মনের গাড়ি টমটম লিচু বাগানে
চালরে গাড়ি যাত্রাবাড়ি...। আক্ষরিক অর্থেই যাত্রবাড়ি পেরিয়ে গেলাম। ধুলোর মেঘ ফুঁড়ে সুড়-ৎ করে যেন এক সুবাতাসের দেশ। এদিকে কাঁচপুর, ওদিকে গাবতলী কিংবা গাজীপুর চৌরাস-া, পেরিয়ে বুকভরে শ্বাস টানলেই বুঝবেন, এ বাতাস অন্য রকম। ঢাকার সিসার বিষে ভারী নয়। হাল্কা। মোলায়েম। শানি- শানি-।
শানি- শানি-।ভাবটা তখন কাজ করতে শুরু করেছে বুকের ভেতর। গাড়ি ছুটছে কাঁচপুর ব্রিজ ছাড়িয়ে। ছুটির দিন শুভশুক্রবার। মানুষ-যানের গুঁতোগুঁতি কম। আরামে ছুটছি সোনারগাঁওয়ের পথে...।
ফলে পরিচয়...
কথায় বলে ‘ঠিক দুক্কুরবেলা ভূতে মারে ঢ্যালা’। কিছু ভূতের আছর তো থাকবেই মনুষ্যজীবনে। আর সেই ভূতের সর্দারটি নিশ্চয় ‘বেড়ানোর ভূত’। সেই ভূতের ঢ্যালা খেয়ে দুপুরবেলাতেই ছুট। তাও এক্কেবারে আণ্ডাবাচ্চাসহ। সঙ্গী এক বন্ধু পরিবার।
মধুমাসের প্রথম সপ্তাহ। সোনারগাঁওয়ের গাছে গাছে আহ্লাদি ফল লিচু আসে সবার আগে। চলো তাই সোনারগাঁও, লিচু বাগানে। বাচ্চারা ঘুরবে, দেখবে, নিজের হাতে লিচু পাড়বে, খাবে...। সেই সঙ্গে ওরা গাছ চিনবে। প্রকৃতির মাঝে মিশে যাবে প্রকৃতির সন-ানরা। আর সোনারগাঁও, সে তো বাড়ির পাশে আরশিনগর। সকাল বা দুপুরে রওয়ানা দিয়ে ফেললেই হলো। আমরাও তাই...।
গন্তব্য এত কাছে!
পৃথিবীর সব সুন্দর জায়গা কেন যে এত দূরে...! এই হলো তাবৎ পর্যটকের দীর্ঘশ্বাস। তবে কাছে-ধারেই অনেক সুন্দর জায়গা আছে। চক্ষু মেলে দেখলেই হয়।
বাচ্চারা ধরেই নেয় গাড়ি চলতে থাকবে, চলতেই থাকবে... তারপর, তারও পর একটি সুন্দর জায়গায় এসে নামা হবে। অভ্যাসবসে ওরা যখন ঘুমের প্রস'তি নিচ্ছে, তখনই পৌঁছে গেলাম সোনারগাঁও। কতক্ষণ আর লাগল? এক ঘণ্টা, সোয়াঘণ্টা। ২৪ কিলোই তো মোটে পথ।
বিশুদ্ধতম পানীয়ে আপ্যায়ন
লোকশিল্প জাদুঘরের প্রধান ফটকেই ছিলেন দেশ টিভির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি স্মিথ আর প্রথম আলোর সোনারগাঁও প্রতিনিধি মনির। অনুজপ্রতীম এই দুই সাংবাদিক বিকট চিৎকার দিয়ে অভ্যর্থনা জানাল। কুশল বিনিময়ের মাঝেই দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেল আমাদের দল। একদলের চা চাই। আরেকদল খাবে ডাব। ডাবের সঙ্গে শাস ফ্রি, এই প্রলোভনে অবশেষে ডাব জয়যুক্ত হলো। প্রকৃতির বিশুদ্ধতম পানীয়ে মুহূর্তেই, যাকে বলে রিফ্রেশ।
গাছে লিচু হয়!
স্মিথ আর মনির নিয়ে গেল কাছেরই এক লিচু বাগানে। আমার ছোট্ট মেয়েটা বিপুল বিস্ময়ে বলল, ‘গাছে লিচু হয়!’ বন্ধুপুত্রের বুদ্ধি আরো বেশি! সে বলল, ‘এই লিচু প্লাস্টিকের মধ্যে ভরে দেয়, শুধু বিচি থাকে না। আমি বুঝতে পেরেছি।’
আহারে, প্লাস্টিকের ডিব্বায় আর্টিফিসিয়াল লিচুখোর প্রজন্ম!
