বই মেলা কড়চা- ১৭
এক ভদ্রলোকের সাথে আজ বিকেল তিনটার সময় আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। ঢাকার বাইরে মানে উত্তরায়। উত্তরাকে আমরা ঢাকার বাইরে বলেই জ্ঞান করি। বিশেষ কিছু শ্রেণীর লোকজনই সাধারনত উত্তরা এলাকায় থাকেন। এর মধ্যে:
যাদের নিজেদের/বাবার বাড়ি বা ফ্ল্যাট আছে
যাদের কর্মস্থল বা ব্যবসা উত্তরা, টঙ্গী বা গুলশান এলাকায়
যারা তুলনামূলক কম ভাড়ায় বড় বাসায় থাকতে চান...
উত্তরার লোকজনকেই বলতে শুনেছি যে, ঢাকায় যাচ্ছি। তবে যাই বলিনা কেন, উত্তরা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আবাসিক এলাকা। এহেন কোন ব্যাংক নেই, যার শাখা উত্তরাতে নেই। সেটাও ১০ বছর আগে থেকে। অনেক ব্যাংকের এটিএম বুথ, শাখা একাধিক রয়েছে। চোখের সামনে যে কটি এলাকা বদলে গেছে- তার মধ্যে উত্তরা অন্যতম। আমার মত তথাকথিত লেখকদের নিয়ে এই এক সমস্যা। চান্স পেলেই জ্ঞানী মানুষের মত লেকচার দেয়া শুরু করে দেয়্। লিখতে বসেছি বই মেলা কড়চা নিয়ে- লিখছি কীনা উত্তরা নিয়ে। কোথায় উত্তরা আর কোথায় বই মেলা...
প্রসঙ্গান্তরে যাই। আমার সাথে যে ভদ্রলোকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, তিনি আবার একজন বড় মাপের ব্যবসায়ি। তবে গতানুগতিক ব্যবসায়ি নন তিনি। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এসব সম্পর্কে ভদ্রলোকের তুমুল আগ্রহ। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, তিনি জানেন ও মেলা। তবে বেশ বিনয়ী হবার কারনে সেটা অন্যকে বুঝতে দিতে চান না। যথারীতি দুপুর দুইটায় বাইকে চেপে বসলাম। ফ্রম ফার্মগেট টু উত্তরা...। অফিস খুজে পেতে তেমন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ১৩ নম্বর সেক্টরের ... নম্বর রোডের ... নং বাসা। ৬ তলা পুরোটাই ভদ্রলোকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার অফিস দেখে মুগ্ধ আমি। মানুষের শুধু টাকা থাকলেই হয়না, তার সাথে রুচির সমন্বয় না হলে এত সুন্দর ডেকোরেশনের কথা ভাবাই যায় না। ৬ তলা ভবনের ৫ তলাতে ভদ্রলোক বসেন। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তিনটা বাজার মিনিট চারেক আগেই পৌঁছলাম আমি। রিসেপশনের ভদ্রলোককে নিজের নাম বলতেই তিনি বরলেন, আপনার কথা এমডি স্যার বলে রেখেছেন। স্যরি, আপনাকে মনে হয় মিনিট দশেক অপেক্ষা করতে হবে। স্যার একটা জরুরি মিটিংয়ে আছেন। আপনি লিফটের ৫ এ চলে যান। ভদ্রলোকের ভদ্রতায় আমি মুগ্ধ। লিফটের ৫ এ যেয়ে বসে অপেক্ষা করছি। এজন অফিস সহকারি কফি, বিস্কুট আর পানি দিয়ে গেলেন। আমি বসে বসে কফির মগে চুমুক দিচ্ছি। অফিসের দেয়ালে বেশ কিছু পেইন্টিং ঝুলছে। সবগুলো ছবির নিচে স্বাক্ষর করা। এসব শিল্পীদের প্রায় সবাইকে আমি চিনি। তাদের চমৎকার পেইন্টিংস দেখছি। এর মধ্যে এক লোক এসে জানালেন, এমডি স্যার আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। চলুন প্লিজ।
আমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে লোকটি চলে গেলেন। আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। টেবিলের ওপাশ থেকে ভদ্রলোক দাড়িয়ে আমাকে ওয়েলকাম জানালেন। ১০ মিনিট দেরি হবার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। নিজের নাম বললেন। ভদ্রতা করে আমিও আমার নাম বললাম। কী কারনে গেছি সেটা তিনি জানেন বলে- সে ব্যাপারে আর কোনো কথা হলোনা। বসার পরে ভদ্রলোক আমাকে মিনিট খানেক সময় দিলেন ধাতস্থ হবার জন্য। তারপর শুরু করলেন- কথোপকথন। সবই মামুলি ধরনের কথা। আমার বাসা কোথায়, এসেছি কীভাবে,তার অফিস খুজে পেতে সমস্যা হলো কিনা, গ্রামের বাড়ি কোথায়, বাসায় কে কে আছে, পড়াশুনা কোথায় করেছি, ল্যাবএইড ছাড়লাম কেন, এখন কী করছি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যথাসম্ভব উত্তর দিয়ে যাচ্ছি। ভদ্রলোককে প্রথম দর্শণেই আমার ভাল লেগেছে। অবশেষে তিনি আমাকে বললেন-
মেসবাহ সাহেব, আপনার ৫ টি পজেটিভ দিক বলুনতো ?
আমি বলতে শুরু করলাম-
আমি ভাল পি.আর জানি
আমার মধ্যে লিডারশিপ বিষয়টি আছে
আমি শুদ্ধ বাংলা বলতে এবং লিখতে জানি
আমার মধ্যে প্রচন্ড উদ্যমতা আছে
আমি বাংলাদেশের ৬৪ টা জেলা ঘুরেছি...
এবার আপনার একটি নেগেটিভ দিক বলুন ? ভদ্রলাক আবার বললেন।
আমি ইংরেজি পারিনা...
আমার কথা শুনে ভদ্রলোক ফিক করে হেসে দিয়ে ভললেন, ঠিক আছে- আপনি আসুন... নাইস টু মিট য়্যু...
আমি বেরিয়ে আসলাম তার অফিস থেকে। নিচে নেমে সামান্য দুরের টং দোকানে চা খেয়ে বিড়ি ধরালাম। দু জায়গায় ফোন করলাম। তারপর বাইক স্টার্ট করলাম। এবারের গন্তব্য: উত্তরা টু বই মেলা...
বাংলা মটরের কাছে আসার পর ফোন পেলাম ফেণীর মেয়ে সোমা'র। ও থাকে চিটাগাংয়ে। ওর সাথে ফেসবুকে কথা হয়। সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ওর বিয়েতে। আমরা অনেকেই গিয়েছিলাম ফেণী। সেটা ১২/১৩ বছর আগেকার কথা। সোমা হচ্ছে- রশীদা আফরোজ এবং লীনা দিলরুবার বেশ ঘনিষ্ঠ। একই এলাকার তিন বালিকা। এই তিন বালিকার সাথেই আমার পরিচয় ভোরের কাগজে লেখালেখির সুবাদে। এখন রশীদা কাজ করে ভোরের কাগজেরই আরেকটা বিকালের কাগজ 'দিনের শেষে'-তে। সোমা চিটাগাং থাকে। ওর স্বামী সেখানেই চাকরী করেন। আর লীনা দিলরুবা সম্পর্কে কোনো তথ্য এবির ব্লগারদের কাছে দেবার প্রয়োজন নেই...। সোমা ফোনে জানাল, সে মেলাতে আছে। আমি কি আশে পাশে আছি ? বললাম, অপেক্ষা কর। আমি আসছি...। বাংলা মটর থেকে টিএসসি হয়ে বই মেলা... বড় জোর ১৫ মিনিট। চারুকলা পার হয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম ! রাস্তার বাম পাশে হাজার মানুষের দীর্ঘ লাইন। সবাই বই মেলার যাত্রী। আমি কোনো রকমে টিএসসিতে বাইক রাখলাম। তারপর দীর্ঘ লা্ইন ঠেলে মেলায় যেতে সময় লেগে গেল প্রায় ৪০ মিনিট। শিশু চত্তরে গিয়েই পেয়ে গেলাম সোমাকে। প্রথমেই অনাকাংখিত দেরির জন্য ক্ষমা চাইলাম। তারপর তাকে উল্টা ঝাড়ি মারলাম-
এই ছুটির দিনে বাচ্চাদের সাথে নিয়ে তোমাকে কে আসতে বলেছে মেলায় ? বেচারি বলল-
আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। কিন্তু এরকম ভিড় হবে কল্পনাও করিনি। তাছাড়া দুদিনের জন্য ঢাকায় এসেছি। কাল চলে যাব...
