ভেতর-বাহির (পঞ্চম পর্ব)
আমার দুটো বেশ পুরাতন খাতা আছে । অনেক কিছু ফেলে দিয়েছি, কিন্তু ঐ রোল টানা খাতা দুটো আমার কাছে যে কোন ভাবে আজও রয়ে গেছে। একটা খাতায় সাল লেখা ১৯৮৬ আর অন্যটিতে ১৯৯০। আমা সেই আট থেকে ১২ বছর বয়স কালে আমি যে সাহিত্য জগতে নিজেকে প্রবেশ করানোর দুষ্টু , গোপন এবং আত্মঘাতি প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম, তারই স্পষ্ট স্বাক্ষী বহন করছে খাতাদুটো। অবাক হই আজও খুললে , সেখানে আমি কবিতা, ছড়া, গল্প এমনকি কৌতূক ও রচনা করবার ব্যর্থ চেষ্টাকে অব্যর্থ বৃথা কর্ম করে তুলেছি। হাসি পায়। সেই রোগ আর ভালো হলো না, তাই রয়ে গেলাম জ্যাকব অব অল ট্রেডস মাষ্টার অব নান -টাইপ হয়েই।
১৯৯০ এর খাতায় একটা কবতিার মত আছে , সেইটা হলো-
(বখতিয়ার
বিকেএসপির সেরা খেলোয়াড় বখতিয়ার
সবার আগে বল নিয়ে ছোটে,
ডান পায়ে বল কাটিয়ে নিয়ে
বাম পায়ে বল পাসিং করে।
হেডের বলে সবাই ভাবে
কেমন ছেলে আসল এযে।
শটের বলে গোলকী ভাবে
যাই বুঝি আজ হার্টফের করে
বখতিয়ারের বল এলে তাই
গোলকীপার দেয় যে ছেড়ে।
সবাই ভাবে বখতিয়ারই
বাংলাদেশের সোনার ছেলে
দেখতে সে যে কালো মানিক
তাই সে একদিন হবেই পেলে।
২৯/৮/৯০)
হাসিয়েন না। মনে পড়ে নিশ্চয় ঐ সে ৯০ এর উত্তাল গনআন্দোলনের বিজয়ে মাঝে আরও একটি বিজয় এসেছিল। ডোনা কাপ জিতেছিল বাংলার পিচকি ফুটবল দল। সেই দলের সেরা খেলোয়াড় ছিল। বখতিয়ার। পরবর্তীতে সে জাতীয় দলেও খেলেছে। তবে কালের অতলে লেবেল (তথাকথিত) মেইন্টেন করেছে মানে অবনতির ধারবাহকিতা ধরে রেখে আর পেলে হতে পারেনি।) তবে সেই বালক কালেই আমি একটা জিনিস বুঝেছিলাম। বুঝেছিলাম বাংলার পোলাপানগুলো পারে, পারে না মূল বুঢ্ঢা রা, যেইটারে জাতীয় দল কয়।
এত কথা কওনের একটাই কারন , সদ্য সমাপ্ত এস এ গেমসের ১৮টি স্বর্ণপদকের মধ্যে ফুটবল এবং সদ্য ইনকর্পোরেট করা টি২০ তে ও রয়েছে দু দুটো। আমি গর্বিত বিশেস করে ক্রিকেট টীমটার জন্য। ভারত ,পাকিস্তান আর শ্রীলংকা যেখানে এই সার্ক কান্ট্রিতেই পইড়া গেছে আর তাগোরে কুপোকাত করেছে লিটল বিচ্ছুর দল। কিন্তু আবার কষ্ট পাই এদের থেকেই হয়তো চিরফ্লপ আশরাফুল নতুন করে গজাবে। আশা করি না গজাক। না গজাক।
দেশের ছাত্র রাজনীতির চরম অস্থিরতার মাঝে এই ক্রীড়া সাফল্যে আসুন একবার জোড়ে নিশ্বাস নিয়ে মুকটাকে ধুনক এর মত উপরে তুলে হাসি। আর হাতে ও তালু দুটো মিলিয়ে দেই করতালি।
এবার সম্পূর্ন ভিন্ন প্রসংগ--মাহবুব মোর্শেদ ভাই, মানে ব্লগার, মানে প্রথম আলো ব্লগের একসময়ের মডু, মানে বর্তমানে সমকালের সাহিত্য বিভাগে আছেন, সাথে যিনি একজন প্রাথমিক কালের ব্লগার (সামু যুগে আবির্ভাব) এবং একজন পাড় ফেসবুকিষ্ট। সেই বহুল গুণে বিভূষিত ব্যক্তিটি একটা লালটুকটুকে মোলাটের বই লিখেছেন এবার। উপন্যাস। নাম - ফেস বাই ফেস। অটোগ্রাফ সহকারে বাড়ীতে নিয়ে আসা বইটি পড়ে এককথায় বলব মজা পেয়েছি। আর বেশী কথায় বললে:
