ইউজার লগইন

একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-৬)

জন সার - সাংবাদিক, লাইফ ম্যাগাজিন

বিখ্যাত লাইফ ম্যাগাজিনের সাংবাদিক JOHN SAAR একাত্তরের জুনে কলকাতায় এসে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন এলাকা। শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে ঘুরে ঘুরে তিনি যুদ্ধের সময়কালীন অনেক লোমহর্ষক ঘটনার চিত্র তুলে ধরেছেন আর সে সময়ের তার সাথে ক্যামেরাম্যান MARK GODFREY এর তোলা দুর্লভ ছবিগুলি আজও সেই ভয়াল কালো সময়ের সাক্ষী হিসেবে বিদ্যমান। JOHN SAAR এর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে অনেক মানুষের, শরনার্থীর সাক্ষাতকার নিয়ে প্রকাশ করেছেন। তাতে ফুটে উঠেছে অনেক নির্মম চিত্র। পাক বাহিনীর অনেক অত্যাচারের চিত্র ফুটে উঠেছে সেই লেখায়। বেঁচে পালিয়ে সীমান্তের ওপাড়ে পৌছে যাওয়া অনেকের কাছ থেকে জানা যায়- আগুন দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া সহ নিরীহ অসহায় গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে পাক বাহিনী। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু কিশোরও রক্ষা পায়নি তাদের অত্যাচারের হাত থেকে।

একাত্তরের আগস্টে প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের একটি নিউজ ছিল এ রকম- JOHN SAAR এর বর্ননামতে- তাদের চলার পথে রাস্তায় সর্বত্রই মৃত মানুষ পড়ে আছে। আকাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসা শকুন মরা মানুষের গা থেকে ছিঁড়ে ফেলছে কাপড়, তখনো তাদের অনেকের শরীর গরম! তীক্ষ্ণ, ধারালো ঠোঁটের ঠোকরে ছিঁড়ে খুবলে খাচ্ছে মরা মানুষের দেহ। এই বিপুল সংখ্যক মৃত মানুষের দেহ ঝাঁকে ঝাঁকে শকুনও খেয়ে শেষ করতে পারছিল না, তাদেরও খাওয়ায় অরুচি ধরে গেছে। জন সার দেখতে পেলেন রাস্তার পাশের ধান ক্ষেতে শাড়ির অংশ দিয়ে মোড়ানো একটি শিশুর মৃতদেহ। শরনার্থীবাহী ট্রাকে চলার কোন এক সময় অসুস্থ শিশুটি মারা গেছে। চলন্ত ট্রাক আর থামেনি, পুটুলি করা শিশুটির মৃতদেহটি চলন্ত ট্রাক থেকে রাস্তার পাশেই ফেলে দেয়া হয়েছে।

group picture_0.jpg

একজন ক্রন্দনরত মহিলার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন JOHN SAAR। মহিলাটি শরণার্থীদের দলের সঙ্গে সীমান্ত পার হয়ে এসেছে। মহিলাটি বলছিল,“ওরা আমাদের পিছনে তাড়া করেছে,আমাদেরকে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে। আমার শিশু সন্তান ছিল আমার কাঁধের উপরেই। লাঠির আঘাতে ওর মাথা গুড়িয়ে গেছে,এখনো ওর রক্ত লেগে আছে আমার গায়ে। ও নেই, তখুনি মারা গেছে।“

এইসব খবরগুলো নিয়মিতভাবেই প্রচার করা হত লাইফ ম্যাগাজিনে, বিশ্ববাসীর জানার সুযোগ হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে ঘটে যাওয়া প্রকৃত ঘটনা জানার।

বার্নার্ড ব্রেইন

Bernard_Braine.jpg

একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান টালমাটাল পরিস্থিতি নিয়ে দ্য টাইম পত্রিকায় একটি বিশাল বিবৃতি পাঠান ব্রিটিশ এমপি বার্নার্ড ব্রেইন, যা ছিল অনেকটা এরকম-

দিনের আলো শেষ হলে রাত আসবে এটা যেমন সত্যি, আন্তর্জাতিক মহল যদি এগিয়ে না আসে, তা হলে অক্টোবর নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আসবে, এটাও অবধারিত। গত মাসে পূর্ব পাকিস্তান সফর করেছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল, তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখেনি। জনগণ এখনো আতঙ্কের মধ্যে দিন যাপন করছে, সেখানে সবার মধ্যেই বিরাজ করছে একটি অবিশ্বাসের পরিবেশে। সরকারি চাকুরিজীবিরা অফিসে যেতে পারছেন না। যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত। যতই দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই খারাপ হচ্ছে। এর মধ্যেই ভারতে জমা হয়েছে প্রায় পঁচাত্তর লাখ শরণার্থী এবং দিন দিন এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দুর্ভিক্ষের আরও বড় দুর্যোগ অপেক্ষমান- এটা অবিশ্বাস করার কারণ কি?

জমি যথেষ্ট উর্বর এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ার পরও প্রদেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টি যেন লেগেই ছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে পশ্চিম ইউরোপ ও উভয় আমেরিকার মানুষের জন্য যেখানে গড়ে দৈনিক দুই হাজার সাতশ ক্যালরি শক্তির খাবার বরাদ্ধ থাকে, সেখানে এই দেশের গড় এক হাজার সাতশ ক্যালরি। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্যশস্য উত্পন্ন হয়েছে গড়ে এক কোটি আট লাখ মেট্রিক টন আর ঘাটতি পূরণের জন্য আমদানি করতে হয়েছে বারো লাখ মেট্রিক টন। এই ঘাটতি তো আছেই, ইউএসএআইডির ডক্টর রোহডের হিসাব মতে, এই বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ২২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন কম উত্পাদন হবে। ১৯৪৩ এর পর এই প্রথম পূর্ব পাকিস্তান এত বড় ঘাটতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। অবস্থা যদি একই থাকে, দুর্ভিক্ষের কারণে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষের মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা। ১৯৭০ সালে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে ১৫ লাখ টন খাদ্যশস্য। যদি সম্পুর্ণ ঘাটতি মেটানোর মতো খাদ্য বন্দরে এসে পৌঁছায়ও, তা সব ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে না। চট্টগ্রামসহ অন্যান্য বন্দরের কর্মক্ষমতা কমে গেছে অনেক এবং শ্রমিকদের অধিকাংশই পালিয়ে গেছে, রাস্তাঘাটগুলো যানবাহন চলাচলের অযোগ্য হয়ে আছে। এ কারণেই অভুক্ত মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছানোটা একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

অগস্টের শেষ সপ্তাহে কানাডার টরোন্টোয় অনুষ্ঠিতব্য বেসরকারি সংস্থাসমূহের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তানের দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে তিনটি প্রস্তাব পেশ করুন-

১. বিরোধী বিদ্রোহীরা খাদ্য সরবরাহে বাধা দেবে না এবং সহযোগিতা করবে।
২. জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যারা প্রকৃত অভাবী তাদের মধ্যেই খাদ্য বিতরণ করতে হবে।
৩. একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলকে পরিস্থিতি তদারকির জন্য পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করতে দিতে হবে, যারা চাহিদা নিরূপণসহ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।

সময় খুব কম, বিশ্ব সম্প্রদায় না সজাগ না হলে অভাবনীয় মানবিক দুর্যোগ দেখার জন্য এখনই তাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।


নিকোলাই পদগর্নি

Nicolai_Podgorny.jpg

একাত্তরে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আমরা পাশে পাইনি, প্রথম থেকেই আমাদের পাশে এসে দাড়িয়েছিল তৎকালীন আরেক পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সয়ং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বাংলাদেশের জনগনেরর উপর অত্যাচার নিপীড়ন বন্ধ তথা তাদের প্রতি ন্যয্য ও শান্তিপুর্ন সমাধানের পদক্ষেপ নেয়ার জন্য একটি চিঠি লিখেছেন, তা অনেকটা এ রকম-

