মেঘবন্দী (৬) ... বর্ষার তিন ছত্র / আশফাকুর র
বর্ষার তিন ছত্র
আশফাকুর র
বৃষ্টি।পৃথিবীর সকল দেশের সকল মানুষের কাছে বৃষ্টি এক প্রার্থিত নাম। আর আবহাওয়া, অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক নানা কারণে আমাদের দেশে বৃষ্টি এক চিরচেনা ও প্রার্থিত অতিথির নাম। আমাদের দেশের সাহিত্যেও তাই বৃষ্টি আর বর্ষার মারাত্মক প্রভাব। এক বর্ষাকে ঘিরেই আমাদের কবিরা লিখেছেন হাজার হাজার ছত্র। আমাদের সাধারন জীবনেও বৃষ্টির প্রভাব কম নয়। বৃষ্টির রূপ নানারূপে আসে আমাদের কাছে আসে আমাদের জীবনের নানা সময়ে। বৃষ্টির এই রূপের বিবর্তন আমাদের জীবনের এক অসাধারন অংশ। আমার মতে রুপের এই বিবর্তন তিন ছত্রে। তাহল শৈশব, কৈশোর আর যৌবন কালে।
বাংলাদেশে শিশুদের এক অপুর্ব অভ্যাস স্কুল কামাই করা।শৈশবে তাই বৃষ্টি আমাদের এক অস্ত্র স্কুলে না যাওয়ার। সকালে ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টির প্রবল শব্দে আনন্দে লাফাতে বাইরে তাকিয়ে যখন দেখে রাস্তা ধুয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির ধারায় তখন সে বুঝতে পারে আজ সে পাচ্ছে ছুটি। বহুল আকাঙ্খিত ছুটি।আবার অনেক সময় নতুন ছাতা দেখানোর লোভে বা বৃষ্টিতে ভেজার জন্য আমরা যেতে চাইলেও মা বাবার যেতে দিতেন না।তারা বলতেন আজ বৃষ্টির ছুটি হবে। কেউ স্কুলে যেতে পারবেনা।স্কুল খালি থাকবে।স্কুলে গিয়ে লাভ নেই। বাসায় থাক।বাসায় থাকা হয় তাদের।ঝমঝম বৃষ্টি পড়তে থাকে। টিনের ছাদ হলে সেই বৃষ্টিপাতের এক বিকট ছন্দের সৃষ্টি হয়। কখনো বা জানালা দিয়ে বাইরে বৃষ্টিপাত দেখা হয়। বৃষ্টিতে ভিজে যায় সব গাছ ।কচুপাতাগুলা অসহায়ের মত বারিধারা কে নিজের গা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা চালায়।অসাধারন সব দৃশ্য। বিকালের দিকে বৃষ্টি কমলে দেখা যেত কয়েকটা কাক গা ঝাড়ছে।সেইসময় ই সবাই বেড়িয়ে পড়ে ফুটবল খেলার জন্য। ফুটবল খেলার মাঝখানেই শুরু হত ঝুম বৃষ্টি। একদিকে ফুটবল খেলে তারা ক্লান্ত হচ্ছে আর অন্যদিকে বারিধারায় নেয়ে সজীব হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলার অভ্যাস চলে একেবারে সারা শৈশব ,কিশোর বা বলতে গেলে সারা যৌবনেই।মূলত আমাদের শৈশবের বর্ষাতে স্কুল কামাই দেয়া, বৃষ্টিতে ভেজা বৃষ্টি দেখা , ফুটবল খেলা এসবই মূল আকর্ষণ।বৃষ্টির আরো রূপ এর পারিপার্শ্বিক আরো ব্যাপারগুলা ধরা পড়ে আরো বড় হলে।
কৈশোরে বর্ষা আমাদের কাছে আসে আরেকটু অন্যরূপে।যাদের কবি হবার বাসনা বা নিয়তি থাকে তারা তাদের প্রতিভা এই সময়েই বিকশিত করতে থাকে। বাসায় ছাদ খোলা থাকলে এসময় লুকিয়ে চুকিয়ে বৃষ্টিতে ভেজা হয়।গ্রীষ্মের খরতাপের পর হঠাৎ যখন বৃষ্টি হয় তখন মাটির এক পোড়া গন্ধ আসে। এঈ বয়সেই তা উপলব্ধি করা হয়। এই সোঁদা মাটির গন্ধ যেন মাটির স্বস্তির নিঃশ্বাস। মাটিও যেন পরমানন্দে করে বৃষ্টিস্নান। এ সময় প্রায়ই বই পড়া হয়। বাসায় শুয়ে শুয়ে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে আর এর মাঝে বই পড়া হয়। তার চেয়েও ভাল হয়। যদি জানালা খোলা রেখে টেবিলে বসে প্রয়োজনীয় বই সব নিরাপদ দুরত্বে রেখে বই পড়া যায়। অসাধারন এক অনুভূতি। যে গল্পের বই ই পড়া হোক না কেন অসাধারন অনুভূতি। দীপু নাম্বার টু বা শওকত আলীর “প্রোদোষে প্রাকৃতজন” যাই হোক না কেন অসাধারন লাগত। আবার মাঝে মাঝে বাসায় বাবা থাকলে প্রায়ই বই পড়া অসম্ভব। তাই এসময় আমি পড়তাম রচনার বইয়ে একটি বর্ষণমুখর দিন টাইপের রচনা গুলা। ভালোই লাগত। বর্ষার যে আলাদা একটা রসনাবিলাস আছে আমি জানলাম এসব রচনার বই পড়ে। গরম ভাজাভুজা খাওয়া, খিচুরি, মাছভাজা বা মাংসভুনা খাওয়ার আবদারের শুরু তখন থেকেই।যারা সাইকেল চালাতে জানে তারা জানে বর্ষার মাঝে সাইকেল চালানোর কি মজা। দ্রুত গতিতে সাইকেল চলছে। আর তার বিপরীতে ভোঁতা তীরের মত আঘাত করে বৃষ্টির ফোঁটা। আবার কৈশোরে বৃষ্টি বন্দীও করে ফেলে আমাদের ঘরের কোণায়। কোন একটা জায়গায় যাওয়ার আগে শতবার চিন্তা করতে হয় যাব কি যাবনা। বৃষ্টি বেশী হলে আসব কি করে?আবার রাস্তাঘাটের যে অবস্থা তাতে যাব কি করে? অবশ্য এটাও ঠিক যে এসব যতটা না নিজের চিন্তা তার চেয়ে বেশী মা বাবার আরোপিত চিন্তা।কৈশোরে বর্ষা আসলে আমাদের সামনে চিন্তা আর একান্তে ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।আমাদের সামনে একটা অনুভূতির সৃষ্টি করে যেন আমরা “বহু জনতার মাঝে অপুর্ব একা”।আশেপাশে আরো অনেক কিছু আছে যা ভুলে গিয়ে একটা অনুভূতির সৃষ্টি করে যা জীবনে প্রথমবারের মত “এখানে শুধু বৃষ্টি হচ্ছে আর আমি আছি।একেবারে একা।” কৈশোরের বর্ষা আমাদের তাই প্রথম একাকীত্বের পাঠ দেয়। অন্যান্য দেশের কথা জানিনা কিন্তূ আমাদের বর্ষা তাই করে।
আস্তে আস্তে বয়স বাড়ে আমরা কিশোর থেকে যুবক হতে থাকি। আর এই সন্ধিক্ষণে আমাদের চোখে বর্ষার রূপ ও পালটে যেতে থাকে। হয়ত আরো পরিণত হতে থাকে বা আরো অপরিণত হতে থাকে।এসময় মনে হয় বর্ষা টা একা কোন ঋতু নয়। এটা দুজন মিলে উপভোগের একটা ঋতু। কবিগুরুও তো তাই বলেন “এমন দিনে তারে বলা যায়………… এমন ঘন ঘোর বরিষায়”। ধরুন কোন বর্ষা কালে মূষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে আমার কাছে ছাতা আছে। কিন্তু আমার পাশের সহপাঠিনীর কাছে নেই। কোন কারণে সে আশ্রয় নিল আমার ছাতার নিচে। অসাবধানতায় বা বৃষ্টির ঝাপ্টায় আমার হাত ছুয়ে গেল তার হাত। আপনি তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন। একটা মিষ্টি হাসিবিনিময় হল। হয়ত এটা তার জন্য তেমন কিছু নয়।আবার হতে পারে তার জন্য ও এটা কিছু। কিন্তূ আমার জন্য এটা যে অনেক কিছু। আমি তো সারাদিন ভাবব এই ঘটনা নিয়ে। আমি তো চাইব সারাদিন এমন বৃষ্টি হোক, আমি তো চাইব সকল ছাতার দোকান বন্ধ হয়ে যাক। আমি চাইব নিজে কাক ভেজা হয়ে হলেও তাকে ছাতার নিচে রাখতে, তাকে নিয়ে হেটে যেতে চাব অনন্তপথ। বর্ষা ছাড়া আর কোন ঋতু কি পারে এত সহজে মনের আকাশে স্বপ্নের রঙধনু এঁকে দিতে। ছাদের মাঝে বসে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এলোমেলো ভাবনায় ভেসে যাওয়া সম্ভব এই বর্ষাতেই। পরিণত বর্ষাতেও বই পড়ার একটা আলাদা মজা আছে। আর বইটা যদি হয় শেষের কবিতা তবে তা নিজেকে আর পৃথিবীতে রাখেনা।আকাশের মেঘের সাথে মিশিয়ে দেয়। ছাদের কোণায় বৃষ্টি থেকে বেঁচে যাওয়া সানসেডের নিচে বৃষ্টি পরছে আর ঝম ঝম আওয়াজ হচ্ছে আর লাবন্য আর অমিতের সাথে হেঁটে যাছি আমি। রোমান্টিকতার সূচনা হয় পরিণত বর্ষায়।
অনেকে বলতে পারে রোমান্টিকতার সময় বসন্তে। দ্বিমত নেই। কিন্তু বসন্ত হল রোমান্টিকতার পরিণতির সময়।যৌবনের বর্ষা হল দুই জনের।
আমার দৃষ্টিতে আমাদের জীবনে বর্ষার এই তিন রূপ।
চর্যাপদ না কোন এক জায়গায় একটা ছত্র পড়েছিলাম;
কি হবে তোর তপস্যায় ,
কি হবে তোর নৈবেদ্যে,
মোক্ষ কি মেলে জলে স্নান করে?
আমি বলতাম মেলে। মোক্ষ মিলে। বৃষ্টির জলে স্নান করে মনের মোক্ষ মিলে। বর্ষায় ভিজে সজীব আত্মার অধিকারী না হওয়া গেলেও সজীব হতে চাওয়া এক আত্মার দেখা মিলে। বর্ষার ধারায় তাই যেন ধুয়ে যায় সকল পাপ আর আবর্জনা।রোমান্টিকতার সুচনা হোক একেবারে নিষ্পাপ।





ভালো পোলাটারে টাকায় খাইলো।

রাসেল ভাইয়া, বাঁশ দিলেন? আপনেও?
(
(
আজ ঢাকায় বৃষ্টি হচ্ছে... আর পড়লামও বৃষ্টি বিষয়ক লেখা
উত্তম লেখা।
লেখায় পেলাচ
মন্তব্য করুন