মোট ১২০ পাতার বইটির প্রায় শেষের দিকে এই ১০১ পাতার শুরতেই পাওয়া যায়-“ কোথাও গিয়ে দুই বন্ধু প্রেমিকা হারানোর কথা শেয়ার করতে করতে গলা ধরে কান্দি”- এই ডায়ালোগ খানা। পড়ে মনে হচ্ছে দুই বন্ধু মানে দুই যুবক প্রেমিকা হারানোর বেদনায় বেদনার্ত। আসলে এই দুই বন্ধুর একজন আবার নারী ।
চরম ক্লাইমেক্স।
ক্লাইমেক্স শুধু এখানেই না, বইয়ের পরতে পরতে নানান বাঁকে নানান টুইস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। আর মূল উপজীব্য বিষয় মানে ফেসবুক এর পোষ্ট মর্টেম লেখক ভাই চরমভাবেই করেছেন। পাতায পাতায় দেখেবেন ঠিক আপনি যে কাজটি একটু আগে ফেসবুকে করেছেন, ঠিক তাই হয়তো ঘটাচ্ছে আমাদের নায়ক শুভ।
বাস্তবের ফেসবুকে মোর্শেদ ভাই যেমন ক্ষণে ক্ষণে চমৎকার চমৎকার ফেসবুক স্টাটাস দেন ঠিক তেমনি তিনি বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় এর কোন সাংখ্যিক ক্রম না করে ফেসবুক স্টাটাসের মত একটা একটা উরাধূরা জব্বর বাক্য ব্যবহার করেছেন। পড়লেই ভাবনা পড়ে যায়মন--‘ আসলে কি অর্থ সে সব বাক্যের’।
“রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে লোকে যেভাবে ডাব উঁচু করে রস খায় , সেভাবে সুপর্ণার মুখ উঁচু করে ওর মুখে চুমো খাই। ” চুমু খাওয়ার এই উপমা ন্সিন্দেহে ভিনন্নতায় পাঠককে কিঞ্চিৎ ভাবুক করে তোলে।
এমন নানান টুকরো টুকরো ঘটনার বর্ননার ফাঁকে ফাঁকে বইটিতে একটু পরে পরেই এসেছে ফেসুবকের মাঝে শুভর সাথে নতুন বা পুরাতন চেনা বা অচেনা কোন ফেসবুক ফ্রেন্ডের কথোপকথন। দু:খের ঝর্ণা ধারায় শেয়ারিং অথবা প্রেমের কথন।
ফেসবুককে লেখক একজায়গায় নাম দিয়েছেন পেন্ডোরার বাক্স । যথার্থ উপমা। কি নেই আসলে ফেসবুকে । লেখক ও তার এই ফেস বাই ফেসে সেইসব ভার্সেটাইল বৈচিত্র স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলিয়েছেন। এমন চরিত্রের সাথে একদা শুভর আলাপ হয় যে কিনা ফেসবুকে পরবাসী এক মেয়ের সাথে অবাধ নিখাদ প্রেমে পড়ায় দুজনে ফেসবুকেই বিয়ে করে ফেলে, মিথ্যে বিয়ে, ভাবনার বিয়ে, কিন্তুফেসবুকের রিলেশনস্টি স্টাটাসে ম্যারিড টু ...সেই দুজন দুজনার নাম । চিন্তার সূত্র লেখকের ফেসবুকের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পেড়েছে এখানে। এক ব্যবসায়ী ভ্রদ্রলোক পৌঢ় ভদ্রলোক এর সাথে শুভর ফেসবুকে খুব জমে, সে তাকে তার বউয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয় তার প্রিয় এবং ব্যতিক্রম মনে হওয়া শুভর সাথে। একদা সেই গৃহবধূর সাথেও ভিন্ন এক সম্পর্ক গড়ে ওঠে শুভর। আমেরিকাতে একজন মেডিক্যাল এনথ্রপলজিস্ট এবং ডিভোর্সী স্বাধীনচেতা নারীর সাথে শুভর নানান আলোচনায় উপন্যাস চরম ভাবে সামনে এগানোর উপাত্য খুঁজে নিয়েছে। পাঠকও সে সব পড়ে ফেসবুকের মূল মজাটার নির্যাস বুঝতে পারবেন । এই চরিত্রটির সাথে আমি বাস্তবের সেলিনা শিকদার নামক একজন ব্লগার কবির মিল খুঁজে পাই।
এই এক সমস্যা পাঠক কূলের , একটু মিল পেলেই কারও সাথে সেটা মিশিয়ে ফেলে। আমিও ফেলতে ফেলতে ফেলি না। মিল সামান্য , অমিলই আসলে বেশী। হয়তো দেখা যাবে ফেসবুকে ঘটে যাওয়া লেখকের নিজের জীবনের অনেক ঘটনাই একটু একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তিনি এখানে ফুটিয়েছেন।
