আমার চাকুরী জীবন
ইত্তেফাকে বিজ্ঞাপণ দেখে হঠাৎ করে দরখাস্ত করে বসলাম। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে ইন্টারভিউ কার্ড হাতে এল। লিখিত আর মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকুরীটা পেয়ে গেলাম। পোস্ট ছিল মেডিকেল-কাম সেলস রিপ্রেজেনটেটিভ। পোস্টিং চিটাগাং। ৯০ সালের গোড়ার দিকের ঘটনা। ঢাকার বন্ধুদের আড্ডার মায়া ছেড়ে জীবনের প্রথম চাকুরীতে জয়েন করলাম। আমার অফিস ছিল আইস ফ্যাক্টরি রোডে। কাজের এলাকা ছিল- তিন পার্বত্য জেলা। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি আর বান্দরবান। চট্টগ্রামে থাকতাম স্টেডিয়ামের উল্টোদিকের বাংলা হোটেলে। মাসিক ভাড়ায় একটা ডাবল রুম নিয়ে থাকতাম। সে হোটেলে তখন অনেকগুলো পত্রিকার ব্রাঞ্চ অফিস ছিল। জানিনা, বাংলা হোটেলটা এখনও আছে কিনা ? দেশে তখন উত্তাল অবস্থা। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। অবশেষে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লো ডিসেম্বরের ৬ তারিখ। আমি চিটাগাং ছাড়লাম জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। ঢাকা এসে ছাড়লাম চাকুরীটা। পেছনে পড়ে রইল প্রিয় সহকর্মী জিল্লু, মেহেদী আর রেজা। জিল্লু এখনও সেই কোম্পানিতে। ফেনীতে আছে। মেহেদী বর্তমানে নিজে একটা মিনারেল ওয়াটার কোম্পানির মালিক। ঢাকায় থাকে। আর বিরাট বড় নামের রেজা (ওয়াজির মাহমুদ শাহান রেজা) অনেকদিন থেকে বেক্সিমকোতে। ঢাকায় আছে।
৯১ সালের মার্চ মাসে আবারও জয়েন করলাম চাকুরীতে। ঢাকায় ১০ দিনের ট্রেনিং শেষ করে চলে গেলাম নিজ জেলা লক্ষীপুরে। বছরখানেক সেখানে কাজ করলাম। তারপর ৯২ সালের জানুয়ারিতে প্রমোশন দিয়ে আমাকে ঢাকায় বদলী করা হল। ঢাকায় এসে অনেকগুলো সহকর্মীর সাথে আমার সখ্যতা হল। তাদের মধ্যে হাফিজ, রোজারিও, লিটন, সালাহউদ্দিন, মোয়াজ্জেম, শাহীন, শামীম আর জাহিদ অন্যতম। এ চাকুরীটাও বেশিদিন করা হয়নি। ১৯৯৩ সালের মার্চে আমরা পুরো দল জয়েন করলাম নতুন একটা কোম্পানিতে। এ কোম্পানির অফিস ছিল মতিঝিল সেনা কল্যাণ ভবনে।
৯৩ থেকে ৯৮ সাল নাগাদ ছিলাম এ কোম্পানিতে। এরপর আবার কোম্পানি বদল করলাম আমরা পুরো দল। এবারের অফিস মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে। আমরা সবাই জয়েন করলাম এরিয়া ম্যানেজার হিসেবে। বেতন ভাতাও মন্দ ছিল না। সবার পোস্টিং ছিল ঢাকায়। এরপর হঠাৎ করেই ২০০০ সালের দিকে আমাদের দলছুট করা শুরু হল। আমাকে পাঠানো হল মৌলভীবাজার। থাকতাম শ্রীমঙ্গলে। অন্যদের একে একে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হল। ২০০১ নাগাদ আমরা সবাই একে একে চাকুরী ছাড়া শুরু করলাম। আমাদের গ্রুপের ২/১ জন রয়ে গেল। আমি ছাড়লাম ২০০১ সালের মার্চে।
তারপর...। কিছুদিন একটা সাইবার ক্যাফেতে। কিছুদিন মামার ইন্ডেন্টিং ব্যবসা দেখাশুনা। কিছুদিন নির্ভেজাল বেকার ছিলাম। ক'বছর পত্রিকার সাথে কাটিয়ে অবশেষে ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে জয়েন করলাম বর্তমান চাকুরীতে। ৯১ সালের সেইসব সহকর্মীদের মধ্যে পাবনার হাফিজ কোথায় জানিনা। ঢাকার জন পিডি রোজারিও গোডরেজ কোম্পানিতে। লিটন জেরাল্ড কস্তা একটা ল্যাপটপ কোম্পানিতে। সালাহউদ্দিন খোকন ওয়ারিদে। বরিশালের জাহিদ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২০০৭ সালে। শাহীন কাজ করে প্যরাসুটে। মোয়াজ্জেম আর শামীমের সাথে যোগাযোগ নেই অনেকদিন।
বর্তমান অফিসে প্রায় ৬ বছর ধরে আছি। মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। টোটাল পাবলিক রিলেশনটা দেখি আমি। আমার সাথে মিডিয়া রিলেটেড লোকজনের বেশ খাতির। এটা আমাদের এ অফিসের সিনিয়র ২/১ জন কলিগের পছন্দ না। গেল বছরগুলোতে যতজন সুহৃদ সহকর্মী পেয়েছি- তারচেয়ে অনেক বেশি খারাপ সহকর্মী পেয়েছি। যারা আমাকে ঈর্ষা করে। আমার রিপোর্টিং বস হচ্ছেন খোদ এমডি। আমাকে ঈর্ষা করা বা আমার ক্ষতি করতে চাওয়ার সেটাও একটা কারণ। এতদিন সেটা সহ্য করেছি আমি। ইদানীং বিষয়টা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। সম্প্রতি অফিস থেকে পুরাতন দায়িত্বের পাশাপাশি আমাকে নতুন করে কাস্টমার কেয়ারের দায়িত্বটা দেয়া হয়েছে। এটা আমার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসের বেশ উর্ধ্বতন এক ব্যক্তি, যার মত বদ লোক আমার জীবনে খুব বেশি দেখিনি আমি। আমার সব কিছুতে এই ব্যাটা নাক গলাতে শুরু করে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমার। নিতান্তই অনিচ্ছায় তার সাথে সরাসরি বিরোধে জড়িয়ে পড়ি। এক পর্যায়ে অব্যাহতি পত্র পাঠিয়ে দেই এমডির কাছে।
এতে দেখি হিতে বিপরীত হল। আমার রেজিগনেশন গ্রহণ না করে এমডি আমার বেতন বাড়িয়ে দিলো। মানসিকভাবে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আর পারছিনা। চাকুরিটা আমি ছেড়ে দেবার ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তার আগে দুটো কাজ করতে চাই।
১. নতুন একটা চাকুরী যোগাড় করা
২. অসভ্য সহকর্মীকে একটা স্পেশাল শিক্ষা দেয়া...





বয়সের এই পর্যায়ে বউ বাচ্চা ওলা মানুষ হয়ে চাকরী ছাড়ার ব্যাপারটা কিভাবে দেখেন? মানে আপনার ফিলোসফি কি বলে? আমিও চাকরী ছেড়ে দেশে চলে যেতে চাই কিনা তাই জিজ্ঞেস করলাম।
যতক্ষণ পর্যন্ত মানিয়ে চলা যায়, ততক্ষণ। বৌ-বাচ্চা আছে বলেইতো এখনও আছি। নইলে ইস্তফা পত্রের নিকুচি করে কখন সব ছেড়ে-ছুড়ে বাসায় চলে যেতাম।
বিদেশ থেকে চাকুরী ছেড়ে আসার ব্যাপারটা ভিন্ন। দেখে-শুনে-ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।
থ্যাংকু।
মেসবাহ ভাইয়ের মতো একই ঝামেলায় আছি। দুই বছর আট মাস ধরে এখানে কাজ করছি। লাস্ট চার-পাঁচ মাস নতুন ইডি আইসে জান ঝালাপালা করে ফেলসে।
আমি অবশ্য আপনার মতো অতো ভদ্র না। অফিসে ঘোষণা দিয়ে রাখছি, যেকোন সময় জুতাপেটা করবো হারামীটারে।
পুরান জুতা লাগলে কৈয়েন...
যেখানে হারাবার কিছু থাকে না, সেখানে বেপরোয়া হয়ে মজা করলে কেমন হয়?
