একাত্তরের অশ্রু, এক
আমাদের স্বীকার করতেই হবে, আমরা মাঝখানে একটা দীর্ঘ সময় পার করে এসেছি, যে সময়টাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার চর্চা অনেকটা সংকুচিত ছিল, একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে ছিল। পুরো ব্যাপারটাতে চলে এসেছিল ট্যাবুভাব; যেন অন্যায় কিছু করছি, সবকিছুতে ছিল লুকোচুরি।
'একাত্তরের অশ্রু' মূলত বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্রের একটি প্রকল্প। মুক্তিযুদ্ধের নানান কষ্টের ঘটনা, বীরত্বের ঘটনা, ইতিহাসের নানান ঘটনা সংক্ষিপ্ত আকারে কিশোর-কিশোরীদের জন্য উপস্থাপনই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
পাঠক মাত্রেই প্রশ্ন করতে পারেন, সংক্ষিপ্ত আকারে কেন? উত্তরটা এভাবে দেবো, ব্যস্ত জীবনের নানান জটিলতার ভীড়ে মানুষ দীর্ঘ রচনা পড়তে ক্লান্ত বোধ করে। আর পাঠক যদি হন কিশোর বয়সের কেউ, তাহলে তো কথায় নেই...দীর্ঘ রচনা, কঠিন আবেগী শব্দ কিশোরদের স্পর্শ করে কম।
সবশেষে এটুকুই বলব, এই ক্ষুদ্র প্রয়াসের একমাত্র লক্ষ্য কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা চর্চার আলো পৌঁছে দেয়া।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা চর্চার আলো বাঙলার সব ঘরে ছড়িয়ে পড়ুক।
==============================================================
ছেলেটার নাম জামাল।
দারুন ডানপিটে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে।
ফেব্রুয়ারীর শুরুর দিকে এক বিকেলে বাসায় ফেরার পথে ঈদগাঁ কাঁচারাস্তার ওই দিকটায় জামাল দেখে, বাঙালী এক ছেলে দৌড়াচ্ছে, পিছনে দা হাতে দশ-বারোজন বিহারী যুবক।
ছেলেটা আছাড় খেয়ে পড়ে যায়। আর উঠতে পারেনি। দা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে বিহারীরা।
ছেলেটা কিছুক্ষণ বিকট শব্দে চিৎকার করে। এরপর সব চুপচাপ।
কিছুক্ষণ পর বিহারীগুলো কাঁধে রক্তাক্ত দা রেখে তৃপ্ত মুখে ধীরে ধীরে বড় পুকুর পাড়ের দিকে চলে যায়। ওদের সারা গায়ে রক্ত লেপটে থাকে।
কিশোর জামাল কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ফিরে আসে।
হালিশহর এলাকায় থাকার কারণে বাঙালী-বিহারী, পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান দ্বন্দ্বগুলো কিছুটা বুঝত।
কিন্তু ওই বিকেলের ঘটনা কিশোর জামালকে যেন যুবক বানিয়ে দেয়।
জীবনের সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম নিউক্লিয়াসের কিছু বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় ছিল।
তাদের সাথে শুরু হলো উঠা-বসা।
মিছিল-স্লোগান-মিটিং, দেশচিন্তা হয়ে গেল জীবনের একমাত্র কাজ।
মার্চ মাস। যুদ্ধ শুরু হলো।
চারপাশে শুধু অশান্তি, আতঙ্ক আর হানাহানি।
হালিশহরে প্রতিদিনই দশ-বারোজন বাঙালীকে বিহারীরা জবাই করছে।
চুনা ফ্যাক্টরীর মোড়টা যেন বাঙালী বধের কসাইখানা।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কিশোর জামাল।
সে যুদ্ধে যাবে কিন্তু বাবা-মা যেতে দিবে না।
এদিকে নিউক্লিয়াসের বড় ভাইগুলোর সাথে কথা পাকা হয়ে গেছে।
যুদ্ধে যাবেই জামাল।
মে মাসের তিন তারিখ মাঝরাতে বাড়ি থেকে পালালো জামাল।
পালানোর আগমুহুর্তে ঘুমন্ত মা-বাবাকে শেষবারের মত দেখে নিল। টেবিলের উপর একটা চিঠি রাখলো।
আব্বা,
সালাম নিবেন।
পুত্রস্নেহের কারণে আপনারা আমায় যুদ্ধে যেতে দিতেন না।
তাই, আপনাদের না বলে চলে গেলাম।
জানোয়াররা এত মানুষ মারছে, আমি কি করে ঘরে বসে থাকি?
আমি একদিন ফিরবো, আপনাদের জন্য স্বাধীন একটা দেশ নিয়ে ফিরবো, ইনশাল্লাহ।
আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
আম্মার খেয়াল রাখবেন। উনাকে একটু বুঝাবেন।
শারুকে বাইরে বেরুতে দিবেন না। পরিস্থিতি অনেক খারাপ।
আমার জন্য দোয়া করবেন, দেশের জন্য দোয়া করবেন।
আমি আপনাদের যোগ্য সন্তান হয়ে উঠতে পারিনি।
আমায় মাফ করে দেবেন।
ইতি,
মোহাম্মদ জামাল উদ্দীন।
বাড়ি থেকে পালালো জামাল কিন্তু ভাগ্য বিশ্বাসঘাতকতা করে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এ.কে. খান মোড়ে পাকি, রাজাকার ও বিহারীদের যৌথ টহল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে কিশোর জামাল।
জামালকে হালিশহর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিরা জামালকে তাঁর সঙ্গীদের নাম জিজ্ঞাসা করে। সারা রাত চলে ভয়ংকর টর্চার।
পাকি জানোয়াররা কিশোর ছেলেটার আঙুলে পিন ঢুকালো, হাতে-পায়ের তালু আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিল, বুটের লাথিতে সারা শরীর রক্তাক্ত করে দিল। জামালের কিশোর কন্ঠের চিৎকার নরপশুগুলোর মনে কোন দয়ার সৃষ্টি করল না।
কিশোর জামাল মুখ খুলল না। হাল ছেড়ে দিল খানরা্ কিন্তু কিশোর জামালের জন্য ভয়ানক পরিণতি অপেক্ষা করছিল।
পরদিন ভোর সকালে জামালের বাবা আর ছোট ভাইকে ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।
সকাল দশটা।
হালিশহর চুনাফ্যাক্টরির মোড়ে খান সেনারা বিহারীদের দিয়ে ১৪ বছরের কিশোর জামাল, তাঁর বাবা ও ১১ বছর বয়সী ছোট ভাইকে জবাই করে।
শহীদ কিশোর জামালরা ফিরেননি কিন্তু আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে গেছেন।
[সূত্র: একাত্তরের অশ্রু (বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও গবেষণা কেন্দ্র)]





এদেশ কি ভুলে গেছে সেই রক্তাক্ত সময়
যারা মোর ঘর ভেঙেছে স্মরণ আছে।
এদেশ কি ভুলে গেছে সেই রক্তাক্ত সময়
এটা কি গলপ নাকি সত্য ঘটনা?
সত্যি ঘটনা।
মন্তব্য করুন