ইউজার লগইন

চোত মাস। গল্প

চোত মাস-

তার বিস্তৃত টাকটারে মৃত বন্ধ পথ ধইরা নিলে কপাল হচ্ছে তার ঢাল। দু পাশে দুইটা থকথকে ঘোলা শাদা গর্তের মাঝ খানে বৃত্তাকার কালো কালো ছায়া। দুই গর্তের মাঝ দিয়া খাড়া পাহাড় হয়ে নাকটা নাইমা গেছে। আর কিছু না হোক লোকটার নাক সুন্দর। সেই নাক হঠাৎ শূন্যে শেষ হয়ে গেলে সেখানে দুটি গুহার সন্ধান পাওয়া যায়। দুই নাসারন্ধ্রের গুহা দিয়ে বাতাসের ওঠা নামা কিছুটা অস্থির। ঠিকন যেন খাবার দেখছে সে, মাঝে মাঝেই তাই নিশ্বাঃস এলোমেলো হয়। অথবা গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে তাই নিশ্বাঃম মৃদু শব্দ তোলে। সেই গহ্বর থেকে বার হয়ে বাতাস মোটা ঠোঁটে আইসা বাড়ি খায়। দুই ঠোঁটের মাঝ খানে প্রায় বছর পঞ্চাশেক পুরোনো গহ্বর। তা থেকে পরবর্তী কোন কথা বের হয়ে আসে তা বোঝার জন্যে আমি তার ঠোঁটের দিকটাতেই খেয়াল রাখি। মসৃন চকচকে গালে মাংস আর পিছলা চিবুকের কিছু অংশ আমার চোখে পড়ে। এসি নাই অফিস রুমে। ফ্যান চলতেছে। চৈত্রের গরমে এই ফ্যান লোকটার জন্যে যথেষ্ঠ না। অথবা তার হাই প্রেশারও থাকতে পারে। কারণ চিটচিটা ঘাম লেপ্টে আছে তার গালে। কিন্তু আচরণে সে এর লক্ষণই প্রকাশ করে না। ভেতরে হয়তো তার কোন কিছু একটার ছুটো ছুটি চলছে। আমার এমন মনে হবার কারণ আছে। আমি ওনার সামনে বশে আছি প্রায় মিনিট দশেক। তিনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন বারবার, কিন্তু কথা বলছেন কম। আমি বুঝে নিলাম তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু বারবার তাকানোতে একটা অস্বস্তি আছে। উনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেও পারেন। একবার টেবিলের আয়নায়, একবার ফ্যানের দিকে, একবার আমার দিকে এইভাবে কোন লোক যদি দশ মিনিট কাটায়া দেয় কোন কথা না বইলা তারে সন্দেহ করাই যায়। তাছাড়া তিনি আমার চোখের দিকে দুবার তাকায়া সাথে সাথেই নামায়া ফেললেন নিজের চোখ। এইখানে গিয়া আমার প্রথম খটকা লাগে। এমনটা উনি না করলেই পারতেন, ক্যান করলেন, ওনার সামনে বাইসা বইসা এসব ভাবতেছি। এই দশ মিনিট শুরুর আগেই আমি কে এবং তার কাছে কেন আসছি তা তারে জানাইছি। আমার কথা শুইনা তিনি আর কিছু বলেন নাই। খালি বসতে বললেন, আমি যেেহতু একটা কাজে আসছি ওনার কাছে আমারে তাই বসতেই হইলো। কতক্ষণ বসতে হবে তা না বইলা কি যেন একটা ফাইলের দিকে চোখ রাখলেন। আমি আসলে কোন ধারণা ছাড়াই তার সামনে বসি। এবং বসার পরই তার উবু হওয়া মাথার টাক আমার চোখে পড়ে। তারে নিজের পরিচয় জানানোর সময় তার বষয়ে আমার কোন খেয়াল ছিলো না। এর কারণ আছে। এই অফিসে তার চাইতে বয়সে বা ক্ষমতায় ছোট বা বড়ো যারাই আছেন, যার কাছে সুযোগ পাবো তার কাছেই যাবো। ফলে আলাদা কইরা আচরণে না হইলে চেহারায় আমি কাউরে মনে রাখার দরকার মনে করি না। আমি খালি যানি আমি ক্যান এনাদের কাছে আসছি আর তারা যাই জিঞ্জেস করুক উত্তর আমার কাছে আছে। আমার চাই বছরের অভিজ্ঞতায় আমি দেখছি হাতে গোনা উনিশ বিশ প্রশ্ন তারা জিজ্ঞেস করেন। এই কয়টা প্রশ্নে উত্তরের জন্য চাইর বছর লাগে না। ফলে কেউ আমারে বসতে বললে আমার ভয় বা সংকোচ হইতো না। বাঙালির চিন্তার ঐক্য আমারে অবাক করে। এই জিনিস একটা জাতির জন্য বড়ো পাওয়া। আমার জন্যও, আমি ফলে নিজে যা করি সেই বিষয়ে ওই উনিশ বিশটা প্রসঙ্গের বাইরে আর কোন প্রসঙ্গে আগ্রহ দেখাই না। কাজ করতে করতে আমার আগ্রহ দাড়ায়া গেছে কিভাবে এই যে সামনে বসা লোকটার মতো লোকগুলারে কনভিন্স করতে হয় আর আমার কাজ আদায় করতে হয়। ফলে কাজ আদায়ের আশায় আমি তার সামনে টানা দশ মিনিট চুপচাপ বইসা থাকি।

- তুমি তাইলে ইতিহাসে পড়ো।

- জ্বি

- ইতিহাস বড়ো করুণ জিনিস। ভুত হয়ে ইতিহাসরে বেঁচে থাকতে হয়। এ জন্যেই মানুষ ভুতে বশ্বাস করে হা হা কি বলা।

লোকটার এই কথায় আমি অবাক হই। চোখে কোন ভাষান্তর না থাক আমি মনে মনে তারে আবারো বুঝার চেষ্টা শুরু করি। লোকটা উচ্চতা আঁচ করা যায়। পাঁচ ফিট দশ বা পুরো ছয়ই হবেন। স্বাস্থ্যটা ভালো না। মানে একেবারে মেদহীন আর কিছুটা মাংসের অভাবও আছে বলে মনে হয়। কারন দুই গালের পাশে কিঞ্চিত খাদ আছে। চেহারার সাথে নাকটা মানানসই। চোখের ভ্রু মোটা। ঠোঁটও মোটা। শেভ করা গাল। একটা কাঁচা হলুদ আর হালকা আকাশি চেকের শার্ট পড়ছেন। শার্ট দেখেই বুঝা যায় ইন করছেন। তার নাভী থেকে শরীরের বাকি অংশ চওড়া ইষৎ নীল কাঁচে ডাকা টেবিলের আড়ালে ঢাকা পড়ে। তিনিও একবার ফাইল দেখা এবং বারে বারে টেবিলের দিকে তাকানোর ফলে বেশিরভাগ সময়ই ঝুঁইকা ছিলেন। বার কয়ে সোজা হবার চেষ্টা করলেও সোজা হইতে পারেন নাই। ফাইলটা দেখত তার মাত্র দুই মিনিট লাগছিল। তারপর থাইকাই উচপিচ করতেছেন। তিনি আমারে বসতে বলার সময়ই আমি চিকন কালো বেল্টের সোনালি ডায়াল ঘড়ি গুলার রুপালি কাঁটারে দেখছিলাম একটা পাঁচের ঘরে। সেকেন্ডর হিসাব অবশ্য করি নাই। মহাকালের হিসাবে সেকেন্ড হইতাছে সেই বিন্দু বিন্দু জল। তার যে দাম নাই এইটা সবাই বুঝে। সমুদ্রর দাম আছে, অসীম দাম। এক ফোঁটা জলের কোন দাম নাই। আমারও একই অবস্থা দাঁড়াইলো নাকি। কথা কয় না ক্যান লোকটা। আর কতক্ষণ বসাযা রাখবো। ক্ষুধা লাগছে, সকালেও কিছু খাই নাই। ঘুম থাইকা উইঠাই পার্টি অফিস। তারপর একগাদা পত্রিকা বগল নিয়াই বাইর হয়া পড়লাম। চৈতের রোদ সকালরেও দুপুর বানায়া ছাড়ে। এল্যিফান্ট রোড আসতে আসতে এগারোটা বাইজা গেছিলো। নাইমাই এক কাপ চা খাইলাম। প্রেসক্লাব থাইকা এলিফ্যান্ট রোড, আই বাপ। তার চাইতে এইভাবে বইসা বইসা চোত মাসা কাটান যায়। চা খায়াই একটা বিড়ি খাওয়ার ইচ্ছা জাগছিলো চরম। কিন্তু ইপায় নাই। আমার লগে কায়সার, নীলা, আর অন্য আসছিল। অন্যের আইজ ক্যাম্পাস জীবনের শেষদিন। এই পত্রিকা বেইচাই হলে গয়া ব্যাগ বোচকা গুটায়া মিরপুর গিয়া উঠবে। এরপর কি করবে সে জানে না। চোখের সামনে সে এখন আমাদের জন্য একটা প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন আমাদের মনে যতোবার আসে মুখে ততোবার আসে না। আকাশে মেঘ টেঘ দেখলেও ছ্যাঁত কইরা সেই প্রশ্ন আমাদের চোখে ভাসে। তাও আমরা বগলে পার্টির পত্রিকা চাইপা চুপ থাকি। চা খায়া চাইরজন চাইর দিকে ভাগ হই। যে যা বেচতে পারে। তিনটার দিকে সবাই এক জায়গায় হবো। নিজেদের পকেট থাইকা পয়সা দিয়া ভাত নইলে চা রুটি কলা খাবো। আজ অন্য ছাড়াও কায়সার বাসায় চলে যাবে। ও পার্টি অফিসে যাওয়ার সময় পায় না। তার এক বোন আছে, অসুস্থ্য, অটিজম। বোনটারে সে খুব ভালোবাসে। সে এমন কাজ বা মিছিল শেষ কইরা বাসায় চইলা যায় প্রায় সময়। নীলা যাবে তার নোট জোগাড় করতে। কাল ওর টিউটোরিয়াল। পার্টি অফিসেই আমরা নিজেদের গন্তব্য যাইনা নিয়া ক্ষুধা পেটে পত্রিকা বেচতে বাইর হই। চা খায়া আমি গাউছিয়ার দিকে হাঁটতে থাকি। বগেলর পত্রিকার প্রথমটা যেন ঘামে ভিইজা নষ্ট না হয় তার জন্যে ব্যাক কাভার হিসাবে একটা নষ্ট পত্রিকা রাখছি। এই পত্রিকা বগলে নিয়া হাঁটতে হাঁটতে আমার ছোট বেলার স্কুল ফাঁকি দেয়ার ঘটনা মনে পড়ে। যদিও আমি এই থিওরি এপ্লাই করি নাই তবুও সেই থিউরি আইজ মনে পইড়া গেল। এক মামাতো ভাই কইছিল, বগলে রসুন চাইপা রোইদে দাঁড়াযা থাকলে জ্বর আসে। এট্টু পর জ্বর ভালো হয়া যায়। তুই স্কুলে যাইতে না চাইলে এই বুদ্ধি করতে পারস। না আমি সেই বুদ্ধি আমি করি নাই। আমি কোনদন স্কুল পালাই নাই, কলেজ পালাই নাই। অথচ আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয় পালাই। এখন অনার্স ফাইনাল ইয়ার। আর এক বছর, তারপর। জানি না। জানি না বইলাই পত্রকা বগলে চাইপা হাঁটতেছি। জ্বর জ্বর লাগে কেমন। পত্রিকাগুলা কি রসুন হয়া গেল নাকি। কাইল রাইতেও একবার জ্বর মতো আসছিল। সকালে মাথাটা একটু ভার ভার লাগতেছিল। তবুও এই যে এরে ওরে পায়া, এইটা ওইটা নিয়া হাসি কথা কইতে কইতে মাথা হালকা হযে গেল। এখন মনে পড়লো গত রাতের জ্বরের কথাটা। কিন্তু তখনই তিনি আমার সামনে তার দশ মিনিটের বিরতীর পর নিজের অস্তিত্বরে স্বীকার করলেন। আমি ফলে এতো ভাবনার জটাজাল থেকে তার ইতিহান বিষয়ক এমন গভীর বাণী তালাশ করার আগে তার বিষয়েই আরো বেশি বিভ্রান্ত হয়া পড়ি। নিজের ভিতরে যা টানা আট মিনিট সন্দেহ হয়া ছিল, এই গভীর তাত্ত্বিক বাক্য আমারে মনে করায়ে দিল যে আসলে সন্দেহ না, আমি তার বিষয়ে বিভ্রান্ত। কিছু খুঁইজা না পায়া আমি হাসি।

- হা হা

- হা হা হা, তা কি করবো আমি এই পত্রিকা দিয়ে।

- জ্বী পড়বেন। পত্রিকা দয়ে মানুষ আর কি করে।

- প্রথমে পড়ে, তারপর প্রযোজন হলে সংগ্রহে রাখে না হয় ফেলে দেয়। কোন ইয়ারে পড়ছো।

