ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস আজ
আজ ৩০ জুন, ব্রিটিশবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ১৮৫৫ সালের এদিনে ভারতের বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগনার সদর শহর বারহাইতের কাছাকাছি ভাগনাডিহি গ্রামের নিপীড়িত সাঁওতাল পরিবারের চার ভাই সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব মুর্মু এবং দুই বোন ফুলমনি ও জান মুর্মুর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল জুলুমবাজ ব্রিটিশ শাসন আর অন্যায় নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ গণপদযাত্রার সূচনা করেন। পরবর্তী সময়ে সাঁওতালদের ঐক্যবদ্ধ এই শ্রেণী সংগ্রামে অংশ নেন স্থানীয় আদিবাসী এবং নিপীড়িত প্রান্তিক বাঙালিরাও। (১)
“একজন দারোগা অন্যায়ভাবে কতিপয় সাঁওতালকে গ্রেপ্তার করিয়া থানায় লইয়া যাইতেছিল। পথে বিদ্রোহীরা তাহাদিগকে আটক করিয়া তাহাদের নায়ক সিদু ও কানুর নিকট লইয়া যায়। দারোগা ক্রোধে চিত্কার করিয়া উঠিল: ‘কে তুই সরকারি কাজে বাধা দিস!’ একজন বলিল: ‘আমি কানু, এ আমার দেশ।’
দ্বিতীয়জন বলিল: ‘আমি সিদু, এ আমার দেশ।’
কানু চিত্কার করিয়া ঘোষণা দিল: হুল (বিদ্রোহ) আরম্ভ হইয়া গিয়াচে। চারিদিকে শালের ডাল পাঠাইয়া দাও। এখন আর দারোগা নাই হাকিম নাই, সরকার নাই, আমাদের রাজা আসিয়া গিয়াছে।” ( ২)
ঐতিহাসিকভাবে সাঁওতালরা শ্রেণী নিপীড়নের বিরুদ্ধে বারবার রুখে দাঁড়ালেও ১৮৫৫ সালের বিদ্রোহকেই কেবল সাঁওতাল জনগণ 'হুল' হিসেবে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করেন। 'হুল' কেবল নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা এবং বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহই ছিল না, এটি একই কায়দায় বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোকে ফানা ফানা করে নিম্নবর্গের রাজনৈতিক ও মনোজাগতিক মুক্তির আহ্বানও ছিল। কার্ল মার্কস তার 'Notes on Indian History'-এ সাঁওতাল বিদ্রোহকে 'গেরিলা যুদ্ধ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। (৩)
সাঁওতাল বিদ্রোহের মহান নেতা কানুকে ইংরেজ উপনিবেশবাদীরা ফাঁসি দেয় ১৮৫৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ৷ তাঁর বয়স তখন মাত্র ছত্রিশ বছর৷ ব্রিটিশবিরোধী এই বিদ্রোহে 'পঞ্চাশ হাজার বিদ্রোহী সাঁওতালের মধ্যে পঁচিশ হাজার যুদ্ধক্ষেত্রে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন৷' (৪)
ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে কানু নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করেন, 'ছ বছরের মধ্যে আমি আবার আসব, আবার সারা দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে তুলব৷' (৫) পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে তাঁর দেহটি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে রাখার পরে, সেটিকে নামিয়ে এনে পুড়িয়ে ফেলা হয়৷ (৬)
তথ্যসূত্রঃ
১. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ঝলসানো আদিবাসী গ্রাম, সমকাল,৩০ জুন ২০০৯।
২. আর. ব্যাট্রিক, সাঁওতাল-বিদ্রোহ, অনুবাদ সুপ্রকাশ রায় , প্রথম আলো ১৮ মে ২০১০ .
