু শুধু একজন পাহারাদার সেখানে বসে থাকার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না মনু মিয়ার। বাড়ির ভেতরকার মোটামুটি অনেক কাজই সে করে। তা ছাড়া তাদের এখানে লোকজন বলতে গেলে কেউ আসে না। মাঝে মধ্যে শৈলেশ বর্মন আসেন রহমান সাহেব বা সালমা বেগম কেউ অসুস্থ থাকলে।

গেট বন্ধ করে দিয়ে মনু মিয়া আজগরের থাকার ঘরটিতে প্রবেশ করলে একটি বিশ্রী গন্ধ টের পায়। তারপর দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে ঘরটির চারদিকে তাকায়। চকির নিচে উবু হয়ে দেখে। প্রায় দেওয়ালের পাশ ঘেষে বেশ কটি বোতল দাঁড় করিয়ে রাখা। সে চকির ওপর হামাগুঁড়ি দিয়ে উঠে চকির প্রান্ত আর দেওয়ালের ফাঁকা অংশে হাত গলিয়ে দিয়ে একটি বোতল তুলে আনে। কিসের বোতল বুঝতে না পেরে বোতলের মুখটা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শোঁকে। ঠিক এমন আরো কড়া একটি গন্ধ ভাসছে রুমটির ভেতর। সে চকি থেকে নেমে গন্ধের উৎস সন্ধানে ফের ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আরেকটি খোলা দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই বুঝতে পারে সেখান থেকেই গন্ধটা ছড়াচ্ছে। পাহারাদারের জন্য তৈরি টয়লেট বাথরুম। দরজার আড়ালে উঁকি দিতেই একই রকম আরেকটি বোতল দেখতে পায় সে। বোতলটিতে বেশ খানিকটা তরল পদার্থ আছে। কিন্তু বোতলটা হাতে নিয়ে বুঝতে পারে না জিনিসটা কি!

আজগরের পরিত্যক্ত সমূদয় জিনিসপত্র একখানে জড় করে বিছানা থেকে চাদরটা মেঝেতে বিছানোর সময় তার চোখে পড়ে একটি কালো ক্লিপ পড়ে আছে। ক্লিপটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবে সে। ঠিক তখনই তার মনে পড়ে একদিন দোকান বন্ধ দেখে একে ওকে জিজ্ঞেস করে খুঁজতে খুঁজতে বালতি কারখানার পেছনে ইসুব মিয়ার ঘরে উপস্থিত হয়েছিলো সে। দরজার পাশে আগে পিছে বসে শাড়ি পরা দুটো মেয়ে। পেছনের মেয়েটি সামনে বসা মেয়েটির চুল বেঁধে দিচ্ছিলো। তাকে দেখতে পেয়ে পেছনে বসা মেয়েটি বলে উঠলো, কারে চাও?

মনু মিয়া মেয়েটির পরিপাটি করে বাঁধা চুলে লাগানো কালো চকচকে ক্লিপগুলোর দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, ইসুব কাহার ঘর কোনডা? দোহান বন্ধ কিয়ারে?

মেয়েটি বলেছিলো, আব্বায় তো মোগো গ্যারামের বাড়িত গেছে? তুমি কোমনের থাইক্যা আইছো? আব্বার কী কাম?

মনু মিয়া হাতে ধরা ডিমের পুটলিটা দেখিয়ে বলেছিলো, ডিমা লইয়া আইছি। কয়দিন পরে পরেই আমি দোহানো আইয়া ডিমা দিয়া যাই। আউজ্জা দেহি বন্ধ!

মেয়েটি বললো, মোর দারে দিয়া যাও। আব্বায় আইলে কইমুয়ানে!

মনু মিয়া হাতের পুটলি এগিয়ে দিতে দিতে বলেছিলো, কুড়িডা আছে!

ডিমগুলো নিয়ে ঘরের ভেতর যেতে গিয়েও কী মনে করে হঠাৎ মেয়েটি থেমে পেছন ফিরে তাকিয়েছিলো। খানিকটা লজ্জা মেশানো কণ্ঠে বলে উঠেছিলো, তোমার নাম কি মনু মিয়া?

মেয়েটির মুখে নিজের নাম শুনতে পেয়ে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো মনু মিয়া। আর তখনই তার মনে হয়েছিলো মেয়েটির রঙ ময়লা হলেও দেখতে খুব সুন্দর!

মনু মিয়ার চোখে মেয়েটির চোখ পড়লে সে হেসে উঠে বলেছিলো, আব্বায় চাইর দিন পরে আইবে!