কোন এক ফেসবুক আইডির নারী চরিত্রের রগরগা প্রোফাইল পিকচার দেখে শুভর যখন মনে হয় সেটা ফেইক, সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে, নারী চরিত্র তাকে প্রমান দেয়ার জণ্য বলে , আমার পিরিয়ড চলছে। তারপর আলোচনা হয় পিরিয়গ হলে মেয়েদের কেমন লাগে সেই সব বিষয়ে। ফেইক চরিত্রের কথায় নারীর ঐ গোপন বিষয়ে বিশদ জ্ঞান তার মেয়ে হবার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। শুভর মনেও এই পিরিয়ডের রিয়েল অনুভিতি জানার তীব্র আকাংখা জেগে ওঠে। ফেসবুকে শুভর সাথে দেখা যায় একজন সুফি সাধিকার ও পরিচয় হয়। সে তাকে নানা পরামর্শ দিতে থাকে।
মোট কথা ইটস এ কমপ্লিট ফেসবুক একটিভিটিস । এখানে একই সাথে চরিত্র গুলোর মাধ্যমে বেশ মজার , রোমান্টিক এবং হৃদয়ঘন অনেক ঘটনাও ফ’টিয়ে তুলেছেন তিনি।
তবে সরি টু সে একটা ছোট ইতিহাসজনিত ভুল করে ফেলেছেন মোর্শেদ ভাই। সেটা বইয়ের ৮৫ পাতায়। সেখানে উনি ভারতের জয়পুরের পিং সিটির আলোচনা করছিলেন। তথায় জয়পুরের রাজা হিসেব টিপু সুলতানের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে জয়পুরে রাজত্ব করত রাজপুতরা। আর টিপু সুলতানের রাজত্ব ছিল মহিশূরে যেটা ভারতের দক্ষিণে। আর জয়পুরের অবস্থান উত্তরে।
এই ছোট ঐতিহাসিক ভুলটা বাদে পুরো বইয়ের ভাষার সাবলিলতা পাঠককে খুব টানার কথা। আমাকে টেনেছে। ফেসবুক জাতীয় হট এবং প্রচন্ড সমসাময়িক একটা বিষয় মাহবুব মোর্শেদ ভাই যে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তারজন্য তাকে সাধুবাদ। 
এক বুক রিভিউ হয়ে গেলো মনে হচ্ছে । তাইলে আজকের ভেতর-বাহির রিভিউ এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাক।
এমনেতেই নানা কারনে মনে উচাটন ভীষন। তারমধ্যে আমার বই আসছে আগামী ১২ তারিখ রোজ শূক্রবার। ১২ দিন পর। এ ১২দিনে কি ১২ টা বই বিক্রি হতো না?





বই এর রিভিউ এ এমনে সব কাহিনীর টুইস্ট বলে দিলে তো আপনি যে মজা পাইছেন রিভিউ পড়া পাঠক সে মজা পাবে না
সব কি আর বললাম আপু.....আরও কত টুইস্ট আছে ।
বহুদ্দিন পর বিকেএসপির সেই টিমের কথা মনে করিয়ে দিলেন। ওরা জিতেছিলো ডানা (ডোনা না) আর গোথিয়া- এই দুটো কাপ। তবে রে ভাই, খেলা দুইটা দেখে আর ভক্তি রাখতে পারি নাই। অনূর্ধ্ব ৯ বা ১১- এমন টুর্নামেন্ট ছিলো, আমাদের সবগুলা তখন রীতিমতো শেইভ করার পর্যায়ে... ওদের বুক এমনকি কোমরের কাছে ইউরোপিয়ান পুচকিগুলা... খেলা শেষ কোলাকুলি করার সময় কোলে উঠে গেছে এমন সব বাচ্চা...। আমাদের কর্মকর্তারা "গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ; গ্রোথ দ্রুত হয়" এইসব ভুজুং ভাজুং দিয়ে আসছিলেন...
মামোভাইকে বইয়ের জন্য অভিনন্দন। ঐতিহাসিক বিষয়টা পয়েন্ট করার জন্য আপনাকে সাধুবাদ।
কথা অবশ্য মিথ্যে কন নাই। ..এখন তো বুঝি আপু। ....তবে আপনার এই নেতিবাচকতা আমার ভাল লাগে। ইহার দরকার আছে।
মামোর জীবনকাহিনী ভাল্লাগলো।
পড়তে মজা লাগলো।
মন্তব্য করুন