৩. সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ঝলসানো আদিবাসী গ্রাম, প্রাগুক্ত
৪. সুপ্রকাশ রায়, ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, কলকাতা, ১৯৮০, পৃ ১৫
৫. স্বপন বসু সংকলিত ও সম্পাদিত, সংবাদ সাময়িকপত্রে উনিশ শতকের বাঙালিসমাজ, কলকাতা, ২০০০, পৃ ৪২৩
৬. রাজনীতির রবীন্দ্রনাথ, সৈয়দ আবুল কালাম , নতুন দিগন্ত ,অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০০৬





"পশ্চিমবঙ্গ" পত্রিকার একটা সাঁওতাল বিদ্রোহ সংখ্যা আছে। ওটা যোগাড় করুন, বেশ কাজের জিনিষ, আরো অনেকগুলো রেফারেন্সের খোঁজ পাবেন।
ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মানুষদের আর কৃষকদের বিদ্রোহের ইতিহাস প্রাচীন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেগুলো বিচ্ছিন্ন, অসংগঠিত ও স্বল্পস্থায়ী। ঔপনিবেশিক আমল লাগবেনা, দীর্ঘ সময় ধরে সংসদীয় বামদের শাসনে থাকা পশ্চিমবঙ্গে এমন বিদ্রোহের আরো নজির পাবেন।
মানিক ভাই, চমৎকার পোস্ট দিলেন। স্মরণ করি।
ধন্যবাদ মাসুম ভাই ।
চমৎকার পোষ্ট মানিক ভাই।
কিন্তু পাহাড়ী দের উপর নির্যাতনের খবরে আমি একি ছাপ পাই এরকম এখনও।
ধন্যবাদ ।
হ । তাই কানুরা বারবার ফিরে আসে ।
অনেক ধন্যবাদ শেযার করার জন্য। মূল্যবান একটি লেখা।
Sharif A. Kafi
sharifkafi@gmail.com
ধন্যবাদ কাফি ভাই ।
Thanks for remembering the glorious day
ধন্যবাদ ।
মানিক ভাইকে ধন্যবাদ পোষ্টের জন্য । অনেক তথ্য জানা হলো।
ধন্যবাদ জয়িতা ।
আমার বাড়ীর আশে পাশেইতো কত্ত সাঁওতাল, আমরা ডাকি সান্তাল বলে। ১৫/২০ বছর আগেও দল বেঁধে শিকারে বের হতো ওরা। ধান কাটার সময় দল বেঁধে আসতো ধান কাটতে। ৫০ বছর আগেতো এদের অনেক স্থায়ী বসতিই ছিলো, এখন সেগুলো ইতিহাস। নিজ মাটিতে এরা পরবাসী। আগে সীমান্তের বাধা ছিলো না ওদের জন্য, এখন মাঝে কাঁটা তারে বেড়া। এখন যারা আছে তারাও হাতে গোনা। সভ্য সমাজে অচ্যুত এরা এখনো। সেই বিদ্রোহের সুফল কিন্তু এরা কখনোই পাই নি। সেটা ওপার হোক, আর এপার হোক।
সহমত ।
এই মাত্র দেখলাম ব্যানার পরিবর্তন করা হয়েছে । অজস্র ধন্যবাদ । এবির প্রতি প্রেম বেড়েই চলেছে ।
মূল্যবান একটি লেখা।
মানিক ভাই দারুণ হয়েছে। পাঠকের ধন্যবাদ গ্রহণ করুন
ধন্যবাদ ।
দরকারী পোস্ট মানিক ভাই। তবে আরও একটু বিস্তারিত হলে ভালো হতো।
ধন্যবাদ ।
ভাল লাগলো মানিক ভাই। এ আন্দোলনের সময়েই কি কোন ঐশ্বরিক মিথ চালু ছিল? মানে কানু কোন দৈববাণী পেয়েছেন, তাই তার গোত্রের মানুষদের বাঁচাতে এসেছেন, এসব শুনে সব সাঁওতালরা আরো বেশি উজ্জীবিত হয়েছিলেন... এরকম একটা কাহিনী কোথায় যেন পড়েছিলাম। সেটা কি এই আন্দোলন নিয়ে?
