ইউজার লগইন

আমার চলচ্চিত্রদর্শনঃ "বেহুলা"

১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া "বেহুলা" চলচ্চিত্রটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি মাইলফলক। তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের আবেষ্টনে হিন্দু পুরাণ "মনসামঙ্গল" কাব্য থেকে "বেহুলা" নির্মাণ করে জহির রায়হান যে কি পরিমাণের সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু নির্মাতার উপস্থাপনার কৌশল আর নৈপুণ্যে ছবিটির জনপ্রিয়তা লাভ করতে কোনরকম সমস্যা হয় নি।

ভিনদেশী রাজপুত্র লখিন্দরকে একনজরের দেখা দেখেই তার প্রেমে পড়ে যায় রাজকুমারী বেহুলা। কিন্তু লখিন্দরের বাবা চাঁদ সওদাগরের শত্রু মনসাদেবীর রাজ্যে এই বিয়ে দেবী সহ্য করবেন কেন? তাঁর আদেশে লোহার বাসরঘরের চুল পরিমাণ ছিদ্র দিয়ে কালনাগিনী প্রবেশ করে দংশন করে লখিন্দরকে। লখিন্দরের লাশ নিয়ে অকুল দরিয়ায় পাড়ি জমায় বেহুলা। মনসার মাতা বেহুলার দুঃখ দেখে তাকে ইন্দ্রপুরীতে নিয়ে যান। সেখানে নাচের মাধ্যমে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে বেহুলা ফিরে পায় তার স্বামীর জীবন। মনসামঙ্গল কাব্যের এই অতি পরিচিত কাহিনী থেকেই ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান নির্মাণ করেন "বেহুলা”।

নবাগত হওয়াতেই সম্ভবত জহির রায়হান ভবিষ্যতের নায়করাজ রাজ্জাকের অভিনীত লখিন্দর চরিত্রের সংলাপে কৃপণতা করেছেন। রাজ্জাকের সাথে সাথে সুচন্দাকেও(বেহুলা) খুব একটা মুখ খুলতে দেখা যায় নি। তবে অভিনয় করে মাতিয়ে রেখেছেন ফতেহ লোহানী(চাঁদ সওদাগর) এবং স্বল্প পরিসরে হলেও আমজাদ হোসেন(বিশু) তাঁর অভিনয় ক্ষমতার সাক্ষর রেখে গেছেন ছবিতে। বিশেষ করে নিজের স্ত্রীর কাছে দৃঢ়চেতা চাঁদ সওদাগরের বিদীর্ণ হৃদয়ের স্বীকারোক্তি ”ব্যথায় ব্যথায় আমি পাষাণ হয়ে গেছি, আমার চোখের জল ফুরিয়ে গেছে” বা বিশুর কনফেশন এবং অনুতাপের দৃশ্যগুলোতেই তাঁদের মুন্সীয়ানার নমুনা দেখা যায়। সুমিতা দেবীর(মনসাদেবী) চরিত্রটি ছিল খানিকটা চড়া সুরে বাঁধা তবে সহজেই পারিপার্শ্বিক এবং কাহিনীর সাথে মানিয়ে গেছে। প্রয়াত সুরকার আলতাফ মাহমুদের সুরে চলচ্চিত্রটির প্রতিটি গানই দর্শকদের মন জুড়িয়ে দেবে। ”হায়রে পিতলের কলসি” এর মতো চটুল গান, ”সখা বাজে না” এর মতো রোমান্টিক গান বা ”মরি হায়রে হায়” এর মতো হাস্যরসে পরিপূর্ণ গান - সবই জহির রায়হান অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে চলচ্চিত্রটিকে একটি প্রকৃত মিউজিকাল ড্রামার মর্যাদা দিয়েছেন। চলচ্চিত্রটির কিছু দৃশ্য কিছু সংলাপই একে চিরকালীন চলচ্চিত্রের সম্মান দেবার জন্য যথেষ্ট। তবে সর্বোপরি দর্শকরা যদি ”বেহুলা"কে সাধারণ একটি লোককাহিনীর চলচ্চিত্ররূপ মনে করেন তবে ভুল করবেন। লোহার বাসর নির্মাণের পর আবেগাপ্লুত চাদ সওদাগর যখন বিশুকে পুরষ্কৃত করতে চান তখন বিশুর সংলাপ "বিপদে পড়লে প্রজা রাজাকে সাহায্য করবে আর রাজা প্রজাকে - এখানেইতো মানুষের মহত্ত্ব।" শুনেই আমি প্রথমবারের মতো উপলদ্ধি করি যে নির্মাতা নিছক একটা পুরাণের কাহিনী নির্মাণ করতে চান নি। এ ছবির মাধ্যমে জহির রায়হান দর্শকদের কাছে যে মেসেজটা পৌছাতে চেয়েছেন তা খুবই স্পষ্ট। চলচ্চিত্রের একটি সংলাপই তা স্পষ্ট করে দেয়, যখন বেহুলা ইন্দ্রপুরীতে দেবতাদের উদ্দেশ্য করে বলে, "জোর করে কি কারো কাছ থেকে ভক্তি আদায় করা যায় প্রভু?”। না, জোর করে কখনোই সম্মান আদায় করা যায় না। আর তাইতো ভয়ংকর জেদী চাঁদ সওদাগর যে কিনা স্বর্গের দেবী মনসার বিরোধিতা করে গেছে জীবনভর, মনসার শত অভিশাপ, শত চক্রান্ত আর দুর্যোগ যাকে টলাতে পারে নি সেই তিনিই আবার সামান্য একজন মর্ত্যের মেয়ে বেহুলার অনুরোধে মনসার পুজো করতে রাজী হন। ভয়ের নয়, জয় হয় ভালোবাসার, জয় হয় স্নেহের।

যারা ছবিটি দেখতে আগ্রহী তাদের জন্য ডাউনলোড লিংক

বেহুলা

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

ভাস্কর's picture


অনেক ভালো একটা ম্যুভি রিভিউ পড়লাম...কেবল একটা অনুধাবন ভালো লাগে নাই...সেইটা হইলো নবাগত অভিনেতা বইলা সংলাপ কমাইয়া দেওনের যুক্তিটা। সিনেমা মনে হয় না এই প্রোসেসে দাঁড়ায়। জহির রায়হান হয়তো ঐ চরিত্রে সংলাপ দেন নাই বইলাই একজন নবাগত চরিত্ররে কাস্ট করছিলেন।

একটা গল্পরে অনেকভাবে দেখা যায়...জহির রায়হান হয়তো এই গল্পরে চাঁদ সওদাগর বা মনসার গল্প হিসাবেই দেখতে চাইছেন...আর সংলাপ ছাড়া অভিনয় কিন্তু কঠিন বেশি...আমি রাজ্জাকের অভিনয় মনে করতে পারতেছি না, কিন্তু সুচন্দারে মনে পড়তেছে...অসাধারণ!

অপরিচিত_আবির's picture


আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম সেটাই যে নবাগত অভিনেতা নেওয়াতেই জহির রায়হান সংলাপ রাখেন নি রাজ্জকের জন্য, এটা Accusation না বরঞ্চ Compliment কেননা আপনি ঠিকই বলেছেন যে জহির রায়হান যে অ্যাঙ্গেল থেকে ছবিটা বানিয়েছেন তাতে লখিন্দর কেবল একটা ইভেন্ট মাত্র, কোন চরিত্র নয়। কাজেই রাজ্জাকের অভিনয় যে মনে পড়ছে না তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

টুটুল's picture


ভালো একটা রিভিউ পড়লাম
আবিরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ

অপরিচিত_আবির's picture


টুটুলভাই আপনাকেও ধন্যবাদ।

মুকুল's picture


অনেক ধন্যবাদ। ছবিটা দেখেছি কিনা মনে নেই। হয়তো ছোটবেলায় দেখেছি, কিম্বা দেখিনি। যাই হোক, ভালো লাগলো লেখাটা।

আপনার লিঙ্কে কোন ডাউনলোড লিঙ্ক পেলাম না। সরাসরি ডাউনলোড লিঙ্ক কি দেয়া যাবে ?

অপরিচিত_আবির's picture


আমার দেওয়া লিংকে একটু নিচে গেলেই আসল ডাউনলোড লিঙকটা পেতেন, তবে আপনার সুবিধার্থে এইখানে সরাসরি লিংকটা দিয়ে দিচিছ।

http://www.mediafire.com/?sharekey=bad8bb9b87693a607432d3c9683f450a9d4e1c3940950a595be6ba49b5870170

বিষাক্ত মানুষ's picture


অনেক ধন্যবাদ .। এখনি নামাচ্ছি

অপরিচিত_আবির's picture


আপনাকেও ধন্যবাদ।

তানবীরা's picture


প্রিয়তে রেখে দিলাম, কোন একদিন দেখবোনে

১০

অপরিচিত_আবির's picture


অবশ্যই।

১১

নরাধম's picture


বাহ্‌, দারুন রিভিউ। আমি হলিউডের ৫০, ৬০, ৭০ ডশকের মুভিগুলার ভক্ত। এখন তো মনে হচ্ছে বাংলাদেশের সেসময়ের মুভিগুলাও অবশ্য দেখনীয়। উত্তমের মুভিগুলা অবশ্য দেখা আছে।

১২

অপরিচিত_আবির's picture


আমি নিজেও হলিউডের ৫০,৬০ আর ৯০ দশকের ছবির ভক্ত। তবে ইদানিং নন হলিউডি মুভিই বেশি দেখা হচ্ছে। কারণ খেয়াল করে দেখলাম আমার কালেকশনের ৬৫০ মুভির মাঝে ৪০ ভাগই নন হলিউডি আর সেগুলো দেখা হচ্ছে না ... কাজেই আপাতত ফিরিঙ্গিদের "না" বলছি।

১৩

আখসানুল's picture


সুযোগ পাইলে দেখব নে।

১৪

সোহেল কাজী's picture


দেখতে হবে Laughing out loud

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.