গুরু হইতে পয়সা লাগেনা
"গুরু হইতে পয়সা লাগেনা", তাহলে? গুরুই দেখিয়েছেন গুরু হওয়ার রহস্য। তিনিই মনে হয় এই উপমহাদেশের একমাত্র কোটি মানুষের মন জয় করা শিল্পী যার কোন আভিধানিক জ্ঞান নেই সঙ্গিতের উপর। আর এটাই তার গুরু হওয়ার রহস্য।
১৯৮৭ সাল বা তার সমসাময়িক সময়ে যখন দেশে স্যাটেলাইট টেলেভিশন আবিস্কার হয়নি তখন পাশের বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ারে গুরুর গান শুনেছি প্রথমবার। গানের ধরন-টরনই আলাদা। ঐ সময়ে কতবার যে আলাল-দুলাল, সালেকা-মালেকা, পাপড়ী কেন বোঝেনা এসব গান শুনেছি তার কোন হিসেব নেই।
এরপরে গুরুকে দেখার আগ্রহ জাগে। আবাসিক হলে যখন থাকতাম তখন এক নবীন-বরণ অনুষ্ঠানে গুরুকে আনার চেষ্টা চলে। ঐ সময় ওনাকে ম্যানেজ করা আর রাজ্য জয় করা সমান কথা। তখন ১৯৯৪ সাল। গুরুর স্টেজ পোগ্রাম মানেই শহর ভেঙ্গে মানুষের ঢল। জায়গা পেতে অনুষ্ঠান শুরুর ২ ঘন্টা আগে থেকেই ভেন্যুর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
স্টেজে আসেন বাংলার পপ-সম্রাট গুরু আজম খান। গুরুকে প্রথম দেখলাম। এতো সাদামাটা মানুষ হবে ভাবিনি। তার চলন বলন, কথা বার্তা সবকিছুতেই একটা ভিন্ন রকমের মাত্রার প্রকাশ ঘটে। মানুষের চাপে ভর্তা হবার উপক্রম কিন্তু তাতে আমার কোন ক্লান্তি নেই। তার গানের সাথে যে অসাধারন ভঙ্গিমা আর অকৃত্রিম আবেগ মেশান তিনি তা যারা দেখেননি তারা নিঃসন্দেহে মিস করেছেন।
তার আবেগঘন গানের সরল সাবলীল ভাষা আর উচ্চারনের শৈল্পিতা বুকের মাঝে বিনা নোটিশেই আঘাত করতে থাকে। অনুষ্ঠানে সবাই একাকার হয়ে যান তার আত্মার সাথে। তখন কে আজম খান আর কে ভিন্ন তার কোন বিভেদ থাকেনা। অসাধারন আর সাবলীল পদক্ষেপ তার প্রতিটি উচ্চারণে। একে একে গেয়ে চলেন ৯টি গান। পাশের বাসায় ক্যাসেট প্লেয়ারে যেগুলো শুনতাম তার সব গুলোই। তার গানে নেই কোন স্বার্থ নেই কোন বিভেদ। নেই কোন রাজনীতি নেই কোন দ্বেষ। তার গানে আছে ভালবাসা আছে আবেগ। আছে জীবনের কথা অবহেলিতের ব্যাথা। এখন তিনি নেই তবে রয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। তিনি যে গান শুনিয়েছেন আমাদের তার কোন গুরু নেই। আর তাই তিনি গুরু যার কোন ঋণ নেই।
আজ তিনি নেই তবে রবে চিরদিন আমাদের মাঝে!





গুরুকে প্রায়ই দেখতাম বাজার করে ফিরছেন নটডম কলেজের পাশের রাস্তা দিয়ে।
ভালো লাগলো। গুরু আমারও খুব প্রিয়। তবে কোন গুরুর কাছে গান না শিখে শিল্পী হবার অনেক নজির আছে। আপাতত কিশোর কুমারের কথা মনে পড়ছে। দলছুটের সঞ্জীব চৌধুরীও কারো কাছে গান শেখেননি।
ঠিক, তবে উনি বাংলা গানের একটি দিক উন্মোচন করেছেন আর সে জন্যেই সবাই তাকে "গুরু" মানে। শিল্পীর অভাব নেই তবে গুরু ক'জনে?
উনি নেই ভাবতেই মন কেমন করে!
গুরু আজম খান নতুন করে জন্ম নিলেন বাঙ্গালির কাছে। এখন তিনি অমর, তাঁর বিনাশ নেই। আমরা কত ভাগ্যবান, এমন কিংবদন্তী আমাদের সময়কালে প্রত্যক্ষভাবে নাড়া দিয়ে গেছেন।
এমন একটা মানুষ যাকে নিয়ে কখনো কোনো বিতর্ক হয়নি। এইটাই আমার কাছে অসাধারণ লাগে।
চমৎকার শিরোনাম
ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন