ইউজার লগইন

বাঙালির গরব : হাজার বছর আগে বাঙালিরা জনগনের মধ্য থেকে রাজা নির্বাচিত করেছিল দেশকে অরাজকতা থেকে রক্ষা করার জন্য

ব্যক্তিই পারে পরিবর্তন করতে সমগ্র জাতির ভাগ্য।
ব্যক্তিই পারে সৃষ্টি করতে নতুন ইতিহাসের।

একজন ব্যক্তি মহাত্মা গান্ধী সারা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন প্রতিবাদের নতুন তরীকা।
একজন ব্যক্তি নেলসন মেন্ডেলা সারা দক্ষিন আফ্রিকার বর্ণবাদের শৃঙখল ভেঙেছেন।
একজন ব্যক্তি শেখ মুজিব একটা জাতিকে হাজার বছরের গোলামির গ্লানি দূর করে স্বাধীন ভূখন্ড উপহার দিয়েছে।

একজন ব্যক্তি রাজা গোপাল একশ বৎসরের মাৎসান্যায়ের অবসান ঘটিয়ে হতদ্যম বিশৃঙখল নিজ জাতিকে সমৃদ্ধিশালি গর্বিত জাতিতে উন্নীত করেছিলেন।

হাজার বছর পিছনের বাঙালির গর্বের সেই চমকপ্রদ অভূতপূর্ব ঘটনাবলীর দিকে একটু নজর ফেলা যাক।
দেব পালের সাম্রাজ্য
ছবি: দেব পালের সাম্রাজ্য

মাৎসান্যায়
বাঙালি রাজা শশান্কের গৌড়কে কেন্দ্র করে বৃহত্তর গৌড়তন্ত্র গড়ে তুলার প্রচেষ্টা তার মৃত্যুর পর ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। শশান্কের ধনুকে গুণ টানার মত বীর অব্যবহিত পরে আর দেখা গেল না। ফলে এর পর সুদীর্ঘ একশত বৎসর(৬৫০ -৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) সমগ্র বাংলার উপর নেমে আসে গভীর ও সর্বব্যাপী বিশৃঙখলা, মাৎসান্যায়ের অরাজকাতা।

প্রখ্যাত বৌদ্ধ ইতিহাস রচয়িতা তারানাথ এই সময় সম্পর্কে বলেন,
'সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া অভুতপূর্ব নৈরাজ্যের সূত্রপাত হয়। গৌড়ে-বঙ্গে সমতটে তখন আর কোনও রাজার আধিপত্য নাই, সর্বময় রাষ্ট্রীয় প্রভুত্ব তো নাইই। রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন; ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ। নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, কাল তাহার মস্তক ধূলায় লুটাইতেছে।'

এর চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কী হতে পারে! সমসাময়িক লিপি ও কাব্যে (রামচরিত) এ ধরনের নৈরাজ্যকে বলা হয়েছে মাৎসান্যায়। বাহুবলই একামাত্র বল, সমস্ত দেশময় উচ্ছৃঙ্খল বিশৃঙ্খল শক্তির উন্মত্ততা; দেশের এই অবস্থাকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে তাকেই বলে মাৎসান্যায়। অর্থাৎ বড় মাছের ছোট মাছকে গ্রাস করার যে ন্যায় বা যুক্তি সেই ন্যায়ের অপ্রতিহত রাজত্ব।

শত বৎসরের এই মাৎসান্যায়ের নৈরাজ্যে বাংলায় আর্থ সামাজিক অবস্থা চরম নাজুক অবস্থায় পতিত হয়। এই নৈরাজ্যে সাধারণ মনুষের জীবনে কি পরিমান ভোগান্তি ও দূর্দশা ছিল টা সহজেই অনুমেয়। সংস্কৃত গ্রন্থ মঞ্জুশ্রীমূলকল্প থেকে এই সময় ঘটা এক নিদারুণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায়।

জনগনের মধ্যে থেকে রাজা নির্বাচন
শেষ পর্যন্ত এই উৎপীড়ণ যখন আর সহ্য হলো না তখন সারা বাংলার রাষ্ট্র নায়কেরা একত্র হয়ে নিজেদের মধ্য থেকে একজন কে অধিরাজ বলে নির্বাচন করলেন এবং তাঁর সর্বময় আধিপত্য মেনে নিলেন। এই রাষ্ট্রনায়ক অধিরাজের নাম গোপাল দেব।

কে এই গোপাল দেব? গোপালের পুত্র ধর্মপালের খালিমপুর তাম্রলিপি তে বলা হয়েছে "গোপালদেব ছিল দয়িতবিষ্ণুর পুত্র এবং বপ্যটের পৌত্র। মাৎসান্যায় দূর করিবার অভিপ্রায়ে প্রকৃতিপুঞ্জ গোপালকে রাজা নির্বাচন করিয়াছিল"।

বাঙালি রাজা গোপাল দেব
একটা ব্যাপার লক্ষণীয় পাল রাজাদের রাজ সভায় রচিত কোন গ্রন্থে নিজেদের বংশ কৌলিন্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয় নাই। সাধারণ প্রজা দয়িতবিষ্ণুর পুত্র গোপালদেবের জন্ম ভুমি বরেন্দ্র(রাজশাহি) অঞ্চলে। এবং সেখানে তিনি একজন সামন্ত নায়ক ছিলেন। এবং তিনি যে বাঙালি ছিলেন এতে সন্দেহের অবকাশ নাই।

লিপিতে বলা সংস্কৃত প্রকৃতিপুঞ্জ শব্দের অর্থ যদিও জনসাধারণ, কিন্তু বাংলার সকল জনগণ সম্মিলিত হয়ে গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এটা মনে হয় না। আসলে তখন দেশ জুড়ে অসংখ্য সামন্ত নায়কেরা ছিল দন্ডমুন্ডের কর্তা। তাহারা যখন দেশকে বারবার বৌদেশিক শত্রুর আক্রমন থেকে আরা রক্ষা করতে পারলেন না, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারলেন না, তখন একজন রাজা ও কেন্দ্রিয় রাষ্ট্র গড়ে তোলা ছাড়া বাঁচার আর পথ ছিলনা। তাদের এই শুভ বুদ্ধির ফলে বাংলাদেশ নৈরাজ্যের অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা এবং বৈদেশিক শত্রুর কাছে বার বার অপমানের হাত থেকে রক্ষা পেল।

আনুমানিক ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে গোপালদেব(৭৫০ খ্রীঃ-৭৭৫ খ্রীঃ) পাল বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা হয়ে সমস্ত সামন্ত প্রভূদের দমন করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন, দেশ থেকে অরাজকতা দূর করেন, বহি শত্রু আক্রমন থেকে দেশ কে রক্ষা করেন। দ্বাদশ শতাব্দিতে গোবিন্দ পালের(১১৬১খ্রীঃ-৬৫খ্রীঃ) সঙ্গে সঙ্গে গোপাল প্রতিষ্ঠিত এই পাল বংশের অবসান ঘটে। সুদীর্ঘ চারশ বৎসর ধরে নিরবিচ্ছিন্ন একটা রাজবংশের রাজত্ব খুব কম দেশের ইতিহাসেই দেখা যায়।

বাঙালির সামরিক শক্তি ও সাম্রাজ্য বিস্তার
বৃহত্তর বাংলাকে সংহত ও শক্তিশালী করে গোপাল মারা যাবার পর হাল ধরেন পুত্র ধর্মপাল। তার নেতৃত্বে বাঙালির সামরিক শক্তি তৎকালীন ভারতের আন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। তিনি প্রায় সমগ্র পূর্ব ভারতের একের পর এক রাজয় জয় করে এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি হন।
"কনৌজ জয় করার পর এক দরবারের আয়োজন করেন। ঐ দরবারে ভোজ, মৎস, মুদ্র, কুরু, যদু, যবন, অবন্তী, মালব, বেরাব, গান্ধার, পেশোয়ার, কীর প্রভৃতি প্রাচীন রাজ্যগুলির রাজাগন উপস্থিত হইয়া বাঙালি ধর্মপালকে অধিরাজ বলিয়া স্বীকার করেন" - (খালিমপুর তাম্র লিপি)

পাঞ্জাব থেকে নেপাল পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন রাজ্যসমূহ ধর্মপাল জয় করেছিলেন। ধর্মপাল মারা যাওয়ার পর রাজা হন পুত্র দেবপাল। দেবপাল পিতার সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত করেন। হিমালয়ের সানুদেশ হতে আরম্ভ করে বিন্ধা পর্যন্ত এবং উত্তর পশ্চিমে কম্বোজ থেকে আরম্ভ করে প্রাগজোতিষ পর্যন্ত তার আধিপত্য স্বীকৃত হতো।

এত বড় সাম্রাজ্য রক্ষার জন্য বিশাল শক্তিশালি সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। আরবের বণিক পর্যটক সুলেমান তার বিবরণীতে বলেন।
"বঙ্গরাজ দেব পালের সৈন্যদলে ৫০০০০ হাতি ছিল এবং সৈন্যদলের সাজসজ্জা ও পোষাক পরিচ্ছদ ধোওয়া, গুছানো ইত্যাদি কাজের জন্যই ১০ থেকে ১৫ হাজার লোক নিয়োজিত ছিল"।

একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন হত্যদম বাঙালি গা ঝারা দিয়ে উঠে শোর্য বীর্য ও দক্ষতার সাথে বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছিল। যার যাদু মন্ত্র ছিল বৃহত্তর বাংলার ঐক্যবদ্ধ শক্তি। এই শক্তির ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলে প্রতিষ্ঠাতা গোপাল।

বাঙালির জন্য পাল বংশের গুরূত্ব
বাংলার ইতিহাসে পালবংশের আধিপত্যের এই চারশ বৎসর নানাদিক থেকে গভীর ও ব্যাপক গুরূত্ব বহন করে। বর্তমানের বাঙালি জাতির গোড়াপত্তন হয়েছে এই যুগে। শশান্ক যদিও শুরু করেছিলেন কিন্তু পাল আমলেই বাঙালির রাষ্টব্যবস্থার বিকাশ লাভ করে এই পাল যুগে। বাংলা ভাষা ও লিপির গোড়া খুঁজতে হলে এই চারশ বৎসরের মধ্যে খুঁজতে হবে। এই লিপি, ভাষা, ভৌগলিক সত্ত্বা ও রাষ্ট্রিয় আদর্শকে আশ্রয় করে একটি স্থানীয় সত্ত্বাও গড়ে উঠে এই যুগে।

সেই হাজার বছর আগে পাল রাজাগন ছিলে অসম্প্রদায়িক। তারা নিজেরা বৌদ্ধ; অথচ বৈদিক হিন্দু ধর্মও তাদের আনুকূল্য ও পোষকতা লাভ করেছিল। এমনকি একাদিক পালরাজা হিন্দু ধর্মের পুজা এবং যজ্ঞে নিজেরা অংশ গ্রহন করেছেন, পুরোহিত সিঞ্চিত শান্তি বারি নিজেদের মস্তকে ধারণ করেছেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মে ব্রাহ্মণের নিয়োজিত হতেন, মন্ত্রি সেনাপতি হতেন, আবার কৌবর্তরাও এই সব পদে স্থান পেত। এইভাবে পালবংশ কে কেন্দ্র করে বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয় সম্ভব হয়েছিল।

পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে নালন্দা, বিক্রমশীলা, ওদন্তপুরী, সারনাথের বৌদ্ধ সংঘ ও মহাবিহারগুলিকে আশ্রয় করে আন্তর্জাতিক বৌদ্ধজগতেও বাংলা ও বাঙালির রাষ্ট্র এক গৌরবময় স্থান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

এই সকলের সম্মিলিত ফলে বাঙলায় এই সময়েই অর্থাৎ এই চারশ বৎসর ধরে একটি সামগ্রিক ঐক্যবোধ গড়ে উঠে। এটাই বাঙালির স্বদেশ ও স্বজাত্যবোধের মূলে এবং এটাই বাঙালির একজাতীয়ত্বের ভিত্তি। পাল-যুগের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ দান।

মোরাল অব দি স্টোরি: একজন নেতা দরকার।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------

ছবি কৃতজ্ঞতা : উইকিপিডিয়া

তথ্য সূত্র :
বাঙ্গালীর ইতিহাস (আদি পর্ব) - নীহারঞ্জন রায় | দে'জ পাবলিশিং - কলিকাতা
বাংলাপিডিয়া
উইকিপিডিয়া

অনুপ্রেরণা : মুক্ত মনার লেখক ফতে মোল্লার বিদ্রোহি বঙ্গ।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

ভাস্কর's picture


এই পোস্ট স্টিকি হিসাবে দেখতে চাই...

মীর's picture


ভাস্করদা'র সঙ্গে সহমত। পোস্ট অতি দুর্দান্ত, সুস্বাদু এবং অনায়াসে ভরপেট খাওয়া যায় -এমন হয়েছে। মোরালটা অদ্ভুতেরও অদ্ভুত। বিষয়গুলো জানতামও না।

সবকিছু মিলিয়ে হাসান ভাইকে জাঝাসহকারে ধইন্যা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

হাসান রায়হান's picture

নিজের সম্পর্কে

অথচ নির্দিষ্ট কোনো দুঃখ নেই
উল্লেখযোগ্য কোনো স্মৃতি নেই
শুধু মনে পড়ে
চিলেকোঠায় একটি পায়রা রোজ দুপুরে
উড়ে এসে বসতো হাতে মাথায়
চুলে গুজে দিতো ঠোঁট
বুক-পকেটে আমার তার একটি পালক
- সুনীল সাইফুল্লাহs