ইউজার লগইন

জীবন থেকে নেয়া (টুকরো টাকরা সুখের গল্প )

ঢাকা গেলে যা দেখি তাই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে নিউমার্কেট আর গাওছিয়া যাই শুধু খাওয়ার জন্যে। কিছুই কিনি না, এ দোকান ও দোকান ঘুরি তারপর খাই, আবার খাই। হালিম, মোরগ পোলাও, শিক কাবাব, জিলাপি যা পাই তাই। একদিন কি কি অনেককিছু খেয়ে শপিং শেষ করে বেড়োতে যাবো আজিমপুরের সাইডের গেট দিয়ে, দেখি ওমা ঐখানের গেটের পাশের ছোট দোকানটায় কোণ আইসক্রীম বিক্রি হচ্ছে, সেটা খাওয়া হয়নি। বল্লাম পাশের লোককে। তিনি মহা বিরক্ত হলেন। প্রবাসীরা আমরা দেশে এলে অতিরিক্ত সচেতন থাকি। কোথায় কে আমাদের টাকা ছিনিয়ে নিয়ে উড়ে যায় সেই দুশ্চিন্তায়। আর এ ভদ্রলোকের সাথে এ ঘটনা বেশ কয়েকবার হওয়াতে তিনি মহাসতর্ক। তিনি তিক্ত গলায় বললেন, রাত বাজে নয়টা, এখন সব টাকা আমি গুছিয়ে ফেলেছি, কে কোথায় কি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কোনদিক থেকে দেখবে, গুঁতা দিবে, আইসক্রীম খেতে হবে না, চলো বাসায়। আমি বল্লাম অসম্ভব আইসক্রীম না খেলে আমি আজ রাতেই মারা যাবো। আইসক্রীম আমাকে এখন খেতেই হবে। তিনি বুঝলেন আমি আজ রাতে আইসক্রীম না খেয়ে যাবো না। দোকানে যেয়ে বললাম, আইসক্রীম দেন। আর উনি দুই পকেট সাফ সুতরো করে ঝেড়ে যা খুচরো ছিল দোকানদারের তাকের ওপর রাখলেন। দোকানদার অসীম ধৈর্য্য সহকারে সেগুলো গুনে দেখলেন মাত্র সাতাশ টাকা। বিরক্ত গলায় বললেন, আইসক্রীম পঁয়ত্রিশ টেকা। আপনেতো মাত্র সাতাইশ টেকা দিলেন। তিনি বললেন ভাই, আপনাকে পঁয়ত্রিশ টাকার কোণ দিতে হবে না। আপনি সাতাশ টাকার কোণই দেন। আপনার মেশিন, আপনার স্বাধীনতা। আপনি জোরে চাপ দিয়েন না। অল্পচাপে যতোটুকু পড়বে, ততোটুকুই চলবে। চাইলে আপনে আরো কম দেন, পঁচিশ টাকার দেন। রাত নয়টায় দোকান বন্ধের সময় কোন উটকো চাপে পড়লো ভেবে দোকানদার কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর মেশিন চেপে কোণ দিয়েই দিলেন। আজ প্রায় সাত আট বছর আগের কথা। কিন্তু এখনো সেই রাতের কথা ভাবলে, দোকানদার ভদ্রলোকের প্রথমে হতভম্ব তারপর গম্ভীর মুখখানা মনে পড়লে অজান্তেই হেসে ফেলি। কি বিপদে না ফেলেছিলাম তাকে।

আমি রান্না করতে থাকলে, কাজ করতে থাকলে মেঘ খুবই নিঃসংগবোধ থাকে। ঘুরে ঘুরে বলে মা, আমি কি করবো? আমার খুব একা লাগছে। আমি মাঝে মাঝে আমার সাথে কাজ করতে ডাকি। আলু খুলে দেয়া তার প্রিয় কাজ, পেঁয়াজ খুলতে বেশি পছন্দ করে না। সালাদ বানায়। টেবল থেকে প্লেট গ্লাস এনে রিঞ্জ করে ডিশ ওয়াসারে ঢুকায়। একদিন নিজে নিজে ডিম ভাজতে চাইলো। সব নিজে করবে, আমি যেনো না ধরি। করলো একা একা সব। গরম প্যানে তেল দেয়া থেকে শুরু করে সব। এখন এক যন্ত্রনা হয়েছে, রোজ ডে কেয়ার থেকে ফিরেই বলবে, আমি আজকে ডিম ভাজা আর ভাত খাবো। আমি একা একা ডিম ভাজি মামা? এখানে ডাক্তার সপ্তাহে তিনটের বেশি ডিম খেতে না করে। ডিম ভাজা শিখে এখন নিত্য অশান্তি।

