বুয়েটের ক্যাফেটেরিয়া
বুয়েট থেকে পাস করে বেরিয়েছি আজ প্রায় ছয় বছর। তবুও কোন এক অজ্ঞাত কারণে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করে ফেলে আসা সেই সব দিনগুলোতে। ক্লাশ আর সেশনাল এর রোলার কোস্টারে চেপে কেটেছে কতো অগনিত দিন রাত্রি। শত যন্ত্র আর যন্ত্রণার ভিড়েও সেই সময়টাকে আমরা রাঙিয়ে নিয়েছিলাম নিজেদের রঙ তুলি দিয়ে।
কারণে অকারণে অটো নেয়া, এক ক্লাসে বসে অন্য subject এর assignment করা, কতো আবোলতাবোল চিরকুট আদান-প্রদান করা। এখনো মনে পড়ে মেকানিক্স ম্যাডাম এর ক্লাস কারো ভালো লাগত না। ম্যাডাম black board এর দিকে ঘুরলেই সবাই চক, কাগজ - যার হাতে যা আছে তাই ছোঁড়া শুরু করতো। ম্যাডাম ফিরে তাকানো মাত্রই সব শান্ত। যেন ভাঁজা মাছটিও কেউ উল্টে খেতে জানে না।
মনে পড়ে old academic building (OAB)এর সামনের আম গাছ থেকে চুরি করে সেই আম খাওয়ার স্মৃতি। মনে পড়ে রকে বসে ক্যাফেতে বসে আড্ডা দেয়া; গলা ছেড়ে গান গাওয়া; ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সবাই মিলে ‘মনের মাঝে তুমি’ দেখতে যাওয়া; সকাল আটটায় ভেলপুরির খোঁজে পলাশী, ফুলার রোড, শহীদ মিনার পর্যন্ত ছুটে যাওয়া। এখনো মনে পড়ে ঘণ্টা ভাড়া করে ভ্যান গাড়িতে চেপে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো আর গলায় বিখ্যাত সেই গান ‘দিল চাহতা হে কাভি না বিতে ছুটি কে দিন…দিল চাহতা হে হাম না রাহে কাভি ইয়ারোকে বিন…’।
পথে প্রান্তে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাওয়া, দুটা ডিম ভাঁজা চারজনে ভাগ করে খাওয়া, কে কী বলছে তার তোয়াক্কা না করে চার মেয়ে এক রিক্সায় করে ঘুরে বেড়ানো, লেভেল শেষের অনুষ্ঠান, বুয়েটে চারটি বছর পার করবার পর বুয়েট ছেড়ে যাবার অনুষ্ঠান, রঙ খেলা - বন্ধুদের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আজও আপন রঙে চির অমলিন।
আহসান মঞ্জিল, লালবাগের কেল্লায় যেমন ঘুরে বেরিয়েছি তেমনি ঢাকার বাইরে সিলেট, বিরিশিরি, কক্স-বাজার, সেন্টমার্টিনে পড়েছে মুখর পদচারনা। যখনি মনে হল ভালো লাগছে না, কাঁধে একটা ব্যাগ চাপিয়ে দল বেঁধে রওনা হলাম নতুন কোন গন্তব্যর দিকে। পৃথিবীর সকল বাঁধন, সমস্ত নিয়ম ভাঙাটাই যেন অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর দুরন্ত মনকে আটকাবে, সেই সাধ্য কার ছিল? রবীন্দ্র সংগীতটা আজ বড় মনে পড়ছে, ‘পুরানো সেই দিনের কথা…’।
হ্যাঁ, পুরানো সেই দিনগুলো ফিরে পাওয়ার লোভে বারবার ফিরে গিয়েছি বুয়েটে। হাজারো অচেনা মানুষের ভিড়ে চেনা মুখগুলো খুঁজে বেরিয়েছি। কিন্তু অজানা কোন কারণে ক্যাম্পাসটা একটু একটু করে কখন কীভাবে দূরে সরে গেছে টের পাইনি। নিজেকে কেমন যেন বহিরাগত মনে হয়। বুয়েটের আঙিনায় পা দিলেই অসংখ্য চোখ যেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় আর বলে, ‘তুমি কে হে? বুয়েট তো এখন আমাদের। এখানে পুরনোদের কোন জায়গা নেই।’
এখন আসি মূল কথায় যে কারণে লেখাটা শুরু করেছিলাম। কিছুদিন আগে ডিপার্টমেন্ট এ গিয়েছিলাম একজন প্রফেসর এর সাথে দেখা করতে। কাজ শেষে ক্যাফেটেরিয়াতে গেলাম – পেট পূজা তো করতেই হয়। গেলাম সিঙ্গারা, সামুচা যেখানে বিক্রি হয় সেখানে। হাত সামান্য বাঁকা একজন মামা সেখানে খাবার দিয়ে থাকেন। যারা বুয়েটে পড়েছেন অথবা পড়ছেন তারা নিশ্চয়ই সেই মামাকে চিনবেন।
আমি দুটা সিঙ্গারা অর্ডার করতেই উনি বললেন, “মামা ভালো আছেন?”
