হাওয়ার ঘুম
আমরা মুখোমুখি অথচ মাঝবরবার ঢুকে পড়েছে যেন আলোকবর্ষ অথবা এক শতাব্দী দূরত্ব। হয়ত তাই আমরা কেউ কাউকে ছুঁতে পারিনি। মা অবশ্য স্বচ্ছ দিঘির মত; আমাদের নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা, ক্ষোভ বা অভিযোগ সবটাই আমার মুখস্ত। অথচ আমি গাঢ় থেকে গাঢ়তর শৈবালের ঝোঁপ তৈরি করে ফেলেছি। না আমি যেতে পেরেছি, না মা আসতে পেরেছে। তাই ইউ-টার্ন না করে কেবল আমাদের সমান্তরালে ছুটে চলা। 'গর্ভধারিনী' উপন্যাসে এক চরিত্র বলেছিল "যে বাচ্চা মাকে বেশী কষ্ট দিয়ে পৃথিবীতে আসে সে চিরদিন সুখী করে রাখে।" আমার জন্মকথা যে শুনেছে সেই-ই বলেছে 'মিঠি, মাকে কোনদিন কষ্ট দিও না!' ছোটবেলা থেকেই আমার উপর যোগ্য সন্তান হওয়ার একটা দায় চাপিয়ে দিয়েছিল সবাই বুঝে অথবা না বুঝেই। হয়ত সব সন্তানই এইটুকু দায় নিয়েই বড় হয়।
মন্ত্রপাঠ করেও আমি মায়ের মনের মত হতে পারিনি। মা যেসব সরল প্রাপ্তিকে সফলতার চিহ্ন হিসেবে দেখতে চেয়েছিল সেগুলোকে চেষ্টা করেও সফলতা হিসেবে ভাবতে পারিনি। আমার যা করতে ভালোলাগে মা সেখানে অপচয় আর সময় নষ্ট খুঁজে পেয়েছে। আমিও অবশ্য সময়ে সময়ে প্রমাণ দিয়েছি সত্যিই সময়ের অপচয় করেছি তবুও 'ভালো লাগে' এর থেকে তীব্র যুক্তি আমার কাছে কিছু ছিল না। সম্ভাবনাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম বলেই হয়তো মায়ের এত দুশ্চিন্তা, আক্ষেপ। তবুও মায়ের অগোচর অন্য আমিরা বেড়ে উঠেতো। আমি দিশেহারা অথবা আহত একটা বাঘের ছানার মত ঝাঁপিয়ে পড়ি 'আমাকে কখনো বুঝার চেষ্টা করোনি। তুমি কি জানো আমার কিসে ভালো লাগে? আমি কি চাই?' ভাবিনি মা জানতে চাইনি বলেই কি জানতে চাওয়ার ইচ্ছে হয়নি তাঁর। অভিমান জমতে জমতে জন্ম নিয়েছে ঘৃণা। সুখেল বাইরের পৃথিবীও টিকটিক করে জানিয়ে গেছে ভেতরের পৃথিবী কি ভীষণ বিভৎস।
আমাকে বুঝতে না পারাটা কি মায়ের অপরাধ! অপরাধইতো? যে আমার বয়সন্ধির গল্প জানে, যে ঠিক সময়ে জানিয়ে দিয়েছে কখন আমায় গুছিয়ে পড়তে হবে। যে আমার সব জেনে বসে আছে সে কেন বুঝতে পারছে না আমার এইসব চাওয়া? একটাই কারণ আমি গুরুত্ব পাচ্ছি না। আবার ভাবতাম আমার সবকিছুর বাঁধা হয়ে সুখ নষ্ট করার কি অধিকার আছে? আমি কি তোমার হাতের ঘুড়ি? আমি কখনো কারো হাতে ঘুড়ি হতে চাইনি। হতে চেয়েছি পাখি, নরম তুলতুলে পাখি। উড়ার স্বাধীনতা চেয়েছিলাম; তুমি উড়ানোর স্বাধীনতা নিয়ে বসে ছিলে। আমি তোমার হাতে বাঁধা পড়তে চাইনি। হয়ত তুমি আমাকে শুধুই ছুঁতে চেয়েছিল আর তোমার ছুঁতে চাওয়াকে মনে হয়েছে রুখে দেয়া। কি অদ্ভুত কন্ট্রাডিকটরি, আমি যতটা নির্ভরহীন হতে চেয়েছিলাম ততটাই নির্ভরতা চেয়েছিলাম তোমার কাছেই!
অদ্ভুত কি জানো, আমি যত বড় হয়েছি একটা ভয়ও আমার মতো বড় হয়েছে। আমি কেমন স্ত্রী হবো, পরিবারের বড়/সেঝ/ ছোট বৌ হিসেবে কেমন হবো এই নিয়ে কখনো ভাবিনি। আমি কেমন মা হবো এই নিয়েই আমার যত গা শিরশির করা ভয়। এক সন্তান হয়ে উঠতে পারে মায়ের ব্যর্থতা। একটু এদিক-ওদিক; উঠে আসবে সারি সারি আঙুল। ভালো সন্তানের মা হতে হবে এই দায় মায়েরও যে থাকে। নাকি সেটা মায়ের সংস্কার? যেমন থাকে সন্তানের সংস্কার? মা, তোমারো কি এই ভয় অথবা সংস্কার ছিল? তুমিও কি দিশেহারা হয়ে ছুটে যেতে? শাসনের আড়ালে তোমার দূর্বলতাই ছিল আমার মত। তুমি ব্যর্থ হতে চাওনি।
মায়েদের এক বিপত্তি মাকে চাই চাই আবার মাকেই মনে হয় গলার কাছে চেপে ধরে আছে। চুপ-ভয় থেকে প্রীতি উপহার পড়ি, ক্রাচের কর্ণেলের আশরাফুন্নেসাকে, জাহানারা ইমামকে মায়ের অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নীচে এনে ব্যবচ্ছেদ করি, বাচ্চাদের সাইকোলজি নিয়ে বিস্তর বই পড়ি। আমার ডায়েরীর পাতায় পাতায় আদর্শ মা হওয়ার উপদেশে ঠাসা। মাঝে মাঝে নিজেই হাসি সন্তান পালনের সহজাত ব্যাপারটাকে জটিল আর ব্যাপক করে তুলেছি। পাখির মা হতে পারছি কই? অভিভাবকই থেকে গেলাম বোধহয়। মানুষ যে, মানুষ মায়ের মায়া যে বড় দীর্ঘ। ক'মাসে ডানা ঝাপটানোর কৌশল শিখিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিতে পারি না যে। আশেপাশের মায়েদের দিকে তাকিয়ে ভুলগুলো শুধুরে নিতে চাই। আশেপাশের মায়ের দিকে তাকাই আর মা তোমার দিকেই ফিরে যাই। তুমি হয়ে যাও লাইট হাউস। আমি কেমন যেন তুমিই হয়ে যাই যদিও আমার কিছুটা পরিমার্জন অথবা অনেকটাই।
প্রায়ই মেয়ের চোখে আমাকে দেখার চেষ্টা করি। তারও কত কত অভিমান জমা হচ্ছে। আমার জন্য তার প্রথম বিশেষন বোধহয় Rude; যে প্রিয় পুতুল ছাড়া ঘুমুতে পারে না মেয়ে সেটাই আয়েশাকে দিয়ে দিতে বাধ্য করেছি। মেয়ের কান্নাকে এতটুকু প্রশ্রয় দেইনি। প্রিয় জিনিস হারাতে না শিখলে/ ছেড়ে দিতে না শিখলে যে সামনের জীবনটায় ব্যথা পাবে। অন্য সব মায়ের মত হাতে ধরে ধরে সব জায়গায় নিয়ে যাই না, ভাতের থালা হাতে পেছনে পেছনে দৌড়ুতে জানি না। মেয়ে ভেবে বসে মায়ের অবহেলা। ও বোধহয় আমার হাত ধরে হাঁটতেই ভালোবাসে, চায় মেয়েকে নিয়ে মায়ের আদিখ্যেতা।
বোকা মেয়ে জানবে কি করে এত যত্নে পাত্তা না দেয়াটাই যে বিশাল গুরুত্ব দেয়া, পাত্তা দেয়া! কয়টা মুহুর্ত আছে আমার জীবনে যেখানে ও নেই! তবুও আমি মেয়ের বন্ধু হতে পারি না; সে আমাকে বন্ধু ভাবে না। মানুষ বন্ধুতো চিরদিন থাকে না। একলা হওয়াও যে শিখতে হয়। আমি মেয়েকে বন্ধু উপহার দেই 'সুর'। দোকানে ছেড়ে দিলাম ও পছন্দ করলো ভায়োলিন। ভায়োলিনই ওর পৃথিবী, ওর বন্ধু। ওকে কখনো কারো কাছে ছুটতে হয় না, সে কাছে পায়।
পাখি হতে চাইলে আমাকেও যে পাখির মা হতে হবে রে মেয়ে নয়তো উড়বি কি করে? ঘুড়ি নয় পাখির মতো উড়ে উড়ে মেঘ ছুঁবি তুই... তাই আমি তোকে উড়তে শিখাই। তোকে উড়াবো না, তুই একদিন ঠিক উড়ে যাবি। আর একদিন মা হবো হাওয়ার ঘুম, তোর ছায়ায় বেঁচে থাকবে মানুষ পাখির মার নিশ্চুপ সার্থকতা। কে জানে তুইও খুঁজে পাবি বাতিঘর। না পাস ক্ষতি কি? ভালো থাকিস নিজের মতো করে।






চেনাজানা মানুষদের ব্লগে দেখলে ভালো লাগে!
চমৎকার লাগলো কথা গুলো।
নিয়মিত লেখলে খুব খুশি হবো!
আমি চিনলাম না কেন?
অসাধারণ হয়েছে কবি!
অনেক অসাধারণ আর গভীর।
মীর, কবি উপাধি না দিলেই কি নয়! দেখলেইতো অস্বস্তি বাড়ে "আমার হবে না আমি বুঝে গেছি"
আচ্ছা। কবি উপাধি কেড়ে নেয়া হলো।
চমৎকার...
সময়টা বেশ অস্হির। চারিদিকে শুধু ঘন ঘোর অমানিশা। এই অমানিশা শুধু স্বদেশ আক্রমন করেছে এটা নয়, এর ব্যাপ্তি ব্যাপক।
মনের কথা গুলো এভাবে সুন্দর করে প্রকাশ এবং শোনাবার মতো সময়টুকু যদি পাওয়া যায় তাহলে হয়তোবা সমাজের অমানিশা কিছুটা হলেও ফিকে হতো।
এবির পাতায় অনেকদিনের মাঝে পড়া সবচাইতে সেরা লেখাগুলোর একটা,
কোন টু শব্দ না করেই প্রিয়তে।
দারুন চিন্তাভাবনা, অসাধারণ লেখনীতে চমত্কার প্রকাশ।
নিয়মিত লিখতে দেখলে ভালো লাগবে খুব। ভালো থাকুন, সবসময়।
১ম কথাটা বোধহয় একটু বেশি বেশি হলো কারণ এই একটু সময়ে এবির পাতায় ঘুরেফিরে আমারতো উল্টোটা মনে হচ্ছে। তারপরো উৎসাহ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। সত্যিই দীর্ঘ-দীর্ঘ সময় পর ব্লগে লিখলাম। লিখতে গিয়ে হাবাগোবা-টাইপ প্রশ্ন মনে আসছিল ব্লগ কি রাফ ড্রাফট নাকি একদম শেষ ঝরঝরে লেখাটার জন্য!
দুটোর মিকচার বলা চলে!
কিছু লেখা রাফখাতা থেকে জাস্ট তুলে দেওয়ার মত,
আর কিছুতে ফাইন টিউনিং এর অভার চোখে পড়ে যায়।
চমৎকার লাগলো
মনকে খুব নাড়া দিল লেখাটা। অনেক দিনের স্তুতি হয়ে বসা বোধ একটু দোল খেল। একেবারেই মনের কথা।
চমৎকার...চমৎকার...চমৎকার...
মন্তব্য করুন