নারীর মর্যাদা রক্ষায় চাই আত্মমর্যাদাশীল জাতিঃ চাই অলৈঙ্গিক সমাজ ব্যবস্থা
২০০০ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে বিবস্ত্র করা হয়েছিল বাঁধন নামের এক তরুণীকে। পুলিশের উপস্থিতিতে একদল যুবক ক্ষুধার্ত পশুর মত হামলে পড়েছিল তার উপর। পরদিন পত্রিকার পাতায় দেখেছিলাম সেই ছবি। স্মৃতিটা এখনো টাটকা। ঘটনাটি অত্যন্ত আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিল সেই সময়।
অনেককেই বলতে শুনেছিলাম গভীর রাতে বাঁধনের উচিৎ হয়নি বাইরে যাওয়া। অত রাতে বাইরে গেলে এমন তো হবেই...ইত্যাদি। পুলিশের কন্ঠেও ছিল একই সুর। আবার কেউ কেউ বলেছিল, প্রত্যেক নাগরিকের আছে চলাচলের স্বাধীনতা, তার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
এক দশক পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি এতটুকুও। যদিও বেড়েছে বিশেষ দিনগুলোতে (কিংবা রাতগুলোতে) পুলিশি তৎপরতা। তবুও প্রতিদিন নারী আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে অজ পাড়া গাঁ থেকে রাজধানীর ডিপ্লোম্যাটিক জোন পর্যন্ত। কখনো এই আক্রমন ধর্ষণ, খুনের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। কখনো শারীরিক লাঞ্ছনা সইছে নারী। প্রতিটি নারী ভীষণ রকম অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির শিকার হন ঘরের বাইরে বের হলে। পাবলিক বাস বা একটু ভীড়ের মধ্যে নারীর উপস্থিতি মানেই তার দিকে এগিয়ে যায় কোন পুরুষ হাত; সেই হাত খুঁজে ফিরে মানুষের উচুনীচু মাংশপিন্ড। আমার ধারণা বাংলাদেশের সব মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীই এধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে। এসবের কোন কোন ঘটনা সংশ্লিষ্ট নারীর মানসিক জগৎটাকেই ভীষনভাবে পাল্টে দেয়। জীবনের গতিপথ দেয় বদলে। কখনো কখনো নারী আক্রান্ত হবার ভয়ে বেছে নেয় আত্মহননের পন্থা।
তবুও প্রতিদিন অসংখ্য নারীর হাহাকারের ধ্বনি শুনেও নিশব্দে নীরবে সমাজ বয়ে চলেছে। নারী ঘর থেকে বের হলেই কেন অজস্র অজস্র কুষ্ঠব্যধিগ্রস্থ হাত তার শরীরের দিকে এগিয়ে আসে? কেন কাম তৃষ্ণায় উন্মাতাল পুরুষ জিহ্বা ছিড়ে খুঁড়ে নারীকে খেয়ে ফেলতে চায়?
কেন? কেন? কেন?
এদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাথ দিয়ে হাটা যায় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মূত্র বিসর্জনের স্থান হিসেবে সরকারী ফুটপাথকেই আদর্শ মনে করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে রুচি বৈকল্যের চিকিৎসা হয় না বরং সেটাকে প্রণোদিত করা হয়। তাই এখান থেকে পাশ করে একজন যখন বিচারপতি হয় তখন সে দূতাবাসের দেয়ালে জলত্যাগ করে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে দেখেছি অন্ধাকারে রাস্তায় দাড়িয়ে জলত্যাগ করতে। এই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে শিক্ষিত নাগরিকদের রুচির চিত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্ত্বরসহ প্রায় গোটা ক্যাম্পাস জুড়ে সন্ধ্যার পরে হাটা যায় না। হাটতে গেলে হঠাৎ পায়ে বাধে আলিঙ্গনে আবদ্ধ কপোত-কপোতি। পাশে দাড়িয়ে কেউ জলত্যাগ করলেও তাদের ধ্যান ভঙ্গ হয় না। রুচি বৈকল্য কেবল ওই দাড়িয়ে জলত্যাগ করা পুরুষটির একার নয়, ওই কপোত-কপোতিরও বটে। সমাজের সামগ্রিক দূষন কেবল পুরুষের একার সৃষ্টি নয়, সেখানে সহযাত্রী নারীও।
এই তো কয়েকদিন আগে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হলো তারই এক সহাপাঠির দ্বারা। ওই ছাত্রীটি একটি অনুষ্ঠান শেষে হলে ফিরছিল তার সহপাঠির সাথে। মধ্যবর্তী অন্ধকার রাস্তায় সে আক্রান্ত হয় ওই সহপাঠির দ্বারা। ওটা কি ছিল ধর্ষনের জন্য উপযুক্ত স্থান? ওই পাষন্ড ছেলেটি কেন তবে ওই স্থানটিতে এই কাজ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেছিল? আসলে ওখানে এবং ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা স্থানে ওই ছেলেটি নানা সময়ে অনেক জুটিকে আদিম ক্রীড়ায় লিপ্ত দেখেছে। আমি অবশ্য ওই ছাত্রীটির কথা বলছি না, তবে অন্যদের বেলায় প্রশ্ন এসেই যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর কেন জঙ্গলের মধ্যে যেতে বাধে না?
সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই এরকম নানা স্থান আছে, নানা ঘটনার ইতিহাস আছে। পুরুষের রুচি বৈকল্যের দায় কেবল পুরুষের একার নয়; এ দায় সমগ্র সমাজের। এ দায় পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী ও প্রেমিক-প্রেমিকার । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে রিক্সাওয়ালা, ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে আমরা কি আশা করতে পারি?
এই সকল ছাত্রদেরই একটা অংশ একসময় শিক্ষক হয় এবং ছাত্রীর শ্লীলতা হানীর চেষ্টা করে। কখনো কখনো কোন ছাত্রী নিজে থেকেই কিছু সুবিধা পাবার আশায় বাহুলগ্না হয় কোন কাম কাতর শিক্ষকের, কখনো শিক্ষক জবরদস্তিমূলক ঝাপিয়ে পড়ে ছাত্রীর উপর এবং আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্থ ছাত্রী মান সন্মানের কথা চিন্তা করে পুরো ঘটনাটি চেপে যায়। মূলত এগুলোই ওই শিক্ষককে সাহসী করে তোলে বারবার ছাত্রীদের উপর ঝাপিয়ে পড়তে। এছাড়া শিক্ষক রাজনীতি তো আছেই।
কর্পোরেট জগৎ, এনজিও, মিডিয়া কোন কিছুই আমাদের সমাজের বাইরে নয়। সমাজের সবচেয়ে বড় বড় ডিগ্রীধারী মানুষগুলোই যখন এতটা কুরুচি সম্পন্ন ও আত্মমর্যাদাহীন; সেখানে একজন বাস কন্ডাক্টর নারী যাত্রীর শরীর স্পর্শ করবে- এতে অবাক হবার কি আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যেখানে ইভ-টিজিংয়ে ব্যস্ত; সেখানে ট্যাক্সিচালক নারী যাত্রীর উদ্দেশে ছুড়ে দেবে অশালীন বাক্যমালা- এতে বিস্মিত হবার কি আছে?
মনে পড়ে একবার জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ধর্ষনের শিকার হয়েছিল ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ছাত্র দ্বারা। একজন অশিক্ষিত বাস কন্ডাক্টরের কাছে তাহলে আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি?
সমাধান কোথায়?
