ইউজার লগইন

বিবর্তন

১.
দেশী রুই, কাতলা, মাগুর, চিকন চালের ভাত আর খুঁজে পাওয়া দায়। বরং দেখি ইন্ডিয়ান রুই, সিল্ভার কার্প, আফ্রিকান মাগুর আর হাইব্রিড ধানের ভাত। কবুতরের মাংস, বিলের কই, বিলের মাগুর-শিং, পুটি, আইড়, বোয়াল মাছের স্বাদ আজ ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাজা ছোট মাছের চচ্চরি, বাইম মাছের দ্বো-পেয়াজা, পাঁচ মিশেলি শাঁক আর সাথে মশুর ডালের পাঁচ-ফোঁড়ন মেশানো গন্ধ ও স্বাদ কবে উবে গ্যাছে মনে নেই। আগুনে পোড়ানো ঝুপরি বেগুনের ভর্তা খাওয়ার মজা যা আজোও ভোলা যায়না সেই বেগুন-ই নেই বাজারে। আছে এক কেজি ওজনের বিলেতি বেগুন। পোড়ালে ঔষধের গন্ধ।

দেশী মুরগির ডিম মামলেট, মশুর ডালের জম্পেষ রান্না, বগুড়ার লাল আলুর আঠালো ভর্তা যা সেই ঘানির সরিষার তেল দিয়ে মেশানো, মিহি চিকন চালের গরম ভাত আর দেশী গরুর খাটি দুধের গাওয়া ঘিয়ের মজা একবার ভাবুন। জীবনে হয়ত আর এগুলোর দেখাই পাবেন না। যা পাবেন তা হলো ফার্মের মুরগির ডিম, হল্যান্ডের আলু, মিশরীয় মশুর ডাল, পোড়া মবিল (!) মেশানো সরিষার তেল, পাস্তুরিত তরল দুধ আর ঘিয়ের কথা বাদই দিলাম।

ব্ল্যাক বেঙ্গল গোটের শিনার মাংসের কোপ্তা কতদিন খাইনা আর যা পাই তা যে আসলে ভেড়ার মাংস তা জেনেও না জানার ভান করি, দেশী কচি গরু মাংসের ভুনা হয়ে গ্যাছে এখন ইন্ডিয়ান বোল্ডার, মোরগের মাংসের ঝোল এখন বিবর্তিত পাকিস্তানি মোরগের লাল মাংস।

২.
নানির হাতে ভাঁজা মুড়ি খাটি সরিষার তেল, চিকন করে কাটা পেয়াজ আর কাঁচা মরিচ দিয়ে মাখানো আহ যা মজা। কাঁচা আম মাখা সাথে কাশুন্দি, নানা-কিছিমের আচার বানানো হতো আমাদের নানি বাড়ি আর তা বানিয়ে পাঠিয়ে দিত সব ছেলে-মেয়েদের বাড়িতে। গরমের দিনে ক্লান্ত শরীরে ঠান্ডা বেলের সরবতে প্রাণ জুড়িয়ে যেত। আম কুঁড়াতে ঝড়ের দিনে ঝুকি নিয়ে সেই প্রতিযোগিতা, কাঠাল পাকানোর জন্যে লবন লাগিয়ে রাখা, কুল গাছে ঢিল মেড়ে বৃষ্টির সৃষ্টি কত কিইনা ছিল, জাম গাছে পাকা জামে কাপড় রঙ্গিন করে বাড়ী ফেরা আরোও কতকি। এখন এত কস্ট করতে হয়না। হাত বাড়ালেই পাবেন প্রান, একমি, বিডি ঝালমুড়ি, আচার, চানাচুর, আম, কাঠাল, আনারস, কমলা, লিছু সবকিছু।