P1070365

মেঘ সপ্তাহে একদিন ক্ল্যাসিক্যাল ব্যালেট শিখতে যায়। ব্যালেট আমাদের দেশের নাচের কায়দা থেকে পুরোই আলাদা। তারপরও এখানে বৈশাখী কিংবা বিজয়া, স্বরস্বতী পূজার অনুষ্ঠানে নাচের ডাক আসলে বাংলা কিংবা কখনো কখনো হোলি দিওয়ালিতে হিন্দী নাচ শেখানোর চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে চেষ্টা কিছুটা উতরায়। এবার মনে হলো কিছুটা উতরেছে। মেঘের নৃত্যকান্ড

399022_210082155768338_209920182451202_325958_292986166_n

ডাচ বাচ্চাদের জন্য সাঁতার জানা বাধ্যতামূলক। সমুদ্রপৃষ্ঠের নীচের দেশের লোকদের প্রতিনিয়ত পানির সাথে লড়াই করে এক সময় বেঁচে থাকতে হতো। এতোদিন সরকার অনুদান দিতেন স্কুল থেকে বাচ্চাদের সাঁতারে নিয়ে যাওয়া হতো। এখন সরকার অর্থনৈতিক মন্দার ভাব ধরে ক-স-ট কাটিং করছেন সবকিছুতে। সাঁতার শিখতে হবে তবে স্কুল আওয়ারে আর নয়, অবশ্যই সরকারি পয়সায় নয়। বাবা – মাকে নিজের পয়সায় স্কুলে টাইমের বাইরে করাতে হবে। মেঘ বেসিক সাতার আগেই শিখেছিলো। চৌদ্দ তারিখে নৃত্য দিয়ে পনেরো তারিখে বেসিক প্লাস সাঁতারের পরীক্ষা দিয়ে ডিপ্লোমা নিয়ে আসলো। এখন রেস ক্যু টিমের সাঁতারে যাচ্ছে। কাপড় টাপড় পড়ে সাঁতার করে, কেউ ডুবে গেলে কি করে টেনে আনবে, ঝড় বৃষ্টিতে কি করে সাহায্য করবে অন্যদেরকে, সে ক্লাশ করছে। ভাবি ঘরে বসে বসে টিভি দেখবে, নড়বে না চড়বে না, থাক। সাঁতারের উছিলায় নড়ুক চড়ুক।

P1070446

P1070402

নেদারল্যান্ডস মানেই সাইকেল। দেড় কোটি জনগনের এক কোটি সত্তর লক্ষ সাইকেল। বাচ্চারা একটু বড় হলে সাইকেল নিয়ে বের হয়। ট্রাফিক আইন জানা থাকা নিতান্ত জরুরী। স্কুলে প্রথমে থিওরি শিখায় ক্লাশ টুতে। তারপর টিচাররা সাথে নিয়ে রাস্তায় বেড়িয়ে হেঁটে প্র্যাক্টিকাল করায়। হাটার বেসিক রুল জানার পর সাইকেল। এরপর ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত ধাপে ধাপে প্র্যাক্টিস করানোর পর আসে পরীক্ষা। স্কুলে সাইকেল নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ডিপ্লোমা নিতে হয়। ষোল তারিখে ময়না পাখি সাইকেল ডিপ্লোমা পেলো। এক নৃত্য ছাড়া কোনটাতেই মা-বাবা সাহায্য করিনি। তারপরো সে নিজে নিজে সব করে এসে মাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি কি তোমাকে একটু প্রাউড করেছি মামা?

P1070458

অনেক কষ্টাকষ্টির দিনের মধ্যে এগুলো হলো এক টুকরো সুখের ছায়া, বন্ধুদের ছাড়া আর কার সাথে ভাগ করবো এগুলো?

