লেখার কার্য-কারণ বিষয়ক ব্যক্তিগত কৈফিয়তনামা....
কেউ কেউ থাকে এমন যাদের কিছুতেই কিছু হয় না। তারা ঠিকমতো না শেখে লেখাপড়া, না শেখে কোনো কাজকর্ম। তারা না লাগে হালে, না লাগে জালে। না হয় ঘরকা, না ঘাটকা। তারা বাপে খেদানো, মায়ে তাড়ানো। সমাজে তাদের আলাদা একটা পরিচয় আছে।
শাস্ত্র বলে- ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’। বিজ্ঞজনেরা তাই অপচয় হবে বোধে বেশি শব্দ ব্যবহার করেননি, একটি মাত্র শব্দ বরাদ্ধ করেছেন তাদের জন্য- অপদার্থ। জ্ঞানীদের তো আর সাধে জ্ঞানী বলে না, একটি মাত্র শব্দ, কিন্তু তাতেই কেমন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে পরিচয়, চারিত্র- ‘হেড টু টেইল’!
অপদার্থরা যুগ যুগ ধরে সমাজে অবহেলার পাত্র, হাসির পাত্র। পরিবারে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বস্তু। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগত কারণেই তাদের দিয়ে সমাজ ও সংসারের কোনো কাজ হওয়ার নয়। কাজ নাহয় না-ই হলো, কিন্তু তাই বলে কী তাদের কোনো দায়িত্ববোধও থাকতে নেই! আর কিছু না হোক, সমাজের চোখে পরিবারের মান-সম্মানের ব্যাপারটা তো অন্তত তাদের দেখা উচিত। আর তা দেখতে গেলে একটা না একটা কিছুতো তাদের করাই উচিত। তাতে কিছু উপার্জন হোক বা না হোক, ‘অপদার্থ’ টাইটেলটাতো অন্তত ঘুচবে, সমাজের চোখে পরিবারের মান-সম্মানটাতো অন্তত বাঁচবে। দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-অবমাননা সহ্য করে ’৭০-এর দশকে পরিবারের মান-সম্মান বাঁচাতে মরীয়া হয়েই অপদার্থরা তাই তাদের কার্যক্রম শুরু করেন।
কথায় আছে- ‘যার নাই কোনো গতি, সে-ই পড়ে ওকালতি’। প্রচলিত আছে- ‘আদালতের ইট পাথরও দুই পয়সার মুখ দেখে’। বাণী চিরন্তনী! বাণীকে আরও পোক্ত করতে ’৭০-এর দশকের কিছু অপদার্থ আর কোনো কিছুতেই কিছু করতে না পেরে অন্তত একটা কিছু করার আশায় দলে দলে গিয়ে ভর্তি হতে লাগলো ‘ল’-এ, নাইট কলেজে’।
কথায় আছে- ‘ওকালতীতে গরু-ছাগল মায় গাবগাছ-ডাবগাছও পাশ করে’। কথা মিথ্যা নয়। ‘বিএ, বি.কম’-এ যেমন ‘সেকেন্ড ক্লাস’ পেয়ে যায় টেবিল-চেয়ারও, কিন্তু ‘ফার্স্ট ক্লাস’ আর ‘থার্ড ক্লাস’ পেতে হলে কঠিন সাধনা করতে হয়, ঠিক তেমনি ল’তেও ফেল করতে হলে রীতিমতো পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু পরিশ্রমই যদি করবে, তাহলে আর অপদার্থ হলো কী করে! নিজেদের শ্রমে-ঘামে-ত্যাগে অর্জিত (!) দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, মান-সম্মান ও বৈশিষ্ট্য রক্ষার্থেই অপদার্থরা তাই টপাটপ পাশ করে যেতে লাগলো। আর পাশ করেই তৎকালীন রেগ্যান মার্কেট থেকে হাফ প্রাইসে রঙজ্বলা কালো কোট-টাই কিনে তিন পায়া টেবিল নিয়ে বসে পড়তে লগলো আদালত পাড়ার কোনোয়-কানায়। সব মামলাইা তো আর রাস্ট্রদ্রেহিতা-খুন-খারাবী-রাহাজানির হয় না, কিছু কিছু মাথা ফাটা, জমি দখল, ছিচকে চুরি বা গরু চুরি টাইপেরও হয়। অপদার্থদের কপালে তেমন দুই-একজন মক্কেল জুটে যেতে লাগলো। রুটি-রুজির কোনোরকম একটা কায়দা হলো।
সুখ সইলো না বেশিদিন। কথায় আছে- ‘হুজুগে বাঙালি’। একজন যা করে সব বাঙালি ঝাপিয়ে পড়ে সেই কাজে। কথার সত্যতা প্রমানে ’৮০-র দশকে বাঙালি সমাজের তাবৎ অপদার্থরা ঝাপিয়ে পড়তে লাগলো ‘ল’ পড়তে। ফলে অবস্থা দাঁড়ালো ‘কাকের চেয়ে কবি বেশি’-র!
প্রকৃতির নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে, সূত্র আছে। সেই সূত্র বলে- খাদ্য এবং খাদকের রেশিও হতে হবে নির্দিষ্ট অনুপাতে। আর তা না হলে ঘটবে বিশৃংখলা, সৃষ্টি হবে অপ্রকৃতস্থ অবস্থা, ভেঙ্গে পড়বে চক্র। ব্যতিক্রম হলো না নিয়মের। খাদকের সংখ্যাধিক্যে দেখা দিলো খাদ্য ঘাটতি। মানে, মক্কেলের অভাব দেখা দিলো। (এখানে ‘অভাব’ শব্দটির প্রয়োগ অবশ্য সঠিক নয়, কারণ বাস্তবিক অবস্থা বিচারে খাদ্যের সংখ্যা সচরাচর যেমন ছিল, তেমনই রয়েছে, কিন্তু ১০ গুন বেড়ে গেছে খাদকের সংখ্যা।) তখন থানায় থানায় আড়কাঠি সেট করে মক্কেল ধরার এক যুগান্তকারী কায়দার প্রবর্তন করলো তারা। কিন্তু খাদকের সংখ্যা এতো বেশি বেড়ে গেছে যে সেখানেও শুরু হলো কামড়াকামড়ি, ফলে আশানুরূপ কোনো ফজিলত লাভ করা গেলো না। অপদার্থদের ভুবনে ঘনিয়ে এলো দুঃসহ সময়।
মানবজাতির মহা দুর্যোগের কালে যেমন ত্রাণকর্তা হিসাবে আর্বিভূত হয়েছিলেন ঈশ্বরপুত্র যিশু, ঠিক তেমনি ’৯০-এর দশকে অপদার্থদের এই ক্রান্তিকালে মুক্তির দিশা দেখালেন কতিপয় ধনাঢ্য ব্যক্তি। তবে শখ করে নয়, বাধ্য হয়ে। দীর্ঘ শীতের আড়ষ্টতা কাটিয়ে ন্যাড়া ন্যাড়া গাছগুলোয় হঠাৎ করেই যেমন ‘ওয়ান ফাইন মর্নিং’ গজাতে শুরু করে কচি কচি পাতা, ঠিক তেমনি তথাকথিত ঐ ধনাঢ্য ব্যক্তিরা সকাল-সন্ধ্যায় ভূমিষ্ট করাতে শুরু করলেন নিত্য-নতুন সব সংবাদপত্র!
স্বল্প লোকের দেশ। প্রয়োজনের তুলনায় সর্বদাই ঘাটতি এখানে দক্ষ জনবলের। কিন্তু তাই বলে কী থেমে থাকবে কার্যক্রম! অসম্ভব- তথাকথিত ধনীদের পিঠ ও পিছন বাঁচাতে হলে- দ্যা শো মাস্ট গো অন! ‘মহাভারত’-এর পক্ষপাতদুষ্ট শিক্ষক কিন্তু স্নেহময় অক্ষম পিতা দ্রোণাচার্য যেমন ‘দুধ’-এর অভাবে তার ছেলেকে ‘পিটুলি গোলা’ দিয়ে বুঝ দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি তথাকথিত ধনীরাও দক্ষ কর্মীর অভাবে অপদার্থদের দিয়েই সাজিয়ে নিলেন সংবাদপত্রগুলো। ফলে আদালত পাড়ায় হাবুডুবু লাওয়া অপদার্থরা খুঁজে পেলো নতুন আশ্রয়। ... আর বাঘ নাই বনে শিয়ালরাই হয়ে উঠলো রাজা!
