ইউজার লগইন

আজি ঝরোঝরো মুখর বাদরদিনে

০১
বৈষ্ণব কবিতা ঝরছে
ঝরছে গীতগোবিন্দের শ্লোক,
ঝরছে মিঞা তানসেন
মেঘমল্লারের ভিজে চোখ।
ঝরছে রবীন্দ্রনাথ
— পূর্ণেন্দু পত্রী

সকাল থেকে ঝরো ঝরো করে অঝরে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। থামার কোনো লক্ষণ নেই। শহুরে মানুষদের ব্যস্ততায় ছুটে চলার গতি কিছুটা হলেও মন্থর করে দেয় এ বৃষ্টি।

বাইরে তেমন কাজও নেই আজ। তাই বৃষ্টিটাকে খুব উপভোগ করছি। ইদানীং কেনো জানি নাগরিক জীবনের গতি স্লথ করে দেওয়া সব অনাসৃষ্টিকে উপভোগ করা শুরুও করেছি; এমনকি মহাবিরক্তিকর যানজটকেও।

বালিশের কাছ থেকে গীতবিতানটি নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। ইদানীংকালে আমার বালিশের পাশটা হয়ে গেছে ‘গীতবিতান’টার স্থায়ী ঠিকানা। বইটাকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছি যে তাকে “বুক শেলফ” নামক দূরের ঠিকানায় রাখলে মনে কেমন জানি একটা শূন্যতা এসে ভর করে – যেন প্রিয় কোনো মানুষকে অনেক দূরের কোনো জায়গায় ফেলে এসেছি। গীতবিতানের একাকীত্ব দূর করার জন্য মাঝে মাঝে অন্য বইও বালিশের পাশে ঠাঁই নেই। তবে তারা কয়েকদিনের অতিথি – কয়েকদিন পর পরই তারা আবার “বুক শেলফ” এ ফিরে যায়, তাদের বদলে অন্য কোন বই এসে জায়গাটা দখল করে।

০২
এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ — বুলায়ে দিয়েছে চুল — চোখের উপরে
তার শান — স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, — আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমা দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে;
— জীবনানন্দ দাশ

এখন বর্ষাকাল। তাই “প্রকৃতি” থেকে বেছে বেছে বর্ষার গানগুলো পাঠ করতে লাগলাম। তবে স্বভাবদোষে পাঠ বেশি দূর এগুলো না। আমার এ একটি সমস্যা: আগের-পড়া কোনো কবিতার বই পড়তে শুরু করলে অনেক সময় প্রিয় কোনো কবিতায় এসে আঁটকে যাই, সামনে আর এগুনো হয় না। বারবার ঐ কবিতাটিই পড়তে থাকি – একবার, দুবার, তিনবার... বহুবার। অনেক সময় গানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে – একই গান হয়তো কম্পিউটারে বারবার পুনঃবৃত্তি হতে থাকে। আমি জানি না অন্য কারও এটি হয় কিনা, নাকি একা আমরাই এই পুনঃবৃত্তি-প্রীতি। আজও একই ঘটনা হলো। চোখ বুলাতে বুলাতে অতি প্রিয় একটি গানের কলিতে চোখ আঁটকে গেলো। বারবার খালি এ কয়েকটি লাইনই পড়তে লাগলাম:

হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল নব গগনে
সেই সজল কাজল আঁখি পড়িল মনে।।
অধর করুণা-মাখা,
মিনতিবেদনা আঁকা
নীরবে চাহিয়া-থাকা
বিদায়খনে।।
হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল নব গগনে।

ঝরঝর ঝরে জল, বিজুলি হানে,
পবন মাতিছে বনে পাগল গানে।
আমার পরানপুটে
কোনখানে ব্যথা ফুটে,
কার কথা বেজে ঊঠে
হৃদয়কোণে।।
হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল নব গগনে

০৩
বৃষ্টিও এলো সাথে ভুলে যাওয়া ফোটা ফোটা
ফিরে পাওয়া মৌতাতে বিরহের হয়ে ওঠা।
ভাসুক বিরহ আজ একার বৃষ্টিতেই
বৃথায় মেঘের সাজ
তুমি কেনো কাছে নেই...
— কবীর সুমন