‘দু নম্বর থালাবাসন নেই, খাবার দেওয়া যাবে না’
আনোয়ার হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ | তারিখ: ০৪-০৭-২০১০
‘আমি যখন তোমাদের বিদ্যা দান করি, তখন তো আমাকে তোমরা বল না যে আমি সাঁওতাল, আমার দেওয়া বিদ্যা নেবে না তোমাদের সন্তানেরা। অথচ আমি খেতে চাইলে বলছ, দু নম্বর থালাবাসন নেই, খাবার দেওয়া যাবে না।’
কথাগুলো একজন সাঁওতাল আদিবাসীর। তিনি রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুণ্ডমালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামেল মারান্ডি। তাঁর দাবি, গত ৭ জুন দুপুরে কয়েকজনের সঙ্গে এক রেস্তোরাঁয় গেলে সাঁওতাল বলে তাঁকে খেতে দেওয়া হয়নি। তখন তিনি রেস্তোরাঁর মালিককে এসব কথা বলেন।
শিক্ষক কামেল মারান্ডির সঙ্গে তানোর সদরের এক রেস্তোরাঁমালিকের এ ঘটনা জানাজানি হলে আদিবাসীসহ স্থানীয় সচেতন মহলে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। গত ১৩ জুন আদিবাসীদের নিয়ে কর্মরত একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য তানোরে মানববন্ধন হয়। আদিবাসী ছাড়া সচেতন অনেকেই এই মানববন্ধনে অংশ নেন।
এরপর তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিক, আদিবাসী নেতা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও তানোরে কর্মরত বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের ডেকে সভা করেন। সভায় হোটেল-রেস্তোরাঁয় আদিবাসীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়। এমন ঘটনার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে তাদের হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়।
কামেল মারান্ডির সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের ব্যাপারে ওই রেস্তোরাঁর মালিক মো. সালাউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, রেস্তোরাঁর যে কর্মচারী শিক্ষককে খাবার দেয়নি, সে ছিল নতুন। তাকে চাকরি থেকে বরাখাস্ত করা হয়েছে। ইউএনওর সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে রেস্তোরাঁয় আদিবাসীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
আগে কেন এমন আচরণ করা হতো—এ প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দীন বলেন, ‘আমাদের পাঁচজনকে নিয়ে ব্যবসা করতে হয়। আপনাকে এর বেশি কিছু বলব না।’
আদিবাসীদের আলাদা থালাবাটিতে খাবার দেওয়ার অভিযোগে অপর এক রেস্তোরাঁর মালিক আবদুল আলিম বলেন, ‘ব্যবসার স্বার্থেই আমাদের এমন করতে হয়। তবে এখন আর করি না।’
কালীগঞ্জ কলেজের ছাত্র বিশ্বনাথ সরেন ও যোগেন বেসরা প্রথম আলোকে জানান, গত ৩০ জুন তানোরে ডাকবাংলো মাঠে সাঁওতাল বিদ্রোহ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা। এ সময় তাঁরা মাঠের পাশে একটি রুটির দোকানে খেতে যান। তাঁদের খবরের কাগজে করে খাবার দেওয়া হয়। আর স্থানীয় অন্যদের দেওয়া হয় থালায়। তাঁরা প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা কি এ দেশের নাগরিক নই?’
সাঁওতাল ছাত্রদের ছাত্রাবাস ত্যাগ: তানোর ডিগ্রি কলেজের ছাত্রাবাসে সাঁওতাল ছাত্রদের থালাবাসন আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে জুন মাসের গোড়ার দিকে ১১ জন সাঁওতাল ছাত্র ছাত্রাবাস ছেড়ে চলে যান।
ছাত্রবাস ছেড়ে যাওয়া ছাত্র সুশীল হেমব্রম, সন্তোষ কুমার হেমব্রম, মিখাইল হাসদা, ডেভিড হাসদা ও হাবিল মার্ডি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই ছাত্রাবাসে আদিবাসী-বাঙালি ছাত্ররা মিলেমিশে থাকছে। কিন্তু ছাত্রাবাসের নতুন মনিটর এসে থালা-বাটি আলাদা করে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করেন। এর প্রতিবাদ করে সমাধান পাইনি। এ কারণে মনোকষ্ট নিয়ে আমরা ছাত্রাবাস ত্যাগ করেছি।’
এ ব্যাপারে তানোর থানার ওসি এস এম বজলুর রশিদ বলেন, ‘হোটেল-রেস্তোরাঁয় আদিবাসীদের প্রতি এমন আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে কলেজের ছাত্রাবাসের ঘটনার ব্যাপারে আমাদের করার কিছু নেই।’
তানোর ডিগ্রি কলেজের ছাত্রাবাসের মনিটর মোবারক হোসেন বলেন, ‘ছাত্রাবাসের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছাত্রদের দাবির মুখে আমাকে থালা-বাটি আলাদা করতে হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটা চাইনি। আমার তো আদিবাসী বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে খেতেও সমস্যা নেই।’
স্থানীয় সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, ‘তানোরের বিভিন্ন স্থানে আদিবাসীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণের বিষয়টি আমার জানা আছে। তবে রাতারাতি এর পরিবর্তন হবে না। বৈষম্য দূর করার মানসিকতা তৈরির ব্যাপারে স্থানীয় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মানুষকে পরিবর্তনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। ক্রমশ এ অবস্থার পরিবর্তন হবে।’
রাজশাহীর তানোরে ৪ আদিবাসী নেতা ও ১৩ ছাত্র অস্পৃশ্যতার শিকার
লাল সালাম সিধুঁ -কানু
লাল সালাম সিধুঁ -কানু
মন্তব্য করুন