ইউজার লগইন

এই দিন আর রাত একটা ফাঁকা রাস্তার মত

বেশ কিছুদিন ধরে মনের ভিতরে ভাবনা জমে আছে। সেগুলোতে ধুলোও জমেছে বিস্তর। কাজে-অকাজে দিনটা কেটে যাবার পর রাত হলে হটাৎ করে ঠাণ্ডাটা যখন জেঁকে বসে তখন অলসতা আমাকে মেরে ফেলার উপক্রম করে। তার মধ্যে ইদানিং শৈত্যপ্রবাহ নামক শীতকালীন বাতাসটা রাতে-বিকেলে গায়ে লেগে হিম শিহরণ জাগাচ্ছে প্রায়ই।
সেই বাতাসে হেঁটে হেঁটে হলে ফিরি। পাশ দিয়ে রিক্সা চলে যায়, জামাকাপড়ে প্যাকেট হওয়া মানুষগুলো আমার গতিবিধি দেখে উদ্দেশ্যহীন মনে করে হয়ত। মাঝে মাঝে তাদের সাথে আমার দৃষ্টিবিনিময় হয়। তুষারের দেশে পথ পাড়ি দেবার সময় এক পথিক আরেক পথিকের সাথে হয়ত এভাবেই দৃষ্টিবিনিময় করে হয়ত।
ফুলার রোডের ধার ঘেঁষে আমি গন্তব্বে পোঁছানোর চেষ্টা করি। কয়েকমাস আগে করা স্টেনসিল গ্রাফিতিটাকে আরও একরাত টিকে থাকতে দেখে বেশ জোর পাই শরীরে। আরও একটু হাঁটলেই বড় তেতুল গাছটা। কোনো একরাতে তেতুল গাছের কাণ্ডটা দেখে মনে হয়েছিল অনেক মানব শিশু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। প্রায় রাতেই হলুদ আলোয় তেতুল গাছটায় ওদের শরীরের আকৃতি দেখতে পাই আমি। হলের দেয়ালের একটা জায়গার খানিকটা জুড়ে লতানো ঝোপঝাড়গুলো দেয়ালের চিকাদের বেশ যত্নে ছায়া দিত, কালকে দেখলাম কারা যেন কেটে ফেলেছে সব। আমার প্রিয় চিকাটাকে নগ্ন দেখে ওদের গাল না দিয়ে পারলাম না।
রাতের আলোয় হাঁটার সময়ে পীঠে ব্যাগ আর গায়ের সোয়েটারে নিজের ছায়া দেখে ছোটবেলার বইয়ে আঁকা মহাকাশযাত্রীর কথা মনে পড়ে যায়। আড্ডা শেষে তখন একমাত্র গন্তব্য ক্যাপস্যুল, আমার ছোট্ট শোবার যায়গাটা। সেখানে রাবারের মত একটা কম্বল আছে। সেটা দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দারুণ আরামে শরীরটাকে মুড়ে ফেলা যায়। ক্যাপস্যুলে ঢুকে আমি অনন্তকালের মত একটা সময় পার করি। সাধারনত এই সময়ে কোন একটা ভাবনা আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
কাল রাতেও সকালের কাজের পরিকল্পনা আর ঘুম থেকে উঠতে না পারার অনিশ্চয়তা মাথায় নিয়ে ক্যাপস্যুলে ঢুকে গেলাম। কিন্তু মাঝরাতের তিন পেগ হুইস্কির ঝিরঝিরে নেশাটা আমার মধ্যে রাত জাগার দুষ্টু বুদ্ধি ঢুকিয়ে দিয়েছিলো।
ডিসেম্বর মাসটা বছরের নানা ঘটনা অঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এ বারের বছরের শেষটা আমাকে খানিক বদলে দিয়েছে । আমার চার পাশের মানুষগুলো আগের মতই ওঠে বসে, চলে ফেরে। আর আমি নীরব থাকার স্বভাবটাকে গভীর যত্নে লালন করতে থাকি। আমি জানি এভাবেই আরও একটা বছর কেটে যাবে হয়ত। কোন এক ডিসেম্বরের শীতে আবার বছরটা ফুরিয়ে আসবে। আমি হিসেব করব এখনো জীবনের টু ডু লিস্টের কত কি করার আছে বাকি।
কাল বিকেলে এই শহরের এক শপিং মলে এক সেলসগার্লের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল অনেকক্ষণ। আমার তাড়া ছিল। তবুও কিছুক্ষণ সেই আলো ঝলমলে পরিবেশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। টুকটুকে চেহারার মেয়েটির শরীর বিরাট কোনো পর্বতের মত করে মেঘেদের হাতছানি দিচ্ছিলো। সেই আহবানে লোকগুলো তার আশেপাশে নির্লজ্জ ভীড় জমাজ্ছিল। বোধহয় সেই হাতছানি অনুভব করেছিলাম আমিও। শাড়ি পরলে মেয়েটিকে কতোটা ভালো লাগবে তা দেখার খুব একটা ইচ্ছা মাথায় ভর করেছিলো ক্যাপস্যুলে ঢোকার পর। কোন একদিন আমি সারা সন্ধ্যা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব। তারপর তার কাজ শেষ হলে এক কাপ কফির আমন্ত্রন জানাবো। এসব ভাবতে ভাবতে কখন জানি বছরের শেষ সকালটায় পৌঁছে গিয়েছিলাম।
আরও অনেক পরিকল্পনা আমার টু ডু লিস্টটা বেশ লম্বা করে ফেলেছে। লিস্টটা আমার মানিব্যাগের কাগজ পত্রের ভীতরে বাস করে। কাউকে দেখাইনি সেটা। জীবনের হিসাব নিকাশ করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড় ভাই বলেছিলেন ব্যস্ততাই আমাদের দরকার। মাঝে মাঝে আমি লিস্টটার দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হবার তোড়জোড় চালাই। সবগুলো ইচ্ছা পূর্ণ করতেই হবে আমাকে। অন্তত কয়েকটা। এখনো সামনে কত পথ হাঁটা বাকি। তাই নিমিষেই মুছে ফেলছি সব ক্লান্তি।

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এই তো জীবন..

ভালো লাগলো আপ্নার কথকতা,
ভালো থাকুন।

নিয়োনেট's picture


ধন্যবাদ।
নিজের কথাগুলো বলা আর অন্যদের কথা শোনার জন্যই তো বেঁচে থাকা।
আপনিও ভালো থাকুন। বেঁচে থাকুন পুরোপুরি।

মীর's picture


ফুলার রোড, ক্যাম্পাসের চিকা, গ্রাফিতি, হুইস্কি...বাহ!

এই বিষয়গুলা নিয়ে বহুদিন পর কাউকে লিখতে দেখছি। অসাধারণ হচ্ছে ব্রাদার। লেখালেখি চলুক পুরোদমে Smile

নিয়োনেট's picture


থ্যাংক ইউ ব্রাদার। আপনার লেখা কই ভাই?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিয়োনেট's picture

নিজের সম্পর্কে

অতীতের ভিত্তিতে নিজেকে ডিফাইন করা অর্থহীন। আর আগামীও অদেখা। বর্তমানে আমি কী সেটা যদি এখন বলি, সেই তথ্য খানিক সময় পরে ইনভ্যালিড হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষ প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। ফলে, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলাটা কঠিন কাজ।