না! আর পারা গেলো না। অবশেষে গীতবিতানের পাতাটি বন্ধ করে কম্পিউটারে গানটি চালিয়ে চোখ বুঝে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। গানের প্রতিটি শব্দ যেনো প্রাণের গহীনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো আছড়ে পড়ছে। শুনতে শুনতে হঠাৎ করে একটি কথা মনে আসলো: বসন্ত হচ্ছে ঋতুরাজ, কিন্তু কবি-সাহিত্যকেরা তারপরও বসন্তের চেয়ে মনে হয় তাঁদের সৃষ্টিতে বর্ষা-বন্দনাই বেশি করেছেন। স্মৃতি হাতরে নিজের জানা কবি-লেখকদের লেখায় বসন্ত এবং বর্ষার উপস্থিতি কী রকম মনে করার চেষ্টা করতে লাগলাম।

আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল – তার উপরে ভরসা করতে আমি কখনোই সাহস পাই না। তারপরও যতটুকু উদ্ধার করতে পারলাম তাতে মনে হলো কবি-লেখদের সৃষ্টিতে বৃষ্টিবালিকার দৌরাত্ম্যের কাছে ঋতুরাজের গাম্ভীর্য কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে আছে। কবি-লেখকদের বর্ষাপ্রীতির নিশ্চয় গূঢ় কোনো কারণ আছে।

কবি নির্মলেন্দু গুণের লেখায় একবার পড়েছিলাম,

“বাংলার ষড়ঋতুর ভেতরে বর্ষাই হচ্ছেন একমাত্র নারী। বাকি সবাই হলেন পুরুষ ঋতু। গ্রীষ্ম (গ্রীষ্মদেব ঠাকুর) নামটি না থাকলেও নাম হিসাবে গৃহীট হতে পারে; শরৎ (লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়); হেমন্ত (গায়ক হেমন্ত হেমন্ত মুখোপাধ্যয়); শীত (কবি শীতল দাস জোয়ারদার); বসন্ত (নায়ক বসন্ত চৌধুরী) – এঁরা সবাই পুরুষ। বর্ষাই একমাত্র নারী”।

এটি কবিদের বর্ষাপ্রীতি একটি কারণ হলেও হতে পারে।

০৪
বৃষ্টি মানেই নষ্ট প্যাঁচ এক ত্যাগ গড়িয়ে
অথৈ পুকুর দুঃখবিলাস।
কখনও বা দুঃখ ঝরে টাপুসটুপুস ভীষণ গোপন।
বৃষ্টি মানে সত্যি করে মন খারাপের প্রাচীন প্রহর।
— মোফাজ্জেল করিম

অনেকরই প্রিয় ঋতু বসন্ত। কিন্তু বর্ষা আর শীত আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটি ঋতু। প্রিয় কারণ দুটোকেই আমার মনে হয় অনেক অভিমানী, অনেক দুঃখী। যেন বুকের ভিতরে কী জানি এক কষ্টের বিরাট ভার বয়ে বেড়াচ্ছে সবার অলক্ষে। শুধু কষ্টের প্রকাশভঙ্গিটাই আলাদা – একজন যেন সারাদিন-মান চোখের জল ঝড়িয়ে ঝড়িয়ে ফেলতে চাচ্ছে বুকের জমানো কষ্টগুলো। আরেকজন একটু চাপা – বুকের কষ্টগুলো বয়ে বেড়াতে চায় নীরবে; চোখের জলকে গোপন করে রাখতে চায় বুকের অতল গহীনে। তারপরও অজান্তেই মাঝে মাঝে গাল বেয়ে কুয়াশার আকারে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা চোখের জল।

এখন বর্ষাকাল। মেঘমল্লারে আজ সারাদিন-মান ঝরনার গান বাজছে। বৃষ্টির ছাট থেকে ঘর বাঁচাতে সব জানালা বন্ধ। বৃষ্টির ফোটাগুলো একের পর এক আছড়ে পড়েছে ঘরের বন্ধ জানালার কাঁচে – অনবরত ঠোকা দিয়ে যাচ্ছে যেন কাছের কোন ঘনিষ্ট মানুষ - অনেকদিন পর ফিরে এসেছে, দরজা খোলার সামান্য দেরিটুকুও সহ্য হচ্ছে না; আকূল হয়ে আছে দ্রুত সাক্ষাতলাভের বাসনায়। বৃষ্টির ফোটার মতোই মনের জানালায় এসে ঠোকা দিতে থাকে বিগত দিনের আধ-ভোলা, আধ-মনে-রাখা কিছু স্মৃতি। বৃষ্টির ফোটাকে ঘরের জানালা বন্ধ করে

