কাছের মানুষরা বইয়ের ফ্ল্যাপ লিখলে!
ফ্ল্যাপ লেখক : গলির মোড়ের চা দোকানদার
বইয়ের ধরন : গল্প
কুদ্দুসের নামই যে অনন্য অনার্য এটা জেনেছি মাত্র সপ্তাহখানেক আগে। হঠাৎ সে আমার কাছে এসে বললো, ফ্ল্যাপ লিখে দিতে হবে। তাও আবার গল্পের বইয়ের। আমি সারাদিন চা বানাই, কাস্টমারদের সেবা-খেদমত দিই, পড়ার সময় কই! তবু কুদ্দুস যখন বলেছে না দিয়েও তো পারি না। হাজার হোক, সে আমার কাস্টমার! কাস্টমারের মন জোগানো যে কোনো ব্যবসায়ীর জন্য অতীব জরুরি। দুঃখের কথা হচ্ছে, কুদ্দুসের বইটা আমি পড়ে শেষ করতে পারিনি। অবশ্য শেষ করতে পারবো কি, ওটা শুরুই তো করতে পারিনি। আর সুখের কথা হচ্ছে, বই না পড়েও আমি বুঝেছি কুদ্দুস গল্পকার হিসেবে খুব ভালো। নিজেকে দিয়েই তো সেটা বুঝতে পারি। ও আমার বাকি কাস্টমার। সময়মতো টাকা দেয় না। টাকা দেবে বলে মাসের পর মাস ঘোরায়। হয়তো কোনোদিন বলে বসলো, ভাই, আগামীকাল অবশ্য আপনার সব টাকা দিয়ে দেবো। এখন ১০টা টাকা ধার দেন। পরদিন টাকা পাওয়া দূরে থাক, নগদ দেয়া ১০ টাকাও পাওয়া যায় না!
টাকা না দেয়ার অজুহাত হিসেবে কুদ্দুস আমাকে নানান রকম কথা শোনায়। আমি মুখ বুঝে ওর সব মিথ্যা কথা সহ্য করি আর মনে মনে গালাগাল দিই। সেই কুদ্দুস যখন গল্প লিখেছে, ভালোই লিখবে, বলার অপো রাখে না। ওর গল্প তো আমিু কম শুনিনি! আমি তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।
মোকসেদুর রহমান
ফ্ল্যাপ লেখক : অর্ধ বেকার মেস মেম্বার ছালামত
বইয়ের ধরন : কবিতা
কবিতা লেখা খুব ভালো অভ্যাস। জগতে যত রকম ভালো কাজ আছে, তার মধ্যে কবিতা লেখা অন্যতম। দীর্ঘ ২ বছর যাবত আমি মিজান সাহেবের মেসে থাকি। এক রুমে আমরা চারজন। দুইজন চাকরি করে, আর আমরা দুজন অর্ধ বেকার। আমি সকালে একটা রাতে একটা প্রাইভেট টিউশনি করি। আর অন্য রুমমেট আজমল রাতে একটা সকালে একটা টিউশনি করে। বলতে গেলে দুজনই সমান ব্যস্ত আবার দুজনই অর্ধ বেকার। এই করেই আমাদের দিন কাটছিলো। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলাম, আজমল কবিতা লিখছে! কবিতা লিখে সে আমাকে পড়ায়ও। পড়ায় মানে শোনায় আর কি! আমার কি ওসব পড়ার ইচ্ছা আছে! সে তার এক ছাত্রীর প্রেমে পড়েছে। প্রেমের পড়ার পর থেকেই প্রতিনিয়ত কবিতা লিখছে। মাঝরাতেও আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সদ্য জন্ম নেয়া কবিতা পড়ে শোনাতে আরম্ভ করে সে। এ তো মহাবিপদ। কবিতার জ্বালা থেকে মুক্তি পেতে ছাত্রীর অভিভাবকের সাথে কথা বলে প্যাঁচ লাগিয়ে দিলাম! ফলাফল : আজমলের চাকরি গেলো। প্রেমও গেলো। ভাবলাম, এবার সে থামবে, কিন্তু থামলো না। নবউদ্যমে চলতে থাকলো কাব্যচর্চা। একপর্যায়ে বলতে বাধ্য হলাম, ‘শোন, তোর কবিতা যদি পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হয়, তখন আমি পড়বো।’ এরপর থেকেই সে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে দৌড়াদৌড়ির পাশাপাশি শিামন্ত্রীর মোবাইলফোন নম্বর সংগ্রহ করার তালে মেতেছে। লেখা এবং অলেখা কবিতাগুলো এবারের বইমেলায় সে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করছে। তার কবিতায় অন্যরা কী পাবে জানি না, তবে আমি কিছুই পাইনি!