সোনারগাঁওয়ের গোয়ালদি, পাঁচপুর, ত্রিবোর্দী, চিলারবাগ, দুলালপুরে আছে লিচু বাগান। আমরা যেখানে, তার নাম সর্দারবাড়ী। ছোট বাগান। সাত-আটটি গাছ হবে। একটি গাছে হেরিকেনবাতি ঝুলছে। কয়েকটিতে কেরোসিনের টিন বাঁধা। বাঁদুর ও পাখি থেকে পাকা লিচু রক্ষা, কঠিন কাজ।
গাছের ডালে ডালে দুলছে টুকটুকে লাল লিচু। চোখ জুড়িয়ে যায়। বাচ্চাদের লাফ-ঝাপ দেখে প্রাণও জুড়োয়। বাগানের এক কোণায় ছোট্ট একটি চালা তুলেছেন মালিক। অস'ায়ী ব্যবস'া। পরিবারের লোকজন নিয়ে লিচুর তোড়া বাঁধছেন। দেখে মনে হয় ফুলের তোড়া। হাসিমুখে ভদ্রলোক প্রচুর লিচু তুলে দিলেন বাচ্চাদের হাতে। আর অভয় দিলেন, যত পারেন পাইরা খান।
বাচ্চাদের, এমনকি এই বড়দেরও আর কে থামাবে! লিচুর টসটসে রস হাত বেয়ে নামে। আর রসেভেজা ঠোঁটের হাসি... আহা, এমন অমলিন হাসি আমরা কতদিন হাসি না এই নাগরিক জীবনে...!
বাগানের মালিক বললেন, ‘আর এক সপ্তাহ আগে আসতেন যদি, দ্যাখতেন লেচুর কী বাহার! এহন তো পরায় শ্যাষ...। আচ্ছা, কোন গাছের লিচু ভাঙ্গব?’
লিচু পেড়ে আনাকে তারা বলেন ‘ভাঙ্গা’।
অতীব দুঃখ এবং সুখকথা
পছন্দের গাছ থেকে ‘লিচু ভেঙ্গে’ আমরা গাড়ির ব্যাকডালা ভরে ফিরলাম বটে। তবে অতীব দুঃখের কথাটি এখানে জানাই, এই লেখা যখন ছাপা হবে, ধারণা করি তখন সোনারগাঁওয়ের লিচু আর থাকবে না। লিচু তো এক স্বল্প সময়ের অতিথি।
তবে মন খারাপ করবেন না। এবার সারা দেশেই লিচুর বাম্পার ফলন হয়েছে। লিচু বাগানে ঘোরার সাধ হলে এক্ষুণি ছুটতে পারেন ঈশ্বরদীর পথে। রাজশাহীর লিচুতেও পাক ধরেছে। আর কিছুদিন পরেই পাওয়া যাবে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচু।
এর সবখানেই বাস ও ট্রেনের চলাচল আছে। একটু খোঁজখবর করে বেরিয়ে পড়লেই হলো। ষড়ঋতুর এই দেশ। এর প্রতিটি মৌসুমকেই অনুভব আর উপভোগ করে নেয়া চাই। জীবনের ব্যস-তাকে একদিন পাত্তা না দিলেই তো হলো।
ঐতিহাসিক সোনাগাঁও
সোনারগাঁওয়ের আরেক নাম সুবর্ণ গ্রাম। ১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স'াপন করেছিলেন সোনারগাঁওয়ে। ঐতিহ্যমূল্যে ভীষণ সমৃদ্ধ এই জনপদ। এখানে যদি আসেন, অবশ্যই দেখবেন লোকশিল্প জাদুঘর। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন একে মিনি বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মাইল দেড়েক দূরেই গিয়াস উদ্দীন আজম শাহের সমাধি। এর একটু দূরেই পাঁচপীরের মসজিদ ও মাজার। অনেক প্রাচীন স'াপনা আছে এখানে। তবে মনে রাখবেন বুধ-বৃহস্পতিবারে লোকশিল্প জাদুঘর বন্ধ।
দেখুন ঐতিহাসিক পানামনগর। লিচু বাগান ঘোরা শেষে সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে আমরা পানামনগরের পথ ধরে হাঁটছিলাম। সে এক অদ্ভুত অনুভব। মনে হবে, আমরা এ সময়ের কেউ নই। চলে গেছি শতবর্ষ পিছনে। এর বেশির ভাগ বাড়িই ঊনবিংশ শতাব্দীর। আর দেখতে পারেন তাজমহল। আসলে তাজমহলের রেপ্লিকা। অনেকেই যান দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে।
চলে যান, সঙ্গে থাকুক, প্রিয়জন আর ক্যামেরা। দিনটি স্মৃতির সোনার পাতায় লেখা থাক। স্মৃতি বড়ই অমূল্য।





কত সুখ মানুষের! চাইলেই ঘুরতে যেতে পারে। হিংসা দিলাম এক বস্তা।
এইটুক সুখ কিন্তু চাইলেই নেয়া যায়। খালি "ব্যস্ততারে একদিন ছুটি দিলেই হয়"।
"এক বস্তা হিংসা"র জায়গায় আমি "এক বস্তা শুভকামনা" পড়লাম।
ব্যস্ততা না ভাইয়া তবু চাইলেই যাওয়া যায় না। নাইলে তো এই দুক্কুরবেলাই যাইতাম পোষ্টটা পড়ে ।আফসুস।
গিয়াস ভাই একা একা এত লিচু খেলেন কাজটা ভালো করলেন??
আপনাকে দেখলেই পেছনের কথা মনে পড়ে যায়.............ভালো থাকেন সবসময়।
সোনারগাঁও এ আমাদের একটা বড় পিকনিক হয়েছিল মনে আছে? সেখানে ফারুখ ভাইর মেয়ের নামকরণ প্রতিযোগিতায় আমার নামটি টিকে যায়-শাল্মলী
লীনা, সব মনে আছে। আমাদের সেইসব দিন কী আর ভোলা যাবে...
"আপনাকে দেখলেই পেছনের কথা মনে পড়ে যায়" মানে কী! আমারে আর বুড়া বানাও না
পেছনের দিন মনে পড়ে যায়- কারণ আপনার চ্যালা-চামুন্ড হিসেবে আমরা তো আপনার পিছে পিছেই ঘুরতাম বস
আপনারে বুড়া বানাবো সেই সাহস কী আমার আছে!!!!!! আমার ঘাড়ে বস একটাই মাথা
ঘুরতে যাইতে মন চায়।
কাজের মায়া না করে বেরিয়ে পড়লেই হয়...
এখন পর্যন্ত দুই-চারটা লিচু খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। যে কারণে কিছুটা মেজাজ গরম। আর এই লেখাটা পড়ে মনে হচ্ছে, আমি ফলমূল অনেক কম খাই। যেটা খারাপ। খুবই অনুচিত।
গিয়াস ভাই কেমন আছেন?
ভালো আছি ভাই। আপনি ভালো আছেন?
ইয়েস্ দারুণ আছি

সারারাত জেগে কি করেন? একটা নতুন পোষ্ট তো দিলেন না!
আমি পোস্ট দিলাম না ঠিকাছে। যেহেতু প্রচুর দিই, তাই একটু-আধটু না দিলে ক্ষতি নাই। কিন্তু মাননীয়া, আপনি কি করলেন? নতুন লেখা নাই তো নাই-ই; একেবারেই নাই। আর কিছু না পেলে ব্লগীয় খবরাখবরও তো লিখতে পারেন। এতে আমাদের মতো ম্যংগোপিপলরা বন্ধুদের কথা জানতে পারে। যেমন- কে বিদেশ থেকে আসলো বা গেলো, কবে কার বিয়ে, কোথায় কিংবা কার শরীর কেমন...।

অতোদূর না পারলে নিজের খবরটাই না হয় দিন। জেনে নিশ্চিন্ত হই। আর তাও যদি না পারেন তো কি আর করা। কেটে-কুটে ও বেটে খাওয়ার জন্য দিলাম এককেজি
আর মা'র শরীর এখন কেমন? উনার জন্য, সঙ্গে আপ্নার জন্যও, অফুরন্ত শুভকামনা রইলো।
কি যে হলো আমার ! বদনজর দিছে কে জানি! দৌড়ের উপড়ে থাকি। মা আছেন মোটামুটি। মা কে দেখতে যাবো কাল/ পরশু। আসেন না বেড়াতে নরসিংদী! আম-কাঁঠাল খেতে!
