ইউজার লগইন

কষ্টের ঈদ

আমাদের বিয়ের আট বছর পর এই প্রথমবার ঠিক হয়েছিল আমার স্ত্রী শ্বাশুড়ির সাথে ঈদ করবে। প্রতিবছর আমার ভাই-বোন আমার কাছে থাকেতে আগে কখনও সম্ভব হয়নি, এবার ওরা যার যার বাসায় ঈদ করাতে ঠিক হল স্ত্রী শ্বাশুরির বাসায়ই যাবে। মেয়ের যাবার কথা শুনে শ্বাশুরি খুব খুশি হয়েছিলেন। ওনাকে যে দেখাশোনা করছিল তাকে বার বার নাকি বলছিলেন-এবার আমার সব ছেলেমেয়ে নিয়ে একসাথে ঈদ করব। দীর্ঘ দুই বছর প্যারালাইসড হয়ে বিছানায় শোয়া, তবুও ছেলেমেয়েদের কাছে ভরসার স্থল। শ্বশুর জীবিত নেই, তাই সবার মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করেন উনিই, ওনার টানেই কিছুদিন পর পর সবাই ছুটে আসে।

ঈদের আগের দিন, আমাদের ব্যাগ-ব্যাগেজ গোছানো কমপ্লিট। ঠিক হল ওদের ও বাড়িতে পৌছে দিয়ে আমি আবার বাসায় চলে আসব, ঈদের দিন সকালে আবার ওদের সাথে মিলিত হব। গিন্নি আমার জন্য কিছু রান্না-বান্নার আয়োজনে ব্যস্ত, আর এই ফাঁকে প্রায় দুই দিন ব্যস্ততার পর ব্লগ খুলে বসেছি, দেখছিলাম কি কি নতুন লেখা পোষ্ট হয়েছে। রান্নার এক ফাঁকে আমার স্ত্রী পাশে এসে বসলো, ওর চোখে মুখে দেখছিলাম অন্যরকম এক আলোর দীপ্তি। আমি কখনও ওকে এতটা আনন্দিত হতে দেখিনি, তাই ভীষন ভাল লাগছিল। বেলা প্রায় সাড়ে বারোটা, আমার মোবাইলে ওর বোনের ফোন দেখে ও-ই রিসিভ করলো। ফোনটা ধরেই প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলো- কি বলিস! ওর কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তাকিয়ে দেখলাম ওর চোখে পানি চিক চিক করছে। আমি জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল-আম্মা নাকি নড়াচড়া করছে না, কোন কথাও বলছে না। ওরা হসপিটালে নেয়ার ব্যবস্থা করছে। আমার ভিতরটা কেঁপে উঠলো। আমি অনেকদিন থেকেই একটা আশঙ্কা করছিলাম। শেষবার বারডেম থেকে ফিরে আমার বাসায় এক মাস ছিলেন। বারডেম থেকেই বলে দিয়েছিল ওনার অবস্থা ভালনা, ভিতরে ভিতরে ছোট ছোট স্ট্রোক হচ্ছিলো। আমার কেবলই মনে হত এগুলি হয়ত বড় কোন স্ট্রোকের সংকেত। এর আগে দুইবার স্ট্রোকে একপাশ প্যারালাইসড হয়ে বিছানায়, আর একবার স্ট্রোকেই হয়ত সব শেষ।

আমরা আর দেরী না করে যা যেভাবে ছিল সেভাবে রেখে বেরিয়ে পড়লাম, সরাসরি হসপিটালে। ইমারজেন্সিতে গিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলতেই জানলাম- সব শেষ! আমার স্ত্রীকে সামলানো অনেক কঠিন হয়ে গেল। আমি জানি ঠিক এই মূহুর্তে কোন শান্তনা বাক্যই ওর ভিতরের কষ্টকে কমানোর কাজে আসবে না। আমার নিজের ভিতরটাই ভীষণ ফাঁকা লাগছিল, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছিলাম না। এই পরিস্থিতিতে কাউকে না কাউকে শক্ত হতে হয়। ওরা তিন ভাই বোন হসপিটালে উপস্থিত ছিল, তাদের সামাল দিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলে ডেড বডি বাসায় নেবার ব্যবস্থা করলাম, কাছের আত্মীয় স্বজনদের কাছে ওনার মৃত্যূ সংবাদ পৌছে দিলাম। সবার আগমনে আজকে যে বাড়ি আনন্দমূখর হয়ে ওঠার কথা ছিল এখন তা শোকপুরী, কান্না-আর্তনাদ-আহাজারিতে পরিপূর্ণ।

