২৭ অগাস্ট, ২০১৪।
আজ মারিই আমাকে অনুরোধ করলো তার সাথে রাতের খাবারটা খেতে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। কারন আমি ক্ষুধার্ত ছিলাম আর আমার রাঁধতে ইচ্ছে করছিলোনা। গতপরশুদিন এখানে আসবার পর থেকে খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো কারণ এখানকার কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মারিই বা লিসা কাওকেই চিনিনা। মনে হল এই সুযোগে হয়তো কিছুটা সহজ হতে পারবো মারিই’র সাথে।
চমৎকার মোটাসোটা মহিলা এই মারিই, যার বয়স এখন ৫৮ বছর। তার সঙ্গী তার এক কুকুর আর দুই বিড়াল। পিৎসা খেতে খেতেই আমাদের গল্প শুরু হয়ে গেলো- জানতে পারলাম মারিই জাতিতে আইরিশ-ফ্রেঞ্চ। তার দাদা-দাদী আয়ারল্যান্ড থেকে বহু আগে আটলান্টিক পারি দিয়ে বোস্টন এ বসত গড়ে আর সেই থেকেই তারা এই দেশে। মারিই’র ছোটবেলা কাটে ফেয়ার হেভেনে, যে শহরটা কিনা ঠিক স্বর্গের মতই সুন্দর আর নিরিবিলি আর সেই একই শহরে কাটে তার মেয়ের শৈশবও। পরে সেখান থেকে সরে এসে নর্থ ডার্টমাউথের এই জায়গাটা মারিই কেনে ১৯৭৭-এ। এর কিছুদিন পরেই তার স্বামীর সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়- সাথে থেকে যায় তার একমাত্র মেয়ে লিসা। কথায় কথায় মহিলা জানালো যে তার চাকরির সময়গুলো ছিলো এমন যে, রাতে বিছানায় যেতে যেতে বেশ রাত হতো- যেই অভ্যাসটা তার এখনো রয়ে গেছে যদিও সে বহু আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। আর তার অবসর নেওয়াটা ছিলো তার নিজের জন্য অপ্রত্যাশিত কারণ এমন একটা অ্যাকসিডেন্ট তার জীবনে তখন ঘটে যায়, যার জন্যে সে উবু হতে পারতোনা এবং ভারি কিছু তুলতেও পারতোনা। ডাক্তার বলে দিয়েছিলো যে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে বলে তারা মনে করলেও খুব বেশি আশা তারা করতে পারছেনা। কিন্তু ব্যাপার হলো, মারিই কে দেখে তুমি একদমই বুঝতে পারবেনা যে এমন কোন অ্যাকসিডেন্ট তার জীবনে আদৌ ঘটেছিলো। তার ব্যাখ্যা মারিই’র কাছে এরকম যে- তার ধারনা একমাত্র ইচ্ছেশক্তির জোরেই সে এখন সবকিছু করতে পারে। অপারেশানের বেশ অনেকদিন পর সে হাল্কা ওজন আস্তে আস্তে বহন করা শুরু করলো এবং একসময় আরেকটু ভারী জিনিস বহন করা শুরু করলো আর এভাবেই সে সুস্থ হয়ে উঠলো, যদিও বয়েস বাড়ার সাথে সাথে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতা আবার সে বুঝতে শুরু করেছে।
একটা সময় সে বললো তার ছেলেবন্ধু’র কথা, যাকে কিনা সে হারিয়ে ফেলেছে ২০০০ সালে। স্কুল থেকেই তারা একে অপরকে ভালোবাসতো। মারিই খুব মমতা নিয়ে বলতে লাগলো কিভাবে সে তার প্রেমিকের অসুস্থতার দিনগুলোতে নিজের চাকরীস্থল থেকে ফিরে এসে তাকে কেমোথেরাপী’র সেশানগুলোতে নিয়ে যেতো এবং আমি খুব বুঝতে পারছিলাম যে এই ভয়ঙ্কর কাজগুলো সে কতোটা ভালোবাসা আর নিষ্ঠার সাথে করেছিলো। তার কণ্ঠস্বর, চাহনি- এসবকিছু তাই বলে দিচ্ছিলো। তার কাছে যে দুটো বিড়াল আছে তার একটা তার প্রেমিকের আর আরেকটা বিড়াল তার প্রেমিকের এক বান্ধবীর যে মরে যাবার আগে মারিইকে অনুরোধ করেছিলো যাতে করে তার প্রিয় বিড়ালটাকে সে আগলে রাখে।
একটা সময় কিছুটা অসাড় আর অন্যমনস্ক হয়ে সে বলতে লাগলো তার মেয়ের ছেলেবন্ধু’র কথা, যার সাথে লিসার পরিচয় স্কুলে এবং যে কিনা আর্মিতে ছিলো। তার সাথে একটা সময় লিসার বাগদান হয় এবং তারা সবাই মিলে বেশ আনন্দের সাথে বিয়ের আয়োজন শুরু করে। কিন্ত দুর্ভাগ্যক্রমে বিয়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই, ২০০৫ সালে এক কার অ্যাকসিডেন্টে সে মারা যায়। তারপর লিসা অনেকদিন একা ছিল। তাদের বাসার যে রুমটাতে লিসার প্রেমিক থাকতো সে রুমে আজ অব্দি তার জিনিসগুলো যত্ন করে লিসা রেখে দিয়েছে। মারিই জানালো লিসার প্রেমিক মারা যাবার পরে তার কাজ পাগলা মেয়ে কেমন করে আরও বেশি কাজ পাগলা হয়ে উঠলো। লিসা আর মারিই দুজনেই খুব কুকুর ভালোবাসে আর লিসা ঠিক করলো যে সে একটা পার্লার দেবে বাসাতেই যেখানে কিনা সে কুকুরদের স্নান করাবে, পশম ছেঁটে দেবে, নখ কেটে দেবে।
বেশ কিছু বছর পর মারিই’র সস্তি ফিরে আসে যখন সে জানতে পারে তার মেয়ে এক পর্তুগীজ ছেলের প্রেমে পড়েছে যার নাম মিগেল আর তারা বিয়ে করতে যাচ্ছে। কিন্তু এবার লিসা শুধুমাত্র মারিই আর মিগেলের বাবা-মা আর ভাই-বোনকে নিয়ে বিয়েটা অনাড়ম্বর ভাবে সেরে ফেলে কোনোরকম জাঁকজমক ছাড়াই, এখন থেকে তিন বছর আগে।
মারিই খুব আনন্দিত হয়ে বলতে লাগলো তার তিন নাতি-নাতনীর কথা, যারা জন্ম নিয়েছে এই বছরের জানুয়ারি মাসে এবং একই সাথে। উচ্ছ্বাসিত ভাবে মারিই স্যামি, ড্যানি আর এলসি’র রোজকার বেড়ে ওঠার গল্প শুরু করে দেয় আর জানায় যে সে কতো সুখী একজন নানী এবং মা, আর তার মেয়েকে নিয়ে সে কতোটা গর্বিত- কি সুন্দর করেই না তার মেয়ে সব কিছু সামাল দেয়, এই পুরো বাড়িটার নক্সা থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা ইঞ্চি তার মেয়ে নিজ হাতে বানিয়েছে কোন আর্কিটেক্ট আর মিস্ত্রী ছাড়াই। আরো হড়বড় করে বলে যেতে লাগলো তার মেয়ে কতোটা গোছানো যে তাকে কোন কিছু নিয়েই চিন্তা করতে হয়না, নিজের বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব বুড়ি মেয়েকে দিয়ে নিশ্চিন্তে দিন কাটাচ্ছে। তার মেয়েই নিত্যদিনকার রুটিন তৈরি করে এবং লিসা যখন কুকুরদের গ্রুমিং করতে তার বাসায় আসে তখন তাকে পাঠিয়ে দিয় নিজের বাসায়- যাতে মারিই বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে পারে আর কাজ শেষ হলে লিসা নিজ বাসায় পৌঁছে গেলে সে ফিরে আসে এখানে। একতলা কাঠের বাড়িটাকে দোতলা বানিয়ে রুম ভাড়া দেবার সমস্ত বুদ্ধি তার মেয়ের- এতে করে তার পুরো বাড়িতে একা থাকতে হচ্ছে না আর বাড়তি টাকাও রোজগার হচ্ছে।