সম্মানিত প্রেসিডেন্ট,

সোভিয়েত ইউনিয়নে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, ঢাকায় শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর সামরিক বাহিনী কর্তৃক চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহন ও শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ওখানে যে ঘটনাগুলো ঘটছে এবং যার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের অগনিত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু, ধ্বংশ আর দুর্গতির স্বীকার হওয়ার খবরে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণও শঙ্কিত না হয়ে পারে না। অল্প কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য রাজনীতিবিদ যারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন তাদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের খবরে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগন চিন্তিত হয়ে পড়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগন সবসময়ই পাকিস্তানের শুভাকাঙ্ক্ষী এবং তাদের উন্নয়নের প্রত্যাশী, দেশের যে কোন বড় সমস্যা হোকনা কেন গনতান্ত্রিক সমাধানে সোভিয়েত জনগন সমভাবে আনন্দিত হয়েছে। আমরা মনে করি এই সময়ে পাকিস্তান যে জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে কোন শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করা সম্ভব এবং সেটাই হওয়া উচিৎ। পূর্ব পাকিস্তানের জনগনের উপর দমন-পীড়ন, অত্যাচার আর মৃত্যু সমাধানের পথকে রুদ্ধ করে দিবে আর তা মানুষের মৌলিক স্বার্থহানি ঘটাবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ সোভিয়েত প্রেসিডিয়ামের পক্ষ থেকে আপনাকে জানানো আমাদের কর্তব্য যে যত দ্রুত সম্ভব মৃত্যু-হানাহানি বন্ধ করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর অত্যাচার-জুলুম কমিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বের করুন। আমরা বিশ্বাস করি, একমাত্র এই পথেই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখা সম্ভবপর হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণ যে কোন শান্তিপূর্ণ সমাধানে আনন্দের সাথে গ্রহণ করবে। বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণার মানবিক মূলনীতি অনুসারে আমরা এই অনুরোধ জানাচ্ছি, আমরা পাকিস্তানের বন্ধুপ্রতিম জনগণের সম্মতিতেই তাদের সবার জন্য এই অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রেসিডেন্ট সাহেব, আমরা আশা করব, এ চিঠির প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবনে আপনি সক্ষম হবেন। যত দ্রুত সম্ভব পূর্ব পাকিস্থানে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক এই আমাদের প্রত্যাশা।

এন. পদগর্নি
মস্কো, ক্রেমলিন ২ এপ্রিল, ১৯৭১


ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল সেই বুট পালিশওয়ালা বালকদের দল

 টার্মিনাল সেই বুট পালিশওয়ালা বালকদের দল.jpg

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে ভারতীয় মিত্র বাহিনী, সেই সাথে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দেশের মহৎ হৃদয়ের ব্যক্তিবর্গকেও আমাদের দুর্দিনে পেয়েছি আমাদের পাশে। এই স্বাধীনতার স্বাক্ষী হয়ে আছে ছোট বড় কত ঘটনা! তার অনেক ঘটনাই রয়ে গেছে অজানা, কিন্তু একটি যুদ্ধে এ রকম সব ঘটনারই তাৎপর্য রয়েছে। যে কোন অবদানকে ছোট করে দেখা মোটেই কাম্য নয়। এ রকম একটি খুব ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা এখানে তুলে ধরা হল-

এই সময়ের পরিচিত ভারতের মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি রেলস্টেশন, যা একাত্তরে ভিক্টোরিয়া টার্মিনাল বা ভিটি রেলস্টেশন নামে সবাই জানতো, এই স্টেশনের সামনে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ছোট ঘটনা ঘটে কিন্তু মানবতার প্রতি ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে এটি মোটেই ছোট নয়। সেদিন সেই স্টেশনের খেটে খাওয়া বুট পালিশওয়ালা বালকদের একটি দল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের এক দিনের রোজগার তুলে দেবে মহারাষ্ট্রের বাংলাদেশ-সহায়ক সমিতির হাতে। এবং তারা সবাই মিলে তাদের উপার্জনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দান করেছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য।