সোমার সাথে অনেক মানুষ। ওর দুই ছেলে। জা এবং জার দুই মেয়ে। শহীদ ভাই মানে সোমার হাজব্যান্ড। বেচারা স্বামী এবং তার দুই ছেলে এত লোক দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে।
অনেক সময় ধরে ধরে আড্ডা চলল আমাদের। আড্ডায় যোগ দিলেন- গিয়াস আহমেদ, মমিনুল ইসলাম লিটন এবং ঈশান মাহমুদ। এরা তিনজনই অনিয়মিত হলেও এবির ব্লগার। সোমা একদম আগের মত ছেলেমানুষ (নাকি মেয়েমানুষ ?) রয়ে গেছে। সেরকম সরলতা নিয়ে হাত ধরে ছবি তুললো আমাদের সবার সাথে। বার বার করে অভিযোগ করল-
চিটাগাংয়ের উপর দিয়ে আপনারা সবাই রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার যান। অথচ চিটাগাং নামেন না। এবার অবশ্যই ভাবি আর বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যাবেন। আমরা সবাই বললাম- অবশ্যই যাব। এরমধ্যে হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল এবির সাবেক ব্লগার উদরাজির সাথে...
উদরাজিকে মনে আছেতো আপনাদের ? ওকে মনে রাখার জন্য একটা লেকাই যথেষ্ট। সেটি হচ্ছে- গুলনাহার কে নিয়ে তার ঐতিহাসিক কবিতা। সেই যে, পাঙ্গাস মাছের মত... লাফালাফি ঝাপাঝাপি...। এবির জন্য সেটা একটা বিরাট ইতিহাস...। সোমা বলল, আজকে আর কোথাও যাওয়া যাবেনা। প্রতিদিনতো বইমেলায় আড্ডা দেইই... আজ তাদের সাথে থাকতে হবে। বললাম, তথাস্ত। ও বলল, এখন তারা সবাই ছবির হাটে যাবে। তাদের সাথে যেতে হবে। রাজি হলাম। বললাম, তোমরা আগাও ছবির হাটের দিকে। আমাকে শ্রেফ ১০ মিনিট সময় দাও। আমি লিটল ম্যাগ চত্তরে একটা ঢু মেরে আসছি...। ওরা রাজি হল। এর মধ্যে দেখা গেল নজরুল মঞ্চে জাফর ইকবালকে। শয়ে শয়ে ভক্ত পাঠক তাকে ঘিরে ধরেছেন। অটোগ্রাফ নেয়া ছাড়াও তার সাথে ছবি তুলছেন প্রায় সবাই...। হাজার মানুষের ভিড় ঠেলে আমি গেলাম আমাদের আড্ডার দিকে। অন্যরা সবাই ছবির হাটের দিকে।
আজকে কাউকেই পেলাম না আড্ডাখানায়। ম্যুরালের খবর নিলাম। মিনিট দশেক থাকলাম লিটল ম্যাগ এলাকায়। তারপর হাটা শুরু করলাম ছবির হাটের দিকে। আজকের মেলায় হাজার হাজার মানুষ এলেও বই কিনতে দেখলাম কম লোককেই। সবাই যেন মেলায় ঘুরতেই এল আজ। মেলায় আগত মানুষদের অর্ধেক লোকও যদি আজকে একটি করে বই কিনতো- তাহলে আমি নিশ্চিত আজকে মেলার সব স্টলে বইয়ের শর্ট পড়ে যেত। তারপরও মেলায় প্রচুর লোক সমাগম দেখে ভাল লাগল। অবাক ব্যাপার হচ্ছে- এত লোক আসা স্বত্বেও মেলায় ধুলো ছিলোনা...। ধন্যবাদ দিতেই হবে বাংলা একাডেমী কতৃপক্ষকে। মেলা থেকে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে পড়লাম ছবির হাটের উদ্দেশ্যে...





ধন্যবাদ।
তা জনাব, এ ধন্যবাদ দেবার হেতুটা জানতে পারি ?
পারেন।
বলেন
এই পোস্টটার জন্য প্রত্যেকরাতে আগ্রহ নিয়ে বসে থাকি। সেই জায়গা থেকে নিরাশ না করার জন্য ধন্যবাদ।
ও..........অপেক্ষার জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ
বলতে ভুলে গেছি- 'দেখা দেন বা না দেন, মেলায় আইসা আমগোরে দেইখা যাইয়েন...'
আইচ্ছা। দেইখা আসুম
সাদরে গৃহীত। নেন
খান।
কথা দিচ্ছি, দেখা হলে চা আর বি এন্ড এইচ খাওয়াবো; যত খেতে চান
আয়হায়, এই লোভ তো আমি কখনো সামলাইতে পারি না

লোভ সামলানোর জন্য কেউ কি আপনাকে মাথার দিব্যি দিয়েছে ?
বইমেলা শেষ হলে গল্প লিখবেন।
ধুলা আর মানুষের ভীড় ভেবে তো আজ মেলায় গেলাম না। কড়চা চলতেই থাকুক।
ধন্যবাদ।
জ্বী, আপনাকেও
ধন্যবাদ।
জ্বী, আপনাকেও
দিক্কার সহযোগে ধন্যবাদ...
নজ্রুল কবীর ভাইয়ের ধারণা তাইলে ভুল ছিলো না
যারা ৭ টা, সাড়ে ৭ টার পরে মেলায় যায়- হেগোরেও তেব্র দিক্কার জানাই
দাদাভাই, শুরুতে যেভাবে ভদ্রলোকের কথা বলছিলেন, তিনি এতটা অবিবেচক হবেন, আশা করিনি। বড় বড় মাথা যারা তারা বোধ হয় একটু অবোবেচক না হলে, উন্নতি করতে পারেন না।
কি আশ্চর্য উদরাজী ভাই আর এবিতে লিখেন না?
উদরাজী ভাই এবং তার লেখার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম, এবি'র মাধ্যমে।
বই মেলার কড়চা অনেক অনেক ভালো লাগল।
ভদ্রৈাককে আমার কিন্তু খারাপ লাগেনি...
হু, উদরাজীরে মিস করি। ও এতদিন থাকলে আরো / টা গুলনাহার পয়দা হইতো
এইখানে সবাই জামাতে ধন্যবাদ দিতেছে কেন?
যাক, জামাতে শরীক হইলাম!
উত্তরা ভালো না।
জামাতে কে কারে ধন্যবাদ দিল বুঝতে পারলাম না
সবাই বলতেছে, আমিও বলি- ধন্যবাদ
সবাই বলতেছে, আমিও বলি- ধন্যবাদ
বই মেলা কড়চা ১ থেকে ২১ দিয়ে একটা বই নামায়া ফেলতে পারেন।
প্রস্তাবটা অন্য কারো জন্য অবাস্তব হলেও আপনার জন্য অসম্ভব না...
~
আপনেরেতো ওই দিন দেইখা ভাল মানুষই মনে হৈছিল। ক্যান, আমার লগে মিছে শত্রুতা করেন ?
আমিওতো একটা মানুষ ! নাকি মেশিন ?
অসাধারণ।
ধন্যবাদ
হু, উদরাজীরে মিস করি। ও এতদিন থাকলে আরো / টা গুলনাহার পয়দা হইতো
বেচারা পুরাই বাবুর্চী হয়ে গেলো অথচ কবি মানুষ
মেসবাহ ভাই, কড়চা। প্লীইইইইইজ
নাআআআআআআআ...............
ম্যালা তো শ্যাষ হইয়া গ্যালো!
তো...............?????
আজ আবার পড়লাম। পরের ঘটনা কি হল জানতে ইচ্ছা হল।
লান্ডিপাতি নিয়ে উত্তরা চলে যাবেন নাকি!
মন্তব্য করুন