এতক্ষন আমি শুধু তাকে শুনে যাচ্ছিলাম, কিন্তু এবার আমি তাকে হঠাৎ তাকে জিজ্ঞাস করে বসলাম যে সে কি ধরনের গান শোনো। জানা গেলো তার পছন্দের শিল্পী বব ডিলান, বব মার্লে, জন ডেনভার এবং এমন আরও অনেকে। আমি আরও জিজ্ঞাস করলাম সে কখনো ডেমিয়ান রাইসের গান শুনেছে কিনা আর তার উত্তরে সে জানালো যে সে শোনেনি। আমরা তারপর মারিই’র ল্যাপটপ থেকে ইউটিউবে গিয়ে ডেমিয়েন রাইসের গান শুনলাম আর বুড়ি জানালো তার গানগুলো ভালো লেগেছে। তাকে গান শুনিয়ে উঠে আসতে গিয়ে আমি জানালাম পিৎসাটা অনেক মজার ছিলো আর জানতে চাইলাম এটা সে বানিয়েছে কিনা। সে জানালো পিৎসাটা সে বানায়নি এবং উৎসাহের সাথে বলে যেতে লাগলো যে এটা তার খুব প্রিয় পিৎসা যেটা একটা বিশেষ দোকানে কিনতে পাওয়া যায়- যেই দোকানের নাম আমি বুঝে উঠতে পারিনি এবং এটি শুকরের মাংস আর ব্লাক অলিভ দিয়ে তৈরি। এবার আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম প্রথমবারের মতো শুকরের মাংস এতক্ষন ধরে না জেনে খেয়ে ফেলে।
আমি মারিই কে শুভ রাত্রি জানালাম। একদিন ফেয়ার হেভেনে আমাকে নিয়ে যাবে কথা দিয়ে মারিইও আমাকে শুভ রাত্রি জানালো এবং আরও জানালো যে সে নিশ্চিত যে আমার শহরটি খুব ভালো লাগবে।
রুমে ফেরার পথে ফ্রিজের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পেলাম ওটার গায়ে টানানো আর্মির পোশাক পরা সুদর্শন এক ছেলের ছবি। চিনতে অসুবিধা হলো না ছেলেটি কে।
২৪ সেপ্টেম্বার, ২০১৪।





চমত্কার দিনলিপি। আপনি বেশ ভালো ছবি আঁকেন, শব্দকথায়।
অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনার ধারাবাহিক অনুপ্রেরণার জন্য। নতুন বছরের জন্য আপনাকে জানাই শুভকামনা
নতুন বছর আপনার জন্যও হোক আনন্দময়।
আমি জার্মানিতে ফ্লেবার না দেখে শুকরের ফ্লেবার দেয়া চিপস খেয়ে খেয়ে ফেলেছিলাম
যাক লেখা ভালো লাগল
হাঃ হাঃ! এই ধরণের অভিজ্ঞতা মনে হয় বিদেশে আসলে কম-বেশী সবার হয়
ধন্যবাদ! শুভকামনা 
ভালো লাগলো পড়ে। কিপ ইট আপ!
অনেক ধন্যবাদ আপনাকে
শুভকামনা।
আপনার দিনলিপি গুলো সরাসরি জীবন থেকেই নেয়া। ইদানিং অনেকের বিদেশে এসে তাদের দিনলিপি পড়তে বসলে মনে হয় কেন যেনো তারা নিজেকে অহংকারী হিসেবে দেখাচ্ছে। আর ভীনদেশী লোকগুলো যেনো ছোটলোক। আর যদি এশীয় কাউকে গল্পে কোনো চরিত্র দেয়া হয় তাহলে তার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ে।
অথচ বাস্তবতা এর পুরোই বিপরীত।
যাই হোক, লেখাগুলো পড়তে মাঝে মাঝে ভালোই লাগে।
মন্তব্য করুন