গাছে তেঁতুল জিবে জল
ন্যাড়ার বেলতলায় যাওয়া মানা থাকলেও তেঁতুলতলায় মোটেও বাধা নেই। তেঁতুল অনেক উদার, অসময়ে ঝরে পড়ে ন্যাড়ার মাথা ফাটিয়েছে_ অপবাদ দিতে পারবে না কেউই! তারপরও অধিকাংশ ন্যাড়া বেলতলার দিকেই ছোটে! শক্তের ভক্ত হিসেবেই বোধহয়! ব্যতিক্রম পাওয়া গেল নোমান মামাকে। এক মাওলানার ওয়াজ শুনে আজকাল তিনি তেঁতুলতলায় ঘোরাঘুরি শুরু করেছেন। এদ্দিন শুনতাম_ গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল; মামার হাব ভাবে মনে হয়_ গাছে তেঁতুল জিবে জল!
মহল্লার সামাদ সাহেবের বেশ কয়েকটি তেঁতুলগাছ আছে। তেঁতুলগাছের পাশাপাশি আছে মেয়ে মহুয়াও। মেয়েটি কারও সঙ্গে মেশে না; শুধু তেঁতুলের সিজনে তেঁতুলতলায় ঘোরাঘুরি করে। কখনও দু-একটা বিচি মুখে পোড়ে, বাকি সময় উপভোগ করে ঝুলন্ত তেঁতুলের সৌন্দর্য! বাড়িতে মানুষজন বলতে সামাদ সাহেব ও তার স্ত্রী, মহুয়া একাই ঘোরে ফেরে।
সব সময় আমি মামার কাছাকাছিই থাকি। মামার সঙ্গে প্রতিদিন আমাকেও তেঁতুলতলায় যেতে হয়। যদিও প্রশ্নের উত্তর পাই না। গাছভর্তি ডাঁসা তেঁতুল আছে ঠিকই, কিন্তু সেগুলো পাকতে আরও দুই মাস লাগবে। এমন না যে, মামা কাঁচা তেঁতুলই পাড়তে আসেন। প্রতিদিন বিকেলে নিয়ম করে তেঁতুলতলায় এসে পাঁয়চারি করেন, কখনওবা গাছের মগডালে উঠে বসেন। আমি একবার তেঁতুল দেখলে দুইবার মামাকে দেখি। যোগসূত্র পাই না, সদুত্তরও না। প্রশ্ন করলে শুনি_ 'জ্ঞানীরা প্রশ্ন করে না, দেখে শেখে'। অষ্টম দিনেও প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া গেল না দেখে চামচামিতে যতি টানলাম। মামা আমাকে পাকড়াও করলেন_ 'তোরা বড়জোর কারও হারানো গরু খুঁজে আনতে পারবি, কখনোই গবেষক হতে পারবি না।'
'গবেষক হয়ে আমার কাজ কী?'
'গবেষক হবি কেন, সারাজীবন গবেটই থেকে যাবি।'
'সেই ভালো। গবেটরা আর যা-ই করুক, অকারণে তেঁতুলতলায় যায় না!'
মামা থমকে যান। বেয়াড়া কথা শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তারই আজ্ঞাবহ, তেল-নুনে পালিত ভাগ্নে যদি উল্টো স্রোতে ভাসে_ না থমকে উপায় কী!
'না বুঝে চ্যাটাং চ্যাটাং করিস না' মামা যুক্তি দেখান, 'তেঁতুলবনে বনভোজনের আয়োজন করব!'
'কেন সুন্দরবন হারিয়ে গেছে নাকি? তেঁতুলবন খুঁজছো, তেঁতুলের বন হয় নাকি?'
'হবে না কেন! তেঁতুলের হয়_ ফুলেরও হয়। গান শুনিসনি_ নিশিথে যাইও ফুলবনে...।'
'তাই বলে তেঁতুলবনে বনভোজন, কেমন হয়? এর চেয়ে বান্দরবান ভালো না?'
'ভালো নারে বান্দর, মোটেও ভালো না।'
সাফ জানিয়ে দিই_ ওইসব বনবাদাড়ের পিকনিকে আমি নেই। যৌক্তিকতা উপস্থাপনে ব্যর্থ মামা বিষণ্ন হয়ে যান।
পরদিন মাথায় প্রশ্নটা জাগে, তেঁতুলবনে পিকনিক করবেন_ তাই বলে প্রতিদিন গাছতলায় ঘোরাঘুরি কেন? মামা খোলাসা করেন_ পিকনিকটা হবে রাতে, জোছনা রাতে। তেঁতুলবনে এমনিতে ভূতপেত্নী থাকে। নিয়ম করে যাতায়াত করলে ভূতপেত্নীর সঙ্গে অদৃশ্য বন্ধুুত্ব স্থাপিত হয়ে যাবে_ পিকনিকের দিন ডিস্টার্ব দেবে না।
ভূত-পেত্নী? কী বলছে বিজ্ঞানপড়ূয়া ছেলেটা! নার্সারির বাচ্চারাও ভূতের কথায় হাসে! উত্তর খাড়া_ 'আমরা যখন বই পড়ব, পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তর লিখব কেবল তখনই জানব_ ভূত বলে কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবে ভূত আছে। ভূতের প্রধান আস্তানা তেঁতুলগাছ!'
'তাহলে তেঁতুলবনে পিকনিক না করে আম, জাম-কাঁঠালবনেও করা যায়।'
'যায়। সেটা গতানুগতিক পিকনিক। আমরাই প্রথম জোছনা রাতে তেঁতুলবনে পিকনিক করে ইতিহাসে নাম লেখাব!'
'এই ইতিহাসের খবর জানবে কে?'
'গিনেস বুক অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। আমিই জানানোর ব্যবস্থা করব।'
'তারা বিশ্বাস করবে?'
'বিশ্বাস না করে ইমানহারা হবে নাকি! ওরাও আমাদের মতোই ব্যতিক্রমে আসক্ত।'
মামা যতই যুক্তি দেখান, মন থেকে মানতে পারি না। কেবলই মনে হয়_ ডালমে কুছ কালা হ্যায়।
বাজার থেকে পঞ্জিকা কেনা হলো পূর্ণিমার হদিস জানার জন্য। পিকনিকে যোগ দেওয়ার জন্য জনাদশেক লোকও ঠিক করা হয়েছে। চাঁদা দিয়ে কেউই 'উদ্ভট' পিকনিকে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক না। বাধ্য হয়ে উল্টো প্রতিশ্রুতি_ অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকে নগদ পাঁচশ' টাকা পাবে!
হাঁড়ি-পাতিল কেনা হলো, রান্নার ট্রায়াল চলে প্রতিদিন। চিফ শেফ নোমান মামাই। রান্না বলতে কী, দোকান থেকে কিনে আনা হয় বিরানির প্যাকেট। প্যাকেটগুলো পাতিলে ভরে নিয়ে আসা হয় তেঁতুলতলায়। দা-বঁটি দিয়ে কাটা হয় পেঁয়াজ, শসা, গাজর, কাঁচামরিচ। তারপর দল বেঁধে ভক্ষণ। ট্রায়াল পর্ব শেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, পত্রিকার নির্দেশনা অনুযায়ী জোছনা রাত। লাকড়ি কিনে আনা হলো, সেই সঙ্গে গোটা পাঁচেক নিরীহ মুরগি, বাসমতি চাল...। হাঁড়ি-কড়াইয়ে চামচ লেগে মনোহর শব্দ হয়!
ফাইনাল রান্নাপর্ব শুরু হওয়ার আগে দেখা গেল মহুয়ার বাবা সামাদ সাহেবকে। প্রমাদ গুনলাম, এই বুঝি সব ভণ্ডুল করে দেন। দিনের আলো ফুরানোর আগেই বুঝি কর্মকাণ্ড সারা হয়ে যায়! শুনেছি সামাদ সাহেব বাড়িতে নেই, মাসখানেকের মধ্যে ফেরার সম্ভাবনা নেই!
কিছুক্ষণ পর দেখা গেল নানাকে, সামাদ সাহেব তাকে হাত ধরে নিয়ে এলেন তেঁতুলতলায়। হতভম্ব মামা পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে আঙুল কেটে ফেললেন। দরদর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে; সামাদ সাহেবের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো কঠিন বাক্য_ 'দেখুন আপনার ছেলের কাণ্ড! বলি, বিয়ের বয়স হয়েছে সেটা আপনাকে জানালেই পারে! বিয়েটা মহুয়ার সঙ্গে হবে না ঠিকই, কারও না কারও সঙ্গে তো হবেই!'
এতক্ষণে বুঝলাম_ আসলেই বাস্তবে ভূতপেত্নী আছে_ ভূতটা মামা নিজে, পেত্নী মহুয়া! নির্দোষ পেত্নী!
মামা দাঁড়িয়ে আছেন হতভম্ব হয়ে। কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। রক্ত পড়ছে তো পড়ছেই_ টপটপটপ...! চুলায় বাসমতি চাল চড়ানো হয়েছে, সুগন্ধি ছাড়েনি এখনও।
নানা কী করবেন বুঝতে না পেরে উনুন থেকে জ্বলন্ত একটা চ্যালাকাঠ ছুড়ে মারলেন মামার দিকে। মুখে বললেন, 'গোলামের পুত, আমার মানইজ্জত ধোঁয়ার সঙ্গে উড়িয়ে দিচ্ছিস...!' চ্যালাকাঠের বাড়ি খেয়ে মামা ভূপাতিত! হয়তো পালানোর ইচ্ছা বা শক্তি কোনোটাই নেই! টি-শার্টে জ্বলে উঠল আগুন! দেখে অন্যরা যে যার মতো দৌড় লাগাল। শুধু আমি করলাম ব্যতিক্রমী কাজ_ ঝাঁপ দিলাম পুকুরে। নানা মারুন তো জ্বলন্ত চ্যালাকাঠ_ কোনো আগুনই জ্বলবে না, নিভে যাবে পানির স্পর্শে!





আফনে তো পানিতে ঝাপ দিয়া আগুন নিভাইলেন। কিন্তুক মামার কি অইল। তয় নানাজান আল্লামা শফির অবদানে তেতুল কাহিনী ঘুরায় পেচায় অনেক জায়গাই দখল করছে। তাও আমার নানাজানের বন্ধী জীবনের লাইগ্যা মাইনষে হুদাই, কি না কি যেন করে। তয় নানা জান নিজের নামের লগে আল্লাহ্ নাম কিল্লাই লাগান তার মোজেজা আমি কারও কাছ থন পাই না। আন্নের জানা থাইকলে কইয়েন। খুপরিটা একটু হালকা কইরতাম।
মজার হয়েছে
মন্তব্য করুন