ইউজার লগইন

ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে

স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর থেকে অয়নের ছোট্ট জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এতদিনের চেনাজানা ক্ষুদ্র গন্ডিটা বড় হতে শুরু করেছে ডালপালা ছড়িয়ে। ওর পরিচিত মানুষের তালিকায় যোগ হচ্ছে অনেক নতুন মুখ। স্কুলে বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে এই সময়টুকু কখন যে শেষ হয়ে যায় টেরই পায়না! বড় ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা ওকে নিয়ে আড়ালে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে, ও ঠিকই শুনতে পায়। তখন মা’র কথা খুব মনে হয়। মনে আছে ও যেদিন প্রথম স্কুলে এলো, মা ওকে কাজল পরিয়ে দিয়েছিলেন। ছোটদির একটা কাজলদানি আছে, পিতলের। দুইদিক দিয়ে চাপদিয়ে ওটা খোলা ও বন্ধ করা যায়। মা কাজল পরিয়ে দিতে দিতে বলেছিলেন- ‘আমার বাছার যেন কারো নজর না লাগে’! সেদিন খুব সকালে উঠে ওর জন্য খেজুরের রসের পায়েস করেছিলেন, সেই পায়েস খেয়ে বাবার হাত ধরে স্কুলে এসেছিল ও।
ওদের ক্লাস টিচারের নাম জগানন্দ বসু, সবাই বলে বসু স্যার। অয়নকে খুব আদর করেন। স্কুলে ভর্তির আগে বাবার কাছে ওদের বাড়িতে যখন যেতেন, অনেক মজার মজার গল্প শোনাতেন। ইসমাইল স্যারকে স্কুলের সবাই খুব ভয় পায়, পিটির সময় মাঠের মধ্যে জোড়া বেত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্যারের ভয়ে কেউ পিটিতে অনুপস্থিত থাকে না। এই সময় বড় ক্লাসের ছাত্ররা যখন স্যারদের সামনে গিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গায়- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি, চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস... এই সময় বাবা কেমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন দেশকে নিয়ে বাবার কথাগুলো খুব মনে পড়ে ওর। বাবা সবসময়ই বলেন- দেশকে ভালবাসবে, দেশ হচ্ছে মা।

অয়নদের ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা মোট পঁচিশ জন। একপাশে ছেলেরা আর অন্যপাশে মেয়েরা বসে। ইসমাইল স্যার ক্লাসে আসলে রুমের ভিতর নেমে আসে পিনপতন নীরবতা, একটু আগের হই-হুল্লোড় এক নিমেষেই বন্ধ হয়ে যায়। ওদের ক্লাসে স্যার কখনও বেত নিয়ে আসেন না, তবুও সবাই খুব স্যারকে খুব ভয় পায়। সামনের ব্লাকবোর্ডের সংখ্যাগুলো সব খাতায় লিখে ফেলেছে অয়ন। রাজু সুবলের সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে। ও স্কুলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। স্কুলঘরের ঠিক উল্টাদিকে একটা উঁচু রাস্তা সোজা সামনের দিকে চলে গেছে, অয়নের খুব জানতে ইচ্ছে করে ওদিকে কি আছে। একদিন ও ঠিকই যাবে ওদিকে।
বাবার সাথে স্কুলে গেলেও ছুটির পরেও বাবার কিছু কাজ থাকে, তাই অয়নকে ফিরতে হয় একাই। অবশ্য বাড়ি থেকে স্কুল বেশী দূরে নয়। এটুকু পথ হেঁটে আসা যাওয়া করতে ওর বেশ লাগে। স্কুলে যাওয়া শুরু করার পর ওর বেশ কিছু বন্ধু জুটে গেছে। ক্লাসের বন্ধুদের মধ্যে সুবল আর মিরাজের সাথে ভাব একটু বেশী। তিনজনের বাড়ি কাছাকাছি, তাই স্কুল ছুটি হলে ওরা একসাথেই কোটাখালী খালের পাড়ের সরু রাস্তা ধরে একসাথে ফিরে আসে। হাঁটতে হাঁটতেই ওর চোখে পড়ে খালের ঘোলাজলের মধ্যে হাসগুলি ভেসে বেড়ায় মনের আনন্দে। অদ্ভুত সুন্দর মাছরাঙাটা জলের মধ্য থেকে একডুবে মাছ তুলে নিয়ে বসে পড়ে খালের পাড়ে ঝোপঝাড়ের কচিডালে।