আমি বিস্মিত চোখে তাকালাম, “আপনি আমাকে চিনতে পারছেন? আমি তো অনেক আগে পাস করছি।”
উনি উত্তর দিলেন, “আপনাদের চিনবনা মামা? আমাদের সবার কথাই মনে থাকে। আপনি আমাকে চিনতে পারছেন?”
“কী যে বলেন! আপনারা আমাদের মনে রাখতে পারলে আমরা আপনাদের মনে রাখবনা সেটা কি হয়?”
“ভালো আছেন তো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ ভালো আছি।”
মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। প্রায় পাঁচ ছয় বছর পরে আমি যেন আমার বুয়েট ফিরে পেলাম। যে বুয়েট আমাকে চেনে, যে বুয়েটকে আমি চিনি। চোখের কোণে পানি জমে উঠল। মামার বলা একটা কথা বুয়েটকে আবারো আমার কাছাকাছি নিয়ে এলো। নাহ, বুয়েটে এখনো আমার জন্য কোথাও না কোথাও জায়গা আছে। ক্যাম্পাসের আনাচেকানাচে এখনো আমাদের ফেলে যাওয়া চিহ্ন হয়তো রয়ে গেছে। কিছুই মুছে যায়নি। আমরা আছি, আমরা থাকবো –এই মানুষগুলোর মনে, ক্যাফেটেরিয়ার লাল চেয়ার টেবিলে, অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে, মাঠের সবুজ ঘাসে, rag cornerএর গানে, ক্লাসরুমের দেয়ালের সাদা রঙে, ডিপার্টমেন্টের করিডোরে কারো হৈ হুল্লোরে।
মাঝে মাঝে উচিত অনুচিত এর টানাপোড়নে অনেক কথা বলতে চাইলেও বলা হয়ে ওঠে না। সেদিন ক্যাফেটেরিয়ার মামাকে হয়ত আমার ধন্যবাদ জানানো উচিত ছিল, আমাকে আমার হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু বলা হয়নি। আবেগে আপ্লুত আমি হাজারো হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত নিয়ে শুধু ফিরে এসেছি।





সময় যে কোন দিক দিয়ে গড়িয়ে যায় ... টের পাই না... স্মৃতী শুধু জমা হতে থাকে... হয়তো এটাই নিয়ম
ভালো লাগলো পড়ে...
সময় যদি আটকে রাখা যেত।
স্মৃতিচারণমূলক এ লেখাটি পড়ে বুঝতে পারলাম, বুয়েট ক্যাফেটেরিয়া স্মৃতিতে টিকে আছে ভালোভাবেই।
এবি ব্লগে
সানজানা
নিয়মিত পাবো আশা করি।
এত দেরিতে উত্তর দেয়ার জন্য আগে ক্ষমা চাইছি। ধন্যবাদ উৎসাহ দেবার জন্য। চেষ্টা করব নিয়মিত লিখতে।
আহা সেই ছাত্র জীবন, আমাদের সময়তো ছিল এরশাদ খেদানোর যুগ।
সেটা তো আরো interesting ছিল বোধহয়...
ভালো লাগলো পড়ে...
ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো।
ধন্যবাদ....
Mon kharap hoye gelo....
মন্তব্য করুন