বিংশ শতাব্দী বিজ্ঞানের শতাব্দী। বিজ্ঞানের যাদুর ছোঁয়ায় প্রতিনিয়তই বদলে যেতে লাগলো পৃথিবী। বদলে গেলো দৃশ্যপটও। ভিজ্যুয়াল মিডিয়া, মানে টিভি চ্যানেলগুলো নিয়ে এলো নয়া বয়ান- আপনাকে কষ্ট করে পত্রিকা পড়তে হবে কেন! আমাদের পঁচার বাপ-খেদীর মা’রাই ঠোট রাঙিয়ে ভ্রু নাচিয়ে রোজ আপনাকে শুনিয়ে দেবে বিশ্বের তাবৎ সংবাদ। সঙ্গে পাবেন সম্পূর্ণ রঙিন চিত্র। উচ্চারণে নাহয় একটু ভুল হলোই, তাতে কী, আপনি তো আর পরীক্ষায় বসছেন না। তাছাড়া আকর্ষণ আছে আরও। প্রতিদিনই আপনার জন্য থাকছে বাহারি
সব হুদাই অনুষ্ঠান, নানা বেহুদা কথার প্যাঁচাল শো, টুকলিফাই করা কাহিনীহীন দীর্ঘ দীর্ঘ সব ধারাবাহিক। কিন্তু এখানেও সেই একই সমস্যা- দক্ষ কর্মীর অভাব। টিভি চ্যানেলগুলোকে এই সংকট থেকে বাঁচাতে অপদার্থরা ঝাপিয়ে পড়লো। কিন্তু ঐ যে- হুজুগ- একজন যা করে অন্য সবাই... তাই এখানেও ভিড়ে ভিড়ে ত্রাহি মধুসুদন!
আবারও তাই খোঁজ পড়লো নতুন জায়গার। সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো এফএম রেডিওগুলো। নতুন গালভরা পদ নিয়ে- ‘আরজে’! এখানেই শেষ নয়, এলো নতুন... না, আর নতুনের কথায় না গিয়ে এখানেই বরং থামা যাক। আমার বক্তব্যর জন্য আপাতত এতোটুকুই কাফি!
বন্ধুগণ, যে কথার জন্য এই ‘শিবের গীত’, মানে, এই ‘অপদার্থ পাঁচালী’ এবার আসি সেই কথায়। আমি কে, আমি কী, আমি কেন লিখছি, কী লিখছি- লেখার শুরুতেই তা বলে দেয়া প্রয়োজন। আর তা বলতে গেলে, আমার সম্পর্কে ঠিকঠাক ধারণা দিতে গেলে ‘অপদার্থদের পথপরিক্রমা’ জানা থাকা জরুরী।
... সত্য সর্বদাই সত্য। তাই কিঞ্চিৎ শরমিন্দাবোধ করলেও স্বীকার করতে আমি বাধ্য- আমি একজন অপদার্থ’! আমার সক্রিয়-সময়কাল ’৮০-র দশকের প্রায় শেষ এবং ’৯০-এর দশকের সবে শুরু-তে। আদালত পাড়ায় তখন ‘গেয়ো যোগীরাই ভিখ পাচ্ছে না’, তাদের স্থান সংকুলান করতে গিয়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে এলাকার আদি সারমেয়গণকে, ‘নতুনের আমদানী’ সেখানে অসম্বব। তাই হাল-মাস্তুল-বৈঠা- সব ছেড়ে ছুড়ে বিরস বদনে বসে আছি বাসায়। দুঃসহ কাটছে সময়। দীর্ঘ লাগে দিন, হুড়মুড় কেটে যায় রাত। আবার আসে দীর্ঘ অসহ্য দিন। আত্মহত্যা করা নিতান্তই পাপ, এবং পাকেচক্রে করে ফেললেও পরের দিন লোকের মুখোমুখি হলেই বেইজ্জতির এক শেষ- তাই সেই পরিকল্পনাও বাদ দিয়ে হতাশ দিন কাটাচ্ছি। আর ঠিক এমনই সময়য়ে নাযিল হলো অর্থ নিয়ে তা ফেরত না দেয়া বিষয়ক ‘যুগান্তকারী ব্যাংক-অপপ্রচার’! আর তথাকথিত ধনীরা ইট খেয়ে পাটকেল সামলাতে তুলে ধরতে লাগলেন সংবাদপত্রের ঢাল। আর আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ভিড়ে গেলাম অপদার্থদের নতুন ‘হট স্পট’ সংবাদপত্রে।
(আগামী পর্বে সমাপ্য...)
বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই লেখা নিছক আনন্দচ্ছলে লেখা, কাওকে আঘাত বা আহত করতে নয়। কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে, আহত হয়ে থাকলে লেখককে সেই জন্য কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না!





নিছক আনন্দের লেখা খারাপ হয় নাই।
নিছক আনন্দের লেখা খারাপ হয় না।
শ্যাষ পর্যন্ত আপনিও বোলোগার হৈয়া গ্যালেন?
লেখা ভালা ফাইছি। বড়ই সৌন্দযয্য। পরের পর্বের জন্য

মন্তব্য করুন