আমার মা
মাকে বুঝতে শুরু করতে না করতেই একদিন মা নাই হয়ে গেলেন। মা ছিলেন আমাদের পরিবারের সব মুশকিল আসানের নাম। বাবার কাছে আমাদের ছয় ভাইবোনের কোনো আব্দার বা আল্লাদ ছিলোনা। সব মায়ের কাছে। মা কী করে জানি সামাল দিতেন। বাবা সরকারি চাকরীজীবি। সামান্য আয়ের মানুষ। মাস পহেলা তার আয়ের বেশিরভাগ তুলে দিতেন মায়ের হাতে। মা সে টাকায় সারা মাস জোড়া তালি দিয়ে চালিয়ে নিতেন। এর মধ্যে বিভিন্ন সামাজিকতা, আমাদের স্কুলের খরচ সবই ম্যানেজ করতেন মা। বছরে দুই ঈদেই শুধু নতুন জামা পেতাম আমরা। ছোট ভাই বোন তিনটা তখনো বেশ ছোট। বাকী আমরা তিনজন মোটামুটি বড়। অতশত না বুঝলেও এটা বুঝতাম- বাবা-মার সামর্থ খুব সামান্য।
বড় ভাইয়া, বড় আপা আর আমার জন্য কোনোদিন বাসায় মাস্টার রাখতে পারেননি। আমার সকালে এবং রাতে রুটি খেতাম। দুপুরে ভাত। সকালে চা দিয়ে আর রাতে পাতলা ডাল দিয়ে। দুটো মাত্র পড়ার টেবিল ছিলো আমাদের। সে দুটি এবং খাটে বসে পড়তাম আমরা। জোরে পড়ার একটা প্রচলণ ছিলো তখন। একজন জোরে পড়লে অন্যজনের সমস্যা হতো... তাও কিছু করার ছিলোনা। মা আমাদের শান্তনা দিতেন। সবাইকে আগলে রাখতেন। কতদিন রাতের বেলা পাতলা ডাল দিয়ে রুটি খেতে গিয়ে আমরা বড় তিনজন কেঁদেছি নিরবে, ছোটরা কাঁদতো সরবে। মা'ও কাঁদতেন। আমাদের না দেখিয়ে আড়ালে যেয়ে। আমরা বড় তিনজন খুব করে চাইতাম- আমাদের জ্বর হোক। জ্বর হলে সেকালে পাউরুটি আর দুধ খেতে দেয়া হত। আমরা আসলে পাউরুটি আর দুধের লোভেই জ্বর চাইতাম। মরার জ্বর আমাদেরকে দেখেও দেখতো না...
আমি কলেজ পাশ দেবার পর মা অসুখে পড়লেন। মাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলো। প্রফেসর নবী আলম খানের তত্বাবধানে রাখা হলো। নানা পরীক্ষার পর ডাক্তার সাহেব বললেন, মার ফুসফুসে পানি জমেছে। অপারেশন করাতে হবে। অসহায় বাবা আমাদের। কী করবেন তিনি ! অফিসে টাকার জন্য দরখাস্ত করলেন। সে টাকা পেতে মাসখানেক লেগে গেলো। মা সেসময় কী ভীষণ যন্ত্রণায় ছটফট করতেন। আমাদের কিছুই করার ছিলো না। হাসি মুখে আমাদের সাথে কথা বলতেন। উল্টো আমাদেরকে শান্তনা দিতেন। অবশেষে বাবা অফিস থেকে টাকা লোন নিলেন। তারপর মায়ের অপারেশন হলো। লোন নিলেন ১ লাখ টাকা। সে টাকার মধ্যে ৬০ হাজার মায়ের অপারেশনের সময় খরচ হয়ে গেলো। অপারেশন হলো ফার্মগেটের আল রাজী হাসপাতালে। সে সময় সারারাত আমি মায়ের পাশে থাকতাম। রাত অনেক হলে মা বলতেন- 'একটু ঘুমিয়ে নে বাবা, নইলে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়বি।'
আমি ঘুমাতাম না। জেগে জেগে দেখতাম- মার কষ্ট। আল্লাহকে বলতাম- 'আল্লাহ, আমার মাকে সুস্থ করে দাও...'