গ্রামের বাড়িতে নিমন্ত্রণ! বাবাহ্। আমার তো আপ্নার সঙ্গেই চলে যেতে এবং ঘুরেটুরে আবার একসাথেই ঢাকায় ফিরতে ইচ্ছে করছে। তীব্রভাবে। অনেক অনেকদিন কেবলই ঘুরবো বলে কোথাও যাই না।
চলেন তাইলে!
এটা কি বন্ধুর মত কাজ হ্ল এমন একা একা যাওয়া
????
জায়গাটা আমার খুব প্রিয় আর আমাদের অফিসের একটা পাওয়ার প্ল্যান্টের কাছে, তাই সুযোগ পেলেই আমিও একা একাই যাই
সুযোগ পেয়ে একা একা আপনি যদি যান, তাহলে "আমরা বন্ধু" হব কী করে...
তাও কথা
তাহ লে আজ থেকে আমরা বন্ধু না, আমরা শত্রু 
"একটা কিছু হয়েছি বলে তাতেই আমি ধন্য হলাম..."
গানটি শুনেছেন নিশ্চয়ই।
খাসা বলেছেন
যান যান লিচু বাগানে। আর আমি প্রতি দিন আমার বাগানের লিচু দেখি , চোর তাড়াই, ঘন্টি পেটাই, লাইট দেই ।
আপা, আপনার ঠিকানাটি দেন... তাড়াতাড়ি। লিচু শেষ হয়ে গেলে ঘণ্টি পিটায়ে আর লাভ কী হবে!
গিয়াস ভাই,
একা একা লিচু খেলেন, আবার লিচু(স্মৃতি)চারণও করলেন।
বাহ, দারুন!
স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লুম। মামা বাড়িতে লিচু গাছ ছিলো।লিচুর সিজনে মামা বাড়ি বেড়াতে গেলে গাছের টসটসে লিচুগুলো দেখে লোভ সাম্লাতে পারতুমনে। আমরা কাজিনরা, যারা বয়েসে বড়, গোপনে লিচু-চুরি সভা বসাতাম।অলস দুপুরে ক্লান্ত সকলে যখন ঘুমে ব্যস্ত, আমরা তখন চুরি-কম্ম সাঙ্গ করে খেলতে চলে যেতুম।আর বিকেল বেলা ভালো মানুষ সেজে আবারো লিচুতে ভাগ বসাতাম।
মনে পড়ে গেলো সেই সোনামাখা দিনগুলো।
ধন্যবাদ, গিয়াস ভাই।
"সেই সোনামাখা দিনগুলো" যেন আবার ফিরে আসে আপনার জীবনে।
ধন্যবাদ আপনাকেও।
ভাইরে, যে একখান লেখা দিলেন। দশে দশ। আমারেও যাইতে কৈছিলেন, মাগার আমারতো আর আপনেগো মত এসি গাড়ি নাই। একখান দুই চাকার সাইকেল আছে, তার আবার ড্রাইভার নাই। নিজেই ড্রাইভার! দেখলেন, খাইলেন আর লেখলেন- ধন্যবাদ।
(সৈয়দপুরের সামছা আপাগো, আপনে না কৈছিলেন আমগো এবির বন্ধুগো নিজের গাছের লিচু খাওয়াইবেন ? এরপরতো দেখি কোনো আওয়াজ নাই... )
মেয়েরা ডাকলে তো দুই চাক্কা নিয়াই লৌড়ান। আর আমি ডাকছিলাম বইলাইরে ভাই...
(দশে দশ দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আর সৈয়দপুরের সামছা আপা লেঞ্চু পাডাইলে য্যান খপর দিতে ভুইলেন না)
একা একা লিচু খাওয়া ভালু না।
একা একা খাই নাই মাসুম ভাই। বিশ্বাস করেন, নিজের বউ আর বাচ্চা-কাচ্চাদের নিয়া খাইছি।
ব্লগে এসব পোষ্টে ছবি দেয়া মাষ্ট। ছবি মিস করছি
তানবীরা
আমি তো ছবি পোস্ট করেছিলাম। কেন যে শো করল না, জানি না। আমি অত এক্সপার্ট না যে!
একা একা লিচু খাওয়া ভালু না।
মন্তব্য করুন