৩.
রোদের মাঝে সারাদিন দৌড়াদৌড়ির পরে গায়ে জ্বর। পরে মাথায় জলপট্টি। শীতের রাতে ঠান্ডা বাতাসে রাত করে ফিরে সর্দি লাগানো। স্বাভাবিক খাবার বন্ধ রেখে মিস্রি শরবত খাওয়াই হলো তখনকার জ্বরের পথ্য। মাঝে মাঝে লেবু দিয়ে মিস্রি সরবতের লোভে জ্বরের ভান করতাম। নিজেদের বা পাশের বাড়িতে দেখেছি কারোও মাথা ব্যাথা, ম্যালেরিয়া, পেটের অসুখ-বিসুখ, জন্ডিস হতে এবং বার্ধক্য জনিত রোগে স্বাভাবিক মৃত্যু। এখন জ্বর মানে ডেঙ্গু, সোয়ান ফ্লু কমপক্ষে ৫-১০ দিন। স্বাভাবিক মৃত্যুর আগে কমন কোর্স হল ডায়াবেটিক, ব্লাড প্রেসার, ক্যান্সার ইত্যাদি ইত্যাদি।

৪.
মজনু মিয়া পাশের বাসায় উকি দিত যে মেয়েটির দিকে তার পড়নে ছিল সালোয়ার-কামিজ, কখনো ঢং করে পড়ত দেশী সুতি শাড়ী। লম্বা চুল বাঁধানো আর তাতে লাল ফিতে, নয়তো দুইটি বেনি, কখনো বা তার খোপায় হলদে গাঁদা ফুল। চোখে কাজল আর গালে হালকা পাউডার। কখনো বাড়ির পাশে বান্ধবীর সাথে খোশ-গল্প কখনো বা পুরনো পেয়ারা গাছটির নীচে বসে থাকা। এখন সেখানে কনকর্ড এর ২০ তলা বিল্ডিং, আধুনিক ফ্ল্যাটে বিদেশী ফিটিংস, জানালা বেয়ে নেমে গ্যাছে দামী বিদেশী কারটেইন, এক্সপোর্ট কুয়ালিটি সব আসবাবপত্র। কখনো চোখে পরে মেয়েটির জিন্সের প্যান্টের সাথে হাল্কা রঙের স্কাট। চুলে রঙ করা নেমে গ্যাছে কানের একটু নিচে বরাবর। হাতে ব্রেচলেট গালে হাল্কা ফিকে রঙ। গলায় দামী লকেট কানে কিসের দুলনি বোঝা দায়। কখনো মোবাইলে কথোপকথন আবার কখনো বা চলছে আড্ডা ফেসবুক বা ব্লগে।

~

এভাবেই চলছে সবকিছু, হচ্ছে বিবর্তিত প্রতিদিন। হারিয়ে ফেলছি আমাদের মায়াবি চেহারা হয়ে যাচ্ছি যান্ত্রিক। সবকিছুই কত সহজ আজ, অথচ কিছু একটার অভাব সবসময়।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মিতুল's picture


সময় পিষে ফেলছে জীবনকে।জীবনের জন্য আপনার এই আকুতি আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।ভালো থাকুন, এত কিছু হারানোর পরেও।

ইতিকথা's picture


সান্তনা

তানবীরা's picture


যাক, বানান ভুলের বহর দেখে আনন্দ হলো। আমারে ডিফিট দিতে পারবেন Big smile

মেঘলা শ্রাবণী's picture


কষ্ট করে পড়াতেই আমি খুশি। যা বলতে চাই তা' তো বুঝতে পেরেছেন!

টুটুল's picture


যেই পরিমান খাবারের নাম দিলেন... আফসুস Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মেঘলা শ্রাবনী's picture

নিজের সম্পর্কে

কথা কম বলি, কাজ বেশি করি
কিন্তু, মাঝে মাঝে সারাক্ষন শুধু কথাই বলি।
লিখালিখি করতাম হরদম ছোট বেলায়,
আর এখন...

কাজ বেশি, লিখা কম
বাজে কাজ হরদম।
ভুড়িবাজী করে এই
অবশেষে ধরা খাই।
জিম টিমে যাইনা
অবসর পাইনা।

মেঘ ভেজা আকাশে
মেঘ ভাসে বাতাসে।
কভু চাই উড়তে
মেঘটাকে ধরতে।
কখনো যে ওড়েনি, আহা
মেঘলা শ্রাবনী।

স্মৃতিচারণ করতে আমার ভালো লাগে
ছোট বেলার অনেক মধুর মুহূর্তগুলো
কোন ভাবেই ফিকে হতে দিতে চাইনা।
আর সেগুলোই আসবে
এখানে সবচে বেশি...