কিছুটা আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে সেদিন সকালে নিজের জুতা পালিশ করিয়ে অর্থ সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন করেছিলেন বোম্বাইয়ের বিশিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাহিন্দ্র অ্যান্ড মাহিন্দ্রের প্রধান নির্বাহী। বুট পালিশওয়ালা বালকদের মানবতার প্রতি এই মহতি উদ্যোগের খবর বিশেষ আলোড়িত করেছিল মহারাষ্ট্রের তৎকালীন গভর্নর আলী ইয়ার জং কে। বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা হায়দরাবাদের নিজাম-পরিবারের এই সদস্য ছিলেন ভারতীয় অবাঙালি মুসলিমদের মধ্যে এক অন্যতম ব্যতিক্রমী। বুট পালিশওয়ালা বালকদের এমন কাজে মুগ্ধ হয়ে তিনি এক বিকেলে সেই বালকদের মালাবার হিলের শ্বেতপ্রাসাদ, গভর্নরের ভবনে চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এভাবেই বুট পালিশ বালকদের সাথে সংহতি জানিয়েছিলেন তৎকালীন গভর্নর, তবে বাংলাদেশের পক্ষে থেকে সেই ঋণ আজও আমরা শোধ করতে পারিনি।

লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা

কিছু কিছু মানুষ থাকেন যারা মানবতার জন্য শুধু কাজই করে যান বিনিময়ে পান না কোন প্রতিদান, কিংবা বলা যেতে পারে তারা এটা চানই না! থেকে যান লোকচক্ষুর আড়ালে, কেউ তাকে মনে করুক বা না করুক তার যেন তাতে কিছুই আসে যায় না। তার কাজটি কেবল করে যান পরম নিষ্ঠা, পরম আবেগের সাথে।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিতত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’, লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন টিয়ার্স’, কিংবা বোম্বেতে ব্রাবোর্ন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ‘স্ট্রিংস্ অ্যান্ড ফায়ার কনসার্ট’ ইত্যাদি অনেক বড় পরিসরে আয়োজিত অনুষ্ঠানের কথা সবার জানা থাকলেও প্রায় সবার অজ্ঞাতই রয়ে গেছেন লিভারপুলের লি ব্রেনান ও তাঁর সঙ্গীরা।

লি ব্রেনন, যুক্তরাজ্যের লিভারপুলের একজন অখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী। বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর অসহায় মানুষের মৃত্যুর খবর পেয়ে বিচলিত হয়ে ওঠেন এই তরুণ। এবং বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দুর্দশায় তাড়িত হয়ে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে কিছু গান লিখেছিলেন এবং পরম যত্ন সহকারে সেগুলোতে সুর করেছিলেন। তার বন্ধুদের নিয়ে অনেক সংগ্রাম করে অখ্যাত এক স্টুডিও থেকে একটি রেকর্ডও বের করেছিলেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর বাণীসংবলিত করে কেবল একরঙা কভারে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে প্রকাশ করেছিলেন রেকর্ডটি। রেকর্ডের ওপর আবু সাঈদ চৌধুরী লিখে রেখেছেন, ‘সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ লড়ে যাবে। আমাদের স্বাধীনতা আসবেই। বাংলাদেশের এ সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তা করার জন্য আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি লি ব্রেনন, ডন, প্যাটি টমাস, জন ব্রাউন, জিমি সেফটনকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তাঁদের এই অসামান্য অবদানের জন্য।’

