ইউজার লগইন

শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়…

বেশ কিছুদিন ধরেই মেয়েটার শরীর ভাল যাচ্ছিল না, তাই মনটাও বেশ খারাপ থাকতো। দিন দিন মেয়েটা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছিল, ওয়েট লুজ করছিল বেশ। অনেক চিন্তা হচ্ছিল, কারণ প্রতিদিনই পায়খানার সাথে রক্ত যেত। কয়েকজন ডাক্তার দেখানোর পর বোঝা গেল ছোট একটা অপারেশন লাগবে, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। যাক, অনেকদিন পর আশ্বস্ত হওয়া গেল যে মেয়েটা সুস্থ হয়ে যাবে। মন থেকে একটা দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেল। ওর মা চিন্তিত হয়ে পড়লে তাকে অভয় দিলাম এটা নিয়ে চিন্তার কি আছে! এটা তো অনেকটা ফোঁড়া কাটার মত, কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ও সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরবে, ভয়ের কিছুই নেই। তবুও মেয়েদের মন বলে কথা, অতি অল্পতেই কাতর হয়ে যায়!

আমি নিজে খুব শক্ত মনের না হলেও এইসব ছোট খাটো অপারেশন নিয়ে কখনোই ভাবনা হয়নি তেমন। কারো এপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের কথা শুনলে বলি- এটা তো এখন ডাল-ভাতের মত ব্যাপার, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমার মেয়ের বেলায়ও কোন দুশ্চিন্তা করিনি, কারণ এটা আসলেই ভয় করার মত কোন কিছু না। কাটা-ছেড়াঁর কিছু নেই, ওকে ঘুম পাড়িয়ে পলিপটা কেটে ফেলবে, এই তো! আমার সাড়ে চার বছরের ছোট্ট মেয়েটি অপারেশন কি জিনিস জানে না, সে তার আগের দিন থেকেই অনেকটা খুশি মনেই যাকে পাচ্ছে তাকেই বলে বেড়াচ্ছে- জান? কাল আমার অপারেশন হবে! যেন এটা একটা মজার ব্যাপার।

অপারেশনের দিন সে আমাদের সাথেই হেসে খেলেই হসপিটালে গেলো এবং যথারীতি দুষ্টুমির মহড়া চালাতে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্ত ভিতর থেকে তার ডাক না পড়ল। আমিও বাধা দেইনি, ওকে ওর মতই থাকতে দিয়েছি। বিপত্তি ঘটলো যখন তাকে ভিতরে নিয়ে যেতে চাইলো। সে কিছুতেই আমাকে ছাড়া যাবে না। অগত্যা আমাকে তার সাথেই অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে যেতে হল। সেখানেও একই অবস্থা। তাকে বেড়ে শোয়াতে গিয়েই বাধলো আরও বিপত্তি, দুই হাত দিয়ে সর্বোশক্তি দিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরে সে কি কান্না! বাবা, তুমি যেওনা, আমি এখানে থাকবো না, আমার ভয় লাগছে, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও...

আমার ভিতরের শক্ত ‘আমি’টার কেমন যেন পরিবর্তন হতে থাকলো, একটা ভীষণ কষ্টের অনুভূতি আমাকে গ্রাস করছিল। এনেস্থেশিয়ার ডাক্তার ওকে ঘুম পড়িয়ে দিল, আমার রিয়াসা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়লো, ওকে বেডে শুইয়ে দেয়া হল আর আমাকে বলা হল বাইরে চলে যেতে... চোখের সামনে আমার নিস্তেজ মেয়েকে রেখে আমি একটু একটু করে রুম থেকে বেরিয়ে আসছি... আমার ভিতরটা সেই মুহুর্তে কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিলো। সচেতনভাবে আমি জানি কিছু সময় পর ও স্বাভাবিক হয়ে যাবে কিন্তু অবচেতন মন যেন কোন যুক্তিই মানতে চায়না। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো আমি রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি ঠিকই কিন্তু আমার প্রাণটা যেন রেখে যাচ্ছি এই রুমের ভিতরেই... কিছু কিছু মূহুর্ত থাকে যখন নিজেকে ঠিক সামলে রাখা সম্ভব হয় না, সব কিছু বোঝার পরও শরীরের ভিতরে স্বত্বাকে ঠিক মানানো যায়না। এটি ছিল সেরকমই একটি ব্যাপার।

প্রায় ঘন্টাখানেক বাইরে অধীর অপেক্ষা, এই বুঝি ডাক পড়ল, এই বুঝি ডাক পড়ল! একসময় সেই কাঙ্খিত ডাক এলো, ডাক্তারের এসিসটেন্ট এসে বললো অপেরাশন শেষ, ও ভাল আছে। আমাদের দেখালো ভিতর থেকে কেটে আনা বাড়তি মাংসের টুকরা, যেটা ওকে এতদিন যন্ত্রণা দিচ্ছিলো। আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আরও বেশ কিছুক্ষণ পর একজন আমাকে ডেকে নিয়ে গেল অবজারভেশন রুমে, দেখলাম অক্সিজেন দিয়ে রাখা অবস্থায় বেডে শুয়ে আছে আমার রিয়াসা।

বাইরে এসে আবারও সেই অপেক্ষার প্রহর! দীর্ঘ সময় পর ওর জ্ঞান ফিরে এলে আবার ডাক পড়লো আমাদের। একজন এসে বলল মেয়েটির বাবা কে? ও বাবার জন্য কাঁদছে। ছুটে গেলাম ভিতরে। আমাকে দেখে আবার সেই কান্না। বাবা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, আমি এখানে থাকবো না। মাত্র জ্ঞান ফিরে এসেছে, এখনই তো ওকে নেয়া যাবে না, আরও কিছুক্ষণ ওকে রাখতে হবে এখানে। অতএব ওর কান্না থামাতে আমাকে আর ওর মাকে পালাক্রমে থাকতে হল ওর পাশে। এভাবেই প্রায় দুই ঘন্টা পর ডাক্তার রিলিজ দিলেন ওকে। দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টা অবসানের পর রিয়াসা ফিরে এল আমার বুকে! আমার মনে হল আমার প্রাণ ফিরে পেলাম।

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


অনেক অনেক আদর রিয়াসার জন্য। অনেক বড় মানুষ হোক!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আমার সবসময়ের চাওয়া ও একজন ভাল মানুষ হোক।

টোকাই's picture


সন্তানের জন্য বাবা মা'র মায়া, কষ্ট , অনুভুতি অন্য কেউ উপলব্দি করতে পারে না।অপারেশন থিয়েটারে রিয়াসাকে পাঠিয়ে দেবার পর আপনার মানষিক অবস্থা কেমন হইসিলো আমি উপলব্দি করতে পারি।

আমার ছোট ছেলে রায়ান এর জন্ম হইসিলো clefT palaTe নিয়ে। অর্থাৎ ওর মুখের ভিতরে জিহবার উপরের ছাদ এর মাঝে বিশাল গর্ত। জন্ম হবার সাথে সাথেই ডাক্তার এসে আমাকে জানালো। আমিতো এটার অর্থ কিছুই না বুঝে হাঁ করে তাকিয়ে আছি। তাই দেখে ডাক্তার তখন ছবি একে আমাকে সব বুঝিয়ে দিলো। আর এও বলল যে দেড় বছর বয়সের আগে এটা সার্জারি করে ঠিক করা যাবে না। ততদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হল ওকে দুধ খাওয়ানোর অনেক বিড়ম্বনা নিয়ে।

