ইউজার লগইন

চৈত্রঃ ঝিঁঝিঁর গুঞ্জনে ডুবে যাওয়া বিষন্ন দুপুর

কাল রাতেও ভেবেছিলাম তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাবো। কিন্তু রাত দশটার দিকে প্রিয় ক্যাম্পাসে পা রাখতেই ফোন বেজে উঠলো- দ্রুত চলে এসো, সোনালি শিশির ফুরিয়ে যাচ্ছে।

শাহবাগ থেকে জোর কদমে হাঁটা দিলাম। গিয়ে দেখি এখানে ওখানে আসর জমেছে। দূর থেকে শুনতে পেলাম রনি ভাইয়ের গলা- আমার ভালবাসা পিরামিড, আমার দুঃখগুলো নীলনদ। লাইনগুলো সেই যে ঢুকেছে মাথায় আর বের হবার নাম নেই।

পাশেই আর এক দল পাহাড়ে স্থায়ী নিবাস করা সংক্রান্ত এক তুমুল আলোচনায় মগ্ন ছিলো। আমি কিছুক্ষণ ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আর মনে মনে ঠিক করে ফেললাম, এবারের বিজুতে ওদের সাথে আমিও যাচ্ছি।

হৈ হল্লা করতে করতে কালো রাস্তা ধরে ভাত খেতে গেলাম। রুমে ফিরতে ফিরতে রাত ২ টা। কম্পিউটারটার কি যে হয়েছে। প্ল্যানেট আর্থ এর জঙ্গল পর্বটা দেখতে দেখতে তিন বার বন্ধ হয়ে গেলো কোনও কারন ছাড়াই। ৩ টার সময় ধরা দিলাম বিছানার কাছে।

প্রতি রাতে ঘুমানোর সময় সকালে ওঠার সংকল্প করি। প্রতিদিনই হই অকৃতকার্য আর আলসেমির কাছে হেরে যাবার গ্লানি নিয়ে দিনের বাকিটা সময় কাটে। তবুও নিজেকে শাস্তি দিতে পারি না। মাঝে মাঝে হেরে গিয়েও জিতে যাই, আলসেমি করার সুযোগ থাকলে কেন করবো না?

কিন্তু আলসেমিকে প্রশ্রয় দেবার সুযোগ একেবারেই ছিলো না আজকে। তবুও পড়ে পড়ে ঘুমালাম দুপুর অব্দি। সকাল থেকে কয়েকটা ফোন এসেছিলো। অফিস জানতে চাইলো বিশেষ প্রতিবেদনটার অগ্রগতি। ক্লাসে যাবার অজুহাত দিয়ে পার পেলাম আজকের দিনটা। দুপুরে যখন রুমমেটরা ক্লাস থেকে ফিরে এসে হল্লা শুরু করলো তখন ভাবলাম ঢের হয়েছে আলসেমি।

সোয়া দুইটায় ক্লাস। কিন্তু কি এক কারনে ক্লাসে যেতে একদমই ইচ্ছা হল না আজ। ব্যালকনিতে বসে পত্রিকাটা হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে লাগলাম। যেন সারাদিনে কোনও কাজ নেই আমার।

স্নান করার পর আলসেমি অনেকটা কেটে যায়। তাই স্নান আর দুপুরের খাওয়া সেরে হল থেকে বের হলাম। তাড়াতাড়ি হাঁটার কথা ছিলো। শুনতে পেলাম চৈত্র মাসের ঝিঁঝিঁপোকাদের গুঞ্জন। সন্ধ্যাবেলার ঝিঁঝিঁপোকার ডাকের মত শুনতে, কিন্তু অনেক জোরালো।

ক্লাস শুরু হতে তখনো দশ মিনিটের মত বাকি। আমি থেমে গেলাম। গুঞ্জনটা চমৎকার। গরমকালে আমাদের ছোট্ট গ্রামে গোয়াল ঘর আর পুকুর পাঁড়ের নারকেল গাছগুলো থেকে শব্দটা ভেসে আসতো। এতো বছর পরে মনে পড়লো শৈশবের দুপুরবেলার কথা।

এতো বছর পর জগন্নাথ হল আর শামসুন্নাহার হলের মাঝখানের রাস্তাটায় মনিরুজ্জামান বাদলের ভাস্কর্যের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আমি সবকিছু ভুলে গেলাম। মাথার ওপরে চিলের উড়াউড়ি।মনের ভিতরের জঞ্জাল সরে গিয়ে জায়গা করে দিলো দাদুর কাঁধ আর ঠাকুরমার শাসনের দিনগুলোকে।

ক্লাসের প্রক্সি দেবার জন্য দুই এক জনকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু ফোন ধরলো না কেউ। দুটো ক্লাস মিস করে টিএসসির পাশ ঘেঁষে যাবার সময়ও কাটেনি স্মৃতিকাতরতা। কলেজ বন্ধুর সাথে দেখা হওয়াতে আরও কাতর হয়ে পড়লাম।

অফিসের সময় হতেই মাথার ভেতরে চলতে লাগলো অস্থির অনুভূতির বিচরন। ক্লাস মিস করা গেলেও অফিস মিস করার উপায় নেই। কিঞ্চিত বাসে ঝুলে ঝুলে পৌঁছে গেলাম কাওরানবাজার।
আগের দিন বিদেশে পড়তে না যাবার আক্ষেপের কথা লিখেছিলাম ম্যারিয়েনকে। অফিসে পৌঁছে মেইল খুলেই চিঠির উত্তর পেলাম। সে লিখেছে, হতাশ হবার কোনও কারন নেই, ব্যাচেলর শেষ হতেই চট জলদি এপ্লাই করো। চীন সরকার নাকি স্কলারশিপ হিসেবে টিউশন ফি, হোস্টেল খরচ এমনকি প্লেনের ভাড়াও দেয়।

কিন্তু অলস মনটা নিয়ে আমি কোনও ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। এই ভাবি চাকরীটা ছেঁড়ে দেবো তো পরক্ষনে আবার চাকরি আর পড়াশোনা একসাথে চালিয়ে যাবার তাগিদ অনুভব করি।
আলসেমিকে অনেক সুযোগ দিয়েছি সারাদিনে। কাজের কাজ তাতে কিচ্ছু হয় নি। এখন অফিসের অন্যান্যরা যখন খবর লিখতে ব্যস্ত তখনও আমি উদাস। এই লেখাটার শিরোনাম খুঁজে পাচ্ছিলাম না। জীবন বাবুর কাছে গিয়ে একটা কবিতা ভালো লেগে গেলো-

অলস মাছির শব্দে ভ’রে থাকে সকালের বিষণ্ণ সময়,
পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ ব’লে মনে হয়।
সকল পড়ন্ত রোদ চারিদিকে ছুটি পেয়ে জমিতেছে এইখানে এসে,
গ্রীষ্মের সমুদ্র থেকে চোখের ঘুমের গান আসিতেছে ভেসে,
এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেক দিন-
জেগে থেকে ঘুমাবার সাধ ভালোবেসে।

ফাল্গুন প্রায় ফুরিয়েছে। চৈত্র এসে গেলো বলে! আমার বেলা বয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে অবাধ্য মনটাকে নিয়ন্ত্রনে আনার সময় এসেছে। কেননা, কাল থেকে আর আলসেমি করার সুযোগ নেই, সকালে ক্লাস করতে হবে আর তারপর ছুটতে হবে খবর জোগাড় করতে।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


সুন্দর লেখা!

আহসান হাবীব's picture


ভাল লাগল

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


বাহ! চমত্‍কার লেখনী আপনার। মুগ্ধ হয়ে পড়ার মত লেখা, ভালো লাগলো অনেক।

নিয়োনেট's picture


পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। কিন্তু আমার মনে হয় না আমার লেখা মুগ্ধ হয়ে পড়ার মত কোনো কিছু। আপনাদের ভালো লেগেছে শুনে অবাক হতে হল। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নিয়োনেট's picture

নিজের সম্পর্কে

অতীতের ভিত্তিতে নিজেকে ডিফাইন করা অর্থহীন। আর আগামীও অদেখা। বর্তমানে আমি কী সেটা যদি এখন বলি, সেই তথ্য খানিক সময় পরে ইনভ্যালিড হয়ে যাবে, যেহেতু মানুষ প্রতি সেকেন্ডে বদলায়। ফলে, নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলাটা কঠিন কাজ।