ছালামত শিকদার
ফ্ল্যাপ লেখক : বাস কন্ডাক্টর মনির
বইয়ের ধরন : ভ্রমণকাহিনী
ভ্রমণ মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। জ্ঞানীও করে। কিন্তু দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা ভ্রমণ করেও আমি কেন পরিশুদ্ধ হইনি, কেন জ্ঞানী হইনি, সেটা বোধহয় অন্য প্রসঙ্গ। ৩ বছর যাবত আমি চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর রুটের বাস কন্ডাক্টর। প্রতিদিন লক্ষ্মীপুর যাচ্ছি, চট্টগ্রাম আসছি... এমনই চলছে। আমার অপরিচিত ব্যক্তিদের জানার কথা নয়, এর আগে আমি ঢাকা শহরের সিটিং সার্ভিস বাসের কন্ডাক্টর ছিলাম। সেই বাসে সুন্দর একটা কথা লেখা থাকতো ‘বিনা টিকিটে ভ্রমণ করবেন না’। তারপরও কেউ কেউ বিনা টিকিটে ভ্রমণ করতো। মানে আমি কোনো কোনো যাত্রীকে টিকিট কাটায় নিরস্ত করে নগদ টাকা নিতাম। এতে আমার কিছুটা উপকার হতো। একদিন মালিকপরে কাছে ধরা পড়ে এ উপকারের কাহিনী। ফলে চাকরি চলে যায় আমার। চাকরি গিয়ে আমার পদোন্নতি ত্বরান্বিত হলো। এখন ডিস্ট্রিক্ট গাড়িতে চাকরি করি। এই গাড়ির একজন নিয়মিত যাত্রী বদরুল ভাই। বদরুল ভাই নতুন বিয়ে করেছেন, ভাবি বাড়িতে থাকেন। তাই প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে আসেন। এই আসা-যাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখে ফেলেছেন চমৎকার একটি ভ্রমণকাহিনীর বই। বইটি সবাইকে পড়ে দেখার অনুরোধ জানানো গেলো।
মনির আহাম্মদ
ফ্ল্যাপ লেখক : ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার মন্টু
বইয়ের ধরন : সমালোচনা
বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্য এগিয়ে গেছে অনেকদূর। এটা নতুন করে বোঝা গেলো তালুকাটা কাশেমের প্রকাশিতব্য বই পড়ে। সে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীদলের রাজনীতি করে আসছে। সরকারি দল যে আসলে কোনোই কাজের না, বিরোধীদলকে ঠেঙ্গানি দেয়া ছাড়া তাদের কোনো চিন্তা নেই, জ্বালাময়ী ভাষায় এটাই উপস্থাপন করেছে লেখক। শালীন এবং অশালীন ভাষায় সরকারের সমালোচনাও করেছেন। পাশাপাশি যারা তার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না, চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, এমন সব মানুষকেও মুলিবাঁশ দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কাশেমের নামের আগে তালিকাটা শব্দটা অন্য অর্থ আছে। সেটা আমার নিজের বই যখন বের হবে, তখন বলবো। এখন বলে সময় নষ্ট করতে চাই না। কারণ ম্যাটার আগেভাগে জানিয়ে দিলে অন্যরা বই না-ও কিনতে পারে। আমার ইউনিয়নের সদস্য কাশেমের সুলেখনী ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।
মন্টু মিয়া
ফ্ল্যাপ লেখক : লেখকের বাবা আবদুল মালেক
বইয়ের ধরন : উপন্যাস
আমার ছেলে খালেক পাঠান আস্ত একটা উপন্যাস লিখে ফেলেছে! কেমন লিখেছে তা অবশ্য জানি না। ব্যস্ততার কারণে পড়তে পারিনি। তবে আমার সন্তান যখন, নিশ্চয়ই ভালো লিখবে। বাজারের টাকা চুরি করা ছাড়া তার অন্য কোনো বদভ্যাস নেই। সে আরো উপন্যাস লিখুক, তাহলে আমি আবার ফ্ল্যাপ লেখার সুযোগ পাবো!
আবদুল মালেক





ভিন্নধর্মী লেখা, ভালো লেগেছে।
ধন্যবাদ ভাই। @ আমি কুলাঙ্গার
অসাধারণ আর অন্যরকম। কিনতু নিজের বইয়েরটা নিজে লিখলে সেটা বাদ গেছে বোধহয়
সচেতনভাবে বাদ দেয়া হয়েছে! কমবেশি সবাই-ই তো নিজের বইয়ের ফ্ল্যাপ নিজেই লেখে! তাতে এতো বেশি ভালো ভালো কথা থাকে যে...! ধন্যবাদ। @ তানবীরা
ঐটাই যদি না পঁচাবেন তাহলে আর স্যাটায়ার কিসের?
লেখা ভালো লেগেছে।
ধন্যবাদ। @ লীনা আপা
হঠাৎ করে অন্যরকম লেখা পড়ে আরাম পেলাম বেশ
ধন্যবাদ। আপনি লেখাটার মর্ম উদ্ধার করতে পেরেছেন! @ মর্ম
মন্তব্য করুন