এই খালটা উজানগাঙ থেকে শ্যামলপুর আর ভবানীপুর গ্রামের মাঝখান দিয়ে ঢুকে পড়েছে, তারপর শ্যামলপুরের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেকে গ্রামের শেষ প্রান্তে চলে গেছে। এখানটায় খালটি বেশ চওড়া আর গভীরতাও অনেক বেশী। মাঝে মাঝে বেশ স্রোত থাকে। বর্ষার সময়ে দু’পাড়ের সরু কাঁচারাস্তা দুটি বাদ দিলে খাল আর ধানী জমিগুলো সব পানিতে একাকার হয়ে যায়। মাছ আটকানোর জন্য কিছুদূর পর পরই খালের পাড়ঘেঁষে বাঁশ দিয়ে ঘের দিয়ে তার মধ্যে বেশ কিছু ডালপালা ফেলে রাখা হয়েছে। স্থানীয় ভাষায় একে বলে ঝাউ, দেখতে অনেকটা আধখানা চাঁদের মত। শুকনো মৌসুমে যখন খালের পানি কমে যায়, তখন জাল দিয়ে বাঁশগুলোর চারপাশটা ঘেরাও দিয়ে মাঝখানের ডালপালা তুলে ওর মধ্যে আটকে পড়া মাছ ধরা হয়।

স্কুল থেকে এই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগুলেই খালের পাড়েই তালুকদারের হাটখোলা। এটা নিয়মিত কোন হাট নয়। কয়েকটা ছোট টং দোকান আর একটা চালের কল থাকায় এখানে মাঝে মাঝে লোকজন থাকে। শোনা যায়, খালেক মেম্বারের দাদা সিরু তালুকদার এখানে প্রথম একটা ধান ভাঙ্গানোর কল বসায়। আশেপাশের এলাকার লোকজন এই কোটাখালী খাল দিয়ে নৌকায় করে ধান এনে এখানে ভাঙ্গাতো। ধীরে ধীরে লোকসমাগম বাড়তে থাকে, অতঃপর ধানের কলের চারপাশে কয়েকটি চা-পানের দোকান গড়ে উঠলে অবসর সময়ে গ্রামের কিছু লোক এখানে এসে বসতো। এভাবেই একসময় লোকমুখে এই জায়গাটা তালুকদারের হাটখোলা নামে পরিচিতি পায়। এখান দিয়ে যাবার সময় প্রতিদিনই ওরা দেখে কয়েকজন লোক খালের পাড়ের একটা ছাউনির নিচে বসে তাস খেলে। মাঝে মাঝে চিৎকার চেচামেচিও করে।

দোকানগুলো ছাড়িয়ে কিছুদূর এগিয়ে কোটাখালী ব্রিজের কাছাকাছি এসে রাস্তার ডান পার্শ্বে একটি পূজা মণ্ডপ। বাঁশের খুঁটির উপর ছনের ছাউনি আর দুপাশে চাটাইয়ের বেড়া দেয়া মণ্ডপটিতে কয়েকটি মূর্তি সবসময়ই থাকে। আশপাশের হিন্দু বাড়ির লোকজন সকাল সন্ধ্যা এখানে পূজা করে। এলাকার লোকজন এই মণ্ডপের জায়গাটিকে বলে কালীখোলা। এই কালীখোলার কাছাকছি আসতেই অয়নের খুব ভয় লাগে। ছোটদি একদিন বলেছিল সাঁঝবেলা একলা কালীখোলার কাছাকাছি না আসতে। ও কখনও এখান দিয়ে একা যেতে পারেনা। ওদিকে তাকালেই মনে হয় মণ্ডপের বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো মূর্তিগুলি যেন ওর দিকেই তাকিয়ে আছে, এখনই তেড়ে আসবে। বিশেষ করে যে কালো মূর্তিটা খড়্গ হাতে নিয়ে একটি লোকের বুকের উপর পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সুবলকে মুর্তিগুলো দেখিয়ে অয়ন বলে,
-দ্যাখ, ঐ মূর্তিডা জিব্বা বাইর কইরা ক্যামন হা কইরা চাইয়া আছে! তোর এইগুলি দেইখা ডর লাগে না?
-ক্যান, ডর লাগবো ক্যান? ইনি তো আমগো মা! আমি তো মাঝে মধ্যেই বাবার লগে সাঁঝের বেলা এইহানে আহি, বাবা মায়ের পূজা দেয় আর আমি দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেহি।
-তোর ডর লাগে না মিরাজ? এবার মিরাজকে জিজ্ঞেস করে অয়ন
-সবাই একলগে থাকলে লাগেনা, তয় একলা স্কুলে যাওনের সময় একটু একটু ডর লাগে।
সুবল বেশ অবাক হওয়ার ভঙ্গী করে বলে-তোরা কি যে কস? আমি তো এইহানে সন্ধ্যার পরও একলা আইতে পারুম।
-তোর অনেক সাহস!
-এইহানে সাহসের কি অইলো? উনারা তো আর ভূত পেত্নী না যে ডরামু? বাবা কইছে যহনই ডর লাগবো মা কালীর নাম নিবি, দেখবি ভগবানের কৃপায় কিছু অইবো না।
-থাউক ভাই, আমার এত সাহসের দরকার নাই, আমি এইহান দিয়া কোনদিনও একলা একলা যামু না, অয়ন বলে।
-তোরা এহনও পোলাপানই রইয়া গেছস! অনেকটা বড়দের মত করে বলে সুবল
-হ, তুই তো বুইড়া হাবড়া অইয়া গেছস! তাইলে হাফপ্যান পড়স ক্যান?
-আমি হাফপ্যান পরি আর যাই পরি তোগো মতন ডরাই না
-আরে থামতো তোরা! বড় অইলে দেখবি কাউরও ডর লাগবো না। অয়ন আর সুবলের মৃদু ঝগড়া থামাতে মিরাজ বলে ওঠে।

তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে কোটাখালি ব্রিজের কাছে চলে আসে। সুবলের বাড়ি খালের এই পাড়ে, ও ডান দিকের রাস্তায় নেমে বাড়ির পথে চলে গেলে অয়ন আর মিরাজ কাঠের ব্রিজ পার হয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে সোজা অয়নদের বাড়ি বরাবর এগিয়ে চলে। অয়নদের বাড়ি পার হয়ে আরও বেশ কিছুটা পথ সামনে এগোলেই মিরাজের মামাবাড়ি। গতবছর ওর মা মারা গেছে, তারপর থেকে মামাবাড়িতেই থাকে ও।
-তোর মা’রে মনে পড়ে না? মিরাজের উদ্দেশ্যে বলে অয়ন
মিরাজ কিছুটা আনমনা হয়ে যায়, তারপর বলে, হ খুব মনে পড়ে। দুফুরবেলা মায়ের লগেই তো ঘুমাইয়া আছিলাম, ঘুম থেইক্যা উইঠা দেহি মায় নাই!
-তোর বাবা তোরে দ্যাখতে আহে না?
বাবার প্রসঙ্গ আসতেই মিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ পর গম্ভীরভাবে বলে- ‘না’। এরপর বাকি পথটুকু নিঃশব্দেই পার হয়ে যায়, কেউ আর কোন কথা বলে না।

চলবে...

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


আগেও বলেছি নিভৃতদা'। আপনার প্রকৃতির বর্ণনা অসাধারণ হয়। আজকেরটা অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছু হয়েছে।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ মীর। অনেকদিন পর আজ ব্লগে ঢুকলাম।
এটা একটা ধারাবাহিক লেখা, অনেকদূর টেনে নেয়ার ইচ্ছে আছে। অবশ্য যদি পাঠকরা চায়।
আপনার লেখা এত কম কেন?

মীর's picture


অবশ্যই পাঠকরা চায়। আপনি সিরিজটা নিয়মিত চালান। আমার লেখা কেন যে কম, আল্লাই জানে!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


চলবে। Smile
তাড়াতাড়ি লেখা ছাড়েন। Crazy

নাজনীন খলিল's picture


প্রথম পর্ব থেকে শুরু করে মন্তব্য করবো। Smile

শুভেচ্ছা।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধইন্যা পাতা

প্রাগৈতিহাসিক অভী's picture


ভালো লাগলো ভাি।পোরেরটা কোবে পাবো?

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ, পরের পর্বগুলো আসবে শিঘ্রই Smile

সামছা আকিদা জাহান's picture


স্বপ্নচারী , প্রকৃতির বর্ননায় সত্যিই স্বপ্ন দেখালেন। অসাধারন।

১০

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ আপা। Smile
প্রকৃতির মাঝে বড় হওয়ায় জীবনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কটা অবিচ্ছেদ্য।

১১

আহসান হাবীব's picture


আমার গ্রামের বাড়ী থেকে ঠাকুরগাও শহরে যেতে এমন একটি কালি মন্দির ছিল। আশপাশে কোন বাড়ীঘর ছিল না। আমার খুব ভয় লাগত। রাস্তাও কাচাছিল। কখনও প্রয়োজন হলে কাছাকাছি এসে চোখ বন্ধ করে দিতাম এক দৌড়। তাই পড়ে অনেক মজা পেলাম। আর লেখা তো অনবদ্য কিছু বলার নেই।
তবে

বাবার প্রসঙ্গ আসতেই মিরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ পর গম্ভীরভাবে বলে- ‘না

মনটা ভীষন খারাপ হয়ে গেল!

১২

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ।
মিরাজের বাবাকে নিয়ে মন খারাপ করার কিছু নেই, বরং মায়ের জন্য মন খারাপ লাগতে পারে। সাথে থাকেন, ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

১৩

তানবীরা's picture


আপনার প্রকৃতির বর্ণনা অসাধারণ হয়। আজকেরটা অসাধারণের চেয়েও বেশি কিছু হয়েছে।

১৪

দূরতম গর্জন's picture


সাবলীল ঢং এ লিখে গেছেন

চলতে থাকুক সিরিজটা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।