-অনার্স ফাইনাল।

আমি বিভ্রান্তি কাটাইতে পারি না। এলাকটা এতোক্ষন এমন করতেছিল কেন। এখন তার কথা শুইনাতো তারে স্বাভাবিকই মনে হইতেছে। এখন সে আমার চোখের দিকেই তাকায়া আছে, মাঝে মাঝে গাল চিবুক, বুকের দিকেও তাকাইতে পারে। আমি অবশ্য একটা চওড়া শাদা ওড়না পড়ছি। তাতে আমার বুকের অস্তিত্ব বাইরে টের পাওয়ার সুযোগ নাই। লোকটা হুট কইরা আমার গলার দিকেও তাকায় বার কয়েক। নারী মনের সংশয় মাঝে মাঝে বিদঘুটে হয়া ওঠে। লোকটা এর লোলুপ ভাবতে শুরু করছিলাম। বাস্তবিক যাবতীয় পুরূষ সর্ম্পেক আমার কাছাকাছি রকম ধারণা আছে। অন্য আমার কিছুটা ঘনিষ্ঠ হইলেও তার সাথে মেশা হয় নাই তেমন। মানে আমাদের দুই জনের যোগাযোগে একটা স্বচ্ছন্দ্য আছে, হয়তো কিছুটা নির্ভরতাও। মাঝে মাঝে কিছু রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচ আমি তারে দিয়াই মিটাই। তার কথা বলার ঢংটা এতো মৃদু, আর নরোম। কিন্তু স্লোগান দেয় গলা ফাটায়া। তার সর্ম্পকে আমার কৌতুহল আছে, ছোট বেলায় দেখা টিয়া পাখির মতো। যারে আমার পাওয়ার ভাবনা নাই, কিন্তু চোখে চোখে রাখার ইচ্ছা আছে। আর কেউ পার্টি অফিসে না আসুক, অন্য না আসলে আমার চোখে লাগে। আমি হয়তো দলের কাজ নিয়া সারাদিনই খুব বস্ত কিন্তু হলে আসলেই আমার মনে হয় অণ্যর সাথে দেখা হইলো না। মাঝে মাঝে তারে ফোন দেই। সেই তার নরোম গলা-
কি করলা সারদিন, আমি যাইতে পারি নাই। কাইল পরীক্ষাতো।
আর নইলে মাঝে মাঝেই সে অসুস্থ্য হয়া পড়তো। হয়তো জ্বর বা মাথা ব্যাথা। সে কি প্রচন্ড মাথা ব্যাথা প্রথমবার বার যে দিন দেখলাম সে পার্টি অফিসের বেঞ্চিতে শুয়া কাতরাইতেছে সে দিনই আমি তারে খেয়াল করি। এর দিন দুই পর তার সাথে আমার দেখা হয়। আমি তারে মাথা ব্যাথার খবর জিজ্ঞেস করি। একটা কান র্পযন্ত বিছানো হাসিতে সে আমারে আস্বস্ত করে। মাঝে মাঝেই নাকি তার এমন হয়। এটা অনেকটা মানসিক, টেনশন অথবা মানসিক কোন অস্থিরতা থেকে এই ব্যাথা হয়। ওর হাসির দিকে আমি তাকায়া ছিলাম। সরল হাসি, হয়তো শুধু হাসির জন্যই হাসি, কিন্তু কোন ফাঁক বুঝা যায় না। পার্টি নেতারা ভূলের জন্য যে ঝারি দেন তার উত্তরে যে হাসি আর আমারে দেখলেও সেই একই হাসি। একটা হাসির এতো রকম অর্থ থাকতে পারে। আমি অবাক হইতাম। তার হাসিতে কি যেন আছে। কিম্বা হোয়াট ইজ টু বি ডান এর মিমাংসায় ব্যাস্ত আমাদের হাসি গানের খেয়াল থাকতো না। এই হাসিও আসলে উপরিতল, পায়ের তালু কোথায় সেটাই বিবেচ্য কিন্তু সব অবস্থায় একই রকমের হাসি ধরে রাখা অন্যকে দেখলেই আমি বরং বৈশি বিব্রত হইতাম, হোয়াট ইজ টু বি ডান বিষয়ক ভাবনা আরো জটিল মোড় ধারণ করতো।

- বাড়ি কোথায়

- মানিকগঞ্জ

- কতো দাম এই পত্রিকার

- পাঁচ টাকা

- কেন রাজনীতি করো তুমি

এইবার আমার মুখস্ত বিদ্যা ঝারার পালা। আমাদের জন্য এসব প্রশ্ন নিতান্তই মামুলি। গরুকে কেউ কখনো হাল চাষের পৃসঙ্গে জিজ্ঞেস করে না। বা মাঝ দরিয়ায় যে নৌকা ভাসমান তারে ভাইসা চলার কারণ জিজ্ঞেস প্রশ্নর্কতার কৌতুহলের বিষয় হইলেও ওই নৌকার যাত্রীদের জন্য তা নিতান্তই একটা প্রশ্ন এবং তা বিরক্তি উদ্রেকও করতে পারে। আমারও বিরক্তি জাগে মাঝে মাঝে। উত্তর জানা নাই বইলা না, আমি নিজেও এখন এই প্রশ্নে বিভ্রান্ত হই। সমাজ এতো বড়ো আর বিচিত্র যে আমার নেতার মুখের কথাএসই সমাজের অলিগলিতে গিয়া অনুরণিত হইলেও কানা গলিতে গিয়ো হারায়া যায়। আর নইলে প্রেসক্লাবের ধূলাবালি গায়ে ভালোভাবে মাখতে পারলে আমার মনে হয় যেন যাক বিপ্লর কিছুটা আগাইলো। অথচ গোসল টোসল করে পরিষ্কার হইলে আমি বুঝতে পারি না কি করলাম। এই যেমন কায়সারের বোনটারে দেখলে আমার মায়া লাগে। শোষিতের তরেও এমন একটা বোধ জাগে। এই বোধ আসলে মায়া, মানবিকতা। এর সাথে রাজনীতির সম্পর্ক তালাশ আর এর থেকে উত্তরণের কর্মকান্ডরে যদি রাজনীতি বলি তাইলে আমি রাজনীতি করি। কিন্তু কায়সারের বোনের মধ্যে স্ববিরোধীতা আছে। ওর প্রতি বোধ শোষিতের হলেও আচরণটা মানবিক। এখানে কোন রাজনীতি নাই। কায়সারের বোনের এই রকম চরিত্র আমারে সমস্যায় ফেলে। আমি বুঝতে পারি না, আসলেই সবকিছু রাজনৈতিক কি না। আমাদের পার্টি প্রধাণের সাথে বৈঠকগুলা যখন হয় তখন তার সামনে আমরা সারি সারি টবে লাগানো চারা গাছের মতো বইসা থাকি। তার কথা বলার ভঙ্গিমাতে তোড়েজোড়ে আমাদের শাখা প্রশাখা দোলে। আমরা আসলে শরীরের ভঙ্গিতে মুরিদ হয়া উঠি। তিনি যখন আমাদের বয়ান করেন গনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার বিষয়ে, আমার মনে হইতো যেন কোন রাজ্য জয়ের গল্প পড়তেছি। যে কোন নতুন বিষয় আমার জানা হইলে প্রথমে এই অনুভূতিটাই আসে। এইটা ছোটবেলার অভ্যাস। আমি নেতার কথা শুইনা যাই। গনতন্ত্র আসলে একটা রাজনৈতিক বিষয়। নিজের জীবনের চিন্তার আর রাস্তা ঘাটের চলা ফেরার গনতন্ত্রের বিষয়ে কোন পাঠ না থাকায় আমি বাসে চাইপা অস্বস্তিতে পড়ি। কারণ ভদ্রতা আর গণতান্ত্রিক আচরণের ঘোলা চাঁদের পূর্ণিমাতে আমার চোখ বেশি কিছু দেখতে পায় না। জোছনার মায়া আছে, কিন্তু পরিষ্কার না কোন কিছুই। ফলে আমি যখন লোকটারে রাজনীতি কেন করি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকি তখন আমার নিজের ভেতরটারে কেমন ফাঁপা মনে হয়।