চারদিন পেরিয়ে গেছে আরো দুদিন আগে। ইসুব মিয়ার দোকানে আর যাওয়া হয়নি মনু মিয়ার। সে ক্লিপটি আজগরের পরিত্যক্ত জিনিসপত্রের সঙ্গে চাদরের ওপর রাখে। খুঁজে খুঁজে আরো কাগজ, ছেঁড়া ন্যাকড়া, চকিতে বিছানো নানা জায়গা থেকে বেরিয়ে আসা তুলোর ঝালর সমৃদ্ধ ছেঁড়া-ফাটা তোশকটা গুটিয়ে তুলে নিয়ে চাদরটার চার কোণা গুটিয়ে একটির সঙ্গে আরেকটি গিঁট দিয়ে বেশ বড়সড় একটি গাটরী বাঁধে। তারপর সেটাকে তুলে বাইরে এনে ফেলে রাখে। ভাবে, রহমান সাহেব এলে এটাকে বাইরে ময়লা ফেলার জায়গায় ফেলে দিয়ে আসবে। আর তখনই ফিরে আসার পথে ইসুব মিয়ার সঙ্গে দেখা করবে। তার আগে পুরোটা ঘর ধুয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এখন থেকে হয়তো এটাই হবে তার থাকার জায়গা।

১২

বেশ কিছুদিন হয় রহমান সাহেব হাঁটুর ব্যথায় তেমন একটা চলাফেরা করতে পারেন না। তাই প্রতিদিন সকালের কাজগুলো সেরে তাকে বাজারের দিকে ছুটতে হয়। বাজারে যাওয়ার পথে একটি চায়ের দোকানে বসে থাকতে দেখা যায় আজগরকে। মাঝে মধ্যে দু চারদিন তাকে দেখা যায় না। তখন কোথায় যায় আজগর? তা ছাড়া বাড়ির পাহাদারের চাকরি হারানোর পর আজকাল কেমন করে কাটছে তার দিনকাল তা খুব জানতে ইচ্ছে হয়। পাউরুটি কারখানার চকিদারের মেয়ে মুস্কানকে সে বিয়ে করতে পেরেছে কি না বা মুস্কানের ঘটনা জানার পর থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে তার বাবা কোথায় গেছে তাও খুব জানার ইচ্ছে তার। মামা যাদু মিয়াও অনেকদিন হলো এদিকে আসছে না। বাজার থেকে ফেরার পথে একবার পাউরুটি কারখানা হয়ে আসতে মনস্ত করে সে।

বাজারের মুখেই বেশ একটি জটলা দেখা যাচ্ছে। অনেক লোকজন কোনো কিছুকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। এসব ভিড়-ভাট্টা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন রহমান সাহেব। কিছু কিছু পকেটমার তাদের সুবিধা মত জায়গায় এ জাতীয় আয়োজন করে থাকতে পারে। আর এ ধরনের প্রতিটি জমায়েত থেকেই লোকজন টাকা-পয়সা খোয়ানোর কাহিনী প্রায় একই রকম।

ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে বাজারের ভেতর ঢুকে পড়ে প্রথমেই শাক-সব্জি-আনাজ-পাতির হাটে একটি চক্কর দেয় মনু মিয়া। কী কী তরি-তরকারি এসেছে তা দেখে যায় মাছ বাজারের দিকে। সেখানে ঘুরে-ফিরে মনে মনে মাছ পছন্দ করে ফের চলে আসে সবজি বাজারে। কম পরিমাণে কয়েক পদের আনাজ কিনে নিয়ে সে এগিয়ে যায় মাছ বাজারে। প্রায় তার বুক সমান দীর্ঘ একটি চিতল মাছ লম্বালম্বি ফেলে রাখা হয়েছে দুটি বড় বড় ডালা পাশাপাশি রেখে। মাছটা দেখে তার চোখ যেন চকচক করে ওঠে। অনেক কাল আগে সে যখন ছোট তখন রায় বাড়ির দীঘিতে এর চাইতেও খানিকটা বড় আকৃতির চিতল মাছ ধরা পড়েছিলো। সেই তখন থেকেই তার মনে একটি বাসনা জেগে উঠেছিলো যে, কখনো সুযোগ পেলে এমন বড় মাছের ছোট্ট একটি টুকরো হলেও খেয়ে দেখবে। তারপর আর সুযোগ হয়নি। একবার শীতালক্ষ্যার পাড়ে একটি ভাতের হোটেলে চিতল মাছের পেটি দিয়ে ভাত খেয়েছিলো। আকৃতিতে ভাতের থালার সমান ছিলো। মাছের বড় টুকরো দেখে খুশি হলেও রান্না ভালো ছিলো না বলে তার মনের আক্ষেপ দূর হয়নি। এখন সে নিজেই খুব ভালো রান্না জানে। টাকায় কুলোলে সে আজই তার মনের অতৃপ্তি দূর করতে পারবে। কিন্তু তার মনের ভেতর প্রায় আবছা মতই আরেকটি ভাবনা দুলে ওঠে। মনে পড়ে মায়ের কথা। বোনটির কথা। তবে তেমন একটা খারাপ লাগে না তার। সংসারের বড় অভাবটা দূর হয়ে গেছে। খাওয়া-পরায় তাদের সমস্যা থাকার কথা না। একবার যদি গ্রামের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারতো তাহলে তার মনের এই ছটফটে ভাবটা আর থকতো না। কিন্তু বুড়ো-বুড়ির দিকে তাকালে সে কথা উত্থাপন করার সাহস হয় না তার।

আরো খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ডালার পাশে গিয়ে মাছটির দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকলে মাছ বিক্রেতাটি বলে উঠলো, নিবা? আরো কয়েক জন ভাগীদার আছে!

