ইউজার লগইন

চাঁদ, ঝরাপাতা আর বিকেলের পাখিদের সাথে পথচলা

রাতে হলে ফেরার সময় যখন আমি হারিয়ে যেতে থাকি তখন একটা চাঁদ প্রায়ই আমাকে সঙ্গ দেয়। তারপর ঘুমানোর জায়গাটা অ্যাভেইলেভল হলে মেঘ, রাতের চাঁদ আর মাথা জুড়ে থাকা ভাবনাগুলোকে বিদায় জানাতে হয়। ততক্ষণে চোখ মুখ বন্ধ। তখন আমার শরীর মনে অতীতের কোন আচ্ছন্নতা থাকে না। ঘুমের সময় নাকি মানুষ পুরোপুরি নাই হয়ে যায়। এটা সেটা পরিকল্পনা জড়ো করতে করতে ঘুম চলে আসে আমাকে নাই করে দেবার জন্য।
ঘুমানোর সময়টাতে যখন কম্বলটা টেনে গায়ে দেই তখন মনে হয় সব অপ্রিয় ব্যাপারগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমি বহুদূর চলে যাচ্ছি। বিজয় দিবসে এখানে ওখানে গান আর গীটারের শুব্দের সাথে করে সত্যি সত্যিই সবকিছু ছেঁড়ে ছুড়ে বহুদূরে চলে যাওয়া সম্ভব হয়েছিলো। একটা পুরনো যন্ত্রের মত আত্মবিশ্বাস নিয়ে আমি চলছিলাম। রাতভর আড্ডায় পাওয়া লিরিক্স-মিউজিক-লাল্লু শব্দগুলো মাথার ভেতরে একটা বিশেষ ফোল্ডারে যায়গা করে নিলো। সে রাতে ঘুম বলে এ তল্লাটে কেউ ছিল না, সেরেফ গল্প আর হাসি আর গান ভালবেসেই জেগেছিলাম আমরা।
একটা নিরিবিলি ফুটপাত, একঝাক মানুষের ভিড়ে কনসার্টের ধূলা অথবা রাতের আলোয় বট গাছের পাতার তল ছিল আমার জন্য যথেষ্ট। সেগুলোর সাথে এলো আরও কিছু ভাবনা, নতুন পুরনো যন্ত্রণা, আরও একটু হারিয়ে যাওয়ার তৃষ্ণার জন্ম।
এসবের মাঝে আমি ক্যাম্পাসের নিরিবিলি বিকেলে হাঁটতে থাকি আর সুন্দর সময়গুলোর কথা ভাবতে থাকি। আমার কাছে আড্ডা মানেই সুন্দর সময়। আজ বিকেলটাও এসব ভাবতে ভাবতে যাচ্ছিল। হল থেকে টিএসসি, লাইব্রেরী হয়ে ডাকসুর বারন্দায় একটু তাকানো। আমি হাঁটছিলাম। বারান্দাটা তখন ছিল কোলাহলশুন্য, শুধু বিকেল বেলার কয়েকটা পাখির ডাক আমার কানে আসছিল। আর সেখানে আনমনে বসে খাতায় কি যেন লিখছিলো একটা মেয়ে। পৌষের বিকেলে তার গায়ে একটা চাদর জড়ানো, সে যখন গালে হাত দিয়ে চুপচাপ বসে কবিতার উপমা খুঁজছিল তখন এক গোছা চুল খুব আবেগ নিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে যাচ্ছিল।
আমি হেঁটে চলে গেলাম। আমার খুব ইচ্ছা করছিল তার কানে কানে গিয়ে দুটো কথা বলতে, কিন্তু তাকে বিরক্ত করতে সাহস পেলাম না। কিছুক্ষণ পরে যখন সেই পথ দিয়ে আবার ফিরে আসতে হল, দেখলাম সে তখনও সেখানে বসে। সেই সিঁড়িটিতে। যেখানে আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে আমরা পুড়িয়ে ফেলেছি অনেকগুলো রাত।
হাতে তখনও একটা সিগারেট জ্বলছে, আমি সেখানে গিয়ে বসার তিন মিনিটের মাথায় সে উঠে চলে গেল। তখনই ব্যাপারটা আমাকে অশান্ত করে দেওয়া শুরু করল। আমি হন্যে হয়ে তাকে খুঁজতে লাগলাম সে কেন উঠে গেলো সেটা জিজ্ঞাসা করার জন্য। খুঁজে পেতে কিছুটা পেরেশানি হল, কিন্তু প্রশ্নের উত্তরের বদলে আমি প্রশ্নবিদ্ধ হলাম- আপনি বসায় আমি উঠে যাব কেন? আমি উঠে গেলে সমস্যা কি ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমি আসলে যেটা জানার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম সেটা ছিল তার লেখার বিষয়বস্তু। পৌষের বিকেলে একা মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখে আমার কমবয়সী মন ভেবেছিল, সেও আমার মত বিকেলবেলার পাখিদের ডাক শুনতে শুনতে কবিতার লাইন খুঁজছে। কিন্তু সে আমার মত তৃষ্ণার জন্ম দিচ্ছিল না হয়তো, নিশ্চয়ই পান করার জলের অফুরন্ত সঞ্চয় ছিল তার। ওই যৌক্তিক প্রশ্নগুলোতে বিদ্ধ হবার সময়ে সামনে তাকিয়ে দেখলাম তার বন্ধু চলে এসেছে।

আর আমিও পথ চলতে লাগলাম। আমার সঙ্গে বিকেলের পাখিদের কলতান আর আর ঝরা পাতা।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


টিপ সই

মীর's picture


একটা নিরিবিলি ফুটপাত, একঝাক মানুষের ভিড়ে কনসার্টের ধূলা অথবা রাতের আলোয় বট গাছের পাতার তল ছিল আমার জন্য যথেষ্ট। সেগুলোর সাথে এলো আরও কিছু ভাবনা, নতুন পুরনো যন্ত্রণা, আরও একটু হারিয়ে যাওয়ার তৃষ্ণার জন্ম।

এই লেখাটার ক্ষেত্রে এক কথায় একটা রায় দেয়া যায়- অপূর্ব!

Welcome টু এবি ব্রাদার। লেখালেখি চলুক পুরোদমে।

নিয়োনেট's picture


ধন্যবাদ মীর ভাই। Smile

আরাফাত শান্ত's picture


ভালো লাগলো!

নিয়োনেট's picture


ধন্যবাদ শান্ত ভাই। Smile

তানবীরা's picture


ভাল লেগেছে, বেশ

নিয়োনেট's picture


ধন্যবাদ আপু। লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে জেনে আমারো খুব ভালো লাগলো। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিয়োনেট's picture

নিজের সম্পর্কে

অতীতের ভিত্তিতে নিজেকে ডিফাইন করা অর্থহীন। আর আগামীও অদেখা। বর্তমানে আমি কী সেটা যদি এখন বলি, সেই তথ্য খানিক সময় পরে ইনভ্যালিড হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষ প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। ফলে, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলাটা কঠিন কাজ।