এ কারণেই হয়তো কবিতার অর্ঘ্য দিয়ে বর্ষাকে তুষ্ট না করলে কোনো বাঙালি কবির কবিজন্ম শুদ্ধ হবার নয়। বিশ্বকবি রবিবাবু বর্ষারাণীর বেদীমূলে অর্ঘ্য দিয়ে তাঁর কবিজন্ম শুদ্ধ তো করেছেন এবং সে সাথে লাজলজ্জ্বার মাথা খেয়ে বুড়ো বয়েসেও বর্ষা-বালিকাকে উপরি উৎকোচ দিতেও কার্পণ্য করেন নি। মহাকবি কালিদাস তো বর্ষার মেঘকে দূত বানিয়ে ছেড়েছিলেন।

এখন অবশ্য মেঘদূতের আর দূতালি করতে হয় না। আন্তর্জাল আর মুঠোফোনের কল্যাণে নিজের কথাগুলো অনায়াশে বহুদূরের মানুষটির সাথে নিমেষেই শেয়ার করা যায়।
তবে দূতের কাজ না করলেও মনটাকে জাগিয়ে দেওয়ার কাজ এখনো ঠিকই কিন্তু করে যায় মেঘ। আকাশের মেঘ আর আর মনের মেঘের মধ্যে মনে হয় একটা বৈপরীত্য আছে। বাইরের আকাশে মেঘ জমতে শুরু করলে মনের আকাশের মেঘগুলো কোথায় জানি উধাও হতে শুরু করে। তার বদলে মনের ভিতরের অদ্ভুত একটা রোমান্টিকতা এসে ভর করে। তখন মনের মানুষটিকে মনের সব না-বলা কথাগুলো হুট্‌ করে বলে ফেলতে ইচ্ছে করে।

আটকে রাখা যায়, কিন্তু স্মৃতিগুলোকে মনের জানালা বন্ধ করে আটকানো যায় না। বৃষ্টি রাগি; স্মৃতি অভিমানী। শাষণে হয়তো রাগ দমানো যায়, কিন্তু অভিমান কমানো যায় না। ঘরের বন্ধ জানালায় বৃষ্টি একনাগারে কিল-ঘুষি দিতে থাকে রাগে; মনের বন্ধ জানালায় স্মৃতিগুলো মাথা খুঁটতে থাকে অভিমানে। তাই বৃষ্টি-বেলায় মনটাতে কেমন জানি এক ধরণের স্মৃতিকাতরতা পেয়ে বসে।

... গলার কাছে পাল তুলেছে আজগুবী এক স্মৃতির খেয়া। / বয়েস হওয়া মানেই বোধহয় স্মৃতি সাথে আড্ডা দেওয়া...

বয়েস যে খুব বেশি হয়েছে তা নয়; মুখের রেখায় ত্রিকোণমিতির আজব ক্লাস শুরু হতে ঢের দেরি। তারপরও যৌবণ জোয়ার তরঙ্গেকে উপেক্ষা করে বৃষ্টি হলে একইভাবে গলার কাছে পাল তুলে দেয় আজগুবী ঐ স্মৃতির খেয়া, চলে স্মৃতির সাথে অবিরাম আড্ডা দেওয়া।

রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

“বর্ষাকাল বালকের কাল— বর্ষাকালে তরুলতার শ্যামল কোমলতার মতো আমাদের স্বাভাবিক শৈশব স্ফূর্তি পেয়ে ওঠে— বর্ষার দিনে আমাদের ছেলেবেলার কথাই মনে পড়ে"।

আরেক জায়গায় তিনি বলছেন,

‘বর্ষায় আমাদের মনের চারি দিকে বৃষ্টিজলের যবনিকা টানিয়া দেয়, মাথার উপরে মেঘের চাঁদোয়া খাটাইয়া দেয়। মন চারি দিক হইতে ফিরিয়া আসিয়া এই যবনিকার মধ্যে এই চাঁদোয়ার তলে একত্র হয়’।

তবে সে চাঁদোয়া-তল নিতান্ত সংকীর্ণ – সেখানে বর্তমান-ভবিষ্যেতের তেমন ঠাঁই নেই। আছে শুধু ফেলা-আসা ছোটবেলার স্মৃতির জড়াজড়ি।