আজকের মাছের জন্য নির্ধারণ করা আছে তিন টাকা। খুব বেশি হলে পাঁচ টাকা। মাছের পেছনে এর বেশি যেন কিছুতেই খরচ না হয়, সালমা বেগম বেশ কড়া কণ্ঠে বলে দিয়েছেন। বলতে গেলে সে আর রহমান সাহেবই মাছ খায়। কোনো কোনো দিন দুজনের কেউই মাছে হাত লাগান না। তখন তাকেই খেয়ে শেষ করতে হয়। সে গ্রামের ছেলে বলে মাছ আনাজ-পাতির তরকারি ততটা ভালো লাগে না। তার ভালো লাগে মুরগি আর গরুর গোস্ত। কিন্তু অনেকদিন হয় তারা মাংস খান না। তবে সে ইচ্ছে করলে যে কোনো আকৃতির একটি মুরগি কেটে রান্না করে খেতে পারে। কেউ মানা করবে না। একা একা ভালো কিছু খেয়ে আনন্দ নেই বলে তেমনটি করে না সে। প্রয়োজনীয় তরকারি কেনার পর তার কাছে এখন আট টাকা চার আনা আছে। সে মনে মনে ঠিক করলো যে, এ টাকায় মাছের ভাগ যদি পায় নিয়ে যাবে। নিজের মনোমতো কাজ করার শাস্তি হিসেবে খানিকটা ধমক ধামক শুনতে হতে পারে। যাবতীয় ভাবাভাবি আর হিসেব নিকেশ শেষ করে এক সময় সাহস করে সে বলে ফেললো, ভাগ কত ট্যাহা কইরা পর্তারে?

মাছ বিক্রেতাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা আরো কয়েক জনের দিকে আঙুল তুলে লোকটি বললো, মাছের দাম আশি ট্যাকা। তুমি নিলে দশজনের আট ট্যাকা কইরা পড়বো!

ভাগীদার দশজন। তাইলে পেডির ভাগ দশটা অইবো? এমন একটি ভাবনা আসতেই মনু মিয়া মনে মনে দৃষ্টির পোচে মাছের পেটির অংশটা দশটি টুকরো করে। আর এতে মোটামুটি সন্তুষ্ট হলে সানন্দেই সে বলে উঠলো, তাইলে নিতাইরাম!

মনু মিয়ার কথা শুনে অন্যান্য ভাগীদারদের মুখগুলোও কেমন যেন চকচকে হয়ে ওঠে। লোকগুলোর ঘরেও কি খাওয়ার মানুষ কম? ইচ্ছে করলে চারজনেই নিয়ে নিতে পারতো পুরো মাছটি। যৌথ পরিবার হলে হয়তো এ মাছটি দিয়েই দু তিন বেলা হয়ে যেতে পারতো। তা ছাড়া মানুষ বড় মাছ খায় শখে। আর শখের খাবার পরিমাণে বেশিই লাগে। এদের সবাই হয়তো একক আর ছোট পরিবারের মানুষ। কিন্তু পোশাক-আশাক দেখে তো তেমন অভাবী বলে মনে হয় না। তাহলে কি খাওয়ার মত লোকজন না থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

লোকটি দু হাতে পাঁজা কোলে তোলার মত করে মাছটি তুলে ধারালো বটির উপর ফেলতেই ঘ্যাচ করে একটি শব্দ হয়ে মাছটি আটকে গেল। তখন গোল মতো একটি কাঠের মুগুর দিয়ে মাছটির গায়ে আঘাত করতেই সেটি দু টুকরো হয়ে ডালার ওপর দুদিকে পড়ে গেল। তারপর আনুমানিক একটি সমান মাপে বটির ওপর ফেলে মুগুরের আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেললো মাছটিকে। তারপর ডালার ওপর দশটি ভাগ সাজিয়ে লোকটি বললো, দেখেন সমান হইছে নাহি? নাইলে পাল্লি-বাটখারা দিয়া মাইপ্যা দেওন যাইবো!

তিনজন একই ভাগের দিকে আঙুল তাক করলে লোকটি হেসে উঠে বললো, এই ভাগাটারে আবার তিন ভাগ করতে কন?

মাছ বিক্রেতার কথায় যেন তিনজনেরই হুঁশ ফিরে আসে। তখন তারা মনু মিয়াকে দেখিয়ে দিলে প্রথম ভাগাটি থেকে দুহাতে মাছের টুকরোগুলো তুলে মনু মিয়ার মেলে ধরা থলের মুখে ঢেলে দিতে থাকে।

পাশ থেকে একজন বলে উঠলো, এক ভাগায় কতটুকু ওজন হতে পারে?

মনু মিয়াকে মাছ দিয়ে টাকা নিতে নিতে লোকটি জানালো, দুইসেরের বেশি ছটাক খানেক হইবো। এর কম না!

মনু মিয়া মাছের দাম পরিশোধ করে ফেরের তাগিদে দ্রুত বাজার থেকে বের হয়ে আসে। দূর থেকেই চায়ের দোকানটিতে বসা আজগরকে দেখতে পায় সে। তার দৃষ্টি এড়াতেই সে আরো খানিকটা দূর দিয়ে কোনো দিকে মনযোগ নেই এমন ভান করে দ্রুত পদক্ষেপে হাঁটতে থাকে। কিন্তু আজগরের দৃষ্টি থেকে নিজকে আড়াল করতে পারে না। অন্যান্য দিনগুলোর মতই তাকে দেখতে পেয়ে আজগর চেঁচিয়ে উঠলো, অই কুমিল্লার ইতর! হুইনা যা!

রাগে মনু মিয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে এলেও সে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে পথ চলতে থাকে। এখন উলটো ফিরে গিয়ে আজগরের সঙ্গে বিতর্কে জড়ানো ঠিক হবে না। সে হয়তো মনে-প্রাণেই চাচ্ছে যে, মনু মিয়া ক্ষেপে গিয়ে তার সঙ্গে ঝগড়া করুক। কিন্তু তাকে এখন এমন সুযোগ দেওয়াটা চরম হঠকারী হয়ে যাবে।

কাটার পর খুব অল্প সময়ের ভেতরই মাছ পচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই মনু মিয়া মনে মনে ঠিক করে ফেলে যে, এখন কোনো অবস্থাতেই তাকে থামা চলবে না।

১৩

বড় মাছে চর্বির মত তেল থাকে। যা অনেক সময় বয়স্ক মানুষের হজম শক্তিকে এলোমেলো করে দিতে পারে। তাই যাতে পেটের জন্যে কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য সে অল্প মশলা মাখিয়ে খানিকটা সিরকাও মিশিয়ে দেয়। এই সিরকার ব্যাপারটা সে শিখেছে সালমা বেগমের কাছ থেকেই। কেবল মাংস রান্নার সময়ই তিনি সিরকা ব্যবহার করেন। পরীক্ষামূলক ভাবে মাছের সঙ্গেও সে ব্যবহার করেছে। রহমান সাহেব বা সালমা বেগম কিছুই বুঝতে পারেননি। তবে রান্নার সু-স্বাদুতার কথা বলতে কার্পণ্য করেন নি। সেই থেকে মাঝে মাঝে সে মাছের তরকারিতেও সিরকা ব্যবহার করে।

বাজার থেকে ফিরেই সে মাছ রান্না করতে লেগে যায়। কিন্তু দুপুর বলতে দেড়টা দুটোর সময় খেতে গেলে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভালো লাগবে না। তাই বাজার থেকে ফিরেই সে মাছের তরকারি হলে রান্নাটা অর্ধেক রেঁধে রেখে দেয়। খাওয়ার সময় হতে থাকলে চুলোয় ভাত চড়িয়ে দিয়ে অর্ধেক রান্না করা তরকারিটাও চুলোয় চড়িয়ে দেয়। আজ খাওয়ার সময় দুজনেই চমকে যাবেন বড় মাছ দেখে। পেট খারাপের ভয়ে খেতে চাইবেন না হয়তো। তবু রান্নাটা ভালো হলে অনেকেই পেটের সমস্যার কথা ভাবেন না। প্রতিদিন সু-স্বাদু রান্না খুব কমই জোটে মানুষের জীবনে।

মশলা দিয়ে কষানোর পর মাছের টুকরো থেকে বেরুনো পানিটা শুকিয়ে যেতেই সামান্য পানি ঢেলে দিয়ে হাঁড়িটা ঢেকে দেয় মনু মিয়া। তারপর গামছায় হাত মুছে চুলোর আগুনের আঁচ কমিয়ে দিতে স্টোভের কেরোসিনের ট্যাঙ্কটার হাওয়া কিছুটা ছেড়ে দিতেই আগুনের তেজ কমে এলো। ঠিক তখনই সালমা বেগম রান্না ঘরের দরজায় এসে বললেন, বাজার থাইকা ফিরলি কখন?

সালমা বেগমের দিকে ফিরে মনু মিয়া বললো, অনেক ক্ষণ!

তো ফেরত আওয়া ট্যাকা-পয়সা দিলি না?

সব খর্চা অইয়া গেছেগা!

কস কি?

আউজ্জা খরচ বেশি অইছে।

বেশি হইলো কেন?

বড় মাছ আনছি!