ডাক্তার একদিন ডেকে বললেন- আপনার মাকে হাসপাতালে রেখে লাভ নেই। বাসায় নিয়ে যান। অনেক পরে জানলাম- মার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে। এর কোনো চিকিৎসা নেই। ক্রমে সেটা পরিবারের সবাই জানলো। কী করে জানি জানলেন মা ও...। মাকে নিয়ে আমরা কুমিল্লা চলে গেলাম। কুমিল্লা গিয়ে মা গোঁ ধরলেন, তিনি তার বড় ছেলেকে বিয়ে করাবেন। আমরা সবাই মাকে বুঝালাম- আগে আপনি সুস্থ হয়ে নিন। তারপর বিয়ে। মা মানতে চাইলেন না। জেদ করলেন। মা কি জেনে গিয়েছিলেন, বেশিদিন তার আর সময় নেই ? হয়ত জেনেছিলেন বলেই তার জেদের কাছে আমরা হার মানলাম। ভাইয়াকে বিয়ে করানো হলো। মায়ের পছন্দ করা মেয়ে। সেটা ৮৮ সালের জানুয়ারি মাস।
এরপর থেকে মা একদম বিছানায়। উঠতেই পারতেন না। ছোট বোনটা তখন সিক্সে পড়ে। ভাবী আর ও মিলে পুরো সংসারের কাজ কর্ম দেখতো। ওষুধে আর কাজ হচ্ছিলোনা। মার শরীর খারাপ হতেই থাকলো। একসময় আমরা মায়ের জন্য ফকিরের তাবিজও এনেছিলাম। কোনো কিছুতেই আর কোনো কিছু হচ্ছিলোনা। আমাদের পুরো সংসারের দায়িত্বে থাকা মা শুয়ে শুয়ে দেখলেন- তার সোনার সংসার কীভাবে ঠেলে ঠেলে চলছে...। তার কিছুই করার ছিলোনা। ছোট বোনটা মার পাশে গেলে তাকে জড়িয়ে ধরে শুধু কাঁদতেন। এছাড়া সারাদিন নিথর পড়ে থাকতেন বিছানায়। তেমন কোনো কিছু খেতেও পারতেন না। খেলেই বমি করে দিতেন। এভাবে ৮৮ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখ মা চুপ করে চোখ মুদলেন। আর কোনোদিন সে চোখ খোলেননি তিনি। মাকে নিয়ে গেলাম গ্রামের বাড়ি লক্ষীপুরে। যেতে যেতে মধ্যরাত। পরদিন সকালে তাঁকে শুইয়ে দিলাম মাটির ঘরে। অসহায় আমরা সবাই ফিরে এলাম কুমিল্লায়...