-আমি আসলে বলতে পারেন সামাজিক দায় আর মানবিক বোধ থেকে রাজনীতি করি। বিষয়টা এমন যে আসলে আমার অবস্থান রাজনীতির বাইরে না। এই সমস্ত ক্রিয়া কান্ডের মধ্য দিয়ে আমি আমার রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করি। তাছাড়া কতো জন কতো কিছু করছে। কেউ গান গাইছে, ছবি আঁকছে, ছবি তুলছে দিনভর আমি রাজনীতি করি। আমি আসলে একজন একটিভিস্ট যার দলীয় পরিচয় রয়েছে।

লোকটা এবার আরো খানিক চুপ করে। এইবারও প্রায় দুই মিনিট আঠারো সেকেন্ড। আমি রাজনীতি করার কারণ ব্যাখ্যা করার পরই একবার ঘড়ির দিকে তাকাইছিলাম। কারণ তিনটা বাজতে কত বাকি দেখা দরকার। মাত্র বিশটা পত্রিকা বিক্রি হইছে। এই লোক পরিমাণে বেশি টাকা না দিলে এই প্রায় তের মিনিট আমার লস। এবং এর আলাপ যেখানে আছে না জানি কখন ছাড়া পাই। ফলে আমারে উঠতে হবে। কিন্তু উঠার উপায় নাই। আমি মুখে একটা বিরক্তির ভাব শুরু থেকেই ফুটায়া রাখছি। কাঠ কাঠ জবাব দিতেছি তারে। মুখাবয়বে কোন প্রশ্রয় নাই। মুখে এমন ভাব ধইরা রাখার কারণ অবশ্য অন্যটাও হইতে পারে। এই সামাজিক প্রেসারে পইড়া নিজেরে দিনের মধ্যে এতো বার নারী মনে হয় যে লোকটার প্রাথমিক আচরণে তারে সন্দেহ করতে এতোটুকু বাধে নাই আমার। আইজ অবশ্য নিজেরে নারী ভাবার কারণও আছে। আমার পিরিয়ড শুরু হইছে। কাইল অমন একটা লম্বা মিছিলের পরে পার্টি অফিসে আইসাই বিপদে পড়লাম। তলপেটে একটা ব্যাথা আর প্রসবণের চাপ টের পাইলাম। ভাগ্যিস ব্যাগে টিস্যু ছিল। তাড়াতাড়ি অফিস ছাইড়া হলে আইসা পড়ি। সারাদিনের ঘামনুন আর রজঃস্রাবের রক্ত ধুয়ে সাফ সুরত হইতে হইতে শরীরে আর শক্তি পাইলাম না। না খায়াই ঘুম। রাইতে খুব মায়ের কথা মনে হইতেছিল। টাকাও শেষ। এই শুক্রবারেই বাড়ি যাইতে হইব। পার্টির কামে গত শুক্রবার মিস করছি। এই এক সপ্তাহ চলতে বহুত কষ্ট হইছে। ভাগ্যিস রুমে কিছু চাল আছিল। এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুম। তারপর এই লোক এখন আমার আজকে দিনের আলোচিত চরিত্র হয়া থাকবে নিশ্চিত। তারে সন্দেহ করার কারণ আমার মাসিক জনিত মনোভাবও হইতে পারে। এই সময়ে প্রথম দুইদিন আমার মধ্যে কেমন জানি একটা সন্দেহ কাজ করে। একটা মেজাজ মেজাজ ভাব আসে। একটা ভ্রু কুচকনি ভাব থাকে। ফলে লোকটারে কি কারণে সন্দেহ করছিলাম এইটা নিয়া আমি আরো বেশি দ্বিধায় পড়ি। আমার উত্তরে তার চুপ হয়া যাওয়াতে যে দুই মিনিট আঠারো সেকেন্ড সময় আমার হাতে থাকে তার মধ্যে আমি একটা সুক্ষ প্রতিদ্বন্দীতার কূটাভাস পাই। আমি খানিকটা অবাক হই নিজের মেজাজের ওপর। লোকটারে সন্দেহ করছি বইলা আমার ভিতরে একটা হীনমন্যতা দেখতে পাই। এবং এই হীনমন্যতারে জয় করবার জন্য আমি লোকটার যে কোন প্রশ্ন তাচ্ছিল্যের সাথে জবাব দেয়ার মানসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। লোকটা আবারো ফাইলের পাতা ওল্টায়। ফাইলের একটা পাতা দেখতে বোধহয় দুই মিনিট বা তার কাছাকাছি সময় লাগে। কারণ দুই মিনিট আঠারো সেকেন্ড পরেই তিনি আবারো কথা বলে ওঠেন।

- আমাদের ভূখন্ডে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস বিষয়ে তোমাদের মতামত কি। এই দেশের শ্রেণী সংগ্রামের ধারা কোনটা। রাজনীতি সম্পর্কিত আমাদের বোধগুলো কি রকম। মান ধরো এই যে তুমি এখন রাজনীতি করছো। তোমার দশ বছর আগে যারা তোমার দলের সাথে যুক্ত ছিলেন কাজ করেছেন তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম তোমার সময়ের চাইতে ভিন্ন। তাদের সাথে তোমার যোগাযোগ কেমন। এমনি করে ধরো আরো যুগ পরিক্রমায় এই দেশের পরিবর্তনগুলোকে তোমরা কিভাবে মূল্যায়ন করো।

প্রশ্ন বুঝতে আমার সময় লাগলো। এবং আমার মেজাজরে চাপায়া দেয়ার জন্য এই প্রশ্নটা যথেষ্ঠ ছিল। এই প্রশ্নের কোন জবাব আমার হাতে না থাকায় আমি পিছু হটি এবং তার সাথে ঠিক দ্বন্দ নয় এইবার বোঝাপড়ার দিকে ঝুঁকি।

- আসলে এই সমস্ত প্রশ্নের আলাপ অনেক লম্বা। আপনি একদিন আমাদের অফিসে আসতে পারেন বা আমি আরেকদনি সময় করে আসবো। তখন লম্বা আলাপ করা যাবে। এখন শুধু এটুকুই বলতে পারি যে আমাদের সংগ্রাম শ্রেণী সংগ্রাম এবং আমরা সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে। আমাদের দেশের মানুষ অনেক লড়াকু। এক দিকে পরিবেশ অন্যদিকে রাষ্ট্র। এই দুই পক্ষকে মোকাবেলা করতে পারে কেবলমাত্র সংগঠিত জনগোষ্ঠি। এবং এই জনগোষ্ঠিকে সংগঠিত করে যে দল আর মুক্তির পথ হিসেবে মার্ক্সবাদকে বেছে নেয় এবং যথাযথ প্রয়োগ ও সংগ্রামে লিপ্ত থাকে তাকে বিপ্লবী পার্টি বলে। আমাদের পত্রিকাটা সেই পার্টির মুখপত্র। আপনি যে কোন সমালোচনার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

এইবার লোকটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। মুখের কুঞ্চিত রেখায় বিরক্তি আর হতাশা। এইবার তার চোখের ভাষাও আমি বুঝতে পারি। আমার উত্তর শুইনা চোখ দুইটা খানিক নিষ্প্রভ হয়। আমিও সংকুচিত হই। আমি আসলে এতো জটিল সব বিষয় নিয়া কখনো ভাবি নাই। নেতার সব পাঠচক্রেই আমি ছিলাম। বলা যায় যুক্ত হওয়ার পর থাইকা ছিলাম না এমন প্রোগ্রাম কম আছে। কিন্তু আমার মস্তিষ্কের জোর কম। খালি দুশ্চিন্তা করতে আমার ভাল্লাগে আর কাজ করতে। সারাক্ষণ যেন কিছুই ভাবতে না হয় এর জন্য আমি খালি কাজ করতাম। আমার কোন প্রশ্ন ট্রশ্ন থাকলে অন্যরে জিজ্ঞাস করতাম। ও অনেক কিছু জানে। রাইত ভর তারা অনেক ছেলে কর্মীরা আড্ডা দেয়। মাঝে মাঝে নেতাদের সাথেও অনেক রাত পর্যন্ত এইটা ওইটা আলাপ চলে। কিন্তু পার্টির মেয়েরা এসব থেকে বঞ্চিত হয়। যারা হলে থাকে তারা হলে আর যারা বাসায় থাকে তাদের বাসায় ফিরতে হইতো সময়মতো। বাসায় বা হলে ফিরার পর আমাদের স্বভাবমত রুমটুম গোছানোর কাজ করতে হইতো। তাছাড়া শরীরের ক্লান্তিটারে অস্বীকার করা যায় না। বোধহয় নারী বইলাই ঘরের টান বিষয়টাও কাজ করতো। এইটা অবশ্য কায়সারের ক্ষেত্রেও সত্য। সেও রাজনীতি কম বুঝে। কিন্তু এখন অন্য ছাড়া এই লোকরে আমি কি বুঝ দেই ভাইবা পাই না।

- তুমি ভেবো না। আমি তোমার সময় লস করবো না। আমার আসলে তোমাকে দেখে মানে তুমি আর তোমার পত্রিকা দেখে অনেক কথা মনে পড়ে গেল। এটা ওটা অনেক প্রশ্ন। আমি জানি না আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে তুমি বাধ্য কি না। আমি যেমন তোমার পত্রিকা রাখতে বাধ্য নই। তবুও যদি মনে করো তাহলে খানিক আলাপ করতে পারো। আমি তোমার পার্টির জন্য এই মুহূর্তে আমার পক্ষে যতদূর সম্ভব সহযোগীতা করবো।

লোকটার এই কথায় আমি আসলে আস্বস্ত হই। এইটা আমার স্বভাব দাঁড়ায়া গেছে। তিনি যে বললেন আমার পত্রিকা রাখতে তিনি বাধ্য নন। এইটা সত্য। আমি লোকটার কাছে আসছি রাজনীতির প্রয়োজনে, দলের প্রয়োজনে। তার সাথে আমার সম্পর্কটা তাত্ত্বিক। মানে আমি তারে হয়তো আর কোনদিন দেখলে চিনবো না। তিনি হয়তো কান পর্যন্ত ছাটা চুলের আমারে দেখলে চিনবেন। কিন্তু জনগণর সাথে কারবার বইলা সকল জনতার মুখচ্ছবি একই আদলে আমার চোখে বিরাজ করলে আমি এই লোকটার মতো কাউরেই আলাদা কইরা চিনতে পারি না। আমাদের নেতা আমাদের কখনো গল্প শোনান নাই। কোন মানুষের গল্প, সম্পর্কের গল্প। ফলে আমরা গল্পহীন এক সামষ্টিক আঁটি বাঁধি, দশের কাঁধে সেই আঁটি চাপিয়ে স্লোগানে অবরোধে আমাদের মুক্ত দিনের সোনালি সূর্যের ঝিলিকে আমরা লাল মেঘ দেখি আকাশে। আর তার নিচেও লাল বাতাসের ফাঁকে ফাঁকে অন্য অথবা নীলাকে আমি চিনতে পারি। আরো যারা আসেন সেই লাল বাতাসে ফেস্টুন উড়িয়ে তাদের আমি চিনতে পারি না। কায়সারের বোনের মতো যে আসতে পারে নাই তারে আমার মনেই পড়ে না। এই লোকরেও আমি এরপর চিনবার কোন কারণ নাই। কিন্তু এখন সে আমার সামনে দারুণ এক বাস্তব হয়া বইসা আছে। প্রশ্ন আর প্রাপ্তি এই দুই প্র অদ্যাক্ষরের শব্দ আরেক শব্দকল্প হাজির করে-প্রচ্ছন্ন। একটা প্রচ্ছন্নতার আড়ালে আমি নিজেরে ঢাকতে থাকি। তার এই কথায় আমি ঘড়ি দেখি। আমাদের ভূখন্ডের প্রথম শ্রেণীসংগ্রাম কোনটা। এই প্রশ্নের উত্তর আমারে কে দিবো সেই প্রশ্ন পরে, এখন আমারে উদ্ধার করে কে। ঘড়ি ছাড়া আর কেউ না। আমি ঘড়ি দেখার প্রচ্ছন্ন ভঙ্গি করি। এইটা আমি ভাইবা করি না অভ্যাসবসত করি সেই আলাপ বাদ।

- আমাদের ভূখন্ডে ধর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এখনো রাজনৈতিক সাংস্কৃতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হয় নি। এবং একইভাবে নারী পুরুষ সম্পর্কের বিষয়গুলোও দলের অভ্যন্তরে পরিষ্কার নয়। সাধারণ অর্থে বাজার নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সংস্কৃতিকে মোকাবেলা করতে পারার মতো সাংকৃতিক সংগ্রাম অনুপস্থিত। ফলে রাজনৈতিক বোধও ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশের এক অংশের জনগণ আওয়ামিলীগ বিএনপিতে ঘুর পাক খাচ্ছে। আরেক অংশ ঘুর পাক খাচ্ছে রাস্তা হাতড়ে বেড়ানোতে। জনগণের কাছে যাওয়ার রাস্তাটা মুলত সম্পর্কের, অনুভূতির আদান-প্রদানের। সেটা যতোটা না রাজনৈতিক তার চাইতে বেশি সামাজিক। মানুষ প্রেমিকও বটে। তার প্রেম করারও সময় চাই। একইভাবে উপার্জনের, অর্থ অথবা মেধার উপার্জন। দল আর শ্রেণী এক হতে পারে না। দল মানেই তার নিজস্ব রাজনৈতিক মত এবং পথ থাকবে। সেই পথের পথিক গোটা জনগোষ্ঠি হবে না। কিম্বা যারা সেই পথে হাঁটবে তারাও ছন্দে কথায় হুবহু একই হবে না। ভিন্নতা থাকেই। বৈচিত্র পৃথবীরই বৈশিষ্ট্য। ফলে পার্টি আর পরিবার এক নিক্তিতে মাপা যায় না। তোমার পরিবারের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন আমি জানি না। কিন্তু এখনকার সময়ের রাজনীতি কেন যেন পরিবার থেকে মানুষকে বিচ্ছন্ন করে দেয়।

আমি এতোক্ষণ লোকটার কথার অলি গলিতে ঘুরতেছিলাম। আবার আমি লোকটার মুখ চোখের পরিবর্তনটাও খেয়াল করতেছিলাম। আমি আসলে এক সাথে এতো কিছু খেয়াল করার ঘোরে তার কথা শেষ হওনের ক্ষণটা বুঝতে পারি নাই। এবার তার কথা শেষ হইলে আমি বরং কিছুক্ষণ চুপ কইরা থাকি। বেশিক্ষণ না হইলেও তা চোখে পড়ার জন্য যথেষ্ট। লোকটা হয়তো আমার এই স্থির মুহূর্তটারে খেয়াল করে। হয়তো লোকটা কিছুটা লজ্জা পায় আমারে এতো কথা শোনানোর জন্য বা শেষে আমার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়া প্রশ্ন করার কারণেও তিনি লজ্জা পাইতে পারেন। তিনি এরপর ব্যাক পকেটের মানিব্যাগে হাত দেন। একটা পাঁচশো টাকার নোট বাইর কইরা আমার দিকে বাড়ায়া দেন। আমি এতো ধীরে হাতা বাড়াই যে ওনারে একটু আগায়া আসতে হয় তার উল্টা দিকে। টাকাটা হাতে নিয়া আমি হাতেই গুটায়া ফেলি। এরপর কোলের ওপর হাত আইনা বাকি হাত দিয়া টাকার পইড়া না যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত করি। উনি প্রথমবারের মতো পত্রিকাটা হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করেন। আমি কিছু না বলে বসে থাকি। এইটা আমার কৌশলও হইতে পারে। ভাঙতির কথা বলি না মানে আমি আসলে পুরো টাকাটাই নিতে চাই। আবার উঠতে পারি না কারণ আমি নিশ্চিত হইতে পারি না তিনি পুরা টাকাটাই আমারে দিছেন কি না। আমি উঠতে শুরু করি। এতোক্ষণ টেবিলে রাখা বাকি পত্রিকাগুলা হাতে নেই। তিনি আমারে পুরা টাকাই রাখতে বলেন। আমি একটা ধন্যবাদ দিয়া চেয়ার থাইকা উঠি। তিনি এবার আবারো ব্যাক পকেটে হাত দেন এবং খুব দ্রুত তার ভিজিটিং কার্ডটা আমারে দেন। আমি কার্ডটা হাতে নিয়া দেখি। শাহেদ রহমান লোকটার নাম। এই অফিসের মার্কেটিং প্রধাণ। ভালোই বেতন টেতন পায় লোকটা। অফিস কার্ড দেইখা মনে হইলো। তিনি আবারো আমার দিকে মুখ বাড়ায়া কথা শুরু করেন।

- আমার বোন তোমাদের দল করতো। আমার ছোট বোন। আরেক বোন আছে আমার। ওর নাম কলি। আর যে তোমাদের দল করতো, আমার ছাটবোন কাকলি। আমার নাম কল্লোল। খালি নামেই না আমরা তিন ভাইবোন সব বিষয়েই একই রকম ছিলাম। আমরা মানসিকভাবে জমজ আসলে। আমার সেই ছোটবোন কলেজে উঠেই তোমাদের দল করা শুরু করলো। আরে যে মেয়ে সারদিন হা হা হি হি করে। এই বয়েসেও আসক্রিম খাবো বলে প্যান প্যান করে। সারা জীবনে ঈদের জামার জন্য যে ময়েটা কাঁদেনি একবার এক ভিক্ষুককে টাকা না দেয়ায় সে যে কি কান্নাটাই কেঁদেছিল, সেই ছোটবেলায়। আমাদের আদরের সেই ছোটবোন নাকি রাজনীতি করবে। শুনে আমিতো অবাক। আমি সাথে সাথে কলেজে গিয়ে কি রাজনীতি করে, কাদের সাথে করে, কোন দল, নেতা কে সব খোঁজ নিলাম। আমার জন্যে এটা কোন কষ্টের বিষয় ছিল না। সে ভিন্ন আলাপ। তো আমি কাকলির সাথে পার্টি অফিসে যেতাম। তার নেতাদের সাথে আলাপ করতাম আড্ডা দিতাম। আমার অনেক বিকেলের আড্ডার সঙ্গী তোমার দলের অনেকেই। আমি জানি আমার বোনকে সে এতো নরোম, এতো অনুভূতিপ্রবণ, তার রাজনীতি করার কারণটা আমি বুঝি। তারই এক বান্ধবীর অকাল মৃত্যুর কারণ ছিল এই সমাজ। এই সমাজ ভালো করার আব্দার ভাইয়ের কাছে না, এর জন্য সংগ্রাম প্রয়োজন। আমার বোন এতোবড় সত্যটাকে কিভাবে চিনলো। আমি খুব অবাক হতাম। আমি ওর সাথে পার্টি অফিসে গলেও আলাপ হতো অন্যদের সাথে। দেখা গেল বাসায়ও ওর সাথে আমার কথা হচ্ছে না, দেখা হচ্ছে না। আমরা বাসায় সবাই নামাজ পড়তাম। এখনো মা আর বোন পড়ে। রাজনীতি শুরুর আগে কাকলিও পড়তো। পরে যখন ছেড়ে দিল মা খুব বকতো। মায়ের বয়েস হয়েছিল, প্রায় সময়েই বিছানায় থাকতেন। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর মাই আমাদের সব। ফলে কাকলির নামাজ না পড়ার বিষয়টা মাকে বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না। মা কাকলীকে কিছু বলতেন না। সব আমাকেই বলতেন। কিন্তু কাকলিকে আমি এসব বুঝিয়ে বলতে পারতাম না। তার সাথে আমার দেখাই হইতো না। সে সকালে বেরিয়ে যেত ফিরত রাতে। যেহেতু তার রজনীতি করা আমরা মেনে নিয়েছিলাম ফলে তাকে কিছু বলতাম না। মাকেও জানাতাম না তার রাজনীতি করার বিষয়ট। কিন্তু আম ওর বিষয়ে আপোষহীন ছিলাম। কেন সে এই রাজনীতিতে আসলো, কি করে, তার রাজনৈতিক জ্ঞানের বিকাশ কতোটা হচ্ছে এসব খেয়াল রাখতে শুরু করলাম। আমি এটা সেটা অনেক বই কিনে তার সাথে পড়তাম। এতে করে আমি আবারো ওর ঘনিষ্ঠ হই। এবং তখনই বুঝতে পারি আমার বোন আসল প্রেমে পড়েছে, দল এবং ব্যক্তি উভয়রকম প্রেম। আমি বুঝতে পেরে তাকে জিজ্ঞেস করি। সে আমাকে নয়নের বিষয়ে জানায়। নয়ন কবিতা পড়তো আর খুব ভালো বতৃতা দিত। প্রকাশ্যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলতে পারা আমার বোনকে খুব নাড়া দেয়। সে নিজে যেচে নয়নের সাথে আলাপ করে। রাজনীতি করার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই সাথে প্রেমও। আমি অবাক হই এতকিছু শুনে। আমার বোনের এতো সাহস আছে আমি জানতাম না। আসলে ও কখনো বাধা পেতে শেখেনি। কখনো চেয়ে পায়নি এমন কিছু ছিল না। ও সবসময় সব কিছুকে ওর খেলনা বা চকলেট মনে করত। বেশি কিছু প্রত্যাশা তার ছিল না বলে যা চাইতো তাই হাজির করতে হত তার সামনে। কিন্তু নিজে নিজে জোগাড় করার ক্ষমতা আমার বোনে কিভাবে হল এটা ভেবে আমি অবকা হই। আমি নয়নের সাথে মিশতে শুরু করি। ওর সাথে আড্ডা, ওদের বাসায় যাওয়া, সময় কাটানো। আমি আসলে এখানে নিছকই স্বার্থপর আর ধূরন্দর। আমি আমার বোনের প্রেমিক সম্পর্কে খোঁজ নেয়ার জন্যই নয়নের ঘনিষ্ঠ হই। কিন্তু আমি হতাশ হই। আমার বোন সুখী হতে পারবে না ওর সাথে থাকলে। এক ধরণের শোয়িং ছিল নয়ন, আর ছিল তার খবরদারির মানসিকতা। আমি তাকে টাকা সাধলেও সে নিয়েছে। ওদের আর্থিক অবস্থা এতো ভালো ছিল না, কিন্তু আমি ওর টাকা নেয়াটাকে ভালোভাবে দেখলাম না। তাছাড়া ছেলেটা খুব ভালো রাজনীতি বুঝত না। ওর ভেতর প্রেম ছিল হয়তো। এটা হয়তো কেবল আমার বোনই বুঝতো কিন্তু আমার সন্দেহ হত। আমি আসলে বোনের ওপর আস্থা পাচ্ছিলাম না। আমি বোনকে আমার মতো করেই চাইছিলাম। সে রাজনীতি করুক, কিন্তু অন্যভাবে। সারাক্ষণ দল, কাজ, মিছিল এসব করতে করতে বোনটা আমার শুকিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে এসেই ঘুম। নয়ন না মাঝে মাঝে ফাঁকি দিত। ওর অন্য রকম কিছু বন্ধু ছিল। ও আসলে দলের বাইরেও একটা ভালো সময় এনজয় করতো। আমার বোন ও আর দল ছাড়া অন্য কিছু করতো না। আমি আর কলি শংকিত হয়ে পড়ি। ওকে নিয়ে আমরা আলাপ করি। আমি নয়ন সম্পর্কে কাকলীকে জানাই। নয়ন আমার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে এটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলো না কাকলী। আমি বুঝতে পারি নাই আমার এই ছলনার কি পরিণতি হইতে পারে। পরদিন কাকলী যখন সন্ধ্যার পরে বাসায় আসে সে কারুর সাথে কথা বলে না। কান্নাকাটির ছাপ তার চেহারায়, চোখে, গালে নোনা দাগ। আমি বুঝতে পারি, নয়নকে ফোন দেই, নয়ন বলে সে কাকলীকে থাপ্পড় দিয়েছে। আমাকে অশ্রাব্য ভাষায গালি দেয় নয়ন। সে ভেবেছিল আমি তার রাজনৈতিক ক্ষতি করবো হয়তো। নয়নের ধমকের সুর আমাকে আঘাত করে। আমি মুষড়ে পড়ি। সারারাত আমি নিজের বিছানায় শুয়ে থাকি। সেদিন কলি বাসায় ছিল না। সে হলে গিয়েছিল, তাদের কি যেন একটা প্রোগ্রাম ছিল। আমি লজ্জায় আর হীনমন্যতায় কাকলীকে রাতে একবার দেখতে যাওয়ার সাহসও পাই নি। পরদিন সকাল আমি যখন দেখতে যাই অনেক সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করে। তখন, তখন, তখন আর কিছুই করার নেই আমার। আমি আজো তার লেখা চিরকুটটা মানিব্যাগে নিয়ে ঘুরি। এই চিরকুট আসাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তার ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ফ্যানে ঝুলে পড়ার জন্য কেউ দায়ি নয়। নইলে আমি হয়তো নানা পুলিশি ঝামেলায় ফেঁসে যেতাম। আমি ওই চিরকুটটা সাথেই রেখেছি। যতোবার আমার কালীর কথা মনে হয়, চিরকুটটা আমাকে একটা করে চড় দেয়। আমার বেঁচে থাকাকে এতো মারাত্মক উপহাস করে। তোমাকে দেখার পর আমি অনেক অস্বাভাবিক ছিলাম। আমার বারে বারে মনে পড়ে যাচ্ছিল কাকলীর কথা।

 

লোকটা বোধহয় কাঁদছে। কিম্বা কাঁদার উপক্রম হচেছ তার। মাথা নিচু করে আবারো ফাইল দেখতে শুরু করে। এতোক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকা তার ছলছল চোখ জোড়া মসৃন টাকটায় গেঁথে থাকে। আমার হুট করেই কাকলীর চেহারাটা মনে পড়ে। সেদিন ইম পার্টি অফিসে ওঠার সিঁড়তে কাকলীর সাথে দেখা হইছিল। ও হুড়মুড় কইরা নামতেছিল। আমি ওর কাঁধে হাত দিয়া দাঁড় করাই। আমার দিকে না তাকায় বইলা যায় কাকলী। ও আমার গায়ে হাত তুলছে, ভাইয়ারে অশ্লীল গালি দিছে। ইম ওরে খুন করবো। বইলাই আমার হাত থাইকা ছুইটা আবার দৌড় দেয়। এরপর আর জীবিত কাকলীরে আমার দেখা হয় নাই। এখন ঝুঁকে থাকা শাহেদ রহমানে কপালে ছল ছল চোখ জোড়া নিয়া কাকলী বিরস বদনখানি ঝুলায়অ রাখছে। আমি আর দাঁড়াই না। স্বয়ংক্রিয়ের মতো আমার হাত জামার পকেটে ঢুকে যায়। সর্ন্তপণে পাঁচশো টাকার নোটটা রেখে দেই। বের হয় আসি অফিস থেকে। আজ আর বিক্রি করা হবে না। শাহেদ রহমান আমাকে ক্লান্ত কইরা দিছেন। আমার মাথায় কাকলী-বিপ্লব-রাজনীতি এতোকিছু ঘুরতেছে যে কাল রাতের জ্বর আইসা হাজির হইছে শরীরে। রাস্তায় আসতেই চোত মাসের রোদ আমারে ঝাপট মারে। হাঁটতে হাঁটতে রহমান আলির দোকানে আইসা হাজির হই। এই দোকন আমাদের জন্য ফ্রি। আমরা এমন কি রহমান আলির ভাত খাওয়া হোটেলের পেছনে তার শোযার জায়গাও ব্যবহার করতে পারি। সেখানে গিয়া আমি একটা সিগারেট ধরাই। একটু পর কায়সার আসে। বাকি দুইজনের টাকা আর অবিক্রিত পত্রিকা নিয়া আসছে সে। অফিসে গিয়া সব হিসাব নিকাশ বুঝায়া দিয়া আমি হলে যাবো। গোসলটোসল কইরা কি করবো। আজ হাকিম চত্বরে আড্ডা দেয়া যাবে। অন্য অনেক আগেই চইলা গেছে। ও কি ফ্রি থাকবো। ওর সাথে আড্ডা দিতে পারলে ভাল্লাগতো। কায়সারের কাছ থাইকা সব বুইঝা নিয়া আমি পল্টনের যাওনের উদ্দেশ্যে বাস খুঁজি। হাঁটতে হাঁটতে পাঁচশো টাকার নোটটা মনে পড়ে। শাহেদ সাহেব, কাকলী, নয়ন, তাদের হাসি কান্না সব কেমন পাঁচশো টাকায় পরণত হয়া আমার পকেটে আইসা আশ্রয় নিছে। আমি পকেটে হাত দিয়া রাখি। পাঞ্জাবির পাতলা পকেট। অনেক টাকা। তার মধ্য থেকে আমি পাঁট আঙ্গুলে ওই পাঁচশো টাকার নোটটা খুঁজি। চোতের রোদ আমারে নেশাগ্রস্ত কইরা দিতাছে। হঠাৎ দূরে আমি কাকলীরে দেখতে পাই। নাহ, অন্যরে একটা ফোন দেই। পকেট থেকে ফোন বাইর করি। অন্যর নাম্বারে ডায়াল করি। রিং হয়, ও ধরে না।

পোস্টটি ৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


গল্পটা ভালো ও সুন্দর।

শুধু লেখার ধরনটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস টাইপ। আমার এই টাইপটা পড়তে আরাম লাগে না।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


হুমমমম,

কেমন  আছেন। ধন্যবাদ গল্পটা পড়ার জন্য।

টুটুল's picture


ভালো লাগলো...
লাইক্কর্লাম

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


Money mouth

নজরুল ইসলাম's picture


গল্পটা হয়তো বুঝি নাই। ব্লগে দীর্ঘ গল্প পড়ার অভ্যাস কমে গেছে। তাই হয়তো শেষদিকে মনোযোগ দিতে পারি নাই।
আপনার সুক্ষ্ম ডিটেইলস গুলো ভালো লাগছে। কিন্তু কাকলী কাহিনীর পরেও এই পার্টির প্রতি শাহেদ রহমানের এই আগ্রহ কেন? বুঝি নাই

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


গল্পটা আসলে রাজনৈতিক, অনেক কিছুই আছে যা রাজনীতি ঘনিষ্ঠরা ভালো বুঝবে। ধৈর্য্য ধরে আমার গল্প পড়ার জন্য কৃতজ্ঞতা।

শাহেদের  আগহের কারণ আসলে তার বোনের প্রতি ভালোবাসা। তার একধরণের অপরাধবোধ। এটা হচ্ছে রাজনীতি একেক জনের কাছে একেক রকম। সাবাই একই ঢঙে এবং একই কারণে রাজনীতি করে না।

 

ভালো  থাকুন। 

লোকেন বোস's picture


প্যারা করে দিলে পড়তে সুবিধা হতো

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


প্যারা কইরাইতো দিলাম।

আসলে  ব্লগের হিসাবে বড় লেখা হয়া গেছে।

থ্যাঙ্কু 

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture

নিজের সম্পর্কে

বিষয়টা খুব জটিল।