ভয়ে ভয়ে বেঁচে বর্তে আছি।
যুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৪। তখনো হাফপ্যান্ট পরে বনে বাদারে ঘোরাফেরা চলে দেদারসে। এর গাছের আমটা, ওর গাছের কলাটা চুরিতেই কেটে যায় খেলার সময়। এট্টু নুলোছাপা গড়নের ছিলাম বোলে গায়ে গতরের খেলাতে কেউ আমায় দলে নিতে চাইতোনা। কৈশোরের সম্পূর্ণ দুরন্তপনা সপে দিয়েছিলাম একলা একলা নিষেধের বেড়া ভেঙে অনিয়মের খেড়োখাতায়। যুদ্ধের ডামাডোলটা তেমন একটা ছড়ায়নি তখনো আমাদের গায়ে। কেমন একটা গুমোট বাতাস বয়ে যায় শুধু। আমি প্রথম যুদ্ধের কথা শুনি বাবার মুখে। তিনি শহর থেকে ফিরলেন সপ্তার মাঝে, দাদু তখন পিদিম জ্বেলে আলোর শিখা দেখছিলেন বোধয়। আর আমি সারাদিনের শেষে বাড়িতে ঢুকে হাত পা ধুয়ে মার বকুনি খাবার জন্য তৈরী হচ্ছিলাম। বাবাকে দেখেই দাদু কিছু একটা বুঝে নিয়েছিলেন, তিনি বৌমা বৌমা বলে চীৎকার করে উঠলেন। মা তখন চা করছিলেন। তিনি দৌড়ে এলেন দাদুর গলা শুনে।
তারপর গেরামের অন্য বুড়োদের মতই তারা গলা নামিয়ে খানিকক্ষণ ফিসফাস করলেন। আমার তখন মনে হচ্ছিলো কি এমন হোলো! দাদুর চায়ের জল ফুটতো ঘড়ি ধরে, আজ তাদের মিটিঙে মিটিঙে জল শুকিয়ে উড়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। সময় যতো যাচ্ছিলো আমি ভাবছিলাম যা বাবা, আজ বোধয় বেঁচে গেলাম বকুনি থেকে। বসে বসে বইয়ের পাতা উল্টানোর ভান করছিলাম হারিকেনের আলোয়। মা আর বাবা একসাথেই ঢুকলেন ঘরে।
আমরা বাড়ি ছেড়েছিলাম মে মাসে। তারিখটা মনে নেই। বয়সের সাথে সব গুলে খেয়েচি। ওপাড়ে যখোন পৌছেছি তখোন পিসী কেবল সন্ধ্যেবাতি জ্বেলেছেন। যুদ্ধের সময়টা আমার কিন্তু ভালই কাটছিলো। দেশেতো আমার তেমন বন্ধু ছিলোনা, কিন্তু পিসাত ভাইয়েরা আমার বন্ধু হোলো। তাদের সাথেই গায়ে গতরের খেলাগুলোও খেলতে শুরু করলাম। পিসীর আদরে শরীরে মাংসও লাগলো বেশ। শুধু একটা কেটে যাওয়া ছন্দ ছিলো তখোন। গেরামে থাকতে আমি বাবার জন্য পথ চেয়ে থাকতাম প্রতি শনিবার। আর্ওখানে বাবা আর ফিরছিলেন না। বাবা আমার মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন। আর আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছিলাম বর্ধমানে।
বাড়ি ফিরে এসে দেখি সব ছাড়খাড়। বাবা বলতেন এবার থেকে একটা নোতুন দেশ পাবো আমরা। যে দেশে সবাই সবার বন্ধু হবে। কলিম চাচার ছেলে রহমান আমায় আর মালাউনের বাচ্চা বলে গাল দেবে না। বঙ্গবন্ধুর দেশে সবাই সমান হয়ে যাবে।
এবার আওয়ামীলীগকে ভোট দিয়েছিলাম। বাবার সাথে যারা যুদ্ধ করেছিলো তাদের বিচার হবে বলে হাসিনাকে ভোট দিয়েছিলাম এবার। বঙ্গবন্ধুর হারিয়ে যাওয়া দেশটা ফেরত পাবার আশায়। বাবার খুব স্বপ্ন ছিলো বঙ্গবন্ধুর দেশটাকে দেখে যাবার। তার আগেই তিনি ভেসে গেলেন গড়াইয়ের স্রোতে।
আজকাল মনে হয় বাবার স্বপ্নের সেই বঙ্গবন্ধুর দেশটাকে বোধয় আমি কখোনো বুঝতেই পারিনি। বাবার সাথে যাদের যুদ্ধ হোয়েছিলো তাদের পুলিশ ধরলো কদিন আগে। খুব খুশি লেগেছিলো শুনে। তবে যখোন শুনলাম তাদের অপরাধ, মুসলমানের নবীকে তারা অপমান করেছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তবে কি আবার চলে যেতে হবে পিসীর বাড়ি? আমার ছেলেটা কি প্রতি বিকেলে খেলার মাঠে মালাউনের বাচ্চা গালি শুনবে? মুসলমানেরা কি আবার যুদ্ধ শুরু করবে আমাদের সাথে? পুজোর সময় যদি ওদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে!






বংগবন্ধু যখন ছিলেন তখন কেউ গালি দিতো না দাদাভাই? পিসীর বাড়ি ঐ পারে কেউ বাঙ্গাল বলে গালি দিবে না দাদা ভাইকে? পৃথিবীর যে প্রান্তই ঘুরেন দাদাভাই নিশ্চিত নির্ভরতা কোথায় আছে বলতে পারবেন? গালি শুনতে হয় না এমন জায়গা পৃথিবীর কোথায় আছে? আরবে বাংলাদেশিদের দুরবস্থা জানেন? ইউরোপ এ্যামেরিকায় কালোদের - মুসলমানদের খবরতো হরদম পড়তেই পারেন।
দাদাভাই, মনে শক্তি আনুন। বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সুচাগ্র মেদিনী এ মনোভাব রাখুন। কোন শালা মালাউনের বাচ্চা বলে গালি দিলে ঘুষি দিয়ে থোতা মুখ ভোতা করে দিবেন। বাপের জীবনে যেনো কাউরে গালি আর না দেয়।
তানবীরা আপার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলছি ... এই দেশে আমার, আমাদের ... কেউ কাহিনি করলে তাকেই কাহিনি বানিয়ে দেয়া হবে।
তানবীরা আপুর মন্তব্য অদ্ভূত। লাইকাইলাম
দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সবখানেই বিভিন্ন রূপে আছে। সেটা থেকে এড়ানোর কোন উপায় নেই। যেটা করা যেতে পারে, নিজের অধিকারের কথা সকলকে জানিয়ে দেয়া। এবং, তাদের মাঝে থেকেই নিজের অধিকার আদায় করে নেয়া।
ভালো থাকুন।
সেটাই। রাজাকারদের রাজাকারির জন্য না ধরে ধরল ফালতু একটা অভিযোগে। সময়ে অসময়ে আমি নিজেও ধর্ম নিয়ে নানান প্রশ্ন তুলি। ভয়ে ভয়ে আছি, কবে না জানি জেলের ভাত খেতে হয়।
মন্তব্য করুন