সেই রেকর্ডের গানগুলি যে খুব জনপ্রিয় ছিল তা নয়, কিন্তু বাংলার মানুষের প্রতি ভালবাসা, আবেগের কোন কমতি ছিলনা। একটি গানের কথা ছিল এরকম- ‘In the name of humanity don’t allow Bangladesh fight alone. / Help them in their hour of need.’ ‘মানবতার লক্ষ্যে বাংলাদেশের মানুষকে একা লড়তে দিয়ো না, তাদের এই চরম সংকটের মুহূর্তে সাহায্য করো।’

ব্যাগে রেকর্ড নিয়ে লি ব্রেনান গিটার বাজিয়ে এই গান গেয়ে শহরের রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে পার্কগুলোতে ঘুরে বেড়াতেন, আর রেকর্ড বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করতেন বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য কবলিত মানুষের জন্য। পরবর্তীতে যতটুকু জানা যায়, বিদেশের মাটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়তে তখন কাজ করছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। যুক্তরাজ্যের লিভারপুলে তাঁর তত্বাবধানে একটি কমিটি গঠিতও হয়েছিল। মনে করা হয়, এই টিমের সহায়তা নিয়েই লি ব্রেনন ও তাঁর বন্ধুদের দলটি সারা শহরে ঘুরে ঘুরে এইসব গান গাইতেন আর অ্যালবাম বেচতেন। তাঁর গানেরদলে অন্য বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন ডন, প্যাটি টমাস, জন ব্রাউন ও জিমি সেফটন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তিনিও সেদিন আনন্দে ভেসেছিলেন আমাদের মতোই। তারপর কোথায় যে হারিয়ে গেছেন এই যুবক কেউ তার হদিস জানে না। এক অদ্ভুত উপায়ে এ রেকর্ডটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষের হাতে এসে পড়ে, প্রায় সাত/আট বছয় আগের ঘটনা- একজন প্রবাসী বাঙালি লি ব্রেননের এই ভাঙা রেকর্ডটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রবেশ ফটকে রেখে চলে গিয়েছিলেন। আর কখনোই তাঁর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক তাঁর খোঁজখবর করতে চেষ্টা করছেন। তিনি এ বিষয়ে লেখালেখিও করেছেন। তাঁর আত্যন্তিক আশা, লি ব্রেননের খোঁজ মিলবে। তাঁর গানের একটি ছোট্ট রেকর্ড আজও সংগ্রহীত আছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

চলবে....

একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-১)
একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-২)
একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-৩)
একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-৪)
একাত্তরের বিদেশী বন্ধুগণঃ আমাদের দুঃসময়ের সূর্যসারথি (পর্ব-৫)

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


অনেক খোঁজ করেও লি ব্রেনানের কোন ছবি পাওয়া যাওনি। কারো সংগ্রহে থাকলে প্লিজ হেল্পান।

আরাফাত শান্ত's picture


বুটপালিশের গল্প শুনে চোখে পানি এসে পড়লো!

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


এরাই সত্যিকারের মানুষ, আমরা কেবল নিতেই জানি, কখনও কাউকে সঠিক মূল্যায়ন করতে শিখিনি।

জেবীন's picture


সিরিজটার জন্যে ধন্যবাদ নিভৃত স্বপ্নচারী।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আপনাকেও ধন্যবাদ সময় করে পড়ার জন্য।

টুটুল's picture


কত্ত কি যে জানি না Sad

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আসলেই আমরা অনেক কম জানি! Puzzled

লিজা's picture


সকালেই খুব ভালো একটা লেখা পড়লাম Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


পড়ার জন্য ধইন্না Smile

১০

শওকত মাসুম's picture


অনেক কিছুই জানতাম না। দারুণ পোস্ট

১১

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধন্যবাদ মাসুম ভাই।

১২

টোকাই's picture


দারুন কালেকশন

১৩

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


ধইন্যা পাতা

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture

নিজের সম্পর্কে

খুব সাধারণ মানুষ। ভালবাসি দেশ, দেশের মানুষ। ঘৃণা করি কপটতা, মিথ্যাচার আর অবশ্যই অবশ্যই রাজাকারদের। স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের, একটি সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের।