স্মৃতির পহেলা বৈশাখ (২).....আরুলপারুল দুগ্গাবোন / নজরুল ইসলাম
আরুলপারুল দুগ্গাবোন
নজরুল ইসলাম
ঠিক পিঠ ঘেঁষা আমার এক বোন আছে। পারুল নাম। সবার বড় এক বোন ছিলো, তাঁর অকালমৃত্যুর পরে পারুল বোনটাই আমাদের চার ভাইয়ের চম্পাবোন হয়ে গেলো। কিন্তু ভাগটা সবচেয়ে বেশি পেলাম আমি। থালা থেকে মজার খাবার কেড়ে নেওয়া, রাগ উঠলেই বোন পেটানো [একবার কাস্তে দিয়ে কুপিয়ে হাত কেটে ফেলেছিলাম] সবই মুখ বুজে সহ্য করতো। আমি যে ছোট্টখান ভাই, আমার কি পাপ হয় বোনের কাছে?
পরুলকে ক্ষেপাতে আরুল ডাকতাম। আরুল মানে টিকটিকি। অভিধানে আছে কী না জানি না, কিন্তু আমাদের মধ্যে প্রচলিত ছিলো। তখন শুধুই বলতাম, তাই বানান জানি না, আরুল নাকি আড়ুল? যাহোক... আমার সেই আরুলপারুল বোনটার সঙ্গেই আবার আমার সবকিছু। তুরাগ তীরের শতবর্ষী সিদ্ধান্ত স্কুলের পেছনে তারো চেয়ে প্রাচীন বটবৃক্ষ, সেই বটবৃক্ষে নাকি থাকে ভূত। ইয়া বড় বড় চমচম খাওয়ায় সেই ভূত! ভূত দেখতে যাওয়া থেকে মেলা দেখতে যাওয়া, সবই আমার বোনের সঙ্গে। ঠিক যেন পথের পচালি অপু দুর্গা।
বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে সেই কত্তো দূরের পৈদ্দারটেক মেলা দেখতে যাওয়া মাকে লুকিয়ে... এটা সেটা কেনা...
আমার গ্রামের মেলায় যাওয়া হয়নি। জন্ম থেকে জ্বলছি শহরে। মেলাও ঢাকারই।
শৈশব পেরিয়ে কৈশরে ঢুকলাম। শিশু একাডেমিতে গান শিখি। সবুজ প্যান্ট আর লাল শার্ট, কণ্ঠলগ্না সবুজ প্রজাপতি। ভালো পোশাক আমার এই একটাই। আর পরের ভালো পোশাক স্কুলের ইউনিফর্ম... সাদা মেরুন কম্বিনেশন। আমাদের বাবারা তখন ঈদে জামা কিনে দিলেও পরবছরের স্কুলের ইউনিফর্ম মাথায় রেখেই দিতেন। একবারে যেন ঈদ আর স্কুলটা হয়ে যায়। হায় আমার গরীব বাবা... এখন আমি বুঝি, বৈশাখে মেয়েকে একাধিক নতুন জামা কিনে দিতে পারলেও তোমার মতো বড় লোক হতে পারবো না কোনোদিন।
যাহোক, তো তখন কলাবাগান মাঠে একটা মেলা হতো। বৈশাখি মেলা। শিশু একাডেমিতেও হতো। সেদিন শিশু একাডেমির অনুষ্ঠান ছিলো। সেখানে দলীয় সঙ্গীত গেয়ে লাল সবুজ পোশাকেই মেলা ঘুর বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফিরতে ফিরতেই আমার অপু দর্গা বাস থেকে নেমে পেলাম কলাবাগান মাঠে। মেলা ঘুরে ঘুরে দেখছি। ইচ্ছে করে সবকিছু কিনে ফেলি, কিন্তু পকেট যে গড়ের মাঠ।
তবু কী কী যেন কেনা হলো, পয়সা যখন একবারে ফুরুৎ, তখন একটা খেলনা দেখে আমার আরুলপারুল বোনটার খুবি হাপিত্যিশ... কাচেঁর একটা ছোট জগ গ্লাস সেট। দাম অনেক। বাস ভাড়া যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটুকু পুরোটা দিয়ে দিলেও দাম হয় না। আপুনিটার খুব মন খারাপ।
কৈশোরকাল খুব দুরন্তপনার। আপুনিটার মন খারাপ দেখে ইচ্ছে হলো ডাকাতি করি এই খেলনা। ডাকাত হতে হলো না, চোর হয়ে গেলাম। কীভাবে কীভাবে যেন সেটটা মেরে দিলাম দোকান থেকে। কী যে খুশি অপু দুর্গার...
সেই খুশিতে নাচতে নাচতে বাকবাকুম আমরা। স্টলে স্টলে উড়ে বেড়াই যেন রঙিন প্রজাপতি। আহ্...
এই উড়োনাচানচিই কাল হলো। ধপাস করে পতিত ধরণীতল। ভেঙ্গে গেলো সাধের কাচেঁর জগ গ্লাস সেট... কতোটা মন খারাপ হয়েছিলো?ভীষণ তীব্র... মরে যাওয়ার ইচ্ছের সমান। ট্রেন না দেখার ব্যর্থতার মতো অপু দুর্গা গলা জড়াজড়ি ফিরে আসা বাড়ি। আমার চম্পাপারুল বোনটা বলেছিলো – ‘হারাম আমাদের সইবে না রে.. সইবে না... আর কখনো হারাম নিস না...’
আমার দুর্গা বোনটা এখন কানাডায়। বরফ শীতলতা নিয়ে বসে থাকে আমার থেকে অনেক অনেক দূরে। কিন্তু সেই কথাটা মায়া হয়ে জড়িয়ে থাকে কোলে কাখেঁ আমার। ‘হারাম সইবে না...’
নিশ্চিত থাকিস বোন... হারাম কিছু নিতে হয় না আর... হবে না... ভালো থাকিস... মেয়েটা আর ছেলেটাকে বৈশাখ শিখিয়ে রাখিস.. আর বলিস... যা বলেছিলি আমাকে সেই ছোটবেলার এক বৈশাখে....





এইটা কি বইয়ের শুরু? অতীব চমৎকার হইসে। বই কই মিলবে সেটা না জানানোর জন্য পুস্তক'কে মাইনাস
প্রথম পাতায় দেখেন স্মৃতির পহেলা বৈশাখ নামে ইবুক আছে। ওইটাতে এই গল্পসহ আরো কিছু গল্প পাবেন।
ওহ্ বুঝি নাই ফার্স্টে। লজ্জা পাইলাম। স্যরি
চমৎকার লেখা।
এটা কি কোন ই-বুক এর অংশ নাকি প্রকাশিত বই?
বুঝলাম না ঠিক!
লেখাটা আগেই পড়েছিলাম। ভালো লাগাটুকু জানাতে মন্তব্য করা
মন্তব্য করুন