০৫
ছেলেবেলার বৃষ্টি মানে বিশ্বজোড়া
ছেলেবেলার মানে অবাক বিস্ময়ভরা
আয় বৃষ্টি চলে সেই কিশোরের কোলে।।
গেরস্থালি ফেলে কিচ্ছুটি না বলে
ছেলেবেলার বৃষ্টি…...…
— লোপামূদ্রা মিত্র

সবচেয়ে বেশি করে মনে পড়ে শৈশব-কৈশোরের কৃষ্ণচূড়া রঙের সেই দিনগুলো কথা। যখন বৃষ্টি মানেই ছিল এক অলিখিত আনন্দের হাতছানি; অনাবিল ফূর্তির ঊৎস ।

ছোটবেলায় আমাদের ছুটি-তথ্যের সারমর্ম ছিল “যে ছুটি নিয়মিত, তাকে ভোগ করা আর বাঁধা পশুকে শিকার করা একই কথা। ওতে ছুটির রস ফিকে হয়ে যায়”। তবে এ সহজ তথ্যটা অনুধাবন করার জন্য যতটুকু বিদ্যা থাকা দরকার অবিভাবকদের মাথায় তার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যা বিধাতাপুরুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভরে দিয়েছেন। অল্পবিদ্য ভয়ংকরি কিনা জানা নাই, তবে বেশি-বিদ্যা যে ‘অসহ্য অতিরিক্ত’ তা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি। হয়তো স্কুলে যেতে মন চাচ্ছে না, অবশ্য মাঝে মাঝে স্কুলে যেতে না-চাওয়াটা খুব একটা দোষের কিছু না। অনিয়ম আছে বলেই তো নিয়মের এত কদর। কিন্তু সমস্যটা হয় যখন অনিয়মটাই নিয়ম হয়ে যায়। মাঝে মাঝে স্কুলে যেতে না-চাওয়াটাই যখন সবসময়ের হয়ে যায় তখনই যত সমস্যা। মা যদিও মাঝে মাঝে আমাদের এ অন্যায় অনুরোধের দৌরাত্ম্য সহ্য করতেন, তবে বেশিরভাগ সময়ই মাকে মনে হত সাক্ষাৎ হেডমাস্টারনি; দয়ামায়াহীন – কেন কেন তাতো বুঝতেই পারছেন। তবে বর্ষাকালে অনির্ধারিতভাবে মাঝে মাঝেই ছুটির সাক্ষাৎলাভ ঘটত। আমাদের স্কুল ছিল চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায়। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি থৈ থৈ করত। তাই আকাশে মেঘ কালো করে উঠলেই মনে হত আকাশ যেন আমাদের জন্য কালো খামে পাঠিয়ে দিয়েছে বহুকাঙ্খিত ছুটির বারতা, স্কুল না যাওয়ার ছাড়পত্র। উপরওয়ালার এ ছাড়পত্রকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমাদের ‘হেড-মাস্টারনি’ মারও ছিল না।

তবে মাঝে মাঝে উপরওয়ালার ছাড়পত্রটা আসতে দেরি হয়ে যেত। অবশ্য তাতে অসুবিধের বদলে সুবিধেটাই হতো বেশি। আমরা স্কুলে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে রওনা দিতাম সকাল ৯.০০টায়। যেতাম পাড়ার ৫-৬ জন মিলে একটা দলে। মাঝে মাঝে আমাদের অদৃষ্টবৈগুণ্যবশত(!) বৃষ্টির সাথে দেখাটা হয়ে যেত মাঝপথেই । তখন তার সাথে সৌজন্যালাপটা ভালোভাবেই সেরে নিতাম। বৃষ্টিবালিকার সাথে আমাদের এরকম অবাধ ঢলাঢলি দেখে পাছে আমাদের ছাতাটা লজ্জা পায় তাই তাকে যত্ন করে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগে ঢুকিয়ে দরজাটা দিতাম বন্ধ করে । আর বৃষ্টিতে ভিজে কোনমতে জ্বরটা একবার বাঁধাতে পারলে তো একেবারে কেল্লাফতে – সপ্তাহখানেকের জন্য একেবারে ভাবনাহীন, নিশ্চিন্ত।

আর বাসায় কাকভেজা হয়ে ফিরে আমাদের অপকর্মের সব দায় ছাপিয়ে দিতাম ছাতার ঘাড়ে – কারণ দেখাতাম স্বীয়কর্মপালনে তার ব্যর্থতা। ছাতাকে কথা বলার ক্ষমতা প্রভু দেন নি – আসলেই তিনি সর্বজ্ঞ, অন্তর্যামী। মার যে কিছু কিছু সন্দেহ হত না তা না – তবে উপযুক্ত প্রমাণের অভাব, এবং সর্বোপরি আমদের সরবতা আর বিবাদী ছাতার নীরবতার কারণে ‘বেনিফিট অব দ্য ডাউট” যেত আমদের পক্ষে।

০৬
মেঘেদের যুদ্ধ শুনেছি
সিক্ত আকাশ কেঁদে চলেছে
থেমেছে হাঁসের জলকেলী
পথিকের পায়ে হাঁটা থেমেছে
আজ কেন মন উদাসী হয়ে
দূর অজানায় চায় হারাতে...
— ডিফারেন্ট টাচ্‌

পৃথিবীতে অভিমিশ্র ভালো বলে কিছু নেই। বৃষ্টি প্রসঙ্গেও কথাটা সঠিক।

কৈশোরে আর দশটা কিশোরের মতোই আমারও প্রিয় খেলা ছিল ক্রিকেট। তবে ক্রিকেটের সাথে বৃষ্টির একটা আজন্ম বৈরিতা আছে – যা হয়তো কখনোই ঘুচাবার নয়। কিন্তু ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনি’। রক্তে আমাদের কৈশোরের সহজাত উদ্যত্ব, একগুয়েমি। তাই আমরা এ সত্যটা জেনেও তাদের এ বৈরিতা ঘুচানোর জন্য সম্ভাব্য কোন পন্থায় অচেষ্টিত রাখি নি তখন। যথই বৃষ্টি হোক পিচে যতক্ষণ পানি জমে পুকুর না হচ্ছে ততক্ষণ আমার ক্রিকেট(!) খেলাটা চালিয়ে যেতাম। বৃষ্টির ভিতরেও যে কতো ক্রিকেট খেলেছি তা ভাবলেই হাসি পাই এখন। অনেকক্ষণ এক নাগাড়ে বৃষ্টি পড়লে পিচে পানি জমে যেতো। এ পরিস্থিতিতে যখন কোনোপ্রকারেই খেলাটাকে আর ঠেলেটুলেও চালানো যাচ্ছে না তখন একজন এক দৌঁড়ে বাসা থেকে ফুটবলটা নিয়ে আসতো। ক্রিকেটের ব্যাট স্ট্যাম্পগুলোকে গোলপোস্ট তৈরির কাজে ব্যবহার করতাম। এভাবেই চলতে থাকতো ক্রিকেট, না পারলে ফুটবল। বৃষ্টি যখন নিয়মিত প্রতিদিন হানা দিতে শুরু করে তখন ক্রিকেট বাদ দিয়ে ফুটবল শুরু করে দিতাম।

বর্ষাকালের আর একটি অনবদ্য আনন্দের উৎস ছিল ফুটবল খেলা। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁদা-জলে দাপাদাপি করে ফুটবল খেলার সে যে কী আনন্দ তা যারা কোনদিন খেলেন নি তাদের কে বুঝানো একপ্রকার অসম্ভব। কাদা থকথকক করা মাটে হুটহাট করে এক একজনের পড়ে যাওয়াটা যথেষ্ট হাস্যরসের যোগান দিত। খেলা আর আর হাসাহাসি চলত সমান তালে। আর খেলা শেষে এক-একজনের চেহারা যা হত না তা যদি আমাদের মায়েরা কখনো স্বচক্ষে দেখতেন তাহলে তাঁদের চেহারাটা কেমন হতো বিধাতাই জানেন! আমাদের জানার কৌতূহল ছিল না তা না, কিন্তু সেটি জানার জন্য ঐ রকম ভূতের মতো চেহারাটি নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়ানোর মতো এত বড়ো দুঃসাহস আমাদের ছোট্টো বুকে কখনো পুরতে পারি নি। বাড়ি যাওয়ার আগে তাই পথেই গোসল সেরে চেহেরাটাকে একটু ভদ্রস্থ করতাম। খেলা শেষে সবাই মিলে পাড়ার পুকুরে একসাথে গোসল করার নামে অবাধ লাফালাফির আনন্দটা ছিল উপড়ি পাওনা। পুকুরের পানিতে ধুঁয়ে যেত যত আছে কাঁদা আর নোংরা – থেকে যেতো শুধু বৃষ্টিতে ভেজার অনুভূতির রেশ যার রঙ যাপিত জীবনের হাজার ঘষাঘষিতেও আজও ফিকে হয়ে যায় নি।

রয়ে গেছে – ভগ্নাংশে নয়; পুরোপুরি।

০৭
আমি হাত বাড়িয়ে সেই মেঘবৃষ্টির স্বর্ণমুদ্রা কুড়াতে থাকি,
এই শাদা কাগজ মূহুর্তে হয়ে ওঠে বিরহী মেঘদুত
অথই গীতবিতান।
কাগজ আবিষ্কারের পূর্বে মানুষ প্রেমের কবিতা
লিখে রেখেছে আকাশে
সেই ভালোবাসার কবিতা এই বৃষ্টি,
এই ভরা বর্ষা।
— মাহাদেব সাহা

ছেলেবেলায় যেমন করে বর্ষা দেখতাম, তেমন ঘনিয়ে বর্ষাও এখন আর হয় না। বর্ষার তেমন সমারোহ নেই, নেই সেই উদ্দ্বত্ত্বভাবটাও। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

“বর্ষা এখন যেন ইকনমিতে মন দিয়েছে— নমোনমো করে জল ছিটিয়ে চলে যায়— কেবল খানিকটা কাদা, খানিকটা ছাঁট, খানিকটা অসুবিধে মাত্র— একখানা ছেঁড়া ছাতা ও চীনে বাজারের জুতোয় বর্ষা কাটানো যায়— কিন্তু আগেকার মতো সে বজ্র বিদ্যুৎ বৃষ্টি বাতাসের মাতামাতি দেখি নে। আগেকার বর্ষার একটা নৃত্য ও গান ছিল, একটা ছন্দ ও তাল ছিল— এখন যেন প্রকৃতির বর্ষার মধ্যেও বয়স প্রবেশ করেছে, হিসাব কিতাব ও ভাবনা ঢুকেছে, শ্লেষ্মা শঙ্কা ও সাবধানের প্রাদুর্ভাব হয়েছে”।

মনে আছে আগে রোদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে ভর দুপুরে ক্রিকেট খেলতাম পাড়ার বন্ধুরা মিলে। খেলার আনন্দ এবং আবেগের কাছে তুচ্ছ হয়ে যেতো রোদের তাপ। এখন যখন মাঝে মাঝে যখন দেখি কম বয়েসী ছেলেরা কাকফাঁটা রোদ্দুরে মাঠে ক্রিকেট খেলছে তখন তাদের দুরন্তপনা দেখে স্মৃতিকাতর হওয়ার চেয়ে বেশি আঁতকে উঠি। এমন রোদ্দুরে নিজেরাই একদিন কেমন করে খেলতাম সে প্রশ্নটা দুঃস্বপ্নের মতো খোঁচাতে শুরু করে। এভাবে কৈশোরের অনেক পাগলামি, অনেক দুরন্তপনা এখন শুধুই স্মৃতির আস্তকুঁড়ে জমা হয়েছে। কিন্তু একটি জিনিসের তেমন পরিবর্তন হয় নি।

রোদকে উপেক্ষা করার সেই ছেলেমানুষী সাহস এখন না থাকলেও বৃষ্টি ভেজার সেই ছোটোবেলার অভ্যাসটি এখনো রয়ে গেছে;

এখনও বৃষ্টি হলে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে, সেই ছোটোবেলার মতোই বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ভিজতে ইচ্ছে করে...

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অনিমেষ রহমান's picture


চমতকার লিখেছেন!!

সাইফুজ্জামান খালেদ's picture


ধন্যবাদ আপনাকে।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অসাধারণ পোস্ট।

অনেক দিনের পর এত্ত চমত্‍কার কোন বর্ষা দিনের ব্লগ পড়লাম।
পুরো লেখাটাই বলতে গেলে কোট করার মত হয়েছে।

বর্ষা আর শীত আমারও প্রিয় ঋতু।
একই গান বারেবার শোনা আমার পুরানো অসুখ,
সারারাত বা সারাদিন একটা মাত্র গান শোনা - এমন হয়েছে বহুবার।
আজ সারাদিন রবিবুড়োর সাথেই কাটলো।
শুয়েবসে শুনলাম
অর্ণব এর নতুন এলবাম 'আধেক ঘুমে'
আর
সাগর সেনের গাওয়া ৫০টি রবীন্দ্রসংগীতের কালেকশন
'এ লিজেন্ড অফ গ্লোরী'।

আপনার লেখার ভক্ত হয়ে গেলাম।
নিয়মিত লিখবেন, অপেক্ষায় থাকবো।

ভাল থাকুন, অনেক ভাল।
প্রতিটি দিন, প্রতিটি ক্ষণ।

মীর's picture


আসলেই এই লেখাটা প্রথম পাতার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। দূর্দান্ত বললে নিতান্ত কম বলা হয়, এমন একটা লেখা। কি যে বলবো, বুঝতে পারছি না।

শনিবারের চিঠি's picture


লেখাটা হৃদয় ছুঁয়ে গেলো- হৃদয়ের বারান্দায় কিশোরী গোলাপের মতো এখনও বুঝি সে-ই শৈশব ফিরে আসে? বৃষ্টির মন ভালো থাকুক- লেখক ভালো থাকুক- আকাশ ভালো থাকুক; কেবল পুর্ণেন্দু পত্রীর চশমার ভিতর দিয়ে হেঁটে যাক বিষন্ন জীবনানন্দ, এক চিলতে বৈষ্ণব পদাবলীর রোদে সে পথ আলোকিতো হোক, তারপর বৃষ্টি নামুক- মেঘদূতের শরীর ছুঁয়ে কালিদাসের চুম্বনের মতো বৃষ্টি নামুক- তারপর গীতবিতানের একাকীত্ব, তারপর মেঘমন্দ্রমুখর বিদ্যাপতি।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


চমৎকার একটি লেখা ।
খুব ভাল লাগলো।

জ্যোতি's picture


দারুণ একটা লেখা। অসাধারণ।

টুটুল's picture


দূর্দান্ত একটা লেখা...

প্রিয়তে রাখলাম

টুটুল's picture


দূর্দান্ত একটা লেখা...

প্রিয়তে রাখলাম

১০

বিষাক্ত মানুষ's picture


বাহ !! আপনি তো চমৎকার লিখেন !! দারুন লাগলো লেখাটা Smile

১১

জেবীন's picture


চমৎকার একটা বর্ষামুখর লেখা! পুরা ১০এ ১০ পাবার মতোন!
দারুন লিখেন আপনি

নির্মলেন্দু গুণের কোট করা অংশটা মজা লেগেছে, আসলেই বর্ষাকে দেখেন বর্ষারানী বলা হয়ে থাকে।

১২

তানবীরা's picture


এতো বিলাসী জীবন, হিংসা রেখে গেলাম

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সাইফুজ্জামান খালেদ's picture

নিজের সম্পর্কে

বলতে পারেন ব্লগে আমার লেখাগুলো একান্ত নিজস্ব ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে সেলাই করে জীবনের পথে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পিছেনে ফেলে যাওয়া কতগুলো সুখস্মৃতি। ব্লগ আমার কাছে যাপিত জীবনের বৈচিত্রহীন পৌনঃপুনিকতায় আবদ্ধ চার দেয়ালের গায়ে আলোকিত ছোট্ট একটি খোলা জানালা;সে খোলা জানালা দিয়ে প্রতিনিয়ত ঠিকরে পড়ে এ টুকরো সোনালী আলো আমার ভিতর বাড়িতে।এ টুকরো আলো আর এক টুকরো অন্ধাকারের মধ্যে পার্থক্যটা কি জানেন? এক টুকরো অন্ধকার তার চারপাশটাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করার ক্ষমতা রাখে না; শুধুমাত্র তার নিজস্ব আয়তনটুকো জুড়েই তার যত দৌরাত্ম। কিন্তু এক টুকরো আলো নিজেকে আলোকিত করার পাশাপাশি চারপাশটাকে আলোকিত করে, সে অন্ধকারের মতো অত কৃপণ না। ব্লগের জানালা দিয়ে ঠিকরে পরা আলোটুকু আলোকিত করে রাখে আমার অবসর এবং কর্মমূখর মুহূর্তের একান্ত ক্ষণগুলো। ব্লগের ছোটো এ খোলা জানালা দিয়ে আকাশের বিশালতাকে হয়তো মাপা যায় না কিন্তু আকাশের নীলটুকু অনুভব করা যায়। সে নীলের আঁচরে মনের ক্যানভাসে আঁকা যায় নানা রঙের ছবি। হয়তো যেমন চাই তেমন পারি না; তারপরও অন্তত পক্ষে যতটুকু পারি ততটুকু করার চেষ্টা…