বাঙ্গলা ভাষায় নারীর উপর রচিত শ্রেষ্টতম বই ‘নারী’ নিষিদ্ধ হয়েছিল যে সমাজে সেই সমাজে ওই বই নিষিদ্ধের মাত্র ১৫ বছর পরে আশা করা যায় না উল্লেখযোগ্য কোন পরিবর্তন। এখানে মাত্র একশ বছর হলো নারী ও পুরুষ প্রবেশ করেছে উচ্চ শিক্ষায়। সামাজিক বিবর্তন যদিও ঘটে চলেছে নিরন্তর, তবুও যেতে হবে বহুদুর।
নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ ‘অগ্রসর’ ও সুবিধাভোগী। আর সুবিধাভোগী শ্রেনী কখনোই সুবিধা হারাতে চায় না। নারীকে মর্যাদা পেতে হলে আত্মমর্যাদা বোধ অর্জন করতে হবে। আমাদের অশিক্ষিত ও রক্ষণশীল সমাজের দূর্বল হজমশক্তিকে উপেক্ষা করা চলে না। উপেক্ষা করা চলে না আমাদের দরিদ্র রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা। টিএসসি কিংবা মল চত্ত্বর থেকে ঘুরে এসে একজন রিক্সাচালক তাই নিয়েই আলোচনা করবে যা তার চোখ দেখে অভ্যস্থ নয়।
একজন ট্যাক্সিচালকের পিঠে ‘বল পয়েন্ট কলমে’র খোঁচা দিয়ে বা ‘তাকে ধরে ন্যাংটা’ করে দিয়ে সমস্যার সমাধান আসবে না। আমাদের পাঠ্যপুস্তক এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যা একজন শিক্ষার্থীর নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার চোখ উন্মুক্ত করে দেবে। এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যা মনের কুসংস্কারকে ঝেটিয়ে বিদায় করবে।
আমাদের নারীদের একটি প্রধান সমস্যা হলো এই যে তাদের মধ্যে নিজের পুরুষদেরকে (বাবা, ভাই, স্বামী ইত্যাদি) জগতের অন্য পুরুষদের তুলনায় উন্নত চরিত্রের বলে মনে করার প্রবণতা রয়েছে। মনে পড়ছে বহু বছর আগে দৈনিক ভোরের কাগজে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ এর জরিপের কথা। সেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে নারী যৌন পীড়নের শিকার হয় নিজ আত্মীয় এমনকি বাবা ও ভাইদের দ্বারা।
তাই সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রত্যেক পরিবারকে পুরুষ শিশুর মধ্যে নারীর প্রতি শ্রদ্ধার বোধ তৈরীর দায়িত্ব নিতে হবে। নারী শিশুকে আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব নিতে হবে। তাকে উপলব্ধি করতে দিতে হবে লৈঙ্গিক কারনে কোথাও কোন সুবিধা গ্রহন মানুষকে মর্যাদাবান করে না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদে যাবার জন্য পুরুষ নেতার বাড়ির অন্দরে অন্দরে ঘোরার করার চেয়ে মাঠে ঘাটে কৃষক-জেলের কাছাকাছি যাওয়া অধিক সম্মানজনক। স্বচ্ছল পরিবারের উচ্চশিক্ষিত নারীর জন্য সরকারী কর্মের নিয়োগ পরীক্ষায় ‘কোটা সুবিধা’ গ্রহন অসম্মানজনক।
রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে নিশ্চিত করতে হবে সমান যোগ্যতা সম্পন্ন নারী ও পুরুষ যেন সর্বত্র সমান সুযোগ সুবিধা পায়। আর অনগ্ররসর অংশও যেন লিঙ্গ নির্বিশেষে সাধারণের তুলনায় অগ্রাধিকার লাভ করে।
একটি বৃহৎ সামাজিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন বহু মানুষের সম্মিলিত ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্ম প্রয়াস। আপদমস্তক ব্যধিগ্রস্থ সমাজে নির্বিকার থাকা অসুস্থতা। এবং চিকিৎসার উদ্যোগ না নিয়ে অন্তরে ঘৃনা পোষন ও তার ক্রমাগত উদগীরণ বড় বেশি অসুস্থতা।
হুমায়ুন আজাদের বিখ্যাত উক্তিটি দিয়ে শেষ করছি- চাই অলৈঙ্গিক বিশ্ব সভ্যতা।





দুর্দান্ত পোস্ট!
ডুয়াল পোস্টিংয়ের অভিযোগে লেখাটি প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে আপনার নিজের ব্লগে প্রকাশ করা হলো।
ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে অনুরোধ করা যাচ্ছে
নীতিমালাটি অনুসরণ করুন
খুব ভালো কাজ করেছেন। দোয়া করি চিরকাল ৪/৫জন ব্লগার নিয়েই যেন সংসার চলে। আমার টাইম নাই এই ব্লগে আসার। আগে নিজেরা ভালো করে সাইট ডেভেলপ করেন। কোন দিন উন্নতি করতে পারলে জানাইয়েন, আইসা দেইখা যামু নে। যদিও আর লেখুম না।
আপ্নেদের মনে হয় জানা নাই বাঙ্গলা ভাষায় এখন অনেকগুলা ব্লগ সাইট আছে। পোস্ট দুইবার প্রকাশ হইছে দেইখা একটা মুছে দিলেই পারতেন। শাস্তি হাতে দৌড়ায়া আসতে হবে ক্যান?
যত্তসব.....।
বাই-বাই।
মন্তব্য করুন