আপনার যেহেতু চাকরিটা ছেড়ে দেবারই প্ল্যান। তাহলে ওইসব কর্মকর্তাদের সাথে উচিত ব্যবহারটুকু করে দিলেই তো হয়। নাক গলালে সোজা বাংলায় বলে দেন, ফারদার নোংরা নাক গলাতে আসবেন না। দরকার হলে আঙ্গুল বাকা করেন। যেহেতু আপনার হারাবার কিছু নেই চাকরিটা থেকে। আর যেহেতু আপনার রেপুটেশন ভাল কোম্পানীতে।
আর একটা কথা,
আপনার ওইসব সহকর্মীরা জেলাস হয়ে আপনার সাথে এইসব উল্টাপাল্টা ব্যাপার ঘটাচ্ছে কেন? হয়ত আপনি তাদের উদ্দ্যেশ্য সফল করে দিয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। তাতে করে তাদের শিক্ষা দেবার চেয়ে কিন্তু পুরস্কার দেয়া হয়ে যাবে মনে হয়।
বেপরোয়া হয়ে মজা করার চেষ্টা করছি। লোকটার মুখোশ উন্মোচন করতে চাই, সবার কাছে। ইতোমধ্যে এমডির কাছে অনেক কিছু জানিয়েছি। এমন নির্লজ্জ, বেহায়া আর পার্সোনালিটিহীন লোক জীবনে কম দেখেছি। কেউ পাত্তা না দিলেও এই ব্যাটা সব জায়গায় নাক গলায়। পদে বড় বলে কেউ তার সাথে ঝামেলায় যেতে চায় না। আমিই প্রথম তার কাজের প্রতিবাদ করলাম। এটা তার পছন্দ হয়নি। নানা ভাবে আমাকে অফিসিয়ালি 'দেখে' নেবার চেষ্টায় আছে ব্যাটা। সরাসরি আমার সাথে বিরোধে জড়াবার মত সৎসাহস নেই তার। আমিও শেষটা দেখার অপেক্ষায়...
চালিয়ে যান, ওই লোকের রেপুটেশনই খারাপ হয়ে যেতে বাধ্য যদি আপনি টিকে থাকতে পারেন। হয় সে নিরব আপোষে আসবে নাহয় মচকে যাবে। আপনার যেহেতু কিছুই হারাবার ভয় নেই, সো লেটস ফাইট। বাঘের উপরে টাগ মেসবাহ য়াযাদ হয়ে ব্যাটাকে বুঝিয়ে দেন কত ধানে কত চাল।
সাহস পাইলাম। ইদানীং ব্যাটা চুপসাইয়া গেছে... ভাবতে পারে নাই, আমি তার সাথে লাগতে যাবো। অন্যরা যেভাবে মেনে নেয় সেভাবে মেনে নেব ভাবছিলো...
প্রত্যেক মাসে একটা কইরা রেজিগনেশান লেটার দিতে থাকেন...
বাংলা হোটেল এখনো আছে, তয় তবিয়ত ভালো নাই। শাহজাহান ভাইরে চিনতেন বাংলা হোটেলের মালিক...তিনিও অসুস্থ ছিলেন শুনছিলাম, মারা গেছেন কীনা সেইটার খবর অবশ্য জানি না।
শাহজাহান ভাইরে খুব ভালো করে চিনতাম। বাংলা হোটেলে আমার কত শত দিন রাতের স্মৃতি !
আমিও চিন্তা করতেছি আপনের মত রেজিগনেশন পদ্ধতিতে যামু।
দুর, ফাইজলামী কৈরেন্না...। মহা যন্ত্রণায় আছি।
১। আপনি তো দেখি সেই এরশাদ আমল থেকে চাকরি করেন!
২। কিছু লোক আছে অকারণেই কারো কারো সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করতে ভালবাসে। পেশাগত ঈর্ষার উপাদান থাকলে তো কথাই নেই। রেজিগনেশন দেয়ার অর্থ চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়া।
৩। ঐ ব্যাটাকে শায়েস্তা কীভাবে করবেন আপনার বিষয়। আমার এক সহকর্মী এক বজ্জাত সিনিয়রকে (উভয়ে পুরুষ) শিক্ষা দেয়ার জন্য পুরনো বান্ধবীর সহায়তা নিয়েছিলো। মেয়েটাকে বসের মোবাইল নাম্বার দেয়া হয়। মেয়েটা ফোনে একটু-আধটু খাতিরা আলাপ জমায় বসের সাথে। বসের "সালাম" পেয়ে দেখা করতে যাওয়ার সময় বান্ধবীকে টোকা দিয়ে নিতো ছেলেটা। তারপর চেম্বারে ঝাড়ি শুরু হওয়া মাত্র বসের মোবাইলে মধুর ধ্বনি। মুঠোফোন হাতে বস বাথরুমে চলে যেতেন। মিটিংএ বসেও এই কাহিনী ঘটতো। আমরা বহুকষ্টে হাসি চাপতাম।
১. হ...