তার লাইগ্যা এত সকাল সকাল রান্ধা চড়াইছস? গেটটা খোল যাইয়া। ডাক্তার আইতাছে।

মনু মিয়া ভেবে পায় না যে, প্রত্যেকবার রহমান সাহেব নয়তো সালমা বেগম তাকে বলেন ডাক্তার আসবে। কিন্তু খবরটা পায় কীভাবে?

মনু মিয়া বেরিয়ে গেলে সালমা বেগম চুলায় চড়ানো হাঁড়িটার ঢাকনা খুলে দেখলেন। চশমা চোখে না থাকায় বুঝতে পারলেন না যে, কী মাছটা রান্না হচ্ছে। তবে, রান্নাটা যে বেশ ভালো হচ্ছে তা ঘ্রাণেই বুঝতে পারলেন।

সালমা বেগম রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন, শৈলেশ বর্মণ কাঁধে একটি শান্তিনিকেতনী ব্যাগ বইছেন। মনু মিয়ার সঙ্গে হেসে হেসে কী নিয়ে কথা বলছেন যেন। হাতের কালো চামড়ার ব্যাগ ছাড়া এমন ব্যাগ কাঁধে তাকে কখনো দেখা যায়নি। তাই ভদ্রলোককে কেমন যেন লেখক লেখক দেখাচ্ছে আজ। আর এ কথা মনে হতেই স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সহপাঠী আরিফের কথা। আরিফও এমন ব্যাগ কাঁধে ক্লাসে আসতো। অন্য সময় যখনই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে কাঁধে ব্যাগ ছাড়া দেখেছেন বলে মনে পড়ে না। আরিফ কবিতা লিখতো। কিন্তু কবিতা কোথাও ছাপা হচ্ছিলো না বলে, ঝাঁপ দিয়েছিলো ট্রেনের নিচে। সুইসাইড নোটে নাকি লিখে গিয়েছিলো, কবি হতে না পারার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়! আজকাল মাঝে মধ্যে আরিফের কথা মনে হলে তার মৃত্যুটাকে প্রাণের অপচয় ছাড়া ভিন্ন কিছু ভাবতে পারেন না।

শৈলেশ বর্মণ সালমা বেগমকে দেখতে পেয়ে বললেন, শুনলাম আজ রান্ধা ভালো। দুপুরে এখানে খাইয়াই পল্টনে যামু ভাবতাছি।

খাইলে খাইলেন! কিন্তু অবেলায় পল্টনে কি?

আইজকা শেখ মুজিবের ভাষণ আছে। যাবি নাকি?

যাইতে তো মন চায়। কিন্তু আপনের দোস্ত যে হাঁটুর ব্যথায় বিছনা থাইক্যা নামতে চায় না।

নমাজ পড়ে কেমনে?

নমাজ তো পড়ে না।

শৈলেশ বর্মণ হেসে বললেন, আরে, শেখ মুজিবের কথা হুনলে দেখিস কেমনে ফাল দিয়া ওঠে!

তারপরই তিনি, কইরে রহমান? বিছনায় পইড়া থাকবি আর কত দিন? বলতে বলতে রহমান সাহেবের উদ্দেশ্যে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলেন।

মনু মিয়া রান্নাঘরে ঢুকতেই সালমা বেগম বললেন, কী মাছ আনছস?

মনু মিয়া উজ্জ্বল মুখে জানালো, চিতল!

সালমা বেগম অবাক হয়ে বললেন, এত ট্যাকা পাইলি কই? যেমন টুকরা দেখলাম না হইলেও পঞ্চাশ-ষাইট ট্যাকা দামের হইবো।

ভাগা আনছি। আট ট্যাহা কইরা ভাগা!

সালমা বেগম যেন আরো বেশি অবাক হলেন মনু মিয়ার কথা শুনে। বললেন, ভাগা? গুঁড়া মাছ ভাগা দিয়া বেচে হুনছি। তাই বইলা বড় মাছও?

বড় মাছ বেচা না অইলে কাইট্যা ভাগা দিয়াই বেচে।

সালমা বেগমের মনে হলো, মানুষ আগের তুলনায় বেশ অভাবী হয়ে গেছে। পুরো মাছ কেনার সামর্থ্য নেই বলে কয়েকজনে মিলে ভাগ করে নিয়ে যায়। দেশের মানুষের দুর্দিন কি তাহলে খুব কাছেই?

বিষণ্ণ মনে তিনি একবার মাথা ঝাঁকালেন। তারপর বললেন, তাইলে রান্ধা শেষ কইরা ফালা তাড়াতাড়ি। পল্টন গেলে খাওয়া দেরি করা ঠিক হইবো না।

সালমা বেগম রান্না ঘর ছেড়ে নিজের ঘরে যেতে যেতে শুনতে পেলেন, ড্রয়িং রুমে কোনো একটি বিষয়ে বেশ উচ্চ কণ্ঠে হাসছেন রহমান সাহেব।

১৪

শোনা যাচ্ছিলো শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী হবেন। এ বিষয়ে রহমান সাহেব বা সালমা বেগমের বিশ্বাসের ভিত বেশ পোক্ত হলেও শৈলেশ বর্মণ নিজের মনে সে কথা ঠাঁই দিতে পারেন না। তিনি আরো নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছেন যে, ভুট্টো কখনোই বাঙালিদের ক্ষমতায় বসতে দেবে না। এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের একটি শিশুও মনে প্রাণে চাইবে না যে, পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাক। লোকসানের রাজপুরীর চেয়ে লাভের আস্তাকুর ভালো। আর সে কথা পশ্চিম পাকিস্তানের শকুনগুলো ভালোই বোঝে।

শৈলেশ বর্মণ আর রহমান সাহেব ছয় দফা দাবির বিষয়গুলো নিয়ে আলাপের এক ফাঁকে সালমা বেগম বললেন, আপনেরা কি কিছু টের পাইতাছেন?

রাহমান সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কোন ব্যাপারটা?

এই যে আমাগো চাইরো দিকে বিহারি মানুষ হঠাৎ কইরাই যেন বাইড়া গেছে।

শৈলেশ বর্মণ বললেন, এইটা আমিও লক্ষ্য করতেছি। ভাবতাছি ইন্ডিয়া যামুগা। এখানের পরিস্থিতি কখন খারাপ হইয়া যায় বলা যায় না। আমি তিন চাইরদিনের ভিতর না আইলে বুঝবি পাকিস্তানে আর নাই।

তাইলে তো খুবই দুশ্চিন্তার কথা! বলেই রহমান সাহেব কেমন গুম হয়ে বসে রইলেন।

সালমা বেগম বললেন, আমরা ঘর-বাড়ি তালা দিয়া গেলে যাইতে তো পারিই।

আমিও সেইটাই কইতে চাইছিলাম। বলে, তিনি কেমন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন সালমা বেগমের মুখের দিকে।

সেদিন বাজার থেকে আসার পথে আজগর তার বিহারি বন্ধুদের মাঝখান থেকে উঠে এসে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বলেছিলো, টাউনের অবস্থা বেশি ভালা না। তুই গ্যারাম দেশের কম বুদ্ধির মানুষ, এখানে থাকলে মারা পড়বি। এ ছাড়াও সাহেবের নুন-নিমক খাইছি অনেকদিন তার লাইগ্যাই কথাডা কইলাম।

রহমান সাহেব আর শৈলেশ বর্মণের কথাবার্তার কিছু কিছু রান্নাঘর থেকেই শুনতে পাচ্ছিলো মনু মিয়া। তখনই যেন আজগরের বলা কথাগুলোর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে সে।

রান্না প্রায় হয়ে এসেছিলো। আগুনের আঁচ কমিয়ে দিয়ে মনু মিয়া ভাবলো যে, এমন একটা কঠিন পরিস্থিতিতে এই বয়স্ক মানুষ দুজনকে কী করে সে ছেড়ে যাবে? তারা যদি শহর ছেড়ে যেতে না চান তাহলে স্বার্থপরের মতো নিজের প্রাণ বাঁচাতে সে চলে যেতে পারে যে কোনো সময়ই। কিন্তু সেটা কি ঠিক হবে? বিপদের সময় তাদের দেখার মতো তো আর কেউ নাই!

রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে সে ড্রয়িং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পায় তিনটা মুখই কেমন যেন গভীর একটা বিষাদের অন্ধকারে চাপা পড়ে আছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সে ভাবলো যে, কী কথা দিয়ে শুরু করতে পারে। দুপুর প্রায় পেরিয়ে গেছে। তাই একবার কেশে গলা পরিষ্কার করে বললো, রান্দা তো পরায় শ্যাষ! আফনেরা খাইতেন টাইতেন না?

তিনজনই যেন খানিকটা চমকে ফিরে তাকায় মনু মিয়ার দিকে। তখনই মনু মিয়া বলে উঠলো, কয়দিন আগে দিয়া আজগইরায় কইসিল, আমরা এহেনো থাকলে মারা পড়তারি! অ্যার লাইগ্যা কইতাসলাম যে, সময় থাকতে দুই একদিনের ভিতরে আফনেরা আমার লগে লন। টাউনের থাইক্যা আমরার গ্যারামের ভিতরে বিফদ-আফদ কম অওনের কতা!

মনু মিয়ার কথা শুনলেও তিনজনের কেউ তেমন একটা সমর্থন করলেন না। কিন্তু তার মনে হলো, তারা তিনজনই পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা সেরে ফেলেছেন, যা পাঠ করা তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের সামর্থ্যে কুলায়নি। কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে থেকে বলার মতো তেমন কিছু না পেয়ে হঠাৎ সে রান্না ঘরের দিকে ছুটে গেল।

মনু মিয়া চলে গেলে সালমা বেগম বললেন, পোলাটার কথা আপনেরা খেয়াল করছেন?

রহমান সাহেব বলে উঠলেন, পোলার কথার আগেই বদমাইশটা আমারেও এই কথা কইছে। হ্যায় যে মিছা ডর দেখায় নাই তাও বুঝতাছি। কিন্তু এমন বিপদে কই যাই? এমন কাউরে তো চিনি না যার বাইত্যে গিয়া উঠতে পারি। তা ছাড়া যাগোরে চিনি তারা তো ঢাকাইয়া মানুষই।

শৈলেশ ভাই কী কন? বলে, তার মুখের দিকে তাকান সালমা বেগম।

শৈলেশ বর্মণ কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, তিন ভুবনে তো তগো দুইজন ছাড়া আমার কেউ নাই।

তো ইন্ডিয়া কার কাছে যাইয়া উঠবেন বইল্যা ঠিক করছিলেন?

তেমন কেউ নাই। আমার মতই একটা পোলারে পড়ার খরচ দিতাম। কইলকাতা। ভাবছিলাম তার কাছে যাইয়াই প্রথমে উঠি, তারপর ঠিক করা যাইবো কই থাকি বা কী করি। ডাক্তার মানুষ এত সমস্যা হওনের তো কথা না!

রহমান সাহেব বললেন, কাইলকা ছাব্বিশ তারিখ পোলারা ফোন করনের কথা। দেখি তাগো লগে কথা কইয়া।

শৈলেশ বর্মণ বললেন, তোরা দুইজনে পোলাগো কাছেই তো থাকলে পারস। এত ট্যাকা পয়সা কই রাখবি?

রহমান সাহেব মৃদু হেসে বললেন, আম্রিকান কনস্যুলেটে গেছিলাম তো তরে কয়বার কমু? সামনের মাসের পাঁচ তারিখ যাইবার কইছে। কিন্তু দেশটারে ছাইড়া যাইতে মন চায় না রে! এহানেই পয়দা হইলাম, বড় হইলাম, ঘর-বাড়ি ব্যবসাপাতি বড় করলাম, সব ছাইড়া হুট কইরা ক্যামনে যাই?

শৈলেশ বর্মণের মনোযোগ রহমান সাহেবের প্রতি নেই তা পরিষ্কার বুঝতে পারলেন তিনি। কিছু একটা নিয়ে তিনি নেজের ভেতরই বুঁদ হয়ে আছেন বলে মনে হয়। তাই রহমান সাহেব, স্ত্রীকে বললেন, মনু মিয়ারে তাইলে কাইলকা ট্যাকা-পয়সা দিয়া তার বাইত্যে পাঠাইয়া দেও। আমরা আইজকা রাইতেই ঠিক কইরা ফালামু কী করন যায়।

তারপর তিনি খানিকটা জোর দিয়েই বললেন, ডাক্তার কী কস?

শৈলেশ বর্মণ চমকে উঠে বললেন, কী, কী কইলাম?

তুই কী এত চিন্তা করস? আইজ আর যাইয়া কাম নাই। থাইকা যা। তিনজনে মিল্যা কিছু একটা ঠিক করন যাইবো।

সন্ধ্যা হয়ে আসছিলো। মনু মিয়া রান্না সেরে সব কিছু গোছগাছ করে বাইরে বেঁধে রাখা গাভীটাকে নিয়ে গোয়ালে নিয়ে বাঁধে। তারপর বেশ কিছুটা খড় নিয়ে গাভীটার সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে। গোয়াল ঘরের দরজাটা টেনে বাইরে দিয়ে শিকল আটকে দিয়ে প্রায় মাটিতে শুয়ে পড়ে মুরগির খোঁয়াড়ে উঁকি দিয়ে দেখে। সবগুলো মোরগ-মুরগি ঢুকেছে কি না বা কোনোটা বাইরে রয়ে গেছে কি না বুঝতে না পারলেও খোঁয়াড়ের দরজাটা বন্ধ করে দেয়। আজ কাজের ঝামেলায় বেশ দেরি হয়ে গেছে। এখনই তাকে গা গোসল দিয়ে বেরুতে হবে। এই ক’দিনে বেশ কতগুলো ডিম জমে গেছে। ইসুব মিয়াকে সবগুলো বুঝিয়ে দিতে হবে।

ইসুব মিয়া দোকানে থাকলেও বললো, ডিমগুলো যেন সে তার ঘরে পৌঁছিয়ে দিয়ে আসে। মেয়েটার জ্বর আজ কদিন ধরে। তার অবস্থাটাও যেন দেখে আসে।

মনু মিয়া খানিকটা অবাক না হয়ে পারে না। বাপ হয়ে মেয়ের চাইতে দোকানদারীটা মূল্যবান হয়ে উঠলো এই বুড়োর কাছে? নিজে মেয়ের তত্ত্বতালাশ না করে বলছে অচেনা আরেকটি মানুষকে!

ফিরতে ফিরতে মনু মিয়ার বেশ কিছুটা দেরিই হয়। মেয়েটা নানা কথায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তাকে আটকে রাখছিলো। শেষে প্রায় জোর করেই সে বেরিয়ে এসেছে। গেটে তালা লাগিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই সে দেখতে পায় সালমা বেগম টেবিলে খাবার দিয়ে নিজেও খেতে বসেছেন। মনু মিয়াকে দেখতে পেয়ে তিনি বললেন, তুইও খাইয়া শুইয়া পড়!

মনু মিয়া রান্না ঘরে গিয়ে নিজের জন্য খাবার নিয়ে মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে বসতেই অকস্মাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো বাড়িটাই যেন অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যায়। তখনই সে উঠে দুটো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে একটি খাওয়ার টেবিলের দিয়ে ফিরে আসে। খাওয়ার প্রায় শেষ পর্যায়েই শুনতে পায় দূরে কোথাও দুম দুম ক্র্যাক-ক্র্যাক, ট্যাশ-ট্যাশ করে বিচিত্র শব্দ হচ্ছে। সে অবাক হয়ে কান পেতে শুনতে চেষ্টা করে। প্রথমটায় ভেবেছিলো কোনো বিয়ে বাড়ির পটকা ফাটার শব্দ বুঝি। কিন্তু শব্দগুলো বার বার ধ্বনিত হলে সে বুঝতে পারে যে, এগুলো সাধারণ কোনো শব্দ নয়। খুবই নতুন ধরণের শব্দ। যে শব্দগুলো মনের ভেতর কৌতূহল সৃষ্টি করার বদলে ভীতির সঞ্চার করছে।

খাওয়া শেষ করে সে ডাইনিং রুমে এলে দেখতে পায় তিনজনই কেমন বিভ্রান্ত। রহমান সাহেব রেডিওতে ঘরঘরে বিচিত্র শব্দ শুনতে শুনতে বলে উঠলেন, কাইলকার থাইক্যা কার্ফু! তখনই অকস্মাৎ শৈলেশ বর্মণ ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, শহরটারে শ্যাষ কইরা ফালাইলো রে!

মনু মিয়াকে কেউ কিছু না বললেও কেন যেন তার মনে হচ্ছিলো যে, বাইরের অন্ধকারে ভয়াবহ কিছু একটা হচ্ছে!

সালমা বেগম খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন আগেই। হাত ধুয়ে বললেন, মনু মিয়া, তুই কি এই রাইতের মধ্যে তোর বাইত্যে যাইতে পারবি?

মনে অয় না। এত রাইতে গাড়ি পাওয়া যাইতো না! বলে মাথা ঝাঁকায় সে।

দেখ, যেমনেই পারস! কাইল থাইক্যা বাইরে বাইর হওন যাইবো না। বলতে বলতে তিনি দ্রুত পায়ে শোয়ার ঘরে গিয়ে হাতে টাকা নিয়ে ফিরে আসেন। তারপর মনু মিয়ার হাতে টাকাগুলো গুঁজে দিয়ে আবার বলেন, সাবধানে বাইর হইয়া যা। ফুল বাড়িয়ার দিকে না গিয়া বেবিট্যাক্সি নিয়া মেঘনা ঘাটে যাগা। দেরি করিস না ভাই! যা নাইলে জানে বাঁচবি না! বলতে বলতে তিনি মনু মিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

বিভ্রান্ত মনু মিয়া কী করবে বুঝতে না পারলেও তার মন বলছিলো, যে করেই হোক ঢাকা শহর ছেড়ে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে রাতের ভেতরই। আর সে কথা মনে হতেই সালমা বেগমের পা ছুঁয়ে দ্রুত দরজার বাইরে বেরিয়ে পড়লেও গেটের দিকে যায় না। সে ভালো করেই জানে গেটের বাইরে আজগর আর তার বিহারি বন্ধুরা আছে। গোয়াল ঘরের দিকে এগিয়ে যায় সে। তারপর গোয়াল ঘরের দরজা বেয়ে চালে উঠে দেয়াল ধরে ঝুলে পড়ে বাইরের দিকে আরো গাঢ় অন্ধকারে লাফিয়ে পড়ে।

(প্রথম পর্যায় সমাপ্ত)

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

রাসেল আশরাফ's picture


ধন্যবাদ।

এ টি এম কাদের's picture


খুবই ভাল লেখা ! পড়তে পড়তে কখন যে '৭১ এ পৌঁছে গেছি টের পাইনি ! ভিষণ নষ্টালজিক ! সে সময়ের তরুণদের কাছে য'৭১ যে কি ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব প্রায় ! হ্যাটস অফ টু জুলিয়ান সিদ্দিকি । পরবর্তী পর্যায়ের জন্য দারুণ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি ।

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture


ধন্যবাদ সাথে থাকার জন্য।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

জুলিয়ান সিদ্দিকী's picture

নিজের সম্পর্কে

অনেক কিছুই করতে মন চায়। কিন্তু লেখলেখিতে যে আনন্দটা পাই তার তুলনা খুব কম আনন্দের সঙ্গেই চলে।