ইউজার লগইন

খোলা চিঠি.....

শুরুর কথাঃ এই লেখাটা একটি চিঠির অংশ বিশেষ,কোন প্রিয় কাউকে লেখা। কিন্তু এর মূল অংশটা আমি সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিলাম......
________________________________________________________________________________

গতকাল রাতে (১৩ই জুলাই,২০১০ইং) বাসায় আসলাম সুনামগঞ্জ থেকে। শনিবার রাতে গিয়েছিলাম। সুনামগঞ্জে আমার এবারের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি কিছুটা ভিন্ন হলেও নতুন নয়, বরং অনেক পুরোনো অনুভূতিগুলো নতুন রূপে দেখা দিয়েছে....

গত সপ্তাহে যখন ওখানে যাই তখন মাথায় প্রথম চিন্তাই ছিল যে সকালে যেয়ে আমাকে কী কী কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে আর কত দ্রুত কাজ শেষ করে ফিরে আসব।তবে নতুন কোন স্থানে যাওয়ার মাঝে যে সুক্ষ্ম উত্তেজনা থাকে তা যে ছিল না তা বলবো না। বয়স হয়ে গেলেও সব অনুভূতি তো আর মরে যায়নি,তাই না?

গতবার যখন প্রথম সুনামগঞ্জে প্রবেশ করি তখন মাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। শহরটা তখন প্রায় ১ ঘন্টার পথ ,প্রায় ৬০ কিমি বা তার কিছুটা বেশি হবে হয়তো। সরু ও ভাঙা রাস্তার দু'পাশেই শুধু পানি আর পানি।এরমাঝেই বিছিন্ন দ্বীপের মত সব জন বসতি।কোথাও কোথাও এই বিশাল জলরাশির মাঝে দু'একটা গাছ হয়ত মাথা উঁচু করে দাঁডিয়ে রয়েছে।আরও আছে ছোট বড় মাছ ধরার বা মানুষ পারাপারের নৌকা।এই পানির গভীরতা আর শেষ সীমানা যে কোথায় তা আন্দাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব না।

ভোরের আকাশটা তখন ছিল খন্ড খন্ড মেঘের ভেলায় পরিপূর্ণ। ভোরের আলো সেই মেঘের মাঝ থেকে আলো ফেলছে অবারিত জলরাশির ওপর। আর দূরে,অনেক দূরে মেঘের মাঝ থেকে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের আভা। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য অবশ্য আমার সারা রাতের ক্লান্তিকে জয় করতে পারেনি। তাই খানিক পরই আমি ঘুমিয়ে পরি যা ভাঙে শহরে প্রবেশের পর।

শহরে যখন সকালে রিকশা নিয়ে বের হয় আমার গন্তব্যের পথে তখনকার অনুভূতিটা আমার খুবই পরিচিত,যদিও অনেকদিন পর সেটার স্বাদ পেলাম; যা আমাকে কিছুটা হলেও খোঁচাচ্ছিল। ছোট্ট শহরটার ছোট ছোট পিচঢালা রাস্তা আর ছোট ছোট বাড়ি আর ফাঁকে ফাঁকে খালি জমি,গাছপালা আর পুকুর আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল আমার প্রিয় শহর বরিশালের কথা। তাই সেই অচেনা শহরটা আর আমার অচেনা লাগছিলনা।তবে নতুনকে ভাল করে চেনার চেষ্টাটা বন্ধ ছিল না, ছিল না অল্প অল্প করে শহরটাকে আপন করে নেবার চেষ্টা।

সেদিন দুপুরের মাঝেই আমাদের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় সবাই চলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই।যদিও সবার ইচ্ছে ছিল আরও কিছুটা সময় ঘুরে কাটানোর,কিন্তু শেষ পর্যন্ত সময়ের অভাবে হয়ে উঠল না।

ফেরার সময়টা ছিল ভর দুপুর। প্রচন্ড রোদ সেদিন। এর মাঝে বাসে আবার একই পথে যখন ফিরছি তখন সেই নতুন পরিচিত রাস্তাটা আবারও নতুন করে দেখা দিল। এবার আকাশটা প্রচন্ড নীল,যেন কোন সমুদ্র; আর তার মাঝে শাদা শাদা মেঘগুলো যেন ভাসছে। দূরের পাহাড় গুলো সেই মেঘের মাঝ থেকে আরও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠেছে।আর সূর্যের তীব্র আলো মেঘগুলোকে করে তুলেছে আরও উজ্জ্বল;মাঝে মাঝেই যা ঘন কোন মেঘের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে আবার উকি দিচ্ছে। নিচের পানি এখন তীব্র আলোতে ঝলমল করছে। নৌকা আর মানুষের কর্মকান্ড এখন অনেক বেশি সেখানে। দূরের অনেক দূরের প্রান্তহীন পানির ভিতর থেকে জেগে উঠা মেঘ আর পাহাড় গুলোর সৌন্দর্যের প্রকৃত বর্ণনা করা আমার পক্ষে আসলেই কঠিন। এই অন্তহীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবেশে আমার ক্লান্ত চোখ দুটো কিছুক্ষনের মাঝেই জড়িয়ে যায়...

এবার আবার যখন সুনামগঞ্জ যাই তখন আমার মন কিছুটা বিষণ্ণ.....আর সেদিনের মত যখন অনেক ভোরে সেই রাস্তায় প্রবেশ করি তখন সম্পূর্ণ আকাশটাই যেন আমার মনের মত বিষণ্ণ...মেঘের রঙ আর ঘনত্ব এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দু'পাশের পানির উচ্চতাও কিছুটা বেড়েছে ।দূরের পাহাড়টাও ভাল ভাবে বোঝা যাচ্ছেনা। রাস্তাটাও সম্পূর্ণ ভেজা। হয়ত কিছু আগেই কিংবা সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে; আবার হয়ত এখনি আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পরতে শুরু করবে.....

সারাদিনই কাটলো খুবই বিরক্তিকর। সিভিল সার্জনের অফিসে একটা কাগজ বের করতেই দুপুর হয়ে গেল। সিভিল সার্জনের একটা স্বাক্ষরের জন্য চার ঘন্টা অপেক্ষা আর তারপর স্বাক্ষরের বিনিময়ে নির্লজ্জভাবে সন্মানির নামে ঘুষ দিতে বাধ্য হতে কারই বা ভাল লাগে!!!??

চারটার দিকে সাথের জনকে নিয়ে বের হলাম ঘুরতে।কিন্তু কোথায় যাব জানি না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সাথের জনের যেখানে পোস্টিং সে যায়গাটা ঘুরে আসব; যেহেতু শুনে ছিলাম সেটা শহর থেকে কাছেই। তাই রিকশাও নিয়ে বের হয়ে গেলাম। সারা দিন বৃষ্টি না হলেও রিকশাতে উঠার কিছুক্ষণ পরেই শুরু হল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। এর মাঝে প্রধান সমস্যা হয়ে উঠলো রিকশাওয়ালা সে যায়গা না চেনা আর মানুষ জনের উল্টা-পাল্টা দিক নির্দেশনা। আধা ঘন্টা এরকম শরতলির গ্রামের মাঝে চক্কর দিতে দিতে শুরু হল প্রচন্ড বৃষ্টি।তাই বাধ্য হলাম একটা চায়ের দোকানে আশ্রয় নিতে। সেখানে আমাদের গন্তব্য সম্পর্কে সত্যিকারের ধারণা পেয়ে আবার শহরে চলে এলাম। এবার গন্তব্যের পথে আমাদের বাহন টেম্পু। আমাদের পথ প্রায় ৮ কিমি অথবা তারও বেশি, সেই পুরনো পথে। পুরোটা পথই প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। আমরা যখন টেম্পু থেকে নামলাম তখন বৃষ্টির প্রকোপ কিছুটা কম। হাইওয়ে যেমন হয় পুরোটা রাস্তারই দু'পাশ ফাঁকা। এর মাঝে একটা টং এর দোকানে আশ্রয় নিলাম বৃষ্টি জন্য। সেখানে অপেক্ষা করার সময় উপভোগ করছিলাম বর্ষার রূপ। প্রচন্ড বৃষ্টিতে হাওরের রূপ অসাধারণ। বৃষ্টি একটু কমলে আমরা ঢুকে পরি গ্রামের মাঝে।বৃষ্টিস্নাত গ্রামের সরু পথ আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মাঝে শেষ কবে হেঁটেছি মনে করতে পারিনি। কিন্তু অনুভূতিটা ছিল পুরনো ,যা আমাকে বার বারই নিয়ে যাচ্ছিল আমাদের সেই পুরনো দিনগুলোতে যা মনটাকে বিষণ্ণ করে দিচ্ছিল।কিন্তু তা আমার ভেতরেই ছিল।প্রকাশ পায়নি আমার সাথীর কাছে।

গ্রামের ভিতর কিছু দূর যেতেই কর্দমাক্ত পথ আর সেই পানির প্রবাহ আমাদের থামিয়ে দেয়। এর মাঝেই আমরা যে কমিউনিটি ক্লিনিকটা খুঁজে পাই সেটা সম্পূর্ণ পানির নিচে,সেখানে যাওয়ার কোন পথই নেই। কিন্তু এটা আমাদের লক্ষ্য ছিল না। আমরা আবারও ভুল পথে এসেছি বুঝলাম। ওখানকার কয়েক জনের সাথে কথা বলে বুঝলাম আমাদের হাইওয়েতে আর এক কিমি হেঁটে মূল জায়গায় যেতে হবে।অবশেষে হাইওয়েতে হেঁটে হেঁটে মূল লক্ষ্যে পৌছালাম। আর গিয়ে যা দেখলাম তা ছিল বড়ই হাস্যকর। যে ইউনিয়ন সেন্টারে আমার সাথির পোস্টিং সেটা হাইওয়ে থেকে এক-দেড়শ গজ দূরে পানির মাঝে একটি দ্বীপের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেখানে পৌছাতে হলে আমাদের সাঁতরে যাওয়া ছাড়া আর কোন ঊপায় দেখলাম না!!!

ওখান থেকে ফেরার পথে একবার ভাবলাম এবার আমার যেখানে পোস্টিং সেখানে যাই। কিন্তু আমার যেখানে পোস্টিং সেখানে যাওয়ার যে বর্ণনা আমি শুনেছি তাতে আর সাহস করে উঠতে পারলাম না। আমার পোস্টিং যেখানে সেখানে যেতে হলে যেসব বাহন লাগবে তা হল রিকশা ৩০ মিনিট, নৌকা বা ট্রলারে নদী পার হওয়া ১০ বা ২০ মিনিট , এরপর মটর সাইকেলে আরও ২০-২৫ মিনিট।আর আমি যে খোঁজ পেলাম তাতে জেনেছি যে ওটা আপাততঃ পানির নিচে আছে। আমাকে হয়ত ওখানে স্কুবা ডাইভ করে যেতে হবে......

সেদিন রাতে ছিল ওয়ার্ল্ডকাপ এর ফাইনাল খেলা। প্রচণ্ড ঘুমের চোখে খেলা দেখেছি হোটেলের কর্মচারীদের সাথে। খেলা শেষ হতেই রুমে ফিরে ঘুম। এবারই প্রথম আমি আর সব অনুষ্টান দেখলাম না।যাইহোক এরপর দিন সকালে টিএইচও কে বললাম আমাদের অভিজ্ঞতা ,সাথে চলে যাওয়ার কথা। সে আমাদের জন্য বাসা দেখেছে জানাল। আমরাও আগামি মাস থেকে ওখানে উঠে যাব বলে চলে আসলাম।

আবারও ফেরার পালা।এবারও গতবারের মত ভিন্ন রূপ আকাশের।থম থমে আকাশ,পুরু মেঘে ঢাকা। যখন হাইওয়েতে ঊঠলাম তখন সে পরিচিত রাস্তা আবারও নতুন রূপে ধরা দিল। দু'পাশের অবারিত পানির ওপর দূরে ,অনেক দূরে কাল কাল মেঘ জমেছে আর পিছনে নিলচে কাল পাহাড়গুল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে । এরই মাঝে চলচে মানুষের দৈনন্দিন কর্মকান্ড। একজায়গাতে অনেক গুলো হাঁস দেখলাম পানিতে সাঁতার কাটছে,প্রায় দু'তিনশ হবে হয়ত। অভূতপূর্ব দৃশ্য। এরমাঝেই শুরু হল আকাশের ভেঙে পরা পানিতে...এমন বৃষ্টি যে এবার কিছু দূরের সবকিছুই আবছা হয়ে উঠেছে। পিছনের দূরের নিলচে-কাল পাহাড়গুলোও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।আমিও ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছি দূরে, আরও দূরে......

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

শাওন৩৫০৪'s picture


ভ্রমনুভুতির সুন্দর বর্ণনা, ভালো লাগলো---

তানভীর's picture


ধন্যবাদ....এত্ত কষ্ট করে পড়েছেন....

মীর's picture


বর্ণনা অদ্ভুত। অতি অদ্ভুত।

তানভীর's picture


ধন্যবাদ...আপনার কমেন্টটা আমাকে অনুপ্রাণিত করলো....

টুটুল's picture


অদ্ভুত...
ধইন্যা Smile

তানভীর's picture


ধন্যবাদ টুটুল...রমজান মাসে ধইন্যা খুব কাজে লাগবো....হাহাহাহাহা।

শওকত মাসুম's picture


বাহ, দারুণ। চমৎকার বর্ননা। পোস্টিং তাইলে এতো দূরে?

তানভীর's picture


মাসুম ভাই, কষ্ট করে আমার লেখাটা পড়েছেন বলে ধন্যবাদ। পোস্টিং অনেক দূর,তার ওপর সব থেকে বিরক্তিকর বিষয় হল,কোন কাজ নাই....হাহাহাহা

pothjananai's picture


Bori: Its really a vivid representation of a nice peregrination. Five years ago I have travelled every remote area of Sylhet division except Sunamgonj town. I was at Jauoabazar which is in proximity of Sunamgonj town. As a whole Sylhet division is teem of natural flora and fauna. But the attitude of the general people to the Non-sylheti's is sometimes awful.

১০

তানভীর's picture


চান্দুঃ Cool তোমার কথা একদম ঠিক। বিশেষ কইরা ওদের কথা বার্তা কেমন জানি...যাউগ্যা, তোমার খবর কিতা, ফেইসবুকে নাই কেন???

১১

তানবীরা's picture


ভ্রমনুভুতির সুন্দর বর্ণনা, ভালো লাগলো---

কোন কাজ না থাকাই ভালো, এধরনের আরো দু চারটে ব্লগ ঝটাঝট লিখে ফেলেনতো

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

তানভীর's picture

নিজের সম্পর্কে

আমার একটাই দোষ...আর সেটা হল আমার রাগ...অকারনে আমার প্রচন্ড রাগ হয়, যে জন্য আমি নিজেই নিজের ওপর রেগে আছি....বর্তমানে নিজের রাগ কমানোর উপায় খুজছি...আপনাদের কোন উপায় জানা থাকলে অবশ্যই জানাবে...