তারপর কত কী। ভাইবোনগুলো বড় হলো। সবাই বিয়ে থা করলো। সংসার হলো। অন্য ভাইবোনেরা পেয়েছে কীনা জানিনা। আমি মাকে ফিরে পেলাম আবার। আমার মায়েরই রুপ নিয়ে এলেন আমার শ্বাশুড়ি মা। আজ এত বছর পরও কোনোদিন মনে হয়নি মায়ের স্নেহ থেকে আমি বঞ্চিত। আমার আপন মায়ের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো- মা সবসময় সরব ছিলেন। হৈ হুল্লোড় খুব পছন্দ করতেন। যেখানেই যেতেন তিনি থাকতেন সেখানকার মধ্যমণী। আর শ্বাশুড়ি হচ্ছেন চুপচাপ স্বভাবের। অথচ কী পরিমান আমাকে ভালোবাসেন তিনি- সেটা আমি জানি। খুব বেশি মন-ট্ন খারাপ হলে একবার তার সাথে দেখা করে আসি। দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জ গিয়ে তার হাতের এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার চলে আসি। তাঁকে বুঝতে দেইনা, শুধু তাঁকে দেখতে নারায়ণগঞ্জ গেছি। তিনি কি আর তা বুঝেন না ? হয়তো বুঝেন, হয়তো না...।
আজ মা দিবসে সকল মায়েরা ভালো থাকুন। যাদের মা আছে তারা ভাগ্যবান। দুরত্ব যতই হোক মার কাছে গিয়ে একটু তাঁর কোলে মাথা রেখে দেখুন- পৃথিবীর তাবৎ সুখ সেখানে। যাদের মা নেই তারা কী করবেন, আমি জানিনা... শুধু এটুকু বলি, ভালো থাকুন...





সব দিবসেই সকল মায়েরা ভালো থাকুন!
আমিন
মা এর জন্য ভালোবাসা...
মা'র জন্য শ্রদ্ধা ও...
মা'র জন্য অনেক ভালোবাসা রইল...সব মা অনেক ভালো থাকুন
মাগো তুমি অনেক ভালো থাকো
Ma ke niye emon lekha pore chokh vore jay.ahare ma!sob ma valo thakuk,sustho thakuk,sontaner chaya hoye thakuk
sob ma sontaner chaya hoye thakuk
সব দিবসেই সকল মায়েরা ভালো থাকুন!
আমিন
আপনার লেখাটা পড়ে চোখ জ্বালা করে উঠলো, আমার কান্না চলে আসছে । এত আবেগ ক্যান পৃথিবীতে!! এত মায়া থাকা ভালো না । খুব অল্প সময় আমাদের হাতে
মায়েদের জন্য ভালোবাসা
আসলেই... জীবনটা এত্ত ছোট ক্যানো ?
মা যার নাই, সেই বুঝে মা যে কত বিশাল একটা বটবৃক্ষের মতন।
চির সুখী জন, ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত ব্যাদন, বুঝিতে কি পারে... ?
ধুর এই সব লেখা পড়তে ভাল লাগে না।
আমারও লেখতে ভালো লাগে না...
(খো্মা খাতার (ম্যাডাম) বালিকা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা কর। সারাংশ নয়। ভাব সম্প্রসারন চাই... m_aajad@yahoo.com)
রচনা লিখে পাঠায়ছি
রচনার উত্তর ও দিছি
সকল মায়েরা ভালো থাকুক.....
আমিন
এরকম বিষয় নিয়ে আমি সাধারণত কিছু লিখতে পারি না। লিখতে বসলেই চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু হয়। ভালো লেখা মেসবাহ ভাই। হৃদয়ছোঁয়া লেখা। আপনাকে মেইল করা হয়েছে। প্লীজ চেকক...
আমি আসলে কোনো লেখাই লেখতে পারিনা।
অন্যদের দেখে লেখার চেষ্টা করি।
যখন যা মনে আসে, মনের আনন্দে লেখি।
(যাকগে, ফিরতি মেইল পাঠিয়েছি...)
সব মায়ের ছেলেরা যেন আপনার মত হয়, মায়ের কষ্টে এভাবেই যেন মায়ের পাশে থাকে।
হু...
:'(
সব দিবসেই সকল মায়েরা ভালো থাকুন!
ডিসেম্বরের ২০ আমার শাশুড়িও মারা গেছেন
সব দিবসেই সকল মায়েরা ভালো থাকুন।
আমিন
সকল মা সুস্থ থাকুক......সকল মা ভালো থাকুক......সকল মায়ের সন্তান আপনার মতো হোক......
সকল মায়ের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা
সকল মা সুস্থ থাকুক......সকল মা ভালো থাকুক
মন্তব্য করুন