জীবদ্দশায় একজন মানুষ কত প্রিয়! মৃত্যূর পর সেই আপন মানুষকে আর কাছে ধরে রাখার কোন সুযোগ নেই। শুরু হয় যত তাড়াতাড়ি সম্ভব লাশ দাফন করার প্রকৃয়া। স্ত্রী, শালাদের সান্ত্বনা দেবার পাশাপাশি কবরস্থান, গোসল-কাফন, জানাজা ও বিদায়ের যবতীয় কাজ সম্পন্ন করতে সারাদিন শেষ। দাফন শেষ করে বাসায় ফিরতে রাত সাড়ে এগারোটা। কারো চোখেই ঘুম নেই, আত্মীয়-স্বজনে ঘর ভর্তি কিন্তু সবার চোখে জল, থেকে থেকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসছে ভিতর থেকে। আমার নিজেরও বার বার মনে পড়ছে তার সাথে বিভিন্ন মূহুর্তের স্মৃতি। আমাকে দেখে সবসময়ই একটা হাসি দিয়েই জিজ্ঞেস করতেন- কেমন আছ? সেই হাসিমুখটা চোখে চোখে ভাসছে। রোজা শুরুর আগে একমাস আমার বাসায় থাকাকালীন সময়ে প্রায় প্রতি রাতেই আমাকে ডেকে বিদায় নিতেন, বলতেন- মাফ করে দিও, আর দেখা হবে না! আমি হেসে বলতাম- আচ্ছা ঠিক আছে, সকালে কথা হবে। রোজার একদিন আগেই আমার বাসা থেকে শ্যালকরা নিয়ে গেল ওদের বাসায়। চলে যাবার সময় দু’হাত ধরে আবার সেই বিদায় নেয়া! তখন বুঝতে পারিনি সেটা ছিল সত্যিকারের বিদায়!

সবার ভিতরের শূন্যতা নিয়েই রাতটি পার হল। নির্ঘুম সারারাতের শেষে ঈদের সকাল! ভেজা চোখ, ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ঈদের দিনের শুরু। খুশির দিনে কারো মুখেই হাসি নেই, আনন্দ নেই। চারিদিকে যখন ঈদের আনন্দের ছড়াছড়ি তখন এই গৃহের মানুষদের ভিতরের অনুভূতি কেবলই কষ্টের!

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


বড়ই মর্মান্তিক খবর। উনার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আপনাদেরকে শোক সইবার শক্তি দিন আল্লাহ!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


একসময় শোক সয়ে আসবে ঠিকই তবে প্রতিটা ঈদের আগের দিনই তার সন্তানদের মনে পড়বে এইদিনেই ওরা ওদের মা'কে হারিয়েছিলো।

সাঈদ's picture


মা হারানোর শোক মনে হয় সবচেয়ে বড় শোক ।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আমারও মনে হয় এর চেয়ে বড় শোক আর হয়না।

মীর's picture


আমার কাছে এই পৃথিবীতে সবচে' কষ্টের কাজ মনে হয় যেকোন রকম মৃত্যু সংবাদ গ্রহণ করাটা।

লেখাটা পড়ে খুবই কান্না পাচ্ছে নিভৃতদা'। আমি কক্সবাজারে আত্মীয়-স্বজন নিয়ে খুব ভীষণ মজা করছিলাম এবং ভাবছিলাম ছবি-টবিসহ একটা বড় লেখা দেবো Sad Sad Sad Sad

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ মীর বিষয়টা ফিল করার জন্য।
আপনার ছবিসহ পোষ্টের অপেক্ষায় থাকলাম।

তানবীরা's picture


মৃত্যুই জীবনের বড় সত্যি Puzzled

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্য আর নেই, তবুও মেনে নেয়া বড় কষ্টের!

রাসেল আশরাফ's picture


.... Sad

১০

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Puzzled Puzzled

১১

শওকত মাসুম's picture


Sad

১২

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Sad Sad

১৩

সামছা আকিদা জাহান's picture


খুব খারাপ লাগছে। আমার মাও অসুস্থ থাকেন। ওনার আত্মা শান্তি পাক।

১৪

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনার মা'ও ভাল থাকুন।

১৫

রায়েহাত শুভ's picture


Sad

১৬

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Sad Sad

১৭

মর্ম's picture


২০০৮ এর কোরবানীর ঈদ-এর কথা মনে দিলেন- কাছের মানুষকে হারিয়ে 'ঈদ' করার যন্ত্রনায় সবাই সমমর্মী হতে পারবে না, অসম্ভব একটা ব্যাপার।

১৮

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনি ঠিকই বলেছেন, এই ব্যাপারগুলো সবাই বুঝবে না। আমার কেবলই মনে হয় এরপর থেকে প্রতিটি ঈদেই আমার স্ত্রীর তার মায়ের কথা মনে করে মন খারাপ হবে।

১৯

দূরতম গর্জন's picture


২০০৮ এর কোরবানীর ঈদে বাবার সাথে কোনো একটা ব্যপারে ঝগড়াহয়!

পোস্ট টা পড়ে মনে হলো বাবার সাথে একবার কথা বলি

কেমন আছেন এখন?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।