তানবীরা
০২/০৫/২০১২

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


খুব ভাল লাগলো আপনার টুকরো টাকরা সুখের গল্প।

আসলে আপনে যাই লেখেন তাই ভাল লাগে,
আপনের লেখায় একটা কিছু আছে যা মন ভাল কইরা দেয়।
মন খারাপ করা লেখা হলেও ভাল লাগে,
মন একটু উদাস উদাস হয়েও যায় সেটাও ভাল লাগে।

মেঘের জন্য অনেকগুলা কনগ্র্যাটস!
ও বড় হতে হতে ওর মায়ের মত হোক-
আর ওর মনটা আকাশের মত সুন্দর থাকুক সারা জীবন।

ভাল থাকুন, সুপ্রিয় তানবীরা'পু। অনেক ভাল, সব সময়।

তানবীরা's picture


আসলে আপনে যাই লেখেন তাই ভাল লাগে,
আপনের লেখায় একটা কিছু আছে যা মন ভাল কইরা দেয়।
মন খারাপ করা লেখা হলেও ভাল লাগে,
মন একটু উদাস উদাস হয়েও যায় সেটাও ভাল লাগে।

এহেম এহেম। ঠিকাছে, দেশে আসলে আমাকে এক ঠোঙা ঝাল্মুড়ি খাইয়ে দিও। রবীন্দ্রসরোবরে উন্নতমানের ঝালমুড়ি পাওয়া যায় Tongue Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ঠিকাছে, পা..! Smile

নিওয়ে,
এত ভাল ভাল কথা বলার পর আবার আমিই ট্রিট দেওয়া টা কি ঠিক হইব?! Tongue

এদিকে তো ইগলু কোম্পানি নতুন আইসক্রিম আনছে বাজারে,
বেলজিয়ান চকোলেট সম্বলিত ইস্পিশাল কোণ! Wink

আমি আইসক্রিম ভালু পাই, আর কিছু নাই বা বললাম!! Big smile

তানবীরা's picture


ভালো কথা বলছো বলেইতো ভালো ট্রিট দিবা। আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড় হবে।

আইসক্রীম ফ্যাট, মুড়ি স্বাস্থ্যকর Big smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


কইসে আপ্নেরে!! Stare

গ্রিফিন's picture


এইখানে কি তানবীরাফা কারে কারে কি কি খাবাইবে সেইডির লিস্টি হৈতেছে? তাইলে আম্মো লিস্টি দিয়া যাই। আমি সব খাই জল-পানি-ওয়াটার Tongue স্থলের কিছুও বাদ্দেই না Wink হাওয়া বাতাসো খাইয়া থাকি Laughing out loud

তানবীরা's picture


না মূর্খ গ্রিফিন, এখানে তানবীরা আফারে কে কি খাওয়াবে মানে নাজরানা দিবে তার আলাপ হচ্ছে। তুমি কি খাওয়াবে বলে ফেলো?

কৎবেল আনতে পারবা?

প্রিয়'s picture


লেখা পড়ে আমার এখন ব্যালে ডান্স শিখতে ইচ্ছা করতেসে।মেঘকে অনেক অনেক কংগ্র্যাটস। Smile

তানবীরা's picture


ব্যালে কিন্তু মজা আছে, ট্রাই করতে পারো ইউটিউব দেখে। থ্যাঙ্কস Smile

১০

মিশু's picture


আপনে তাইলে সুখী, সুমিতদা এর সাথে যোগাযোগ করেন, তিনি মহিলাদের সুখ বিষয়ক সম্পাদক এবি এর Tongue

১১

তানবীরা's picture


আমিতো সুখী, আমার কি দরকার! সম্পাদকরে যোগাযোগ করতে বলো বরং

১২

আরাফাত শান্ত's picture


শুভকামনা থাকলো যেনো(
বিশ্ব উদ্ধার করবেন একদিন!

১৩

তানবীরা's picture


বিশ্ব উদ্ধার করবেন একদিন!

আইচ্ছা, মামা - ভাগনী যেখানে
বিপদ নাই সেখানে

১৪

ফাহমিদা's picture


মেঘ মামনি মামা কে অনেক প্রাউড করেছে, তাই না আপু?
অনেক অভিনন্দন আর আদর অলরাউন্ডার আম্মুটার জন্য

১৫

তানবীরা's picture


:bigsmile

থ্যাঙ্কু

১৬

এ টি এম কাদের's picture


সুন্দর লেখা । বাচ্চাদের জন্য অনেক অনেক স্নেহ-আদর । আসলেই তারা আপনাকে প্রাউড করেছে ।

১৭

তানবীরা's picture


ধন্যবাদ। ভালো আছেন?

১৮

লিজা's picture


মিষ্টি মেয়ে তোমার আপু । অনেক গুনী । আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার মেয়েতো বড় একদিন হবে, ওকে কিভাবে সামলাবো । ঠিক কোনটা ওকে দেবো আর কি দেবোনা । Puzzled । বাচ্চাকে বড় করা বেশ কঠিন একটা দায়িত্ব মনে হয় ।
মেঘের জন্য অনেক আদর আর দোয়া Smile

১৯

তানবীরা's picture


এখন এতো ভেবো না লিজা। সময় সব শিখিয়ে দিবে Laughing out loud

২০

শওকত মাসুম's picture


সুখ টুকরো টুকরো হয় বলেই তো বার বার ভাল লাগে

২১

তানবীরা's picture


Big smile

২২

সামছা আকিদা জাহান's picture


তানবীরা আমি আকিদা রুনা। কি কারনে যেন লগ ইন করতে পারছি না Smile তুমি তো দেশের বাইরে থাক তোমার তো এমন হবেই আমি যে এই খান থেকে ঢাকায় গেলেই ভাত ভুলে যাই বাসায় খাই ই না। বেশ মোটা অংকের টাকা শুধু বিভিন্ন দোকানের খাবার চাখতেই শেষ হয়ে যায়।

২৩

তানবীরা's picture


ঠিক, ঢাকার পোড়া মবিল দিয়ে ভাজা সিঙ্গারা না খেলে জীবন বৃথা Sad

২৪

সামছা আকিদা জাহান's picture


তোমার মেয়ে তো বেশ মিষ্টি। আচ্ছা জুতা পরে পানিতে ভাসছে কিভাবে? আমার পা তো এমনিতে আগেই দুবে যায়:০

২৫

তানবীরা's picture


তুমি রোজ ট্রেনিং দাও, তুমিও ভাসবা ডিয়ার Big smile

২৬

মেসবাহ য়াযাদ's picture


সুখ জিনিসটা অন্যের সাথে ভাগ করতে পারলে ভালো লাগে। সেটা টুকরোই হোক আর জোড়া লাগানোই হোক। সুখ ইজ সুখ।
তোমার জীবনটা এরকম টুকরো টুকরো সুখে ভরে থাক। মামনীটা ভালো থাকুক

২৭

তানবীরা's picture


একদম দাদাভাইয়ের আর্শীবাদ। মাথায় যেনো সব সময় এভাবেই হাত পাই Smile

২৮

লাবণী's picture


আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে--------------- Day Dreaming
আপনার জীবনটা এমন আরো অনেক টুকরো টুকরো ভরে উঠুক---- Smile

২৯

তানবীরা's picture


Big smile

৩০

লীনা দিলরুবা's picture


মামণীটা মানুষের মত মানুষ হোক...

৩১

তানবীরা's picture


ধন্যবাদ Big smile

৩২

সাঈদ's picture


মা মেয়ের এত গুন - এমন পরিবারই তো খুজছিলাম Tongue Tongue

৩৩

তানবীরা's picture


খুঁজেতো পেলেন এখন কি খাওয়াবেন খাওয়ান Tongue Tongue Tongue

৩৪

সুদূরের পিয়াসী's picture


আপনার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে । শুভকামনা আপনি ও আপনার পরিবারের জন্য ।

৩৫

তানবীরা's picture


শুভকামনা আপনার জন্য ।

৩৬

জ্যোতি's picture


লক্ষী মেয়ে মেঘসোনা। টুকরো টুকরো সুখেই যেনো জীবন ভরে থাকে আপনাদের, সবার।

৩৭

তানবীরা's picture


জ্যোতি কোথায় হারিয়ে গেছিলা? ভালো আছো?

৩৮

একজন মায়াবতী's picture


মেঘলার জন্য অনেক অনেক জাতা গো জাতা অপেক্ষা করছে Big Hug

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

তানবীরা's picture

নিজের সম্পর্কে

It is not the cloth I’m wearing …………it is the style I’m carrying

http://ratjagapakhi.blogspot.com/