২. কিছু লোক আছে অকারণেই কারো কারো সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করতে ভালবাসে। পেশাগত ঈর্ষার উপাদান থাকলে তো কথাই নেই। এই লোকটা জাত শয়তান...
৩.

১। আপনি তো দেখি সেই এরশাদ আমল থেকে চাকরি করেন
এটা আমিও ভাবছিলাম

তখন আরেক পত্রিকায় কাজ করি। চিফ রিপোর্টারের যন্ত্রনায় আমার বন্ধু সাংবাদিক একদিন তারে আটকাইলো মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের সামনে। হাতে এক কৌটা আলকাতরা। রাস্তায় আটকাইয়া কয় দিলাম মাথায় ঢাইলা। সে এক কান্ড। পরে চিফ রিপোর্টার আর তার লগে ঝামেলা করে নাই।
সেই চিফ রিপোর্টার এখন বেকার, আর বন্ধুটা নিজেই বিশাল বস।
আলকাতরার পরামর্শটা খারাপ না বস। হারামজাদার মাথায় আবার চুল একদম নেই বললেই চলে...। দেখি...
মেসবাহ ভাই, মাসুম ভাই এর বুদ্ধিটা পছন্দ হইছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষা দেন। আমরা তো আছি। আলকাতরা কিনে পাঠাবো?
বসের সাথে মিরলো না বলে একবার চাকরী ছাড়লাম, তারপর দেখলাম চাকরী মানেই কিছু না কিছু ঝামেলা। কখনও কখনও চোখ কান বুজে মেনে নিয়েই কাজ করতে হয়। আগে এসব বুঝতাম না। তবু এখনও মাঝে মাঝে মনে হয়.... ধুর! চাকরী করে মাইনষে!
সবচেয়ে বড় কথা হলো, সব সমস্যার সমাধান হোক। ভালো থাকেন, এটাই সবসময় চাই।
সত্যিই যদি চাকুরীটা ছাড়ি, তাহলে এই ব্যাটাকে একটা ভালো শিক্ষা দিয়ে তবে ছাড়বো। এর অত্যাচারে সবাই অতিষ্ট। কেউ সাহস করে কিছু বলছে না। এই প্রথম আমি তার সম্পর্কে ম্যানেজমেন্টকে জানিয়েছি। দেখা যাক...
হুমম...বিশাল অভিজ্ঞতা আপনার।পরিবর্তন গুলো সুন্দর ভাবেই লিখেছেন...
শুভকামনা...
থ্যাংকু
এইভাবে হবে না। আপনি চাকুরি ছাড়ার দিন ঠিক করেন, তারপর আমাদের দাওয়াত দেন। আমরা গিয়া আপনার ক্যান্টিনে খিচুড়ি খাইয়া...বাকিটা আমাদের হাতে ছেড়ে দেন। তবে ভাংচুর ক্যান্টিন থাইকা শুরু হবে নাকি নিচে থাইকা, সেইটা আগে কইয়া দিয়েন।
খিচুড়ি কী ইফতারের আগে না পরে...
আরিফ ভাই এর বুদ্ধিটাও পছন্দ হইছে।লাইক বাটন প্রেস করলাম।ইফতারের পরে।
ভাইজানের কথা বড়ই পছন্দ হইছে। চালিয়ে যান সংগে আছি। বাঁশ এর দরকার হলে বল্বেন।কিন্তু ক্যান্টিন থেকে ভাংচুর করবেন মানে? আগে কি দাওয়াত খাইয়ে নিবেন নাকি। ভেংগে চুড়ে একাকার করার জন্য। না ক্যান্টিন ই ভাংতে চাচ্ছেন আরিফ ভাই?
মেসবাহ ভাই, শুনে খুব খারাপ লাগল।
আপনার এই মানসিক চাপ দূর হোক।
দুর হচ্ছে, তবে ধীরে ধীরে
বিশাল অভিজ্ঞতা..


বসের সাথে খিটিমিটি মনে সব চাকরী বৈশিষ্ট্য!!
আলকাতরা থেরাপী মনে ধরছে....
আমারও মনে ধরছে। জব্বর আইডিয়া...
আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (বিশেষ করে চাকরি সংক্রান্ত) আমার ভালো লেগেছে। আমিও অনেকটা সেই রকম।
কাউকে না হয় কাউকেতো প্রতিবাদ করতে হইবোই...
মন্তব্য করুন