যেহেতূ রায়ান এর মুখের ছাদ ফাটা তাই শোয়ানো অবস্থায় দুধ খাওয়ালে সব নাক দিয়ে বের হয়ে যেতো। আর তাই বিভিন্ন পশু 'র বাচ্চা হলে ওদের কে যেমন লম্বা রাবারের নিপল ( টিউবের মত) দিয়ে দুধ সরাসরি গলার ভিতরে দিয়ে খাওয়ানো হত, রায়ান কেও এক ই ভাবে দুধ খাওয়াতে হত।

দেড় বছর বয়সে রায়ান এর সার্জারির দিন তারিখ ঠিক হল। আমি ওকে নিয়ে হসপিটালে গেলাম। আমার কোলেই সারাক্ষন রায়ান। কিছুই বুঝছিল না কি হতে যাচ্ছে। আমার হাতের উপর রেখেই এনেস্থেশিয়া দিল রায়ান কে ওরা। আস্তে করে ঘুমিয়ে গেল রায়ান।

এতক্ষন আমিও কিছু বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু যখন হাসি খুশি ছেলে আমার হটাত আমার হাতেই ঘুমিয়ে গেলো অষুদের প্রভাবে, হটাত প্রচন্ড ভীতি চেপে ধরলো আমাকে। ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো। তিন ঘন্টা'র অপারেশন হবে। আমি এই সময়টুকু ওয়েটিং রুমে বসে যত দোয়া জানি সব কতবার করে পড়েছি মনে নাই। শুধু ভয় হচ্ছিলো রায়ান এর জ্ঞ্যান ফিরে আসবে তো? ওদের কোন ভুল হবে নাতো? সিনেমার মত এসে বলবে নাতো যে সরি, উই কুডন্ট সেভ হিম। এসব ভেবে আমি আধ মরা হয়ে যাচ্ছিলাম।
হুশ হোল যখন নার্স এসে আমাকে ডাকছিলো, আর আমি নিজের নাম ও চিনতে না পেরে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। অনেক্ষন পর বুঝতে পারলাম আমাকেই ডাকছে। দৌড়ে গেলাম রায়ান এর কাছে। দেখি মুখে র চারপাশে রক্তের দাগ। ঘুমিয়ে আছে। ডাক্তার বলল , অপারেশন সাক্সেস্ফুল। কিছুক্ষন পর জ্ঞ্যান ফিরে আসবে।

সংক্ষেপে বলি, যখন রায়ান চোখ মেলে তাকালো, আমার শুধু মনে হইসিলো, আমি পৃথিবিতে আর কিছুই চাই না। আর মনে হইসে আল্লাহ অনেক মহান।
রায়ান এর বয়স এখন ষোল বছর। সে অনেক ভাল আছে। সবাই দোয়া করবেন।

রিয়াসা'র জন্য রইল আমার অন্তর থেকে অনেক অনেক দোয়া আর শুভ কামনা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময় প্রতিদিন দেখতাম তীর্থের কাকের মত বাবা দাঁড়িয়ে রয়েছেন বারান্দায়, মাঝে মাঝে রাগ করে বলতাম-আপনি কেন কষ্ট করে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকেন? আমি তো বাসায় ফিরবোই।
উত্তরে বাবা শুধু বলতেন- যেদিন বাবা হবি সেদিন বুঝবি সন্তানের জন্য বাবার অনুভূতি কেমন হয়। আজ এতদিন পরে বাবার কথাগুলো বারে বারে মনে পড়ে।

রায়ানের জন্য আপনার সেই সময়ের অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি, এই সময়গুলোতে নিজেকে সামলানো অসলেই বেশ কঠিন। আপনার রায়ান ভাল থাকুক, অনেক বড় হোক।

লীনা দিলরুবা's picture


রিয়াসার জন্য অনেক অনেক আদর আর শুভকামনা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনার জন্যও শুভকামনা।

দূরতম গর্জন's picture


রিয়াসা ভালো থাকুক সুখে থাকুক

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


রিয়াসা ভাল আছে।
ধন্যবাদ আপনাকে এত পিছনে গিয়ে লেখাটা পড়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।